Thursday, 31 October 2024

আপোষ করলে খালেদা জিয়া আজ পর্যন্ত যা যা হারিয়েছেন, কিছুই হারাতে হতো না।

আপোষ করলে খালেদা জিয়া আজ পর্যন্ত যা যা হারিয়েছেন, কিছুই হারাতে হতো না। কিচ্ছু না। সেই এরশাদের সময় থেকে শুরু। মাত্র ২০ কোটি টাকার কাছে বিক্রি হয়ে হাসিনা পাতানো ইলেকশনে গেল। খালেদা গেলেন না। বাংলাদেশের মানুষ অবাক হয়ে দেখলো, সাধারণ একজন গৃহবধূ কোন ফাঁকে যেন হয়ে উঠেছেন অসাধারণ এক রাজনীতিবিদ। যাকে ভাঙা যায়, মচকানো যায় না। ১/১১ তে হাসিনা দেশ ছাড়লেন। খালেদা ছাড়েননি। তারেক রহমানের উপর অকথ্য নির্যাতন চললো। মা হিসেবে খালেদা যদি ১/১১ র সরকারের সাথে আপোষ করেও বসতেন, আমি একটুও দোষ দিতাম না। হাজার হলেও তিনি একজন মা। নিজের সন্তানকে বাঁচানোর অধিকার তাঁর আছে। খালেদা সেটাও করলেন না। তারেককে ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের মা। জেদ ধরে বসে থাকলেন, মাইনাস টু ব্যর্থ হয়ে গেল। এরশাদের মতো ১/১১ র সকল কুশীলব আবারও জানলো এই মহিলার জেদ আছে। প্রণব মুখার্জির সাথে বৈঠকটা ছিলো ভারতের সাথে খালেদার শেষ রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ। সম্ভবত জামায়াতে ইসলামির হরতাল ছিলো ঐ দিন। যেতেই পারতেন। গেলেন না। খালেদা নিজেও জানতেন, প্রণবের বৈঠক প্রত্যাখ্যান করার ফলাফল কী হতে পারে। তাও করলেন। সাফ জানিয়ে দিলেন, হরতালের প্রোগ্রাম আছে। তিনি বের হবেন না। শাহবাগের বিরোধিতা খালেদা শুরু থেকেই করেছেন।শাপলার পক্ষে ছিলেন। ৪ মেতে খালেদা চেয়েছিলেন অবস্থান কর্মসূচ দেবেন। ঢাকার কয়েকজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার কারণে খালেদা ঐদিন কর্মসূচি থেকে সরে আসেন। অথচ সরকারের পতন ৫ মেতেই হতে পারতো। ২০১৪ ইলেকশনে বিএনপি গেলে খালেদাকে জেলে যেতে হতো না। হাসিনা নার্ভাস ছিলেন। সালমান এফ রহমানসহ বহু নেতা বিদেশ চলে গেছিলেন। হাসিনা ইভেন খালেদাকে ৫ টা মন্ত্রনালয়ের ভাগ দিতেও চেয়েছিলেন। অফারটা নিলে বিএনপি সরকারে না আসলেও অন্তত ১০০ টা সিট নিয়ে বিরোধী দলে বসতে পারতো। খালেদার জেলে যেতে হতো না। বাট মানুষের ভোটে যে নেত্রী আজ পর্যন্ত একবারও হারেননি, তিনি সাজানো ভোটে কেন যাবেন? গেলেন না। বললেন, কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট দাও। বালুর ট্রাক দিয়ে বন্দি করা হলো খালেদা জিয়াকে। সেই বালুর ট্রাক সরাতে কেউ আসলো না। বোঝা গেল, খালেদার এই সিদ্ধান্তে বিএনপির সিনিয়র নেতারা নাখোল ছিলেন। তারা সিট চেয়েছিলেন। খালেদা জিয়া চাননি। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি ব্যর্থ হলো। নেতাদের কিছুই হলো না। শুধু জনি ১৯ টা গুলি খেয়ে মরে গেলেন, খালেদা জিয়া শুধু জেলে চলে গেলেন। হাসিনার নোংরামি সমন্ধে খালেদার অজানা ছিলো না। নিজের দলকেও কি খালেদা কম জানতেন? যে দলের বুড়ো নেতারা তাঁর বাসার সামনের বালুর ট্রাক সরাতে পারে নাই, সেই নেতারা তাকে যে জেল থেকেও বের করবে না, খালেদা জিয়া ভালো করেই জানতেন। জানতেন, জেলে তাকে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবে না, বরং বিষ দিয়ে মেরেও ফেলা হতে পারে। সবকিছু জেনে বুঝেই খালেদা জেলে গিয়েছিলেন। কেন? যাতে নিজের যা হয় হোক, দলের রাজনীতিটা তবুও বাচুক। খালেদা চাইলেই লন্ডন চলে যেতে পারতেন,। তখন নিজে বাঁচতেন, তবে দলের রাজনীতি শেষ হয়ে যাইতো। হাসিনা বলতো, দেখেছো? বিচারের ভয়ে পালিয়েছে। খালেদা নিজেকে কুরবানি করে দলটাকে বাঁচানোর ডিসিশন নিলেন। আওয়ামীলীগ নিয়ে মির্জা ফখরুল, রুমিন ফারহানা বা আমির খসরুরা যখন আওয়ামীলীগের ভাষায় কথা বলে, আমার অবাক লাগে না। এরাই তো তারা, যারা খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে সরকারের কাছে প্লট চেয়েছে। এরা তো তারা, যাদের পরিবার ছিলো, ব্যবসা ছিলো, মাঝেমধ্যে জেল ছাড়া যাদের আর কোন ক্ষতি হাসিনা করেনি। ক্ষতি হয়েছিলো খালেদা জিয়ার। স্বামী হারিয়েছেন কম বয়সে, শেষ পর্যন্ত ছেলে নাতি কাউকেই তো পেলেন না। আর ক্ষতি হয়েছে নুর বা জনির মতো তৃণমূলের নেতা কর্মীদের। আজ যারা আওয়ামীলীগের পক্ষে কথা বলতেছে, ফখরুল বা রুমিন, এরা কৃতজ্ঞতা বশেই বলছে। আওয়ামীলীগ তাদের কম তো দেয় নাই। আমার দুঃখ একটাই। সম্ভবত একটুও দেরিই হয়ে গেল। খালেদা জিয়া যদি একটু সুস্থ থাকতেন। একটাবার যদি রাজনীতি করার একটুখানি সুযোগ এই মানুষটা এখন পেতেন, সংবিধান, রাষ্ট্রপতি বা আওয়ামীলীগ নিয়ে বিএনপির এই মাতলামি আর দেখতে হতো না। বরং খালেদা জিয়া একেবারে রাইট ডিসিশনটাই নিতেন। আমরা শুধু জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দূরদুর্শিতার কথাই বলি। অথচ খালেদা জিয়াও কি দূরদর্শী ছিলেন? আজ থেকে দশ বছর আগেই এই মহিলা বলেছিলেন, আওয়ামীলীগ পচে গেছে। এই আওয়ামীলীগ একদিন দুর্গন্ধ ছড়াবে। এরচে একুরেট কোন প্রোফেসি গত ১০ বছরে কোন রাজনীতিবিদ করতে পেরেছিলেন? আওয়ামীলীগ আর বিএনপির মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ওদের হাতে আছে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের আছে স্বাধীনতার পতাকা। সারাটাজীবন লড়াই করে খালেদা জিয়া বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন, ঢাকা আর দিল্লির প্রশ্নে হাসিনা যতবার দিল্লির কাছে দাসত্বের দস্তখত দিয়েছেন, খালেদা তত শক্ত করে ঢাকাকে আকড়ে ধরেছেন। ভারতও জানতো, এই মহিলাকে জেলে ঢোকানো যায়, কিন্তু একে কেনা যায় না। শেষদিকে খালেদা জিয়ার কিছুই ছিলো না। পদ ছিলো না, দলের অতো সাংগঠনিক শক্তি ছিলো না, সন্তানরা কাছে ছিলো না, সকল ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করা ছিলো, এমনকি ঢাকার বাড়িটাও ছিলো না। খালি ছিলো ঐ পতাকাটা। এমনকি চরম শত্রুও বলতে পারবে না, খালেদা জিয়া একবারের জন্যও কারো কাছে দেশ বিক্রি করেছেন। আজকালকার প্রজন্ম যখন বলে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে কোন মহিলাকে চাই না। তখন কষ্ট হয়।ওদের দোষ দিই না। ওরা মহিলা প্রধানমন্ত্রী বলতে চেনে হাসিনাকে। দেশ বেঁচে খাওয়া ছাড়া যার আর কোন কাজ ছিলো না। মুখের ভাষা ছিলো তৃতীয় শ্রেণীর। নোংরা কথার মানুষ ছিলেন। এই প্রজন্ম একটাবারের জন্য যদি খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পেত!! বুঝতো, সমস্যাটা ছেলেতে বা মেয়েতে না। সমস্যাটা শিরদাড়ায়। বহু পুরুষ নেতা, এরশাদের মতো তথাকথিত শক্তাশালী জেনারেল যখন দিল্লির তাবেদারি করেছে, খালেদা জিয়া তখন দিল্লির বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খালেদা জিয়াকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে বাইরে নেওয়া হচ্ছে চিকিৎসার জন্য। মহান আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা দান করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিক। রাজনীতি থেকে খালেদার আর পাওয়ার কিছু নাই। বাট খালেদা জিয়ার থেকে এখনও আমাদের পাওয়ার অনেক কিছুই আছে। এখনও যদি চোখ বন্ধ করে কারো উপর ভরসা করা যায়, বিশ্বাস করা যায়, স্বাধীনতার পতাকার জিম্মাদারি দেওয়া যায়, সেটা একমাত্র খালেদা জিয়াকেই করা যায়। আর কাউকে না।

