Saturday, 18 April 2026
পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ
ইন্ডিয়ান বীর্য শুয়োরের শুক্রাণু দিয়া যাদের জন্ম হয়েছে তাদেরকে পড়ার অনুরোধ রইল। যাহারা দিনরাত ২৪ ঘন্টা শুধু রাজাকার স্বপ্নে দেখেন, মনে করেন পাঁচ লাখ মা-বোনেরা রাজাকার দ্বারা দর্শনের শিকার তারাও পরবেন।
ব্রিটিশ ২০০ বছর শাসন আমলে পূর্ব বাংলায় মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল "ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়। সেটিরও বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কলকাতার প্রভাবশালী মহল।
ব্রিটিশরা প্রায় ২০০ বছরে পূর্ব বাংলায় কোনো উন্নয়ন করেনি। যদি কিছু করার উদ্যোগও নেওয়া হতো, সেগুলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত কলকাতার দাদা-বাবুরা। কলকাতাকে তারা ভারতের রাজধানী বানিয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আমাদের শেখানো হয় যে পাকিস্তান ২৪ বছর আমাদের শোষণ করেছে। অথচ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন গুলো পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল।
পাকিস্তান আমলে মোট ৫ টি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে।
◾রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩)
◾চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬)
◾জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০)
◾জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৮)
◾পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলাদেশ কৃষি বিঃ) (১৯৬১)
▶ পাকিস্তান আমলে মোট ৪ টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে।
◾বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ১৯৬২ সাল
◾রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ১৯৬৪ সাল
◾চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ১৯৬৮ সাল
◾খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ১৯৬৯ সাল
উল্লেখ্য বর্তমানে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে মোট ৫ টা, যার মধ্যে ৪ টাই পাকিস্তান আমলের। আর পরবর্তী ৫০ বছরে হয়েছে ১ টা।
▶পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার মোট ৮৭ টি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে৷ যার মধ্যে রয়েছে
◾নটর ডেম কলেজ, ঢাকা (১৯৪৯)
◾সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ (১৯৪৯)
◾বাঙলা কলেজ (১৯৬২)
◾ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ
উল্লেখ্য বর্তমানে ঢাকা শহরে মোট ৩৯ টি কলেজ আছে, যার ভেতর ৮ টি তৈরি হয়েছে ইংরেজ আমলে, ২১ তৈরি হয়েছে পাকিস্তান আমলে, আর মাত্র ১০ টি তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার পর ৫০ বছরে।
▶ পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার ৮ টা সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে।
◾চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭)
◾রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮)
◾ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২)
◾সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (১৯৬২)
◾স্যার সলিমুলস্নাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩)
◾স্নাতকোত্তর চিকিৎসা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বর্তমান নামঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) (১৯৬৬)
◾শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮)
◾রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০)
উল্লেখ্য ইংরেজ শাসন আমলের ২০০ বছরে মোট ১টি মেডিকেল তৈরি হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ৷
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ১৯৪৭ সালের আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাকিস্তান আমলে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়।
▶পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার ১৭ টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৯টি সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট রয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে করেছে ১৭ টি। আর বাংলাদেশ সরকার ৫০ বছরে করেছে ৩২টি৷
▶ পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার ৪ টি ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করে।
◾ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ(১৯৫৮)
◾মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ(১৯৬৩)
◾ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ( ১৯৬৩)
◾রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ (১৯৬৫)
উল্লেখ্য বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজ আছে ১২ টা এর ভেতর ৪ টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তান আমলে।
▶ চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমী, নৌ অফিসার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার গড়ে তোলার জন্য ১৯৬২ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনী কর্তিক এই একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এর নাম "বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (BMA)"
▶ এছাড়াও প্রতিষ্ঠা হয়েছে....
◾ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট’ (১৯৫০) যার বর্তমান নাম "বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)"।
◾ চট্টগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৬২ সালে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।
◾এরকম আরো অনেক বিশেষায়িত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তান আমলে। এছাড়া দেশ ব্যাপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েক হাজার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাই স্কুল।
★অনেকেই অভিযোগ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে পুর্ব পাকিস্তান পিছিয়ে ছিলো, কারন পূর্ব পাকিস্তানে কম উন্নয়ন করা হয়েছে। লক্ষ করুন, ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ১ টা, বিপরিতে পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১৮ টা। অর্থাৎ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির আগ থেকেই আমরা উচ্চ শিক্ষার দিক দিয়ে পাকিস্তানের চেয়ে ১৮ গুন পিছিয়ে ছিলাম আমরা!
১৯৪৭ সালের পরবর্তী ১০ বছরে পুর্ব পাকিস্তানে যদি ১০ টা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হতো আর পশ্চিম পাকিস্তানে যদি একটাও তৈরি করা না হতো, তবুও তো আমরা পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়েই থাকতাম। আসলে ব্রিটিশ আমল থেকেই আমরা পাকিস্তানের তুলনায় এত বেশি পিছিয়ে ছিলাম, যার ফলে এই অঞ্চল কখনোই পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে উন্নয়নের দৌড়ে খাপ খাওয়াতে পারেনি।
★ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির আগে এই অঞ্চলের স্বাক্ষরতার হার ছিলো মাত্র ১২%। ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে স্বাক্ষরতার হার দাড়ায় ২৪.৭%। অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছরে এই অঞ্চলের স্বাক্ষরতার হার দ্বীগুন হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের আদমশুমারী না হওয়ায় পাকিস্তান আমলের প্রকৃত স্বাক্ষরতার হার জানা যায়নি।
▶শিল্প প্রতিষ্ঠান, মিল ও কল-কারখানা
◾ বাংলাদেশ সচিবালয় ( ১৯৭১ সালের পর এ সচিবালয়ের পুরাতন ৬ নং ভবনটি ভেঙ্গে ২০ তলা ভবন তৈরী করা হয়)
◾ পাকিস্তানের সেকেন্ড ক্যাপিটাল হিসাবে শেরেবাংলা নগর কে পরিকল্পিতভাবে তৈরী
◾ সংসদ ভবন
◾ বাইতুল মোকাররম মসজিদ
◾ বাংলা একাডেমি
◾ ইসলামিক একাডেমি (বর্তমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
◾ রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, সিলেট বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
◾ কমলাপুর রেলস্টেশন (পূর্বতন রেলস্টেশন টি ছিলো গুলিস্তান-ফুলবারিয়ায়)
◾ মীরপুর চিড়িয়াখানা
◾ কুর্মিটোলা বিমানবন্দর (ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)
◾ যমুনা সেতু (১৯৬৬ সনে সংসদে অনুমোদিত)
◾ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ( ১৯৬১ সালে এর পরিকল্পনা গ্রহন করে তখনকার পূর্বপাকিস্তানের অনেক কর্মকর্তাকে বিদেশে প্রশিক্ষনে প্রেরণ করা হয়, যারা এখন ইরান ইরাকে কর্মরত। ১৯৭২ সালে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়া হয়)
◾ শাহজীবাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
◾ আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
◾ কর্ণফুলী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
◾ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল
◾ গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প
◾ রামপুরা টেলিভিশন ভবন
◾ ঢাকা স্টেডিয়াম
◾ ঢাকা যাদুঘর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক ভবন)
◾ WAPDA এবং এর অধিনে শতশত বাধ ও সেচ প্রকল্প
◾ ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী প্রভৃতি আবাসিক এলাকা গঠন ও নগরায়ন
◾ শত শত পাট ও কাপড়ের কল যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়।
◾ শিল্পায়নের জন্য গড়ে তোলা হয় East Pakistan Industrial Development Corporation (EPIDC)
