Sunday, 8 March 2026
আস্থার দহন।
আস্থার দহন।
ইতিহাসের দাবার বোর্ডে দাপুটে খেলোয়াড়ও কখনো কখনো নিজের সাজানো ঘুঁটির চালে নিজেই কুপোকাত হন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ এসেছে,যেখানে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিশ্ছিদ্র মনে হলেও সময়ের বিবর্তনে সেগুলোই তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চারজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন করার নেপথ্যে যে অগাধ আস্থা ও রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক করুণ নিয়তির পরিহাসে রূপ নিয়েছে।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে শেখ হাসিনা চাইলেন এক নিস্পৃহ অভিভাবক। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে বঙ্গভবনের শীর্ষাসনে বসিয়ে তিনি ভেবেছিলেন এক নিরাপদ ছায়া পেলেন। কিন্তু রাজনীতিতে ‘আদর্শিক নিরপেক্ষতা’ অনেক সময় শাসকের নিজস্ব এজেন্ডার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। শাহাবুদ্দিন আহমেদ নিজের নীতিতে অটল থেকে সরকারের অনেক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন।তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সেই আস্থার প্রতিদান মেলেনি; বরং ২০০১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের শাসনামলে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শালসা-র কারসাজি আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই আস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে যায়। নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে তিনি যে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন, তা আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। শেখ হাসিনা নিজেই পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন,এই নিয়োগ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় ভুল।
এরপর ২০১৫ সালে সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ছিল তাঁর সরকারের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। সমালোচকদের মতে, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে স্পষ্ট প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও যাঁকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের চাবি দেওয়া হয়েছিল, সেই এস কে সিনহাই এক পর্যায়ে সরকারের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে তিনি যে ‘বিচারিক ক্যু’ বা ‘জুডিশিয়াল ক্যু’র নীল নকশা সাজিয়েছিলেন, তা ঢাকাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের এই নজিরবিহীন দ্বৈরথ কেবল সরকারকে অস্বস্তিতেই ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভারসাম্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছিল। কোনোমতে সেই বিচারিক ক্যু থেকে সরকার রক্ষা পেলেও, যাকে ভরসা করে শীর্ষাসনে বসানো হয়েছিল, তাঁর কলম থেকেই যখন শাসনের বৈধতা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ এল, তখন সেই ‘ভুল’ ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হিসেবে স্থায়ী রূপ নিল।
২০২৪ সালে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগ ছিল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও আত্মঘাতী জুয়া। নিয়োগের আগে ও পরে অনেক মহল থেকে তাঁর সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও, শেখ হাসিনা পারিবারিক আত্মীয়তা ও দীর্ঘদিনের চেনা আনুগত্যের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে সেই সতর্কতাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যাকে তিনি তাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ মনে করেছিলেন, সেই সেনাপ্রধানই হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যের মূল নায়ক। ৫ই আগস্টের সেই উত্তাল মুহূর্তে যখন জনস্রোত গণভবনমুখী, তখন সেনাপ্রধানের রহস্যময় ভূমিকা এবং শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল না, বরং অনেকের মতে এর গভীরে লুকিয়ে ছিল আরও ভয়াবহ কোনো ছক। অভিযোগ ওঠে, পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা কেবল ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাতে খোদ শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার বা হত্যার সূক্ষ্ম পরিকল্পনাও ছিল।যে ঢালকে তিনি সবচেয়ে মজবুত ভেবেছিলেন, সেই ঢালই শেষ মুহূর্তে ঘাতকের খড়গ হয়ে তাঁকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাল।
সবশেষে মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি করা ছিল এক বিস্ময়কর ও তড়িঘড়ি নেওয়া সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পোড়খাওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অবহেলা করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একজনকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সিদ্ধান্তটি দলের ভেতরে ও বাইরে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আনুগত্যের বিনিময়ে পুরস্কার দেওয়ার এই কৌশলটি ছিল মারাত্মক ভুল; কারণ কোনো পোড়খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বঙ্গভবনে বসানো হলে ৫ই আগস্টের পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। সংকটকালীন সময়ে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক যে বিচক্ষণতা ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে পারতেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অসংলগ্ন ও দ্বিমুখী বক্তব্যে তার লেশমাত্র ছিল না। তাঁর দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক সাংবিধানিক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়, যা আওয়ামী লীগের পতন পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
রাজনীতিতে অতি-বিশ্বাস অনেক সময় দূরদর্শিতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শেখ হাসিনা এই চারজন ব্যক্তিকে কেবল উচ্চপদেই বসাননি, বরং তাঁদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের একেকটি স্তম্ভের ভার তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন জনআকাঙ্ক্ষা আর রাষ্ট্রীয় সংকটের মুখোমুখি হন, তখন ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার চেয়ে নিজের অস্তিত্ব বা অন্তরে গচ্ছিত জিঘাংসা মুখ্য হয়ে ওঠে। এই চারজন ব্যক্তির নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এগুলো ছিল এক একটি রাজনৈতিক বাজি। আর ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, এই বাজিতে প্রতিবারই হারতে হয়েছে খোদ খেলোয়াড়কে। যে হাতগুলোকে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সিংহাসনের পায়া, সেই হাতগুলোই শেষমেশ সেই সিংহাসন উল্টে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।এই চারটি নিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার শীর্ষে বসে শেখ হাসিনা বারবার এমন ব্যক্তিদের ওপর বাজি ধরেছিলেন, যারা সংকটের মুহূর্তে হয় অতি-নিরপেক্ষ ছিলেন, না হয় সরাসরি বিনাশের পথ তৈরি করেছিলেন। ক্ষমতার মোহ অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে ব্যক্তিগত অনুগত মানুষের চেয়ে আদর্শীক অনুগত মানুষকে বেশি নিরাপদ মনে হয়।এই সিদ্ধান্তগুলো কেবল রাজনৈতিক ভুল ছিল না, বরং এগুলো ছিল নিয়তির সেই অমোঘ লিখন, যা তিলে তিলে এক দীর্ঘ শাসনের ভিত গুঁড়িয়ে দিয়ে এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যের জন্ম দিল।
Subscribe to:
Comments (Atom)