Wednesday, 30 October 2024

আমাদের পূর্বপুরুষরা....

আমাদের পূর্বপুরুষরা কৃষক ছিলেন, শ্রমিক ছিলেন। থাকতেন মাটির কাঁচা ঘরে। অর্থাভাবে-অন্নাভাবে কখনও-সখনও উপোসও করতেন। পরতেন মলিন পোশাকপরিচ্ছদ। আমাদের বাবারা চাইলেন আমরাও যেন পূর্বসূরিদের মতো শ্রমিক না হই, আমাদেরকেও যেন মাটির ঘরে থাকতে না হয়, আমরা যেন পাকা ঘরে থাকি, যেন পেট পুরে তিনবেলা খেতে পাই। বাবারা আমাদেরকে নিয়ে বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে করে গ্রাম ছাড়লেন, মফস্বলে এনে পড়াশোনা করালেন, টিনশেড ঘরে রাখলেন। আমরা পড়াশোনা করলাম, মফস্বল ছাড়লাম, উচ্চশিক্ষার্থে মহানগরে এলাম, স্নাতক হলাম, স্নাতকোত্তর হলাম; পূর্বপুরুষদের বিশাল বাড়ি ছেড়ে অ্যাপার্টমেন্ট নামক কংক্রিটের বস্তিতে উঠলাম, কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্ত হলাম, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্ম (আসলে কেরানিগিরি) করে জীবিকা নির্বাহ করা শুরু করলাম, পোশাকে-আশাকে ফিরিঙ্গিদের মতো ফিটফাট হলাম, শরীরে-মনে আভিজাত্য এল। আমাদের পা আক্ষরিক অর্থেই আর মাটিতে পড়ল না, গা আর বৃষ্টিতে ভিজল না। আমরা মাটির ঊর্ধ্বে উঠে গেলাম, বৃষ্টির ঊর্ধ্বে চলে গেলাম। সর্বোচ্চ স্মৃতিশক্তি প্রয়োগ করেও আমরা মনে করতে পারি না— আমরা সর্বশেষ কবে মাটিতে হেঁটেছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম বা ঘাসের ছোঁয়া পেয়েছিলাম। এমনকি, নিজের কেনা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদের চাবিও আমাদের কাছে থাকছে না, আমাদের মিলছে না নিজের মালিকানাধীন ভবনেরও ছাদে যাওয়ার অবাধ সুযোগ। মানুষ চাঁদে যাচ্ছে, আমরা পারছি না ছাদেও যেতে। আমাদের দাদারা ছিলেন সুন্দর খাঁ, সুরুজ আলি কিংবা ময়েজুদ্দিন। আমরা হলাম ফাহাদ ফারাজ অনন্য, ইফতেখার ইশমাম ইশতি কিংবা আহনাফ মুনতাসির উচ্ছ্বাস। আমাদের দাদিরা ছিলেন সূর্য ভানু, করিমন বেওয়া কিংবা জরিতন নেছা। আমরা হয়েছি আনিকা আজিজ অর্নি, মালিহা তাবাসসুম অবন্তী কিংবা সেগুফতা শেহরিন আনিলা। আমাদের কারো-কারো নামের আগে-পিছে-মাঝে যুক্ত হতে লাগল এসএম, কেএম, এবিএম, আ ক ম, আ ন ম, আ আ ম স। আমাদের নাম ক্রমশ শক্ত হতে লাগল, কাটখোট্টা হতে লাগল, দুর্বোধ্য হতে লাগল। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা সোজাসাপটা নাম ধারণ করেই একটা জীবন কাটিয়ে দিয়ে গেছেন, তাতে তাদের বেঁচে থাকতে সবিশেষ অসুবিধে হয়নি। আমরা আলুভর্তার নাম দিয়েছি ম্যাশড পটেটো উইথ গ্রিন চিলি, পুদিনা পাতা দেওয়া লেবুর শরবতের নাম দিয়েছি মিন্ট লেমনেড, ভাতের মাড়ের নাম দিয়েছি চিকেন থাই সুপ। নতুন নামের খাদ্যের দাম শতগুণ হলেও পুরোনো সেই স্বাদ আমরা আর পাচ্ছি না। আমরা গায়েহলুদকে বানিয়েছি মাহেন্দি নাইট, কনে নাওয়ানোর নাম দিয়েছি ব্রাইডাল শাওয়ার, বউভাতকে বিদায় করে আমদানি করেছি রিসিপশন। আমাদের নামাজ, রোজা, রমজান, সেহরি, জিলাপি হয়ে গেছে যথাক্রমে সালাত, সাওম, রামাদান, সুহুর, জালেবি; কিন্তু হারিয়ে গেছে আমাদের ভাবগাম্ভীর্য, হারিয়েছে আধ্যাত্মিকতা, হারিয়েছে সহজিয়া জীবনবোধ; বিনিময়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে জেঁকে বসেছে উত্তুঙ্গ উগ্রবাদ আর পৌনঃপুনিক প্রদর্শনবাদ। কায়িক পরিশ্রম না-করতে না-করতে আমাদের দেহে পুরু চর্বি জমল, সার্বক্ষণিক রোগবালাই বাসা বাঁধল, ডায়াবেটিস হানা দিলো। চিকিৎসকরা আমাদের খাবারের পরিমাণ বেঁধে দিলেন— দিনে ছয় কাপ ভাত, চারটা রুটি, এক কাপ শবজি, একটা শশা, দেড়টা গাজর, আড়াইটা আঙুর। চিকিৎসকরা আমাদেরকে প্রতিদিন দৌড়াতে বলে দিলেন। আমরা স্টপওয়াচ চালু করে হাফপ্যান্ট পরে ভুঁড়ি নাচিয়ে রাজপথে দৌড়াতে লাগলাম, জিমনেশিয়ামে গিয়ে বাঁদরের মতো এ-ডাল ও-ডাল ঝুলতে লাগলাম, বুকডনের নামে নাকে খত দিতে লাগলাম; আমরা সেসবের গালভরা নাম দিলাম— 'ওয়ার্ক আউট', 'ক্যালরি বার্ন'। শহরে থাকতে-থাকতে ক্লান্ত হয়ে আমরা দু-তিন মাস পরপর ছুটতে লাগলাম রিসোর্টে। একটু গাছপালা আছে, ডোবার মতো একটা হাজামজা পুকুর বা পচা-গলা সুইমিংপুল আছে, ছাদ বা বেড়া খড়কুটোর, সন্ধ্যার পর গোটা দশেক জোনাকির দেখা পাওয়া যায়, বৃষ্টি হলে চার-পাঁচটা ব্যাঙ ডাকে— বেছে-বেছে আমরা এমন রিসোর্টে যাওয়া শুরু করলাম, ভাড়া গুনতে লাগলাম রাতপ্রতি দশ হাজার। রিসোর্টে লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক দিয়ে ভাত খেয়ে বিল দেওয়া শুরু করলাম বেলাপ্রতি মাথাপিছু একহাজার; বারবিকিউ নামক মাংসপোড়ার পেছনে ঢালতে লাগলাম আরো হাজার-হাজার। বারবিকিউর সাথে আমরা খাই তেল-ছাড়া পরোটা, অথচ আমাদের পূর্বপুরুষদের স্বপ্ন ছিল বড়লোক হয়ে একদিন তারা তরকারিতে ইচ্ছেমতো তেল খাবেন। আমরা— উত্তরসূরিরা তরকারিতে তেল খাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করেছি, কিন্তু আমাদের পাকস্থলী তেল সইছে না। খাওয়ার জন্য আমরা বড়লোক হলাম; বড়লোক হওয়ার পর আমাদের কারো-কারো ক্ষুধাই লাগছে না, ক্ষুধা লাগানোর জন্য চিকিৎসকদের পেছনে আমরা ঢালছি কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা। যে-পেট পুরে খাওয়ার জন্য আমরা শহরে এসেছিলাম বা বড়লোক হয়েছিলাম; আমাদের সেই পেটে এখন আর খাবারই সয় না, প্রকৃতি আমাদের জিহ্বা কেড়ে নিয়েছে, মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়েছে, এখন খাবার আমাদের খেতে হয় কাপ মেপে। আমাদের বাবা-মায়েদের পাতে মাংস জুটত না, মাসে একবার বাজার থেকে একজোড়া কবুতর বা এক পোয়া গোমাংস কিনে এনে এক কেজি আলু মিশিয়ে রেঁধে পাঁচ সদস্যের পুরো পরিবার একবেলা মেতে উঠতাম মাংস-উৎসবে। এখন আমরা মাংস খেতে পারি না হার্ট অ্যাটাকের আতঙ্কে। মাংস এখন রেফ্রিজারেটরে পচে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা খেতে পারছি না। মাংস আমাদেরকে ছেড়ে গেছে। আমরা শারীরিক পরিশ্রম থেকে বাঁচার জন্য পড়াশোনা করেছিলাম; কিন্তু