◾ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখান
◾ গাজীপুর মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি
◾ মংলা সামুদ্রিক বন্দর ( চট্টগ্রাম বন্দরটি মুঘল আমলে তৈরী)
◾ঢাকার নিউমার্কেট সহ বিভাগীয় শহরে একটি করে নিউমার্কেট তৈরী
◾তেজগাঁও শিল্প এলাকা
◾হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্প এলাকা
◾খালিশপুর শিল্প এলাকা।
◾আদমজী জুট মিলস (নারায়ণগঞ্জ): ১৯৫১
◾খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস: ১৯৫৯
◾চিটাগং ড্রাই ডক: ১৯৬০
◾ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (চট্টগ্রাম): ১৯৬৮
◾ঢাকা জুট মিলস লিমিটেড: ১৯৫০ এর দশক
◾ আমিন জুট মিলস লিমিটেড (চট্টগ্রাম): ১৯৫৩
◾ খুলনা জুট মিলস: ১৯৫০ এর দশক
◾ ইস্পাহানী কটন মিলস: পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
◾ কাপ্তাই জল বিদ্যুত - ১৯৬২
◾ চন্দ্রঘোনা পেপার মিল - ১৯৫৩
◾ কর্ণফূলী রেয়ন মিল – ১৯৫৩
◾ প্রগতি ইন্ড্রাস্ট্রিজ – ১৯৫৩
◾বাংলাদেশে একটিমাত্র তেল শোধনাগার সেটিও পাকিস্তান করে দিয়েছে।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তান ঘাস খেয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের কাছে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেডসহ একটি পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে।
তাদের বিমান বাহিনীর আকাশ ছোঁয়া সাফল্যের কারণে দেশটি সৌদি আরবের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান বাহিনীর মধ্যে পাকিস্তান বিমান বাহিনী ১৪৩৪ টি যুদ্ধবিমান ও রনকৌশল নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছে। যার মেরুদণ্ড হিসেবে আছে আমেরিকান এফ-১৬, জেএফ-১৭ থান্ডার এবং আধুনিক চীনা জে-১০সি।
তাদের কাছে আছে শাহীন-৩ (২,৭৫০ কিমি পর্যন্ত পাল্লার), গৌরী এবং গজনভীর মতো একাধিক উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তাদের কাছে বাবর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা পারমাণবিক এবং প্রচলিত উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম এবং যা স্থল ও সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়।
তাদের সেনাবাহিনীর কাছে ২,৬০০টিরও বেশি প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্কের একটি বহর রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উন্নত খালিদ, ভিটি-৪ এবং টি-৮০ইউডি ট্যাঙ্ক।
দেশটি তার প্রতিরক্ষা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গিয়েছে। চীনের সাথে যৌথ উদ্যোগে নিজস্ব জঙ্গি বিমান বানিয়েছে। তাদের কাছে বুরাকের মতো উন্নত ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে এবং উইং লুং ড্রোনের জন্য চীনের সাথে সহযোগিতা করে।
তাদের কাছে আটটি সাবমেরিন রয়েছে, উপকূলরেখা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য নৌবহরে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট এবং দ্রুতগামী মিসাইল বোট রয়েছে।
এছাড়াও তাদের কাছে ৩,০০০টিরও বেশি কামান (টানা ও স্ব-চালিত উভয়ই) এবং একাধিক রকেট লঞ্চার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এমনকি পাকিস্তানের ১১ টি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি পেয়েছে। শিক্ষার মানেও পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। সবচেয়ে বড় কথা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশটি বড় খেল দেখিয়েছে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি তে নিজেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে কূটনীতি ও সামরিক পার্সপেক্টিভে। যারা আমেরিকা এবং ইরানকে ও এক টেবিলে বসাতে পারছে।
আর ১৯৭১ সালে বিজয়ী বাংলাদেশের যুদ্ধ করে দাসত্বের সার্টিফিকেট নিয়েছে। তারা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে পৃথিবীর প্রথম চেতনা বোমা বানিয়েছে। যা চীনের হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও ভয়ংকর।
এই পর্যন্ত সংসদের মতো একটা স্থানে চেতনা বড় নাকি আধুনিকতা বড়! এই নিয়ে কয়েকশ অধিবেশন চলছে।আফসোস🙂
সংগৃহীত
#OMG #BreakingNews
Thursday, 16 April 2026
স্পিকার শিরিন শারমিনের 'সততা ও নির্লোভ' জীবন নানা গল্প
কয়েকদিন ধরে সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিনের 'সততা ও নির্লোভ' জীবন নানা গল্প শুনছি। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ পদ, তথা স্পিকার হওয়ার 'গল্প' তাহলে আজ বলি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও, শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ এবং রংপুর-৬ আসন থেকে ভোটে 'জেতেন'। তবে শিরিন শারমিন ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন না। তিনি ২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হয়ে প্রথমে প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে হয়ে যান স্পিকার।
২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি দশম সংসদ শুরু হয়। এর পাঁচদিন আগে ২৪ জানুয়ারি নবম সংসদ বিলুপ্ত করা হয়। শিরিন শারমিন এর মাধ্যমে সাবেক এমপি হয়ে যান।
শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেন, শিরিন শারমিনকেই আবার স্পিকার বানাবেন। কিন্তু স্পিকার হতে গেলো তো এমপি হতেই হবে। এটাই সংবিধান। কিন্তু তিনি তো নির্বাচনই করেননি এমপি হবেন কী করে! আর সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হচ্ছে, সংসদের প্রথম দিনেই স্পিকার নির্বাচন হবে। তাই শিরিন শারমিনকে ২৯ জানুয়ারির আগেই এমপি হতেই হবে। যা অসম্ভব ছিল না। আর সংরক্ষিত আসন থেকে এমপি হতে হলে আরও ৬০-৬৫ দিন অপেক্ষা করতে হতো। তাহলে আর স্পিকার হওয়া সম্ভব না।
কিন্তু শেখ হাসিনা 'যথারীতি' একটা নজিরবিহীন পথ বের করলেন। তিনি রংপুর-৬ আসন ছেড়ে দিলেন। আসন শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন হতে হবে। এবার যেমন তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচন হয়েছে গত ৯ তারিখ। গত ২০ ফেব্রুয়ারির তপশিল ঘোষণার ৪৪ দিন পর এই নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত তপশিল ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪১ দিন সময় দেওয়া হয়।
কিন্তু 'ম্যাজিক' হয় শিরিন শারিমনের জন্য। ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি রংপুর-৬ আসনের উপনির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হয়। (কমেন্টে লিঙ্ক) বলা হয়, ২০ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে। ২৭ জানুয়ারির মধ্যে মনোয়নপত্র দাখিল করতে হবে। মনোয়নপত্র দাখিলের জন্য সাধারণত ১২ থেকে ২১দিন সময় দেওয়ায় হয়। এবার যেমন ১৮ দিন সময় ছিল। কিন্তু শিরিন শারমিনকে এমপি বানাতে সময় দেওয়া হয় ৭ দিন।
তারপর রংপুর ডিসি অফিস এবং পীরগঞ্জ ইউএনও অফিসে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে পাহারা বসানো হয়, যাতে আর কেউ মনোনয়নপত্র কিনতে না পারে। নুর আলম নামে জাতীয় পার্টির এক নেতা গিয়েছিলেন মনোনয়নপত্র কিনতে। উনাকে ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত শিরিন শারমিন ছাড়া কেউ মনোনয়নপত্র কিনতে পারেননি। ২৮ জানুয়ারি, মানে মাত্র একদিন সময় ছিল মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের জন্য (হা হা হা হা)। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সাধারণত বাছাইয়ে চার-পাঁচদিন সময় দেওয়া হয়।
কাউকে মনোনয়ন ফরম তুলতে দেওয়া না দেওয়ার কারণ হলো; পাগল ছাগল যাই হোক আরেকজন প্রার্থীও যদি থাকে, তাহলে ২০ ফেব্রুয়ারি ভোট হবে। তখন আর শিরিন শারমিন স্পিকার হতে পারবেন না। তিনি একমাত্র প্রার্থী হওয়ায়, ২৮ জানুয়ারি বাছাইয়ের দিনে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ঘোষণা করেন। নিয়ম হচ্ছে, ফল ঘোষণার তিনদিনের মধ্যে গেজেট হবে। কিন্তু তড়িৎ গতিতে সেইদিন বিকেলেই শিরিন শারমিনকে এমপি ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন! ফল ঘোষণার তিনদিনের মধ্যে শপথ হয়। কিন্তু পরেরদিন সকাল বেলা এমপি হিসেবে শপথ নিয়ে দুপুরে স্পিকার পদে পুনঃনির্বাচিত হয়ে যান শিরিন শারমিন।
আর আজকাল উনারই সততার গল্প শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
ম্যুরাল অব দ্যা স্টোরি হচ্ছে, অযোগ্য কাউকে খাতির করে নিয়মকানুন ভেঙে যে পদেই বসান না কেনো, প্রয়োজনের সময় কাজে আসবে না। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করুন, এতে আপাতত ক্ষমতা কমলেও একদিন নিজেই এর সুফল পাবেনই।
১০ বছর ধরে তিলে তিলে অর্থ জমা দিয়ে পদ্মা লাইফ ইন্সুরেন্সে একটা ডিপিএস আর একটা পেনশন স্কিম খুলেছিলাম।
সম্ভবত ৯ম বছরে এসে এই ইন্সুরেন্স কোম্পানি এস আলমের কবলে পড়ে। সে বোর্ড অফ ডিরেক্টরস দখল করে পদ্মা লাইফের প্রায় ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার ফান্ড লুটপাট করে বলে শুনেছি।
আমার স্কিম দুইটা ম্যাচিউরড হওয়ার এক বছর পরে দাবী আদায়ে অফিসে দেখা করলে বলা হয়, এক দেড় বছরের মধ্যে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কেন নেই?
সরকারী রেজিস্ট্রেশন পাওয়া, শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত একটা কোম্পানিতে ১০ বছর ধরে বিনিয়োগ করার পর সেটা রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় কোন এক মাফিয়া ব্যাংক লুটেরা এসে পুরোটা ডাকাতি করে নিয়ে যাবে, এ কেমন সভ্য দেশ? সেই ডাকাতের কোন বিচার হবে না৷ বরং তাকে পুরষ্কৃত করার জন্য নতুন সরকার এসে নতুন কালো আইন তৈরি করবে, এ কেমন রাষ্ট্র!!
