Monday, 30 March 2026

বিএনপির অবস্থান গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধীরা ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য ‘আইনি মতামত’ ভাবা ভুল। বরং এটাই বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান, যার লক্ষ্য একটাই: গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার বা সীমাবদ্ধ করা এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। বিএনপি এই অবস্থান নিয়েছে কেন? কারণ যদি স্বীকার করা হয় যে জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে, তাহলে বিদ্যমান সংবিধান বা হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙে যায়। তখন সংসদ আর একমাত্র ক্ষমতার উৎস থাকে না; জনগণ নিজেই হয়ে ওঠে ক্ষমতার উৎস। আর ঠিক এই জায়গাটাই বিএনপি অস্বীকার করতে চাইছে। তাই আইনমন্ত্রী বলছেন, সংস্কার হবে, কিন্তু সংবিধানের ভেতরেই হবে; সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না। এটা কি যুক্তিসঙ্গত? না। এই যুক্তির ভেতরেই ফাঁকি আছে। কারণ গণঅভ্যুত্থান মানেই হলো সংবিধানের সীমা অতিক্রম করা। যদি সংবিধানই সবকিছুর শেষ কথা হয়, তাহলে জনগণ কেন রাস্তায় নামে? কেন জীবন দিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবি তোলে? বাস্তবতা হলো—গণঅভ্যুত্থান সেই মুহূর্ত, যখন জনগণ বলে: “এই সংবিধান আর আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা এই সংবিধান চাই না, আমরা নতুন গঠনতন্ত্র চাই। নতুন ভাবে বাংলাদেশ গড়তে চাই। তার মানে বিএনপি গণঅভিপ্রায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থানকেই আমি বিএনপির জন্য আত্মঘাতী মনে করি। অথচ সেকুলার ইসলাম বিদ্বেষী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির পতনের পর ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির মোকাবিলার মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত এবং যুদ্ধাক্রান্ত টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট জাতীয় সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু বিএনপির ভুল রাজনীতির জন্য তাকে আবার আওয়ামী লীগের মতো চরম মূল্য দিতে হতে পারে। বিএনপির এই অবস্থান বিএনপির অনুকুল নয়। আইনমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক অর্থ ও গাঠনিক তাৎপর্য অস্বীকার করেন। তিনি ঘটনাকে মানেন, কিন্তু তার পরিণতি মানেন না। অর্থাৎ তিনি বলতে চান—জনগণ আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা তাদের নাই; সেই ক্ষমতা থাকবে সংবিধান ও সংসদের হাতেই। এই যুক্তি পুরানা কৌশল—জনগণের শক্তিকে স্বীকার করে তাকে আবার আইনের ভেতরে বন্দি করা। এটাকে সরল ভাষায় বলা যায়: “সংবিধান দিয়ে গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ বা নিদেন পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা।” বিএনপি আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে জনগণ যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায়, তাহলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সেই হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার ব্যবস্থার ভেতরেই ফিরে যেতে হবে। আওয়ামী লীগের স্থান নিয়েছে বিএনপি। এখন যা বোঝার সেটা জনগণকেই বুঝতে ও করতে হবে। এখানে বিরোধীরা যে কথা বলছে, সেটি ভিন্ন। তারা বলছে—যদি গণঅভ্যুত্থান সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে জনগণের নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে। সেই অধিকার থেকে যদি কোনো “সংস্কার পরিষদ” বা “গণপরিষদ” তৈরি হয়, তাহলে সেটি সংবিধানের অধীন হবে না; বরং সংবিধানই তার অধীন হবে। বিরোধীরা সংস্কারবাদী হতে পারে, কিন্তু নিদেন পক্ষে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষেই অবস্থান নেবার চেষ্টা করছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট: আইনমন্ত্রী বলছেন সংবিধান আগে, জনগণ পরে; বিরোধীরা বলছে জনগণ আগে, সংবিধান পরে। যদি ধরে নেওয়া হয় বর্তমান সংবিধানই চূড়ান্ত, তাহলে তার কথা আইনের বই অনুযায়ী ঠিক। কিন্তু সমস্যাটা এখানেই—তাঁর পুরা যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি অঘোষিত ধারণার ওপর, সেটা হলো: সংবিধান এখনো অক্ষত এবং বৈধ। কিন্তু যদি বাস্তবতা এই হয় যে গণঅভ্যুত্থান সেই বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তাহলে এই যুক্তি টেঁকে না, ভেঙে পড়ে। তখন আর “সংবিধানের ভেতরে থাকো” বলা যায় না। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—সংবিধান থাকবে কি থাকবে না, সেটি ঠিক করার ক্ষমতাই জনগণের। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আসলে একটা জিনিস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন—রাষ্ট্রের শেষ কথা সংবিধান, জনগণ না। বিএনপি বলছে, জনগণ প্রতিবাদ করতে পারে, আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র নতুন করে গঠন করার ক্ষমতা জনগণের নাই। সেই ক্ষমতা কেবল সংবিধান-স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার। এটা কি ঠিক? অথচ সংবিধান নিজে কোনো আসমানি কিতাব না—এটি একটি রাজনৈতিক দলিল, যা কোনো এক সময়ে কোনো ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। যদি সেই ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে যায়, যদি জনগণ সেই কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেই সংবিধানের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তখন সংবিধানকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে সবকিছু বিচার করা মানে হলো বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করা। আইনমন্ত্রী বাস্তবতাকে নয়, কাগজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি বলছেন—সংবিধানে যা নেই, তা বৈধ না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে সংবিধান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার ভেতরে থেকে বৈধতা খোঁজা অন্ধকারে ইঁদুর তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টার অধিক কিছু না। বলা হচ্ছে—যারা নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছে, তারা ভুল বুঝছে; সঠিক বোঝাপড়া হলো সংবিধানের ভেতরে থেকেই পরিবর্তন করা। কিন্তু এই “সঠিক বোঝাপড়া” আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? জনগণের, নাকি আওয়ামী লিগ বা সেকুলার ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির? বিএনপিই কি তাহলে আওয়ামী লীগ? বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে বন্ধ করে দিচ্ছে। দেওয়া —জনগণের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা। যদি বলা হয় “সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না”, তাহলে জনগণ কোনো গণপরিষদ গঠন করতে পারবে না, কোনো নতুন গঠনতন্ত্রের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে না। সবকিছুই আবার ফিরে যাবে সংসদ, সরকার, এবং পুরোনো ক্ষমতার কেন্দ্রে। দিল্লীতে বসে শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই অট্টহাসি দিচ্ছেন। ইতিহাসও প্রহসনের রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের যে দরজা জনগণ খুলেছিল——সেটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আমাদের তিনটি বার্তা দিচ্ছে। এক. গণঅভ্যুত্থানকে একটি অতি সীমিত ঘটনা, শেখ হাসিনা সরকারের পতনেই তার শেষ এবং ওখানেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আটকে রাখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতা থেকে একজন ব্যক্তির অপসারণ, আর কোন পরিবর্তন না। দুই. জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা বিএনপি অস্বীকার করে, অর্থাৎ জনগণ ভোটার হতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে কিম্বা রাষ্ট্রের সংস্কারে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেটা থাকবে জাতীয় সংসদের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং জাতীয় সংসদের ক্ষমতা ৭০ অনুচ্ছেদের বলে একনায়কতান্ত্রিক ভাবে কেন্দ্রীভূত থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিন. কিন্তু ঘটনা হিশাবে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে না, কারন তা না হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারতো না। এই কারণেই “ভ্রান্ত ব্যাখ্যা”র অভিযোগ আসলে উলটা পড়া দরকার। প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভ্রান্ত ব্যাখ্যা কে দিচ্ছে? যারা বলছে জনগণের ক্ষমতা আছে রাষ্ট্র নতুন করে গঠনের, নাকি যারা বলছে জনগণ শুধু ভোটার। তারা ভোট দেবে, আর কিছু না। ক্ষমতার সবকিছু সংবিধানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ? এখানেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের আসল জায়গা। এটি কোনো টেকনিক্যাল আইনি বিতর্ক না—এটি ক্ষমতার উৎস নিয়ে দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার উৎস কি সংবিধান, নাকি জনগণ? আইনমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবিধানকেই সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। বিরোধীরা জনগণকে উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, কিন্তু বিরোধীরাও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাই গণতন্ত্রের সারকথা সেটা স্বীকার করে না। এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত “সংস্কার পরিষদ” নিয়ে বিতর্ক থামবে না। আসল প্রশ্ন পরিষদ কীভাবে গঠিত হবে সেটা না—আসল প্রশ্ন হলো, কার অধীনে গঠিত হবে। সংবিধানের অধীনে, নাকি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে? এখানেই বিএনপির অবস্থান মোটেও আইনী নয় আর, বরং একদমই স্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক, তাঁরা পরিবর্তন চান, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চান না। তাঁরা সংস্কারের কথা বলেন, কিন্তু গঠনের কথা এড়িয়ে যান। তাঁরা গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ব্যক্ত জনগণের ক্ষমতার আইনী ও রাজনৈতিক বৈধতা স্বীকার করতে রাজি না। সংসদে বিএনপি উপদেষ্টা সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল , সংশোধন বা শর্তাধীন যেভাবে করবে তা বিএনপির রাজনীতি থেকেই আন্দাজ করা যায়। সে বিষয়ে আমরা আসছি, পরে।