প্রকৃতি আমাদেরকে বাধ্য করছে কুকুরের মতো জিভ বের করে নোংরা রাস্তায় দৌড়াতে, জিমনেশিয়ামে ঝুলতে, বাটখারা তুলতে, বস্তা কিলাতে। কুলিরা চাউলের আড়তে যা যা করেন; জিমনেশিয়ামে আমরা তা-ই করছি, করে গর্বের সঙ্গে সেসবের ভিডিও দিয়ে রিল বানাচ্ছি, বানিয়ে দেখাচ্ছি— আমরা কে কত স্বাস্থ্যসচেতন, কে কত অভিজাত, কে কত আলাদা। যার জিমের মাসিক চাঁদা যত বেশি, সে তত বেশি অভিজাত। শ্রমিকদের মতো দৌড়াব না বলে আমরা সুট-বুট পরে দালানে ঢুকেছিলাম, আমরা এখন ট্রেডমিল কিনে সেই একই দালানের ভেতরই দৌড়াচ্ছি। আমরা দৌড় ছাড়তে চেয়েছিলাম, দৌড় আমাদেরকে ছাড়েনি, দৌড় আমাদেরকে দৌড়ানি দিচ্ছে। কুঁড়েঘরে থাকব না বিধায় আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম, এখন আমরা কিছুদিন পরপরই পর্যটনকেন্দ্রের গলা-কাটা কৃত্রিম কুঁড়েঘরে যাই স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে। কাচঘেরা বায়ুরোধী ভবন বানিয়ে শ্বাসকষ্ট বাঁধিয়ে বুকভরা বাতাস নিতে লাখ টাকা খরচ করে আমরা সমুদ্রসৈকতে ছুটছি। গায়ে মাটি লাগাব না বলে আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম, একটু মাটির স্পর্শের আশায় এখন আমরা পার্কে-পার্কে ছুটছি কিংবা ছাদবাগান করছি। 'চাষাভুষা' শব্দটাকে আমরা গালি বানিয়েছিলাম, এখন ছাদবাগানে এক ডজন টমেটো ফলাতে পারলে গর্বিত 'নগরচাষি' হিশেবে বুক ফুলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করছি। মাছধরা মানুষদের জাইল্লা বলে তাচ্ছিল্য করা আমরাই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে বড়শি পেতে বসে থাকছি সরকারি দিঘিতে সেই মাছই ধরার জন্য। শবজি খাব না বলে আমরা বড়লোক হয়েছিলাম; এখন বাজারে শবজির দামই বেশি, রেস্টুরেন্টে শবজিজাত খাবারের দামই বেশি, শবজি এখন বড়লোকদেরই খাবার। পূর্বপুরুষরা যে শবজি খেতেনই না, যে শবজি বেড়ে উঠত বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড়ে অনাদরে-অবহেলায়; শহরে আমরা এখন সেই অনাহুত শবজিই কিনে খাচ্ছি কেজিপ্রতি শত-শত টাকা খরচ করে। আমাদের পূর্বপুরুষরা ছেঁড়া কাপড় পরতেন অর্থাভাবে, এখন আমরা চড়া দামে ছেঁড়া-খোঁড়া জিন্স কিনে পরি। তারা পান্তাভাত খেতেন তিনবেলা রান্নার মতো জ্বালানি ছিল না বলে; আমরা পহেলা বৈশাখে ঐ পান্তাভাতই খাই গরম ভাতে জোরপূর্বক পানি দিয়ে, হাজার-হাজার টাকার শ্রাদ্ধ করে; খেয়ে ডায়রিয়া বাধাই, বাধিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। মহানগরের সেসব রেস্টুরেন্টের খাবারের দামই এখন সবচেয়ে বেশি; যেসব রেস্টুরেন্টের সাজগোজ গ্রামের মতো, যেসব রেস্টুরেন্টে মেঝেতে বিছানো জাজিমে বসে খেতে হয়, যেসব রেস্টুরেন্টের আবহসংগীত হিশেবে বাজে গাঁও-গেরামের গান। আমরা বাসায় রাঁধি না সময় বাঁচানোর জন্য, অনলাইনে অর্ডার করে রেস্টুরেন্টের খাবার বাসায় আনিয়ে খেয়ে দিনাতিপাত করি, সেই বেঁচে যাওয়া সময়ে আমরা পয়সা উপার্জন করি; এর পর আমরা লিভার সিরোরিস বাঁধাই, শেষে সেই পয়সা খরচ করি লিভার সিরোসিসের চিকিৎসায়। আমরা পরিবারের সবাই মিলে চাকরি নিয়েছিলাম স্বাবলম্বী হব বলে; স্বাবলম্বী আমরা হয়েছি, স্বাবলম্বী হতে-হতে কেউ বা ধনকুবেরও হয়েছি, কিন্তু আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে গৃহকর্মীদের হাতে। আমরা এতটাই স্বাবলম্বী হয়েছি যে, আমাদের সন্তানরা জাগ্রত অবস্থায় দেখছে আমরা ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছি, ঘুম থেকে জেগে দেখছে আমরা অফিসে চলে গেছি। স্বাবলম্বনের দাপটে আমাদের মা-বাবারা বার্ধক্য কাটাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে, সন্তানরা শৈশব কাটাচ্ছে চাইল্ড কেয়ারে, আমরা যৌবন কাটাচ্ছি ডেস্কটপে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে করব না ভেবে আমরা কেউ-কেউ ত্রিশেও বিয়ে করছি না, পঁয়ত্রিশেও বিয়ে করছি না; করছি চল্লিশের পরে অথবা করছিই না। অথচ পূর্বপুরুষরা চল্লিশে দিব্বি নাতি-নাতনির মুখ দেখতেন। কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করতে-করতে আমরা যৌবনেই বুড়িয়ে যাচ্ছি, বুড়ো বয়সে যুবকের ভূমিকায় অভিনয় করছি, শুগার ড্যাডি বা শুগার মম হচ্ছি; কোনোকিছুই শুরু বা শেষ করছি না যথাসময়ে। সূর্যের আলো গায়ে লাগিয়ে ক্ষেতখামারে কাজ করব না বলে আমরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রাজপ্রাসাদে ঢুকেছিলাম। ঢুকে দেখলাম— শরীরে সূর্যের আলোর অভাবে আমাদের ঘুম আসে না। রাতের ঘুম ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা ওষুধ খাওয়া শুরু করলাম, তাতেও কাজ না হওয়ায় সূর্যের আলো গায়ে লাগানোর জন্য আমরা 'মর্নিং ওয়াক' শুরু করলাম। শীতাতপনিয়ন্ত্রক যন্ত্র ওদিকে আমাদের শরীরে ডেকে আনল নিউমোনিয়া-অ্যাজমা-হুপিংকাশি। প্রযুক্তি আমাদের চোখ খেল, কান খেল, নাক খেল; আমাদের চোখে ধরিয়ে দিল চশমা, কানে বসিয়ে দিল হিয়ারিং এইড, নাকে নেবুলাইজার। পূর্বপুরুষদের যা যা আমরা করতে চাইনি, আমরা— উত্তরপুরুষরা এর সবকিছু করতে বাধ্য হচ্ছি। বড়লোক হতে-হতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। টাকা খেয়ে আমরা কুলাতে পারছি না। টাকা রাখারও জায়গা হচ্ছে না আমাদের। টাকা ব্যাংকে রাখলে ক'দিন পরে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে শেয়ারবাজার লুট হয়ে যায়। এখন আমাদের গরিব হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না। গরিবরা বড়লোক হতে পারে, কিন্তু বড়লোকরা একবার বড়লোক হয়ে যাওয়ার পর আর গরিব হতে পারে না। আমরা পাঠ্যবহির্ভূত বই পড়তাম। খবরের কাগজ পড়তাম। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখতাম। শুক্রবার বিকেল তিনটা কুড়ি মিনিটে দেখতাম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। এর মধ্যে খবরের কাগজ বাদে বাকি সবগুলোকেই আমাদের পূর্বসূরিরা অন্যায় বলে মনে করতেন। পাঠ্যবইয়ের ভাঁজে কমিকের বই পেলে প্রহার করতেন, প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার খবর পেলে প্রহার করতেন, প্রহার করতেন এমনকি প্রতিবেশীদের বাড়িতে শুক্রবারের ছায়াছবিটিও দেখতে গেলে। আমরা ভাবতাম বড় হয়ে বড়লোক হলে আমাদেরকে কেউ ঠেকাতে পারবে না— আমরা ইচ্ছেমতো বই পড়ব, চলচ্চিত্র দেখব, গান শুনব। আমরা বড় হলাম, বড়লোকও হলাম। ততদিনে দেশ থেকে প্রেক্ষাগৃহ উধাও হয়ে গেছে, চলচ্চিত্রজগৎই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, চলে গেছে আমাদের পাঠাভ্যাস। আমাদের ফোনে এখন হাজার-হাজার বইয়ের পিডিএফ, ওটিটি-ইউটিউবে অগণিত চলচ্চিত্র। বই পড়ার জন্য এখন গ্রন্থাগারে যেতে হয় না, চলচ্চিত্র দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যেতে হয় না, গান শোনার জন্য কিনতে বা ভাড়া করতে হয় না ক্যাসেট-সিডি-ডিভিডি। কিন্তু আমাদের এখন কিছুই দেখা হয় না, কিছুই শোনা হয় না, কিছুই পড়া হয় না। আমাদের সবকিছু জমা হয়ে আছে, আমাদের সবকিছু জমে গেছে— উত্তর মেরুর বরফের মতো। সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে আসায় আমরা এখন আর কিছুই দেখি না, শুনি না, পড়ি না। আমাদের ভেতরকার পাঠকের মৃত্যু হয়েছে, শ্রোতার মৃত্যু হয়েছে, দর্শকের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরিরা ভ্রমণকাহিনী পড়তেন, পড়ে কল্পনায় ওসব জায়গা দেখে নিতেন, পরে পয়সা জমলে সেসব জায়গায় ভ্রমণে যেতেন। এখন আমরা ভিডিওতেই সব দেখে ফেলছি, আমাদের আর কল্পনা করতে হচ্ছে না, ফলে আমাদের কল্পনাশক্তিও নেই হয়ে গেছে। আমরা এখন আর কল্পনা করি না। কোথাও বেড়াতে গেলে সেই জায়গাটা দেখি না, শুধু ভিডিও করি, জায়গাটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে সহস্র ছবি তুলি; পরবর্তীকালে সেসব ছবি আমরা আর একবারও খুলে দেখি না। ফলে মরে গেছে আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়ও। আমাদের সর্বাঙ্গে মরিচা ধরেছে, সব ইন্দ্রিয়ে জং ধরেছে। যখন সবকিছু দুর্লভ ছিল, তখন ঠিকই আমরা মূল্যবান বস্তুর মূল্য দিতাম। সময় বাঁচানোর জন্য আমরা ফোন কিনেছিলাম। পরে, দেখলাম— ফোনই আমাদের জীবনের সিংহভাগ সময় খেয়ে ফেলেছে। যখন দু-টাকার খামে করে চিঠি লিখে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হতো এক মাস, তখনও আমরা নিঃসঙ্গ ছিলাম না। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের অযুত-নিযুত অনুসারী, মেসেঞ্জারে কড়া নাড়লে এখন উত্তর পাওয়া যায় সেকেন্ডের মধ্যে, কথা বলার জন্য এখন সবুজ বাতি জ্বালিয়ে রাখে শত-সহস্র অনুরাগী; কিন্তু মন খুলে কথা বলার মতো এখন আমরা কাউকেই খুঁজে পাই না, মানুষ খুঁজে পেলেও কথা খুঁজে পাই না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক গল্প এত বেশি বলে ফেলি এবং দৈনন্দিন জীবনের ছবি-ভিডিও এত বেশি দেখিয়ে ফেলি যে, এখন আমরা সবার সবকিছু জানি, মুখোমুখি সাক্ষাতে বলার মতো কোনো গল্পই এখন আর আমাদের অবশিষ্ট থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলতে-বলতে আমরা আমাদের সব গল্প শেষ করে ফেলেছি, দেখিয়ে শেষ করে ফেলেছি সমস্ত ছবি। দু-টাকার হলুদ খামের যুগেও আমরা নিঃসঙ্গ ছিলাম না, কিন্তু দু-সেকেন্ডের সবুজ মেসেঞ্জারের যুগে আমরা নিঃসঙ্গ। এখন আমরা নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ এবং গল্পশূন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিগত গল্পগুলো আমরা এমন ব্যক্তিদেরকে বলে ফেলেছি, ব্যক্তিগত ছবিগুলো এমন ব্যক্তিদেরকে দেখিয়ে ফেলেছি; যারা আমাদের ব্যক্তিজীবনের অংশই না, যাদের সাথে কখনোই দেখা বা কথা হবে না। ভূগর্ভস্থ পানি বেশি তুলে ফেললে নলকূপ আর পানি দেয় না, জীবনের গল্প বেশি বলে ফেললে জীবনও নলকূপের মতো আচরণ করে। আমরা এখন একেকজন পরিত্যক্ত নলকূপ। আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িতে ছিল বিশাল পুকুর, সারি-সারি ফলগাছ, শবজির ক্ষেত, গোয়ালঘর। বড়লোক হয়ে আমরা পুকুরের পরিবর্তে দেড় হাত চওড়া বাথটাব বানিয়েছি, ছাদে গাছ নাম নামক কিছু প্রহসন লাগিয়েছি, খাঁচায় পালছি কুকুর-বেড়াল-খরগোশ। গাঁয়ের বিঘা-বিঘা জমি বেচে শহরে এসে আমরা ফ্ল্যাট নামক সাড়ে সাতশো বর্গফুটের খোপ কিনছি। খোপের ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখছি বনসাই। একেকটা বনসাইয়ের দাম মূল গাছের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। আমরা স্বপ্ন দেখি— শহরে কামানো টাকা দিয়ে শেষ বয়সে গ্রামে গিয়ে বাগানবাড়ি করব। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা বাগানবাড়িতেই জন্মেছেন, বাগানবাড়িতেই দিনাতিপাত করেছেন, বাগানবাড়িতেই মরেছেন। অর্থাৎ শেষ বয়সে যে জীবন যাপন করব বলে শহরে বসে আমরা খেটে মরছি বা স্বপ্ন দেখছি, প্রাচীন আমলের অশিক্ষিত লোকজন বিনা পড়াশোনায়ই সেই জীবন আজীবন যাপন করে গিয়েছেন। শিক্ষিত বড়লোক হয়ে শহরে বসে আমরা যা যা করছি বা করার চেষ্টা করছি, আমাদের অশিক্ষিত গরিব পূর্বপুরুষরা ওগুলোই করতেন। কিন্তু রাত আটটার মধ্যে তারা ঘুমিয়ে পড়তে পারতেন, তাদের চোখে ঘুম ছিল। আর এদিকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে সকাল আটটায়ও আমাদের ঘুম আসে না। পূর্বপুরুষদের যা যা আমরা এড়াতে চেয়েছিলাম, এর সবকিছু আমরা উচ্চমূল্যে করতে বাধ্য হচ্ছি। বরং তাদের বাড়ি ছিল আমাদের ফ্ল্যাটের চেয়ে বহুগুণ বড়, তাদের খাবার ছিল বিশুদ্ধ, তাদের শরীর ছিল সুঠাম। অথচ আমরা ভেবে বসে আছি শিক্ষিত ও বড়লোক হয়ে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে ভালো আছি। তা হলে? আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে কতটুকু এগোলাম? তাদের চেয়ে আমরা কতটা ভালো আছি? প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা কি বিজয়ী হয়েছি? নাকি গো-হারা হেরে বসে আছি? আমরা কি আমাদের পরাজয় টের পাচ্ছি? #Collected#