তখন এস আলমের মালিকানাধীন সব তলা বিহীন কোম্পানিতে তার এলাকার অযোগ্য কিছু লোকজনকে মাসিক বেতনে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল৷ তারা বসে বসে অন্যদের উপরে মোড়লগিরি ফলানোর জন্য মাসিক চুক্তিতে ভাড়া খাটত। আর কোন অফিস কর্মচারী এস আলমের বিরুদ্ধে কিছু বললে তার চাকুরি যেত নইলে তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা হত।
যেমন ইসলামী ব্যাংকে হাজার হাজার অযোগ্য, কম শিক্ষিত আর কম অভিজ্ঞ লোকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই চাকুরি দেয়ার বিনিময়ে নেয়া হয়েছিল বিশাল অংকের ঋণ। সেই ঋণ কিন্তু শোধ করার সামর্থ্য এদের নেই। এদের একটা বড় অংশকে যখন জনাব ওমর ফারুক চাকুরিচ্যুত করেন, তখন এই অর্ধশিক্ষিতরা হইচই শুরু করে।
৫টা লুটপাট হয়ে যাওয়া ব্যাংককে একত্রীকরণ করে তৈরি করা হয়েছে "সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক"।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এস আলমের মত লুটেরা আর ব্যাংক মালিকদের ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করে তৈরি করেছিলেন ব্যাংক আইন অধ্যাদেশ।
সেই আইন পাশ করার পূর্ব মুহূর্তে কোন বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াই বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এতে একটা চরম বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে, যাতে এস আলমের মত পূর্বের ডাকাত আর লুটেরা ব্যাংক মালিকরা মাত্র ৭.৫% অর্থ পরিশোধ করে, মালিকানায় ফিরে আসতে পারে। কমিটির অধিকাংশ সদস্য আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা এই আইনের বিরোধিতা করেছিলেন।
বলা হচ্ছে, আগের সরকারের কোন দায়ের জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করা যাবে না। তারা আগের সরকারের ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য না৷ তারা এস আলমদের লুট করা টাকা ফেরত আনতে পারবে না।
তাহলে প্রশ্ন হল, তারা এস আলমদের ফিরে আসার দরজা কেন খুলে দিচ্ছে?
একজন চোর বা ডাকাত হঠাৎ ভাল হয়ে যাবে, এরকম মিরাকল দুনিয়ায় ঘটে না৷ উলটা তারা আরো ফন্দিফিকির করবে কিভাবে বাকিটা লুট করা যায়।
আমার দুইজন আত্মীয়ের ২৫ লাখ করে এফডিআর আছে এক্সিম ব্যাংক আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে।
বিনিময়ে তারা দেয় মাসে ১০-১৬ হাজার টাকা। দুই বছর ধরে এফডিআর ভাঙ্গার কোন সুযোগ নেই।
এখন বিএনপি যদি সোজা ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষণা করে তাহলে লাখ লাখ আমানতকারী কই যাবে? তারা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করেছিল, বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশ্বাস করেছিল, নির্দিষ্ট একটা ব্যাংককে বিশ্বাস করেছিল। তারা তো বিনিয়োগ করেনি। তারা মূলত টাকা নিরাপদ রাখার জন্যই ব্যাংকে রাখত।
রাষ্ট্র একটা সিস্টেম৷, এই সিস্টেমের দায় এর পরিচালকদের। পূর্ববর্তী পরিচালকদের ভুলত্রুটি মেটানোর দায় পরবর্তীতে যারা সেধে পরিচালক হবে তাদের৷ বিদেশী ঋণ কি তারা শোধ করে না? তাহলে দেশী ঋণ পরিশোধে তাদের গড়িমসি কেন?
Atique UA Khan
Monday, 13 April 2026
ইউনুস থেকে তারেকে ক্ষমতার হাতবদলের এক অনিবার্য পরিণতি
গুম বিরোধী অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হবে না এবং সেটাকে বাতিল করা হবে—এটা ইউনুস থেকে তারেকে ক্ষমতার হাতবদলের এক অনিবার্য পরিণতি ছিলো। যারা আজকে খুব ‘শকড’ হয়েছেন, তাদের অবস্থা দেখে করুণা করবো নাকি আমিও ‘শকড’ হবো—ঠিক বুঝতে পারছি না। এ তো কেবল শুরু; সামনে আরো কী কী আসছে, সেটার আগাম বার্তাও বটে—যারা চোখ খোলা রেখে দেখেননি, তাদের জন্যে এই ‘শকড’ হওয়াটাই বরং এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা।
গুমের সাথে যুক্ত সেনা অফিসারদের ক্যান্টনমেন্টের কথিত সাব-জেলে রাখা—এটা কি ইউনুস সরকার থামাতে পেরেছিলো? সরকার ও জন-আকাঙ্খাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওয়াকার এন্ড গং গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের সাধারণ কারাগারে স্থানান্তর করেনি। কাউকে কিছু না জানিয়েই তড়িগড়ি করে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ক্যান্টনমেন্টে অফিসারদের বিলাসবহুল ভবনকে সাব-জেল ঘোষণা করেছিলো। সেখানে শুধু ইন্টারনেট, টেলিফোন ও বাহারি খাবারের আয়োজনই ছিলো না—বৌদের নিয়ে থাকার ব্যবস্থাও ছিলো। চমৎকার জেল, তাই না? বিশ্বের অন্য কোথাও এ রকম ‘মানবিক’ জেল আছে কিনা আমার জানা নেই—যেখানে অভিযুক্তরা শাস্তি ভোগ করে না, বরং আরাম-আয়েশের জীবন কাটায়।
শুধু তাই নয়—জাতির সাথে তামাশা করার জন্যে বিলাসবহুল এয়ার কন্ডিশন্ড বাসে করে খুনি সেনা অফিসারদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিলো। আশা করি সবুজ রঙের সেই বহুল আলোচিত প্রিজন বাসটিকে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাননি। বিচার প্রক্রিয়াকে এভাবে সার্কাসে পরিণত করার নজির খুব কমই আছে—যেখানে অপরাধী যেন অভিযুক্ত নয়, বরং ভিআইপি অতিথি।
এসব কেন সম্ভব হয়েছিলো? কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো? কোন সমঝোতার ভিত্তিতে হয়েছিলো?—এসব প্রশ্ন যারা করেননি, গুম বিরোধী অধ্যাদেশ বাতিলের কারণে তারাই আজকে ‘শকড’ হয়েছেন। প্রশ্ন না করা, হিসাব না চাওয়া, ক্ষমতার এই নোংরা আপসকে মেনে নেয়া—এসবেরই যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে আজকের এই বাস্তবতা।
জুলাই বিপ্লবের পর ওয়াকার ও চুপ্পুকে কেন সরানো হয়নি? সরল উত্তর—বিএনপি সেটা চায়নি। এটা কোনো অনুমান কিংবা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; নির্মম বাস্তবতা। আপনার আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। ‘বুকে পাথর চাপা দিয়ে’ ড. ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেয়া ওয়াকার কি একদিনের জন্যেও জুলাইয়ের রক্তস্নাত বিপ্লবের পর জন-আকাঙ্খা ও অনুরোধের কারণে প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হওয়া ড. ইউনুসের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে? রাওয়া ক্লাবে যখন আঙ্গুল তুলে নাম ধরে ড. ইউনুসকে সম্বোধন করেছিলো—তখন সেই ঔদ্ধত্য শুধুই কি ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে ছিলো, নাকি আপামর জনগণের বিরুদ্ধে ছিলো? সেই প্রশ্ন কি কখনো করেছেন? প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী—সে ওয়াকার হোক বা অন্য কেউ—দায়িত্বরত কোনো প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা সমমানের কাউকে পদবী ছাড়া নাম ধরে সম্বোধন করা নিছক ধৃষ্টতা নয়, এটা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।
প্রধান উপদেষ্টার অনুমতি না নিয়ে দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে বৈরী রাষ্ট্র ভারতের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির সাথে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ মিটিং করেছিলো ওয়াকার। সরকারকে পাশ কাটিয়ে সেনাপ্রধান বৈরী রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সাথে ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ কোন ক্ষমতা বলে ওয়াকার করেছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে যে বাস্তবতা সামনে আসে, তা অনেকের জন্যই অস্বস্তিকর—কারণ সেখানে রাষ্ট্র নয়, সমঝোতাই নিয়ন্ত্রক শক্তি।
শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া চাকর-বাকর ও ফ্যাসিবাদের দোসর সরকারি আমলা ও সচিবরা প্রধান উপদেষ্টার কথা শুনছিলো না—সে কথা তো প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে ড. ইউনুস নিজেই বলেছিলেন। অর্থাৎ, ক্ষমতার চেয়ারে বসা মানেই ক্ষমতা হাতে থাকা নয়—এই নির্মম সত্যটি তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।
হাসিনার রেখে যাওয়া সামরিক ও বেসামরিক আমলা—যাদের ‘টিকি দিল্লিতে বাঁধা’—তারাই দিল্লীর মধ্যস্থতায় তারেককে ক্ষমতায় বসিয়েছে; তাদের ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ নিয়েই লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছিলো তারেক। খালেদা জিয়া ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ হওয়া সত্ত্বেও এই ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ না থাকার কারণে ঢাকায় আসতে পারেনি তারেক—অর্থাৎ, আসতে দেয়া হয়নি। কে আসবে, কে আসবে না—এই সিদ্ধান্ত যদি অন্য কোথাও নেয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বড় বড় বক্তৃতা নিছক প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।
দিল্লীর হয়ে এসবের সকল মধ্যস্থতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই শিলং উদ্দিন। শিলং উদ্দিনের দাপটে বিএনপি’র ত্যাগী শীর্ষনেতারা কপোকাত। শুধু কি তাই—প্রধানমন্ত্রীকে বসিয়ে রেখে তার সামনেই সংসদে প্রধানমন্ত্রীর হয়ে বক্তব্য দেয় শিলং উদ্দিন। তারেকের মা খালেদা যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন তিনি তো সংসদীয় কায়দায় ঠিকমতো কথাই বলতে পারতেন না; জাতিসংঘের এক অনুষ্ঠানে কোনো রকমে, তড়িগড়ি করে ‘রিডিং’ পড়ে বক্তব্য শেষ করেছিলেন—এসব ভিডিও এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়। কিন্তু তারপরও তিনি নিজের হয়ে অন্য কাউকে দাঁড় করিয়ে বক্তৃতা দেননি।
অর্ধশিক্ষিত এই মহিলা তো কখনো সংসদে বা বিদেশে নিজে বসে থেকে তার পক্ষ থেকে কাউকে দিয়ে বক্তৃতা দিতে দেননি। এইটুকু আত্মসম্মানবোধ খালেদারও ছিলো। তারেকের সমস্যাটা কি শুধুই আত্মসম্মানহীনতা, নাকি হাত-পা শিকলে বাঁধা? নাকি শুধুই পুতুল প্রধানমন্ত্রী হয়ে চেয়ার তা’ দেয়াকেই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ও গৌরব বলে মনে করছেন? এই প্রশ্নগুলো এখন আর ব্যক্তিগত নয়—এগুলো রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
তারেকের আত্মসম্মানহীনতা কিংবা অথর্বপনা এখন আর নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে। তার এই আত্মসম্মানহীনতা ও অথর্বপনা বাংলাদেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে ইতিমধ্যেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে—এটা শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় বিপদের আলামত।
