Sunday, 1 February 2026

নাসিরনামা

নাসিরনামা
........ ২০১৩ সাল। মাদ্রাসা থেকে সদ্য আলীম পাশ করা কিশোর নাসীর উদ্দীন পাটওয়ারী প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার। দিন-রাত পড়াশোনা, লক্ষ্য একটাই। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে হবে। ঢাকার ফার্মগেটে একটা মেস বাসায় উঠলো নির্বিঘ্নে পড়ার জন্য। হাসিনার পুলিশের তখন কোটা ছিলো। প্রতিটি থানায় বিশেষ অভিযানে কতো আটক হবে তা নির্ধারিত। আর পুলিশ সেইটা পুরন করতে মেস বাসা ও হকারদের টার্গেট করতো। নিরীহ ছেলেদের ধরে নিয়ে বেদম মারধর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হতো। ওই সময়টায় আমিও পিকেটিং করতে গিয়ে ধরা খেয়ে জেলে। একদিন রাতে নাসিরের মেস বাসায় হানা দিলো স্বৈরাচারের পুলিশ। নাসিরসহ অনেক ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা আটক হলেন। স্থান হইলো তেজগাঁও থানায়। এরপর চললো অমানবিক নির্যাতন। পরেরদিন আদালতে রিমান্ড চায়। ওই সময়ে আদালত চলতো পুলিশের কথায়। রিমান্ড চাহিবা মাত্র মঞ্জুর। নাসিরদের ভাগ্যেও তাই হইলো। দ্বিতীয় দফায় আবার নির্যাতন। এরপরে কোর্টে চালান। গণমাধ্যমগুলো চলতো প্রেসক্রিপশনে। পুলিশ যেমন বলতো তেমনই নিউজ হইতো। ভুক্তভোগীর কথার কোনো দাম ছিলো না। নিরপরাধ ছেলেদের মেরে ফেললেও সেটাকে কেবল পুলিশের গুলি হিসেবে চালিয়ে দিতো। আমি জেলে এমন ছেলেদেরও দেখেছি, যারা আনারি ছিলো কিন্তু পুলিশ কেবল আনন্দ করতে পায়ে বা হাতে গুলি করে কোর্টে চালান করে দিতো। গণমাধ্যম বলতো, পিকেটিংয়ের সময় গুলিবিদ্ধ। আমরা যারা রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম তারা ৪-৫ মাসে জামিন পাইতাম। কিন্তু নাসিরদের ক্ষেত্রে এই সময়টা দীর্ঘ হতো। ভর্তি পরীক্ষার্থী নাসিরের থাকতে হইলো ৮ মাস। জেলে বসেই তার প্রস্তুতি। এরপর বের হলেন। ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পাইলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন হাসিনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। ফেসিস্টকে বিদায় করবে। সেই যে শুরু, তার প্রাথমিক সমাপ্তি হইলো হাসিনার পালায়নের মাধ্যমে। কিন্তু নাসির যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তা বাস্তবায়ন হয়নি। যুক্ত হইলো নাগরিক কমিটি ও পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে। এখনো চলছে নাসিরের লড়াই। হাসিনার আমলে মাঝে প্রায় ৫৪ দিন রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে। গোয়েন্দা সংস্থা, লীগ ও সন্ত্রাসীদের হয়রানি হুমকি ও হামলাকে উপেক্ষা করে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে গিয়েছিলো "বেয়াদব" নাসির। জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় সবগুলো সংগ্রামে আমরা নাসিরকে পেয়েছি। মোদি বিরোধী আন্দোলন, কোটা আন্দোলন, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, ডাকসুর দাবিতে আন্দোলন, সবখানে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলো আমাদের নাসির। ও যতগুলো আন্দোলন করেছে, আমি নিজেও ততোগুলোয় ছিলাম না। তার এই লড়াই এখনো চলমান।