Saturday, 12 October 2024

কেন হাসিনা আমলে, হাসিনা ভারতের সাথে চুক্তিগুলো সংসদে আলোচনা করত না তার কারন

কেন হাসিনা আমলে, হাসিনা ভারতের সাথে চুক্তিগুলো সংসদে আলোচনা করত না তার কারন খুজতেছিলাম। যে কারন গুলো পেলাম, এক বাক্যে বললে, " চুক্তি ভারতের দ্বারা নির্ধারিত ও লিখিত হত তাই তা নিয়ে হাসিনার সংসদে আলোচনার কিছুই ছিল না। যেমন, উপকূলে ভারতীয় রাডার চুক্তির মত স্পর্শকাতর বিষয়ে পুরটা স্বার্থই ভারতের তাই এই চুক্তির কন্টেক্স কি হবে তা শুধুই ভারত ঠিক করেছে। ফেনী নদীর পানির চুক্তিটি এক পাক্ষিক ছিল, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষ হতে কোন শর্তারোপ ছাড়াই চুক্তি সম্পাদন হয়। উপরের দুটি চুক্তি হাসিনা যখন ভারতে গিয়ে করল, চুক্তি সম্পাদনের এক সপ্তাহ পার হলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম গুলো জানতে পারে নাই কি আছে চুক্তির ভিতর, সে সময় সাংবাদিকরা আওয়ামীলীগ নেতাদের জিজ্ঞাসা করেছিল, তারাও অবগত নয় বলে জানান। আদানী চুক্তির ভয়ংকর তথ্য গুলো চুক্তির আগে কেউ জানত না, এমনকি আদানী কর ছাড় পেলেও করের নামে বাংলাদেশ থেকে অর্থ নিবে এটাও এই চুক্তির নোংরা দিক ছিল, যা চুক্তির আগে হাসিনা কাউকেই জানাই নাই। ভারতকে দেয়া চট্রগ্রাম বন্দরের একসেস এমন ভাবে দিল হাসিনা, যে বাংলাদেশের কন্টেইনার গুলো হতে ভারতের কন্টেইনার অগ্রাধিকার পাবে। অথচ সদ্য যুদ্ধাহত বাংলাদেশকে সে সময় বন্দর ব্যাবহার করতে দেয় নাই। হাসিনার আর এক নোংরা চুক্তি মংলা বন্দর সম্প্রসারণে ভারতকে সম্পৃক্তকরণ, এটার বিশদ এখনো দেশবাসী জানে না। রেল করিডর কোন দেশ অন্য দেশকে দেয় না, কারন রেল করিডর দেশকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। আখাউড়া সড়ক অবকাঠামোর কাজটাও এভাবেই জাতির কলংক হাসিনা ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সকল কাজ ভারতের হাতে তুলে দেয়, আর ভারতের তাদের দেশ থেকে দিনমজুর পর্যায়ের কর্মীদের পর্যন্ত বাংলাদেশে আনে। যে সকল হাসিনার পোষা কুকুর ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিকের সন্ধান চাচ্ছে, তাদের রেফারেন্স ভারতীয় আইনজীবী অরুনাভ ঘোষ, সেই ২৬ লাখ ভারতীয় কোন কোন সেক্টরে কাজ করে তা দলিল দিয়েছিল। বাংলাদেশে এই দলিলাদি আমিই অনুসন্ধান করে স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম আগ্রাসন বিরোধী নানা কর্মসূচিতে, এখন আসিফ নজরুল সাহেব সেই অনুসন্ধানের ভিতরে না ঢুকে আমার বক্তব্য শুনে বলে দিলেন ২৬ লাখ। যার ফলে উনাকে জিজ্ঞাস করলে ভাল কোন উত্তর দিতে পারেন নাই। আজ বলে দিলাম সেই আইনজীবীর নাম অরুনাভ ঘোষ। কতজন ভারতীয় বাংলাদেশে অবস্থান করছে, বাংলাদেশের কাছে সেই তথ্য না থাকলেও ভারতের কাছে সঠিক সংখ্যাটা আছে। হাসিনার এই সকল চুক্তি যেন ক্ষমতায় থাকতে মোদীর কাছে সতীত্ব বিক্রি, এছাড়া ভাল ভবে বলার কোন ভাষা নাই আমার।