জুলাই বিপ্লব ও জন-আকাঙ্খার কবর রচনা করার জন্যে যা যা করা দরকার, তার সবকিছু করার বিনিময়েই তারেককে লন্ডন থেকে ঢাকায় এনে অতঃপর পাপেট হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছে। ক্ষমতার এই লেনদেনের ভেতরে গণতন্ত্রের কোনো স্থান ছিলো না—ছিলো শুধু নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।
‘বিশ্ববাটপার’ আসিফ নজরুল, শিলং উদ্দিন ও ওয়াকার—এই ত্রিভূজের মধ্যে তারেককে বন্দি করে খেলা চালিয়ে ছিলো ভারত। আগে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর সওয়ার ছিলো, এখন ‘নতুন গাধা’ তারেক ও মূর্খ বিএনপি’র ওপর সওয়ার হয়ে জাতির কুলাঙ্গার সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের মাধ্যমে (যাদেরকে অনেকে ‘ডীপ-স্টেইট’ বলে রাজনীতিক প্রজ্ঞা জাহির করে) বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে বাফার স্টেইট বানিয়ে রেখেছে ভারত। খেলোয়াড় বদলায়, খেলা বদলায় না—এই বাস্তবতাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
আর ভারতকে এসব করার সুযোগ করে দেয় ‘দলদাস’, ‘আত্ম-সম্মানহীন’ ও ‘অথর্ব’ লোকগুলো—যারা ব্যক্তি ও যোগ্যতা দেখে না, দেখে মার্কা। যাদের কাছে রাজনীতি হলো বর্বর চর দখলের লড়াই; যে লড়াইয়ে বিজয়ীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে তারা আদিম অসভ্য সুখ অনুভব করে। কিংবা সেই সব লোকগুলো—যাদের কেউ ভোটের বাজারে হাঁস-মুরগির দামে বিক্রি হয়, কেউবা ‘বুদ্ধি-বেশ্যা’ বৃত্তিতে লিপ্ত, আর কেউবা ‘স্তনমৈথনের মতো করে বিবেক বিলিয়ে’ দিয়ে দুই পয়সা কামিয়ে নেয়। এই প্রজাতির ইতরগুলোর কাছে দেশপ্রেম কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়—সামান্য স্বার্থের জন্যে তারা সব করতে পারে, এবং করছে।
মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।
Friday, 10 April 2026
বুদ্ধিজীবীর মূল্য তার বাকশক্তিতে নয়, তার নৈতিক সাহসে
শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের একক মালিক দেখিয়ে ফ্যাসিবাদ ইস্টাবলিশ করেছিল শেখ হাসিনা। ৭ মার্চের ভাষণ, ৭১ ও মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুই মুজিববাদ হয়ে একবার বাকশাল, অন্য বার ফ্যাসিবাদ কায়েমের প্রধানতম টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শিল্প সংস্কৃতির মহীরুহদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। কবিতা, সংগীত, সাহিত্য, সিনেমা যেগুলো মানুষের মুক্ত আত্মার ভাষা, সব কিছু ক্ষমতার কাঠামোর অংশ বানানোর চেষ্টা হয়েছে। যা কিছু বাঙালী ও বাংলা ভাষার সাথে সম্পৃক্ত, সবকিছুই স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের এনাবলিং টুলে রূপান্তর করা হয়েছে। প্রকট সত্য হচ্ছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকেও আওয়ামী ও তার কালচারাল ফ্যাসিস্টরা ফ্যাসিবাদী শাসনের এলিমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছে। আজ স্পষ্ট, এই মেগা প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বুদ্ধিজীবী সমাজের অধিকাংশের লাইফ টাইমেই তাদের নেতা শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়েছে। ভাবা যায়! একটি গোটা বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর নৈতিকভাবে পরাজিত। তারা দেখেছে নিজেদের শহরে, নিজেদের চোখের সামনে, তার ডিজাইন করা রাষ্ট্র যুদ্ধের অস্ত্র নিয়ে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। দুই হাজারের মতো মানুষ খুন করেছে, ২০ হাজারের বেশি আহত ও পঙ্গু। তবুও তারা নীরব থেকেছে। তাদের বিবেক ঘরের পাশের রাজধানীর রাজপথের যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে, সম্মিলিতভাবে ট্রেঞ্চে লুকিয়েছে, আজও তারা গর্ত বাসী।
২৪ এর পুরো সময় চুপ থেকে, আজকে সিরাজুল ইসলামের মতো বুদ্ধিজীবী, কিছু টক শো এক্টিভিস্ট সরব হবার চেষ্টা করছে। এরা আরেকবার ব্যর্থ হবার শপথ নিয়েছে!
যারা বড় বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেনি, তাদের ট্র্যাজেডি এখানেই যে তারা জীবিত থেকেও ইতিহাসের কাছে মৃত হয়ে গেছে। একজন বুদ্ধিজীবীর মূল্য তার বাকশক্তিতে নয়, তার নৈতিক সাহসে। বাংলাদেশের চিন্তা সমাজে এদের জীবনের কোনও মূল্য অবশিষ্ট নাই। ক্ষমতাসীন দলের নিকৃষ্টতম অন্যায়েও চুপ থাকা বুদ্ধিজীবীর নিয়তি হচ্ছে, তার জীবদ্দশাতেই তার ডক্ট্রিনের পরাজিত হওয়াকে স্বচক্ষে দেখা, গলধকরণ করা। এবং নৈতিকতার কাছে পরাজিত বিকেবের আর্তনাদ লিখতে না পারার মর্মবেদনা এদের কুরেকুরে খাচ্ছে, এটা আত্মহত্যার চেয়ে কম কিছু নয়। আওয়ামী লেখক সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের নীরবতার মধ্যে যে আত্মসমর্পণ, তা তো জীবনের চেয়েও বড়ো এক পরাজয়।
আবদুল্লাহ আবু সাঈদ সম্পর্কে একবার বলেছিলাম, উনার জীবদ্দশাতেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো স্বৈরশাসক, ফ্যাসিস্ট ও খুনির শাসন বেড়ে উঠেছে, এবং উনি ১৬ বছর সময়ে পেয়েও তার বিরুদ্ধে সরাসরি দুই কলম লিখতে ও বলতে পারলেন না। ফলে উনি বিরাট বাগ্মী হতে পারেন, বুদ্ধিজীবী নন।
বুদ্ধিজীবী সে-ই, যে বর্তমানের ভেতর ভবিষ্যতের রেখাচিত্র দেখতে পায়, এবং সময় থাকতে শাসককে সতর্ক করেন। তা না পারা লোক, কেবল শব্দের কারিগর, চিন্তার নয়।
সে হিসেবে সিরাজুল ইসলাম থেকে আনিসুল হক সহ বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিককুল এরা সবাই পতিত, ফ্যাসিবাদের উত্থানের কালে ইনারা গোকুলে বেড়েছে। তাদের মোরাল মরে গেছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটা শিক্ষা দিয়েছে যে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, কিংবা কোনো মহান ব্যক্তিত্ব, এগুলোকে আর দ্বিতীয়বার ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার বানানো সহজ হবে না। আমাদের কালেক্টিভ লিভিং হিস্ট্রি ও অভিজ্ঞতায় এই সতর্ক করে যাই যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কিংবা বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে একই বাড়াবাড়ি চেষ্টা কেউ করলে তারাও ব্যর্থ হবে।
মিশেল ফুকো'র একটা উক্তি আছে, Power is everywhere; not because it embraces everything, but because it comes from everywhere. ক্ষমতা যেমন ছড়িয়ে থাকে, তেমনি প্রতিরোধও জন্ম নেয় সর্বত্র। আমরা এটা ভুলে যাই। বাংলাদেশে ৬৯, ৭১, ৯০, ২৪ হয়েছে।
তাই পতিত ফ্যাসিবাদকে, তার বুদ্ধিজীবী, লেখক সাহিত্যিক কিংবা এক্টিভিস্টদেরকে নতুন করে ভয় পাবার কিছু নেই। ভয় পেয়ে কোনও আওয়ামী লেখক, বুদ্ধিজীবী, এক্টিভিস্টকে অযথা জেলে ভরারও দরকার দেখি না। জেল হবে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত। সহিংসতার সাথে সম্পর্কহীন জেল-জুলুম সরকার ও রাষ্ট্র উভয়কে দুর্বল করবে। স্পীচ অফেন্সের ক্ষেত্রেও সহিংসতার সম্পর্ক দেখতে হবে।
আজকে, পতিত ছাত্রলীগ কিংবা ইমি'রা (ইমি ছাত্রলীগ নয়, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে উনার সক্রিয়তা ছিল) যদি ৭ মার্চকে ফিরিয়ে আনতেও চায়, তাতেও ভয়ের কিছু নাই। ইমিদের জেল মুক্তি দিয়ে দিন।
কোনও রাজনৈতিক ধারণার বিরুদ্ধে কারাগার কখনও স্থায়ী সমাধান নয়। বরং আমরা চব্বিশের বাক্ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ধারণ করি। যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করেছি, সেটা দলমত নির্বিশেষে সবাই মুক্তভাবে ভোগ করুক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের শত শত আন্দোলনকে আমি সবসময়ই ১৭ বছরে না বলতে পারার, দাবি উপস্থাপন না করতে পারার চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছি, হ্যাঁ, তাতে মুহাম্মদ ইউনূসকে বিব্রত, বিরক্ত ও ব্যর্থ করার রঙ ছিল।
ফ্যাসিবাদের পতনে ভাষা ও শব্দের স্বাধীনতা ছিল এক অনিবার্য শক্তি। যে কণ্ঠ একসময় ভয়ে স্তব্ধ ছিল, সেই কণ্ঠ যখন উচ্চারণের সাহস পায়- সেই উচ্চারণেই শুরু হয় মুক্তির যাত্রা। সেটাই হয়েছে। এরশাদ বা হাসিনার বিরুদ্ধে গালি দেওয়ার আস্পর্ধা কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; তা ছিল ভয়ের প্রাচীর ভাঙার প্রথম আঘাত। শাসকের প্রতি ভীতিহীন ভাষাই জনগণকে নিজের শক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙার লড়াই ফ্যাসিবাদ পতন করেছে। ফলে ভয় দেখিয়ে জয় করার দরকার নাই। ২৪ আমাদের যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক বুঝাপড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা ভুলে না যাই।
গত ১১ মার্চ লিখেছিলাম ''বিএনপি নির্বাচনি রাজনীতিতে আওয়ামীলীগকে স্পেইস দিয়েছে কথাটা ভুল, দিয়েছে আওয়ামীপন্থী ভোটারদের সেটা ভোটের মাঠের কৌশল ছিল মাত্র। ভোট শেষ, বিএনপি তার নিজের রাজনীতিতে ফিরবে, সে রাজনীতিতে আওয়ামী লিগ থাকবে না.........আর এই বিএনপিকে, আওয়ামী ১৭ বছর মর্মান্তিক নির্যাতন করেছে, সব জুলুম মনে রাখা আছে, ডিজিটাল ডায়েরি কিংবা কাগজে লেখা আছে। মাফিয়া-মিডিয়ার বুদ্ধিজীবী গং'টা আওয়ামীলীগকে ফিরাতে পারবে না, বরং তাদের পুরা জেনারেশন মারা খাবে। কারণ আওয়ামী রাজনীতির শূন্যস্থান আর ফাঁকা নাই, সেটা অকুপাই হয়ে গেছে অনেকাংশে।" আজকে জাতির পিতার পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার আইন রহিত হয়েছে, আওয়ামী নিষিদ্ধের বিল পাশ হয়েছে নির্বাচিত সংসদে।
বরং বিএনপি ঘরনার বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতার বধ্যভূমিতে যাবার লোভাতুর নবযাত্রাকে ভয় করি। ক্ষমতার খুব কাছে যেতে বুদ্ধিবৃত্তির যে আত্মবিনাশী আকর্ষণ, সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতার সান্নিধ্যই চিন্তক বুদ্ধিজীবীর জন্য সবচেয়ে বড়ো ফাঁদ। ক্ষমতার স্পর্শই তাদের নীরব মৃত্যুর সূচনা। আমি অতীতের পরাজিতদের ভয় পাই না, পাই নতুন করে জন্ম নেওয়া সেই আকাঙ্ক্ষাকে, যেখানে চিন্তা আবার ক্ষমতার দাসে পরিণত হতে চায়। শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীর বধ্যভূমি কোনো কারাগার নয়, তার বধ্যভূমি হচ্ছে ক্ষমতার অতি নিকটতা, ক্ষমতার নিকটে আসার তীব্র আকাঙ্ক্ষাজনিত আত্মহনন।
আজকে বিএনপি বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি যাবার তীব্র নেশায় আচ্ছন্ন, তারা কি আত্মহননের স্বাদ নিতে চান? আপনাদের জবান যেন আপনাদেরকে বধ্যভূমিতে নিয়ে না যায়। ক্ষমতাকে তোয়াজ না করে, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাসকে নার্চার করুণ।
গোল্ডফিশ আওয়ামীভক্ত সমীপে— (পর্ব ০১)
গোল্ডফিশ আওয়ামীভক্ত সমীপে— (পর্ব ০১)
(এতকিছু পড়ার টাইম না থাকলে আমার কথাকেই ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে মেনে নেন। আমি আপনার হয়ে এই সবকিছুই মাথায় রেখেই কথা বলি। আপনি ভুলে গেলে আমি যা বলি চুপচাপ মেনে নেন আরকি)
২০০৯ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরবর্তী দেড় দশকে কীভাবে নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য কাঠামোগতভাবে উগ্র ডানপন্থী এবং ইসলামপন্থী মতাদর্শকে রাষ্ট্রযন্ত্রে একীভূত করেছিল, তা যেহেতু গোল্ডফিশ মেমরির আওয়ামীভক্তরা ভুলে গেছেন, এ নিয়ে আমি ফ্যাক্টবেজড এই লেখাটি রাখছি। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে যে দলটি নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, তারাই সময়ের পরিক্রমায় একটি “ধর্মনিরপেক্ষ” পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের গণতান্ত্রিক ঘাটতি পূরণের জন্য ধর্মীয় তোষণ নীতিকে রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়ায় সরকার ক্রমান্বয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়েছে। [১]
এখানে শেখ হাসিনা আমলের (২০০৯-২০২৪) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামীকরণ, মুক্তচিন্তকদের ওপর আক্রমণ, ধর্মীয় অনুভূতির নামে আইনি কাঠামোর চরম অপপ্রয়োগ এবং এর বিপরীতে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের “মব ভায়োলেন্স” বা গণ-উচ্ছৃঙ্খলতার একটি বিস্তারিত ও তুলনামূলক চিত্র দেখানো যাক। ফ্যাক্টবেজড এই আলোচনায় এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আওয়ামী লীগ আমলের ইসলামীকরণ ছিল সম্পূর্ণভাবে “রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত” এবং প্রাতিষ্ঠানিক। সে সময়ে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, একনেক (ECNEC) থেকে মেগা প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম বোর্ডের মাধ্যমে সিলেবাস পরিবর্তনের মতো রাষ্ট্রীয় ম্যান্ডেট ব্যবহার করে উগ্রবাদকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। [১-৩]
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক শূন্যতা এবং পুলিশ বাহিনীর ভেঙে পড়ার সুযোগ নিয়ে যে সহিংসতাগুলো ঘটেছে, তা মূলত “অসংগঠিত মব ভায়োলেন্স” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা সংঘটিত অপরাধ, যার পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় ম্যান্ডেট বা কাঠামোগত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। [৪-৫] এই রিপোর্টটি তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক বক্তব্য, আইনি পরিসংখ্যান এবং কালানুক্রমিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই দুই ভিন্নধর্মী প্রেক্ষাপটের একটি বস্তনিষ্ঠ ও একাডেমিক ব্যবচ্ছেদ করবে।
Competitive Islamization
ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকার ২০১৩ সালের পর থেকে হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে একটি অঘোষিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর কৌশলগত আঁতাত গড়ে তোলে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামোতে ব্যাপক আদর্শিক পরিবর্তন সাধিত হয়। একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ তাদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর “ধর্মীয় কার্ড” অকার্যকর করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক ইসলামীকরণের (Competitive Islamization) পথ বেছে নেয়।
২.১ কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি এবং 'কওমি জননী' উপাধি
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির আন্দোলনের পর সরকার প্রাথমিকভাবে কঠোর অবস্থান নিলেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক মেরুকরণের স্বার্থে তাদের সাথে ব্যাপক আপসের পথ বেছে নেয়। [৬] ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই তোষণ নীতি চরম আকার ধারণ করে, যখন সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষার দুটি প্রধান ধারা রয়েছে: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত 'আলিয়া মাদ্রাসা' এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বেসরকারিভাবে পরিচালিত 'কওমি মাদ্রাসা'। [৭] কওমি মাদ্রাসাগুলো যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমের বাইরে নিজেদের তৈরি করা ধর্মীয় সিলেবাস অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে কোনো কাঠামোগত সমন্বয় বা আধুনিক পাঠ্যক্রম (যেমন- বিজ্ঞান, গণিত বা প্রযুক্তি) অন্তর্ভুক্ত করার শর্তারোপ ছাড়াই তাদের সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেওয়ার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। ১৩ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর 'দাওরায়ে হাদিস' (তাকমিল)-কে ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবি সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান প্রদান করে [৮]। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে জাতীয় সংসদে “কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮” সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় [৮]।
এই আইনের মাধ্যমে দেশের প্রায় ১৪ হাজার কওমি মাদ্রাসার প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীকে রাতারাতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয় [৭]। এর ফলে কওমি মাদ্রাসার গ্র্যাজুয়েটরা কোনো আধুনিক বিজ্ঞান বা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার সংস্পর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রীয় চাকরিতে (যেমন- সরকারি স্কুল, কলেজ বা অন্যান্য দপ্তরে) প্রবেশের সুযোগ লাভ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে গভীর আদর্শিক প্রভাব ফেলার পথ সুগম করে [৭]।
এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতির কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, ৪ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে 'আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ'-এর উদ্যোগে একটি বিশাল 'শোকরানা মাহফিল' বা সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয় [১০]। হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমির ও কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় 8। এই অনুষ্ঠানে লাখ লাখ কওমি ছাত্র ও আলেমের সামনে মাওলানা মুফতি রুহুল আমিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে “কওমি জননী” (Mother of Qawmi) উপাধিতে ভূষিত করেন [১০]।
মুফতি রুহুল আমিন তার বক্তব্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি 'কওমি জননী'। আপনি যদি না থাকতেন, তবে সাহাবাদের শত্রু, আলেম-উলামাদের শত্রু এবং জামায়াতে ইসলামী ও আবুল আলা মওদুদীর অনুসারীরা এটি হতে দিত না” [১০]। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ রাজনৈতিক সংবর্ধনা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার সরকারের শীর্ষ নেত্রীর দ্বারা কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীর আদর্শিক বৈধতা গ্রহণের একটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত দলিল।
২.২ 'মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র' প্রকল্প: রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আদর্শিক আধিপত্য বিস্তার
আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের ইসলামপন্থী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মীয় আবেদনকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে ব্যাপক ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণের এক নজিরবিহীন উদ্যোগ গ্রহণ করে। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাধারণত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনালয় নির্মাণে সরাসরি বিপুল অর্থায়ন করে না, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এই প্রথা ভেঙে দেয়।
১৫ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (ECNEC) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মোট ৫৬০টি “মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র” নির্মাণের মেগা প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। [২] এই প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট নির্ধারণ করা হয় ৯,০৬২ কোটি টাকা (যা প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য), যার মধ্যে সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। [২] পরবর্তীতে সৌদি আরব প্রতিশ্রুত ৮,১৬৯ কোটি টাকা প্রদানে অসম্মতি জানালে, সরকার সম্পূর্ণ নিজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা জাতীয় রাজস্ব থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। [১৩]
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুনিম হাসানের মতে, বিশ্বে এমন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই যিনি সরকারিভাবে এবং সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থায়নে এত বিপুল সংখ্যক মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। [২] বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় জনগণের নিজস্ব অর্থায়নেই মসজিদ নির্মিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই প্রথম রাষ্ট্র সরাসরি ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণে হস্তক্ষেপ করে। [২] এটি ছিল রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র থেকে সরে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি কাঠামোগত পদক্ষেপ।