Monday, 30 September 2024

ঢাকা শহরের আবাসন এর অর্থনীতি।

ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় বাড়ির ভাড়া অত্যাধিক সস্তা। সস্তা বলছি বাড়ি বানানোর খরচ আর আনুপাতিক দ্রব্যমূল্যের নিরিখে। সিটি সেন্টারের বাইরের জায়গাগুলোত (যেটা নগরীর প্রায় ৮০% জায়গা) একটা জমি কিনে বাড়ি বানাতে প্রায় ১.৬ কোটি টাকা খরচ হয়। দেড় কাঠা জমির উপর, গলির ভেতর একদম সাদামাটা পাঁচতলা বাড়ি। তার একটাতে গৃহস্বামী বাস করেন, বাকি চার তলা ভাড়া দেন। ভাড়া এসব ক্ষেত্রে ১৫-১৬ হাজারের বেশি হয় না। পুরো বিল্ডিং থেকে আয় সর্বসাকুল্যে ৬০ হাজার টাকা (খাজনা বাদ দিয়ে)। এই হিসেবে কেবল আপনার দেড় কোটি টাকা উদ্ধার করতেই লেগে যায় ২২ বছর ৩ মাস। আর যদি ১০০% মুনাফা করতে চান তবে সাড়ে চুয়াল্লিশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এর মাঝে মেরামত খরচ আর চাঁদাবাজির সাথে মুদ্রাস্ফীতি কাটাকুটি করে দিলাম। যাইহোক, ১.৬ কোটি টাকাকে বাড়ি বানানোর মাধ্যমে দ্বিগুণ করতে গৃহস্বামীর ৪৪.৫ বছর সময় লাগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ ব্যাংকে, সবচেয়ে কম সুদে ফিক্সড ডিপোজিট করলেও এই টাকা দ্বিগুণ হতে ১২ বছর লাগে। এর মানে বাড়ি না বানিয়ে টাকাটা ব্যাংকে ফেলে রাখা ৪ গুণ বেশি লাভজনক। ফ্ল্যাট কেনার কথা তো বাদই দিলাম। ফ্ল্যাটের ইউটিলিটি চার্জ হিসাব করলে, এটা ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়েও ৮ গুণ খারাপ কাজ। কিন্তু অন্যদিকে, আমি নিজে যখন ভাড়াটিয়া হিসেবে ভাড়া শোধ করতে যাই তখন আবার গায়ে লাগে। মনে হয় ভাড়াটা বেশি। তখন আর সস্তা মনে হয় না। এই শহরের ৯৬% মানুষের আয়ের সবচেয়ে বড় অংশটা ব্যয় হয় বাড়ি ভাড়ায় (২০২০ সালের হিসাব যদিও)। বাড়িওয়ালা মরছে, ভাড়াটিয়াও মরছে। তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? সমস্যা নির্মাণ সামগ্রীতে। একটা ইট বানাতে গড়ে খরচ হয় ৫ টাকা। সেটা ঢাকায় বিক্রি হয় ১৫ টাকায়, চট্টগ্রামে ১৬-১৭ টাকায়। অন্তত ৩০০% মুনাফা। এ কারণেই সাধারণ মানুষ বা ভালো মানুষ ইট ভাটার ব্যবসায় ঢুকতে পারে না। মহা লাভজনক এই ব্যবসায় গুণ্ডা না হলে টেকা সম্ভব না। আমরা জানি ইট ভাটার মালিকরা কেমন। আর শ্রমিকদের তারা কী ট্রিটমেন্ট দেয়। বালু মহলগুলোর অবস্থা আরও পৈশাচিক। ৫০০ ডব্লিউ টিমটি রডের টনপ্রতি উৎপাদন খরচ ৭০-৮০ হাজার টাকার মধ্যে। এটা বিক্রি হয় ১.১ লাখ টাকায়। সোনার ভরি আর রডের টন এখন প্রায় কাছাকাছি। এই রড উৎপাদকরা ইটের ভাটার মালিকের মত ২০০% মুনাফা না করলেও তাদের সার্বিক মুনাফা ইটের ভাটার মালিকের চেয়ে কয়েক হাজারগুণ বেশি। কারণ ২০০% মুনাফা খায় প্রায় কয়েজ হাজার ইট ভাটা মালিক। আর রড বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ আর কার্টেল করে ৮-১০ টা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। এ কারণে তাদের থাবার গ্রাস অনেক বড়। একই ইন্ডাস্ট্রির মালিকই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলে। ফলে শুধু রড না; সিমেন্ট, রঙ, কাঁচ, বৈদ্যুতিক তারসহ প্রতিটা ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ ২০টি পরিবারের কাছ থেকে আমি আপনি সবাই নির্মাণসামগ্রী কিনি। এই মুনাফার পরিমাণ আমেরিকাতেও প্রায় একই। তাহলে আমেরিকাতে আমাদের মত সমস্যা হয় না কেন? কারণ আমেরিকান ট্যাক্সেশন খুব কড়া, টাকা পাচার করা কঠিন, শ্রমিকের নায্য মজুরি আছে। ফলে ট্যাক্স আর মজুরির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের খেয়ে ফেলা সামাজিক পুঁজির একটা বড় অংশ আবার সমাজেই ফিরে আসে। এটা বাংলাদেশের বেলায় ফিরে আসে না। ঢাকা শহরের বাড়ির ভাড়া বাড়িওয়ালাদের দিক থেকে খুব কম, আবার ভাড়াটিয়ার জায়গা থেকে খুব বেশি। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কম। ৮০% এলাকার তুলনায় বাকি যে ২০% এলাকা আছে, যেগুলো বড় রাস্তা বা মেট্রোরেলের কাছে বা ঢাকার অভিজাত - এসব এলাকাও প্রায় পুরোপুরি হাউজিং কোম্পানি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ঘুরে ফিরে আবারও সেই শীর্ষ ২০ ধনী পরিবার। ঢাকায় আপনার করা বাড়ি বা ফ্ল্যাট যদি একটা একশো টাকার নোট হয়, তবে সেই নোটের ৫ পয়সার সুবিধাভোগী ভাড়াটিয়া, ৩০ টাকার সুবিধাভোগী বাড়িওয়ালা। ৪.৯৫ টাকার সুবিধাভোগী স্থানীয় এমপি, সিটি কর্পোরেশন, রাজস্ব বিভাগ ইত্যাদির অসাধু কর্মচারীরা। আর কেকের বড় অংশটা, প্রায় ৬৫ শতাংশ সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী কার্টেলগুলো। এই গেলো ঢাকা শহরের আবাসন এর অর্থনীতি। চাহিদা থাকলে পরে ঢাকার আবাসন মনস্তত্ত্ব আর নৃতত্ত্ব নিয়ে লিখবো নে।

Thursday, 26 September 2024

হাসিনার পতন হয়েছে তাহলে দেশে ফিরে যেতে ভয় কি ?

হাসিনার পতন হয়েছে তাহলে দেশে ফিরে যেতে ভয় কি ? ০৫ আগস্ট ২০২৪ হাসিনার পতনের আগে যারা ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় বা এসাইলাম আবেদন করেছেন তাদের অনেকে দ্বিধাদ্বন্ধে আছেন। আওয়ামীলীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার দ্বারা নির্যাতিত হয়ে অনেকে দেশ ছেড়েছেন এবং এজাইল/ রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জেনেছি, OFPRA/CNDA তে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ''হাসিনার পতন হয়েছে তাহলে দেশে ফিরে যেতে ভয় কি ? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই দিতে পারেননি !!! অনেকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উত্তর দিয়েছেন কিন্তু যৌক্তিক উত্তর দিতে পারেননি। ০৫ আগস্ট ২০২৪'য়ের পর থেকে অনেককেই এই প্রশ্ন করা হচ্ছে। জেনেভা কনভেনশনের আওতায় আশ্রয় পাওয়ার অন্যতম দুটি শর্ত হচ্ছে মৃত্যু ভয় এবং মিথ্যা মামলায় হয়য়রানির হুমকি থাকা। বাস্তবতা হচ্ছে হাসিনার পতন হওয়ার পর এই হুমকিগুলো দুর্বল হয়ে গেছে এবং প্রমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দিতে না পারলে আসলেই সমস্যা। আওয়ামীগ সরকারের নির্যাতনে যারা দেশ ছেড়ে আশ্রয় আবেদন করেছেন এবং কেস চলমান তাদের জন্য এটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও যৌক্তিক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। কেস পাওয়া/রিফুজি স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য অবশ্যই প্রমান করতে হবে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি রয়েছে। ধন্যবাদ

Friday, 23 August 2024

বাংলাদেশে বন্যায় ঘরে ঘরে একটি করে রাবারের তৈরি ইনফ্লেটেবল বোট/ নৌকা রাখতে।

সম্ভবতঃ গত বছর বাংলাদেশে বন্যা চলাকালে আমি এক ফেইসবুক পোস্টে বলেছিলাম, ঘরে ঘরে একটি করে রাবারের তৈরি ইনফ্লেটেবল বোট (বাতাস দিয়ে ফোলানো যায় এমন নৌকা) রাখতে। উদ্ধার তৎপরতায় বিলম্ব হলে বেশী সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়, খাদ্যের ওভাবে নয়। চলমান বন্যায় এই নৌকার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী অনুভূত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বে আকস্মিক বন্যা সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। লন্ডনের মতো আধুনিক ও প্রাচুর্যময় নগরীকেও আকস্মিক বন্যা সহ নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় আক্রান্ত দেশ বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও অনেক বড়। ইনফ্লেটেবল বোট ঘরের স্টোর রুমে রেখে দেয়া যায়; এজন্য বড় জায়গার প্রয়োজন হয়না। সরকারি খরচে কিংবা বিশ্ব জলবায়ু তহবিল থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে এ ধরনের নৌকা বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেইলে উৎপাদন করে বাড়ি বাড়ি বিতরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি লাইফ জ্যাকেট উৎপাদন করে ত্রাণ হিসেবে বিতরণের চিন্তা করতে পারে সরকার। না খেয়ে কয়েক দিন বেঁচে থাকা যায় কিন্তু বন্যার পানিতে ডুবে গেলে মৃত্যু অনেকটা নিশ্চিত। তাই আমাদেরকে আগে প্রাণ বাঁচানোর বাস্তব পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এই বন্যাই শেষ বন্যা নয়। এখনই পরবর্তী সম্ভাব্য বন্যার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আব্দুল হাই সঞ্জু ২৩ অগাস্ট ২০২৪ লন্ডন