এই ৫৬০টি মডেল মসজিদে একত্রে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪৪০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ জন নারীর নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। এর পাশাপাশি এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর ১৪,০০০ শিক্ষার্থীকে কোরআনের হাফেজ হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি বছর ১৭,০০০ শিশুকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এই কেন্দ্রগুলোতে রাখা হয়। [২]
সরকারের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ধর্মীয় বয়ান, খুতবা, হজ প্রশিক্ষণ এবং ইসলামিক সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুকৌশল প্রক্রিয়া ছিল। [২] এটি গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমন্বয়বাদী বা সিনক্রেটিক (syncretic) ধর্মীয় চর্চাকে কোণঠাসা করে রাষ্ট্র-অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট ও রক্ষণশীল ইসলামি আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
২.৩ স্কুল পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন: হেফাজতে ইসলামের দাবির কাছে কাঠামোগত আত্মসমর্পণ
২০১৭ সালের শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়, তা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছে রাষ্ট্রীয় আত্মসমর্পণের সবচেয়ে নগ্ন ও সমালোচিত উদাহরণ। [৩] হেফাজতে ইসলাম এবং কওমি ওলামা পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল, সেকুলার এবং হিন্দু লেখকদের লেখা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। তারা অভিযোগ করেছিল যে, পাঠ্যবইয়ে “নাস্তিক্যবাদী” এবং “হিন্দুত্ববাদী” ধারণা ছড়ানো হচ্ছে। [১৬] সরকার ভোটব্যাংকের কথা মাথায় রেখে তাদের প্রায় সব দাবি মেনে নেয়।
প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে 'ও' অক্ষর চেনাতে যুগ যুগ ধরে 'ও-তে ওল' (এক প্রকার কচু) ব্যবহার করা হতো। ২০১৭ সালের নতুন সংস্করণে তা পরিবর্তন করে 'ও-তে ওড়না' করা হয়। একটি ছোট্ট মেয়ে শিশুর ছবিতে ওড়না পরিয়ে এই শিক্ষা দেওয়া হয়, যা শিশু-শিক্ষার্থীদের মনে শৈশব থেকেই লিঙ্গ বৈষম্য এবং রক্ষণশীল ধর্মীয় পোশাকের ধারণা প্রবেশ করানোর একটি সচেতন রাষ্ট্রীয় চেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। [১৬]
হেফাজতে ইসলামের সরাসরি দাবির প্রেক্ষিতে হিন্দু ও ধর্মনিরপেক্ষ লেখকদের রচিত ১৭টি কবিতা ও গল্প পাঠ্যপুস্তক থেকে কোনো প্রকার শিক্ষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছাড়াই সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলা হয়। [৩] এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী লেখক হুমায়ুন আজাদের লেখা কবিতা “বই”, যা পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ হেফাজতের দাবি ছিল এটি পবিত্র কোরআনের অবমাননা করে। [১৮] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্বকবির নাম এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী চরিত্রগুলোর নাম বিভিন্ন গল্প থেকে সুকৌশলে বাদ বা পরিবর্তন করা হয়। [১৬]
পাঠ্যবইয়ের চিত্রায়নে ব্যাপক রক্ষণশীল পরিবর্তন আনা হয়। ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে স্বাভাবিক কথোপকথনের চিত্রগুলো মুছে ফেলা হয় এবং মেয়েদের ছবিতে বাধ্যতামূলকভাবে ওড়না বা হিজাব যুক্ত করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল, বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের বই থেকে মেয়েদের ঋতুস্রাব (period) সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরিভাষা এবং বয়ঃসন্ধিকালীন বৈজ্ঞানিক আলোচনা সরিয়ে ফেলা হয়, যা জনস্বাস্থ্য শিক্ষার পরিপন্থী। [১৬]
শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলো (যেমন- উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ) এই পরিবর্তনের তীব্র প্রতিবাদ জানালেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। সমালোচনার মুখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) এই গভীর আদর্শিক পরিবর্তনগুলোকে শুধুমাত্র “ব্যাকরণগত সংশোধন” বা “পঠনযোগ্যতা বৃদ্ধি” বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। [৩] পরবর্তীতে জনরোষ প্রশমিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবি'র প্রধান সম্পাদক প্রীতিশ কুমার সরকার এবং সিনিয়র বিশেষজ্ঞ লানা হুমায়রা খানকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করে বলির পাঁঠা বানায়, যদিও কাঠামোগত সিদ্ধান্তগুলো সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই এসেছিল। [১৮] মূলত, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় ভোটব্যাংক নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে এভাবে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছিল। [১৭]
৩. মুক্তচিন্তা দমন ও ব্লগার হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তা এবং ভিকটিম ব্লেমিং (আওয়ামী লীগ আমল)
২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সেকুলার ব্লগার, বিজ্ঞান লেখক, প্রকাশক এবং প্রগতিশীল অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর এক ভয়াবহ ও পদ্ধতিগত আক্রমণ শুরু হয়। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT), আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS) এবং ইসলামিক স্টেট (IS)-এর মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই হত্যাকাণ্ডগুলোর দায় স্বীকার করে ২১। এই সময়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা ছিল চরম হতাশাজনক; তারা নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ছিল।
৩.১ নিহত সেকুলার ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের কালানুক্রমিক তালিকা (২০১৩-২০১৬)
২০১৩ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ৮৪ জন সেকুলার ব্লগারের একটি “হিট লিস্ট” বা হত্যা-তালিকা প্রকাশ করে ২২। সরকার এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। নিচে চরমপন্থীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত প্রগতিশীল এবং ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের একটি কাঠামোগত কালানুক্রমিক চিত্র তুলে ধরা হলো [২২]:
হত্যার তারিখ নিহতের নাম পরিচয়, প্রেক্ষাপট ও হত্যার ধরন
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আহমেদ রাজীব হায়দার স্থপতি, সেকুলার ব্লগার এবং শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ঢাকার মিরপুরে নিজ বাড়ির সামনে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
১৫ নভেম্বর ২০১৪ শফিউল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বাউল মতাদর্শের অনুসারী। কট্টরপন্থীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন।
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞান লেখক, মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা। একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
৩০ মার্চ ২০১৫ ওয়াশিকুর রহমান (বাবু) ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও লেখক। ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় দিনের বেলায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
১২ মে ২০১৫ অনন্ত বিজয় দাশ বিজ্ঞান লেখক, মুক্তমনা ব্লগের লেখক এবং বিজ্ঞানমনস্ক কর্মী। সিলেটের সুবিদবাজারে নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর চারজন মুখোশধারী তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।
৭ আগস্ট ২০১৫ নিলয় চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল) সেকুলার ব্লগার। ঢাকার গোড়ানে নিজ বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।
৩১ অক্টোবর ২০১৫ ফয়সাল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী (যিনি অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করেছিলেন)। শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
৬ এপ্রিল ২০১৬ নাজিমুদ্দিন সামাদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ এক্টিভিস্ট। সূত্রাপুরে তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়।
২৫ এপ্রিল ২০১৬ জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয় জুলহাজ ছিলেন ইউএসএআইডি-র প্রাক্তন কর্মী, সমকামী অধিকার কর্মী এবং 'রূপবান' ম্যাগাজিনের সম্পাদক। কলাবাগানের বাসায় কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয়ে ঢুকে জুলহাজ ও তার বন্ধু তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
৩.২ হত্যাকাণ্ডের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming)
এই ধারাবাহিক ও বীভৎস হত্যাকাণ্ডের সময় সরকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা মুক্তচিন্তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। খুনিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা উল্টো ভিকটিমদেরই (নিহত ব্লগারদের) দায়ী করতে শুরু করেন। তাদের মূল কৌশল ছিল রাজনৈতিকভাবে “ধর্মবিরোধী” বা “নাস্তিকদের রক্ষক” তকমা থেকে নিজেদের দূরে রাখা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ও প্রশাসনিক শাস্তির হুমকি: ২০১৫ ও ২০১৬ সালে যখন একের পর এক ব্লগার খুন হচ্ছেন, তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “আমরা এটি বরদাস্ত করব না যদি কেউ অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসে আক্রমণ করে” (We will not tolerate it if you attack other's religious belief) ২৬। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, ধর্মের সমালোচনা করা বাকস্বাধীনতার অংশ নয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য “প্রশাসনিক শাস্তি” (administrative punishment) ভোগ করতে হবে [২৬]। এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান মূলত খুনিদের একটি প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছিলেন এবং মুক্তচিন্তকদের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়্গ নেমে আসার পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন [২৫]।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রতিক্রিয়া: ৬ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল খুনিদের বিচারের সুস্পষ্ট আশ্বাস দেওয়ার আগে বলেন, সরকার তদন্ত করে দেখবে যে সামাদ তার ব্লগে কোনো “আপত্তিকর” বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কিছু লিখেছিলেন কি না [২৯]। এটি ছিল ক্লাসিক ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming), যেখানে হত্যার শিকার ব্যক্তির লেখাকেই হত্যার যৌক্তিকতা বা কারণ হিসেবে আগে যাচাই করা হচ্ছিল।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের রয়টার্স সাক্ষাৎকার: নভেম্বর ২০১৫ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র এবং আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সরকারের রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও কৌশলগত আপসের বিষয়টি খোলাখুলি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমরা এখানে একটি সূক্ষ্ম সুতোর ওপর হাঁটছি (walking a fine line)... আমরা নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমাদের বিরোধী দল প্রতিনিয়ত আমাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করে, তাই আমরা জোরালোভাবে তার (অভিজিৎ রায়ের) পক্ষে অবস্থান নিতে পারি না। এটি বাস্তবতার চেয়েও পারসেপশনের (উপলব্ধি) বিষয়” [৩০]।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই বক্তব্যগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আওয়ামী লীগ তার ঐতিহাসিক সেকুলার ইমেজ বিসর্জন দিয়ে উগ্রপন্থীদের খুশি রাখতে এবং নিজেদের ভোটব্যাংক সুরক্ষিত করতে মুক্তচিন্তকদের বলির পাঁঠা বানিয়েছিল। রাষ্ট্রের এই নীতির ফলে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে চরম ভীতি এবং সেলফ-সেন্সরশিপ (Self-censorship) তৈরি হয়, এবং অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন [২১]।
৪. ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে আইনের অপপ্রয়োগ এবং কাঠামোগত নিপীড়ন (আওয়ামী লীগ আমল)
আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্নমত দমনের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিবর্তনমূলক সাইবার আইন প্রণয়ন করেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ২০১৮ এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) ২০২৩-এর মাধ্যমে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”-এর মতো অস্পষ্ট ও বিস্তৃত দোহাই দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হয়রানি, বিনা বিচারে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে [৩১]।
৪.১ আইসিটি অ্যাক্ট (ধারা ৫৭), DSA এবং CSA-এর পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশ আমলের প্যানেল কোড ১৮৬০-এ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও, আওয়ামী লীগ সরকার সাইবার আইনগুলোর মাধ্যমে এর শাস্তি এবং অপপ্রয়োগের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় [৩১]।
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা: ২০০৬ সালে প্রণীত এই আইনের ৫৭ ধারাটিকে সরকার ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরও ভয়ংকর রূপ দেয়। এটিকে আমলযোগ্য (cognizable) ও অজামিনযোগ্য (non-bailable) করা হয় এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয় [৩৩]। এই ধারায় বলা হয়েছিল, কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ করা যা “ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত বা মে কজ হার্ট টু রিলিজিয়াস বিলিফ” করতে পারে, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শুধুমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৫৭ ধারার অধীনে ১,২৭১টি চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। [৩১] সাইবার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মো. নজরুল ইসলাম শামীম ২০১৭ সালে স্বীকার করেন যে, এই মামলাগুলোর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আদালতে প্রমাণ করা যায়নি, অর্থাৎ এগুলো মূলত মানুষকে হয়রানি করার জন্য “বানোয়াট” মামলা ছিল। [৩৩]
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ২০১৮: দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার ৫৭ ধারা বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে সরকার আরও কঠোর ও ড্রাকোনিয়ান 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA)' প্রণয়ন করে [৩৩]। এই আইনের ২৮ ধারায় “ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধের ওপর আঘাত” হানার শাস্তি হিসেবে অত্যন্ত কড়া বিধান রাখা হয়, যা মূলত বাকস্বাধীনতা হরণের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয় [৩১]। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই কালো আইনে ৭,০০০-এর বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় [৩১]। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে সরকার নাম পরিবর্তন করে 'সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA)' আনলেও, দমনমূলক ধারাগুলো প্রায় অপরিবর্তিত থাকে [৩১]।
[দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য]
তথ্যসূত্র তালিকা
[১] বিটিআই (BTI), ২০২৬ বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট: বিটিআই ২০২৬, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://bti-project.org/en/reports/country-report/BGD
[২] মডেল মসজিদ - সিরামিক বাংলাদেশ ম্যাগাজিন, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://ceramicbangladesh.com/wp-content/uploads/2024/09/6th-Issue.pdf
[৩] সংশোধন, কিন্তু স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে কোনো পরিবর্তন নেই - ঢাকা ট্রিবিউন, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.dhakatribune.com/bangladesh/education/37092/corrections-but-no-changes-in-school-textbooks
[৪] আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মার্কিন কমিশন (USCIRF), ২০২৫ ফ্যাক্টশিট: বাংলাদেশ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.uscirf.gov/sites/default/files/2025-07/2025%20Factsheet%20Bangladesh.pdf
[৫] বাংলাদেশ পদত্যাগ-পরবর্তী সহিংসতা (২০২৪–২০২৬) - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_post-resignation_violence_(2024%E2%80%932026
[৬] বিশ্লেষণ | হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশে মোদি-বিরোধী বিক্ষোভের নেপথ্যে থাকা গোষ্ঠী - দ্য হিন্দু, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.thehindu.com/news/international/analysis-hefazat-e-islam-the-group-behind-anti-modi-protests-in-bangladesh/article34199332.ece
[৭] বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে শ্বেতপত্র, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://bdplatform4sdgs.net/wp-content/uploads/2025/02/Final-Draft_Unedited_0911-hrs_Compiled-Report-without-Front-and-Back-Cover.pdf
[৮] কওমি ডিগ্রির স্বীকৃতি: প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার পরিকল্পনা করছেন হেফাজত নেতা শফি - বাংলা ট্রিবিউন, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.banglatribune.com/others/news/14845/Qawmi-degree-recognition-Hifazat%E2%80%99s-Shafi-plans
[৯] বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_Qawmi_Madrasa_Education_Commission
[১০] শুকরানা মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীকে 'কওমি জননী' উপাধি প্রদান, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.banglanews24.com/national/news/bd/71993.details
[১১] কন্টেন্ট সূচি, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://objectstorage.ap-dcc-gazipur-1.oraclecloud15.com/n/axvjbnqprylg/b/V2Ministry/o/office-bard/2024/12/eb31a98ba85745f6b7b954a4bf826821.pdf
[১২] রাষ্ট্র, কওমি মাদ্রাসা এবং বাংলাদেশের শিশু: একটি সামাজিক সুরক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.academia.edu/95131313/State_Qawmi_Madrasas_and_Children_in_Bangladesh_From_a_Social_Protection_Perspective
[১৩] একনেক প্রতিটি উপজেলায় মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করেছে, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.albd.org/articles/news/28894/ECNEC-okays-project-to-build-model-mosques-and-Islamic-Cultural-Centres-in-every-upazila
[১৪] মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণে বাংলাদেশ সরকার ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে: ডেপুটি হাই কমিশনার, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.brecorder.com/news/40238332
[১৫] পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধ: "ধর্মনিরপেক্ষতা" নাকি "অ-ধর্মনিরপেক্ষতা"? বাংলাদেশের একটি জটিল মামলা, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.tandfonline.com/doi/full/[১০].[১০]80/23311886.2021.1928979
[১৬] আপনি স্কুলে কী শিখেছেন? 'B' তে কি ব্যানানা (কলা)? নাকি বোরকা? - ওয়ার্ল্ড এডুকেশন ব্লগ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://world-education-blog.org/2017/02/08/what-did-you-learn-in-school-is-b-for-banana-or-burka/
[১৭] বাংলাদেশ: ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে খুশি করতে পাঠ্যপুস্তক কি পরিবর্তন করা হচ্ছে? - প্রতিবেদন ও মন্তব্য, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.sacw.net/article13130.html
[১৮] ২০১৭ বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক সমালোচনা - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/2017_Bangladesh_textbooks_criticism