Monday, 19 August 2024

কাজগুলা না করে, তাইলে এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে

১. অন গভমেন্ট এই গভমেন্ট কোনো ‘বিপ্লবী’ গভমেন্ট হয় নাই। সংবিধান মাইনা রাষ্ট্রপতির আন্ডারে শপথ নিছে এই গভমেন্ট। ১/১১-র কুশীলবরা আবার সেইখানে মেজরিটিপ্রায়। কোন প্রক্রিয়ায়, কার চাওয়া বা না চাওয়ার ভিত্তিতে উপদেষ্টারা নিয়োগ পাচ্ছেন, তাও ক্লিয়ার না। তবু জাতির সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় ছাত্রজনতা এই গভমেন্টের বিরুদ্ধে কিছু বলতেছে না। কিন্তু অতি দ্রুত এই গভমেন্ট যদি নিচের কাজগুলা না করে, তাইলে এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে: ১. রাষ্ট্রপতি ও আর্মি চিফের অপসারণ ২. সংবিধান পুনর্গঠন ৩. জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস, দলিলপত্র ও স্মৃতি সংরক্ষণ ৪. শহিদদের তালিকা তৈরি ও শহিদ পরিবারকে প্রয়োজনমাফিক সহায়তা। আহতদের তালিকা তৈরি করে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। ৫. জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ ফ্যাশিস্ট রেজিমের সকল অপরাধের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের সূচনা করা। এক্ষেত্রে বিতর্কিত আইসিটিকে পুনর্গঠন করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। নতুবা এই বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ৬. নির্দলীয় ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ফ্যাশিস্ট ব্যবস্থার মূলোৎপাটন। ৭. বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ কর্মকৌশল গ্রহণ। ৮. ছাত্রজনতার কাছে জবাবদিহিতার কালচার তৈরি করা। ৯. বিচার বিভাগ ও ইসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নির্দলীয়করণ। ১০. আ. লীগকে দল হিশেবে নিষিদ্ধ করাটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। বরং আপাতত তাদের নিবন্ধন বাতিল করা যেতে পারে। ১১. একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। ২. অন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ছাত্রজনতার আন্দোলনের এই ব্যানারটা কোনো একক দল, মত বা গোষ্ঠীর সমন্বয়ে করা হয় নাই। বরং নানা দল ও মতের মানুশ এখানে ছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নানা কারণে এই ব্যানারটি বিতর্কিত হয়ে উঠছে। অনেকেই নিজ নিজ রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই ব্যানার ব্যবহার করতেছেন। ক্যাম্পাসগুলোতে এই ব্যানারের ছত্রছায়ায় এক ধরনের ছায়া অথরিটিও গড়ে উঠছে। এই ছায়া অথরিটির কর্মকাণ্ড কিংবা মোটিভ নিয়াও জনমনে এক ধরনের অস্বস্তি বা আশঙ্কা তৈরি হইছে। ব্যানারটির সকল সিদ্ধান্ত কোত্থেকে আসতেছে বা কারা দিতেছে— এ ব্যাপারেও অস্পষ্টতা প্রকট। সমন্বয়কদের নিজেদের মধ্যেই এ ব্যাপারে নানারকম ক্ষোভ ও উষ্মা দেখা যাইতেছে। সমন্বয়কদের নিজস্ব কোনো এজেন্সি আছে কি নাই— তা বোঝা যাচ্ছে না। তারা কেবল টকশোর শোভা বাড়াইতেছেন। বাস্তব কার্যক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশেরই সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে কোনো সংযোগ নাই। ফলত, তারা এক ধরনের মিডিয়া সেলিব্রেটি ও ছোটোখাটো ভাবমূর্তিতে পরিণত হওয়ার অধিক কিছু করতে পারতেছেন না। দেশের নানা মানুশ নানা প্রান্ত থেকে নানা আইডিয়া নিয়া তাদের কাছে আসতেছেন বটে, কিন্তু সেগুলা নিয়া ছাত্রদের বৃহত্তর ফোরামে কোনো ইনক্লুসিভ আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। ফলত, ব্যানারটি ক্রমশ বিতর্কিত হয়ে পড়তেছে। আন্দোলনকারী ছাত্রদের সমন্বিত শক্তিকে অটুট রাখার জন্য দ্রুত একটা বৃহত্তর ছাত্র কাউন্সিল কিংবা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের উদ্যোগ নেয়া হোক। এবং এই ব্যানার যত দ্রুত সম্ভব বিলুপ্ত করা হোক। এতেই মঙ্গল। ৩. অন পার্টি ফর্মেশন আজ হোক বা কাল, অভ্যুত্থানকারী ছাত্রদের অন্তত নেতৃস্থানীয় লোকেরা একটা পার্টি খুলবেন— এটা নিশ্চিত। এমনকি একাধিক পার্টিও হইতে পারে। এ ব্যাপারে আপাতত বিশদ মন্তব্য করতে চাই না। জনতার খেয়াল রাখা লাগবে, এই পার্টি যেন অন্য কোনো পলিটিকাল পার্টির পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত না হয়। সেটা ঘটনা হিশাবে খুব বিপদজনক ও ডিজাপয়েন্টিং হবে। ৪. অন ইন্টেলেকচুয়াল অ্যান্ড কালচারাল ফাইট আমাদের এখন ইন্টেলেকচুয়াল ও কালচারাল ফাইটগুলারে নতুনভাবে শুরু করা লাগবে। যেসব ভুয়া ও ফাঁপা ন্যারেটিভের উপর এই ফ্যাশিবাদের ভিত্তি দাঁড়ায়ে ছিল, সেগুলারে কাউন্টার করা লাগবে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প— সবক্ষেত্রেই ফ্যাশিবাদের ভিত নির্মাণকারী বয়ানগুলারে প্রশ্ন করা লাগবে। কবি, সাহিত্যিক, অ্যাকাডেমিশিয়ান ও ইন্টেলেকচুয়ালদের কান্ধে এখন গুরুদায়িত্ব। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখা জরুরি যে, এসব ক্ষেত্রে আমাদের চর্চা হইতে হবে অব্জেক্টিভ ও নির্মোহ। আমরা যেমন নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের আলাপ করতেছি, তেমনি নতুন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরও নির্মাণ করা লাগবে। যেখানে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অবজেক্টিভিটি হবে মানদণ্ড। সৃজনশীলতাই হবে সাহিত্য, প্রোপাগাণ্ডা না। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হইতে হবে সর্বোচ্চ ইনক্লুসিভ। ফ্যাশিস্টের কাউন্টার দেওয়ার জন্য যদি আমরা একপেশে ইতিহাসচর্চা, সাহিত্যিক প্রোপাগাণ্ডা কিংবা অপরায়নের সংস্কৃতির চর্চা করি, তাইলে আমাদের অভ্যুত্থান বৃথা যাবে। ৫. অন মিলিটারি অ্যান্ড সিভিল ব্যুরোক্রেসি মিলিটারি ও সিভিল ব্যুরোক্রেসি নিয়া জনমনে নানা অসন্তোষ, শঙ্কা, সন্দেহ ও অস্বস্তি এখনও বিদ্যমান। এই মিলিটারি ও সিভিল ব্যুরোক্রেসিই কার্যত দেশ চালাইতেছে কিনা, কিংবা গভমেন্টের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেছে কিনা— এ নিয়া নানা ধরনের প্রশ্ন আছে। গভমেন্টরে এইটা দেখতে হবে। সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির মধ্যে ঘাপটি মাইরা থাকা ফ্যাশিস্ট ব্যক্তি ও ব্যবস্থাগুলারে উৎখাত করা লাগবে। আরেকটা ১/১১ হওয়ার সমস্ত পথ রোধ করা লাগবে। ৬. অন বিএনপি বিএনপির বোঝা লাগবে যে, খালি দখলের রাজনীতি দিয়া সে বেশিদূর আগাইতে পারবে না। আওয়ামি ফ্যাশিস্টরে কাউন্টার করার জন্য তার শক্তিশালী বয়ান ও ন্যারেটিভ লাগবে। এবং জুলাই রেভ্যুলুশনের স্পিরিটের সাথে মিল রাইখা নিজেদের রাজনীতি সংস্কার করা লাগবে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও কালচারাল অঙ্গনের সাথে নতুন ধরনের বন্দোবস্ত তার তৈরি করা লাগবে। এক্ষেত্রে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘সমন্বিত জাতিবাদ’ বা ‘কল্যাণ রাষ্ট্রবাদ’ হইতে পারে তাদের আদর্শ। পাশাপাশি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়া গইড়া ওঠা নতুন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাসনাগুলারে ধারণ করতে হবে। দল হিশাবে তারা ফেইল করলে কিংবা ফ্যাশিস্ট হয়া উঠলে বাঙলাদেশ একটা নতুন ক্রাইসিসের মধ্যে পড়বে। ৭. অন জামায়াত-শিবির আ. লীগ ও তার কালচারাল ফোর্সগুলা জামায়াত-শিবিররে আনঅফিশিয়ালি নিষিদ্ধ কইরা রাখার মাধ্যমে, ট্যাবু কইরা রাখার মাধ্যমে, এক ধরনের ভাবাদর্শে পরিণত করছিল। এতে দুইটা ক্ষতি হইছে বাঙলাদেশের: ১. ইসলামি চিহ্নধারী যেকোনো কিছুরেই ‘জামায়াত-শিবির’ ট্যাগ দিয়া ডিহিউম্যানাইজ করার রাস্তা খুইলা গেছে। ওয়র অন টেররের রাজনীতি শক্তিশালী হইছে। ২. জামায়াত-শিবিররে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ বা বর্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের বাইরে সে একটা ভাবাদর্শ হয়ে উঠছে। নতুন বাঙলাদেশে এই অস্বস্তিকর অবস্থাটির অবসান ঘটা দরকার। জামায়াত-শিবির না কইরাও মুসলিম চিহ্ন ধারণ করে দেশের কোটি কোটি মানুশ। তাদের সেইটা স্বচ্ছন্দে করতে পারা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভাবাদর্শ না, জামায়াত-শিবিররে পলিটিকাল পার্টি হিশাবে গ্রহণ, বর্জন বা পর্যালোচনার রাস্তা খোলা থাকা উচিত। পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসনপ্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, সেইটাও এই সরকারের ভাবা উচিত। জামায়াত-শিবিরের উদ্দেশ্যে আমার বেশিকিছু বলার নাই। কারণ উনাদের এত শক্তি যে, আমার মত দুর্বল লোকের কথা উনারা আদৌ শুনবেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু তবু ঝুঁকি নিয়া কিছু কথা বলতে চাই। নয়া বাঙলাদেশে রাজনীতি করতে হইলে উনাদের অবশ্যই জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটরে ধারণ করতে হবে। পার্টিসিপেটরি ডেমোক্রেসি ও ইনক্লুসিভ বাঙলাদেশে বিশ্বাসী হইতে হবে। একাত্তর প্রশ্নে উনাদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান, তা বিগত বছরগুলাতে কতটুকু চেঞ্জ হইছে আমি জানি না। কিন্তু একাত্তর একটা ইস্যু তো বটেই। সেইটা ওনাদের সলভ করা লাগবে। ওনাদের বোঝা লাগবে যে, ষাট ও সত্তর দশকের ক্লাসিকাল ইসলামিজমের জামানা শেষ। আরব বসন্তের পর এখন পোস্ট-ইসলামিজমের জামানা শুরু হয়ে গেছে। ফলে সেই মোতাবেক দলের নীতি ও আদর্শরে রিভিজিট করা লাগবে। পশ্চিমের চাপায়ে দেওয়া সেক্যুলারিজম না, বাঙলাদেশের মাটিজলে সিঞ্চিত যে অর্গানিক ইনক্লুসিভিটি, তারে ধারণ করতে পারতে হবে। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঢাকার মিডল ক্লাশরে শত্রু বানানো উচিত হবে না। দলীয় সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ের বাইরে বৃহত্তর বাঙলাদেশের সাথে একাত্ম হইতে শেখা লাগবে। সেক্যুলার কবি-সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবীদের ‘নাস্তিক’ হিশাবে মোকাবেলার যে পলিটিকাল থিওলজি, তা পরিত্যাগ করতে হবে। বোঝা লাগবে যে, ওনাদের কেন্দ্র কইরাই আ. লীগের বাজে রাজনীতিটা বারবার ব্যাক করে এই দেশে। সেই পথটা কীভাবে বন্ধ করা যায়, কীভাবে একটা সম্প্রীতির বাঙলাদেশ নির্মাণ করা যায়, তা উনাদেরই ভাবতে হবে। ৮. অন লেফট উইং লেফটরা রাজনীতির নামে এখনও কেবল কালচার করতেছেন। আর কতদিন করবেন জানি না। শক্ত জনসমর্থন না থাকলে অবশ্য এছাড়া উপায়ও নাই। কেন বাম রাজনীতি এদেশে ব্যর্থ হইল? এর পর্যালোচনা শুরু করার এইটাই বোধহয় শ্রেষ্ঠ সময়। জুলাই রেভ্যুলুশনের স্পিরিটরে ধারণ কইরা নতুন বাঙলাদেশে নতুন ধরনের রাজনৈতিক চিন্তা নিয়া আগাইতে হবে বামদের। উনিশ শতকের বাঙালি জাতিবাদ, নাইন-ইলেভেনজাত ইসলামফোবিক পরিভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি, অতিমাত্রায় কালচারাল পলিটিক্স ও এনজিওবাদ, জড় ও পুরানা আমলের নেতৃত্ব ইত্যাদি বাদ দেওয়া লাগবে। নিও মার্ক্সিস্ট ধারায় নয়া লিটারেচার, নতুন পরিভাষা, নতুন আইকন ও প্রগতিশীল পলিটিকাল বন্দোবস্ত গড়ে তোলা লাগবে। রাজনীতিটাই করা লাগবে, কালচার না। দেশের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে একাত্ম হইতে পারার মত ভাষা ও পরিভাষা তৈরি করা লাগবে। ন্যায়, ইনসাফ ও ইনক্লুসিভিটিরে মনেপ্রাণে ধারণ করা লাগবে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিরে ট্যাবু বানায়ে রাখলে তাদের কোনো লাভ নাই, বরং লসই বেশি— এটা মাথায় ভালোভাবে নেওয়া লাগবে। ইডিওলজিরে রাজনীতিতে পরিণত করলে হবে না, বরং বাস্তব রাজনীতির আলোকে ইডিওলজিরে নির্মাণ করা লাগবে। তা না হইলে বাম রাজনীতি চিরকাল ক্যাম্পাসগুলাতেই সীমিত হইয়া থাকবে কেবল; গণমানুশের রাজনীতি হইতে পারবে না। একটা সুন্দর, সমৃদ্ধ, ইনক্লুসিভ ও ইনসাফপূর্ণ বাঙলাদেশের স্বপ্ন আমরা এখনও দেখি। আমাদের এই স্বপ্ন ব্যর্থ হইতে দেওয়া যাবে না। ইনকেলাব জিন্দাবাদ।