[১৯] রিসার্চ রিপোর্ট ৮ - হেফাজতে ইসলাম এবং বাংলাদেশে ইসলামি চ্যালেঞ্জ - SADF, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.sadf.online/research-report-8-the-hefazat-e-islam-and-the-islamist-challenge-in-bangladesh/
[২০] হেফাজতে ইসলাম এবং বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি - MP-IDSA, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://idsa.in/publisher/issuebrief/hefajat-e-islami-and-the-politics-of-islamism-in-bangladesh
[২১] বাংলাদেশে ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট এবং অধ্যাপকদের হত্যার নেপথ্যে কী? | পিবিএস নিউজ (PBS News), সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.pbs.org/newshour/world/whats-behind-the-killings-of-bloggers-activists-and-professors-in-bangladesh
[২২] বাংলাদেশে ইসলামি চরমপন্থীদের হামলা - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/Attacks_by_Islamic_extremists_in_Bangladesh
[২৩] বাংলাদেশে ব্লগিং করার কারণে আপনি প্রাণ হারাতে পারেন - অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.amnesty.org/en/latest/campaigns/2015/11/in-bangladesh-blogging-can-get-you-killed/
[২৪] বাংলাদেশ: ব্লগার হত্যাকাণ্ড বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত | হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.hrw.org/news/2015/05/12/bangladesh-killing-blogger-blow-free-speech
[২৫] বাংলাদেশের ব্লগাররা রাষ্ট্রীয় হুমকির আশঙ্কায় রয়েছেন - ভিওএ (VOA), সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.voanews.com/a/bangladesh-bloggers-fear-threat-from-the-state/2960088.html
[২৬] ২০২৪ মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক কান্ট্রি রিপোর্ট: বাংলাদেশ - মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.state.gov/reports/2024-country-reports-on-human-rights-practices/bangladesh
[২৭] ২০১৪ মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক কান্ট্রি রিপোর্ট - বাংলাদেশ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.refworld.org/reference/annualreport/usdos/2015/[১০]5881
[২৮] মানবাধিকার রিপোর্ট: কাস্টম রিপোর্ট সারাংশ - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্টেট ডিপার্টমেন্ট, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.state.gov/report/custom/22dab0e95a
[২৯] স্থিতিস্থাপকতার পথ: দক্ষিণ এশিয়ায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ২০১৫-১৬, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://unesdoc.unesco.org/ark:/48223/pf0000244731
[৩০] এশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক রিভিউ ২০১৬ - IDSA, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://idsa.in/system/files/book/book_ASR2016.pdf
[৩১] দমন-পীড়নের নতুন মোড়ক: সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং চলমান... - অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.amnesty.org/en/wp-content/uploads/2024/08/ASA1383322024ENGLISH.pdf
[৩২] দমন-পীড়নের নতুন মোড়ক: সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং বাংলাদেশে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে চলমান আইনি লড়াই - রিলিফওয়েব, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://reliefweb.int/report/bangladesh/repackaging-repression-cyber-security-act-and-continuing-lawfare-against-dissent-bangladesh
[৩৩] সমালোচনার কোনো জায়গা নেই: বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া মন্তব্যের ওপর দমন-পীড়ন... - হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.hrw.org/report/2018/05/[১০]/no-place-criticism/bangladesh-crackdown-social-media-commentary
[৩৪] ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন: বাংলাদেশের জম্বি সাইবার সিকিউরিটি আইন - ক্লুনি ফাউন্ডেশন ফর জাস্টিস, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://cfj.org/wp-content/uploads/2024/11/Bangladesh-ICT-Act-Report_November-2024-1.pdf
[৩৫] বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে | আল জাজিরা মিডিয়া ইনস্টিটিউট, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://institute.aljazeera.net/en/ajr/article/1872
[৩৬] বাংলাদেশ - ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডারস, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.frontlinedefenders.org/sites/default/files/dsa_report.pdf
[৩৭] ডিএসএ (DSA) বাতিল হলেও ভুক্তভোগীরা অনিশ্চয়তায় - নেত্র নিউজ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://netra.news/2025/dsa-repealed-but-victims-suffer/
[৩৮] কান্ট্রি পলিসি এবং ইনফরমেশন নোট: ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নাস্তিক, বাংলাদেশ, জুন ২০২৫ - GOV.UK, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.gov.uk/government/publications/bangladesh-country-policy-and-information-notes/country-policy-and-information-note-religious-minorities-and-atheists-bangladesh-june-2025
[৩৯] বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে - ভিওএ (VOA), সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.voanews.com/a/in-bangladesh-religious-minorities-targeted-during-political-unrest/7750077.html
[৪০] ২০২৪ বাংলাদেশ হিন্দু-বিরোধী সহিংসতা - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/2024_Bangladesh_anti-Hindu_violence
[৪১] বাংলাদেশ: হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে - অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.amnesty.org/en/latest/news/2024/08/bangladesh-interim-government-must-take-immediate-actions-to-protect-hindu-and-other-minority-communities/
[৪২] 'আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই': হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে হামলার মুখে হিন্দুরা - আল জাজিরা, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.aljazeera.com/features/2024/12/12/our-lives-dont-matter-in-post-hasina-bangladesh-hindus-fear-future
Monday, 6 April 2026
কর্নেল রশিদের হামলার শিকার হন তারেক রহমান
বেগম খালেদা জিয়াকে কেন হত্যা করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশিদ?
আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেদিন সশস্ত্র হামলার শিকার হন। কর্নেল রশিদের লাঠি ও অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন।
১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বরের সেই ঘটনা আজ অনেকেই ভুলে গেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম জানে না—সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।
বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি কর্নেল রশিদ সেদিন সশস্ত্র অবস্থায় হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন খালেদা জিয়াকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
সেই সকালেই ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবনে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কর্নেল রশিদ কীভাবে খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে ঢুকলেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।
কর্নেল রশিদ পিস্তল হাতে প্রথমে যান খালেদা জিয়ার বেডরুমে। তাকে না পেয়ে চিৎকার করতে করতে ঘরের পর ঘর তছনছ করা হচ্ছিল; চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ভয় আর আতঙ্ক।
কিন্তু খালেদা জিয়া ভাগ্যক্রমে তখন বাসায় ছিলেন না—কর্নেল রশিদ ঢোকার মাত্র কিছুক্ষণ আগেই তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান এবং এরশাদ বিরোধী রাজপথের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
খালেদা জিয়াকে না পেয়ে হামলাকারীর আক্রোশ গিয়ে পড়ে তাঁর পরিবারের ওপর।
তারেক রহমান তখন টগবগে যুবক। বয়স মাত্র ২৪। হইচই-চিৎকার শুনে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে এসে কর্নেল রশিদের আক্রমণের শিকার হন।
কর্নেল রশিদ তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেন। হাতের অস্ত্র দিয়েও আঘাত করেন।
তারেক রহমানকে রক্ষার জন্য অন্যরা এগিয়ে এলে আরও কয়েকজনকে তিনি নির্মমভাবে প্রহার করেন। এতে আহত হন চারজন।
গুরুতর আহত তারেক রহমানকে পরে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া জনসভা থেকে ছুটে আসেন ক্যান্টনমেন্টের বাসায়। যা সেই সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে।
সেনানিবাসের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ভেতরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের ওপর এমন সশস্ত্র হামলা ছিল এক অভাবনীয় ষড়যন্ত্র।
১৯৯০ সালে বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর পতনের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রহসনটি মঞ্চস্থ হলো ঠিক এর পরেই। খুনি রশিদকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার বদলে তৎকালীন এরশাদ সরকার তাকে বাঁচানোর এক নির্লজ্জ ফন্দি আঁটল।
রাতারাতি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করে দেয়া হলো—কর্নেল রশিদ নাকি হঠাৎ ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে পড়েছেন! সরকারিভাবে প্রেস রিলিজ জারি করে বলা হলো কর্নেল রশিদ মানসিক বিকারগ্রস্ত?
গ্রেফতার বা আটকের পরিবর্তে এই খুনিকে সসম্মানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) ভর্তি করে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হলো। এটি ছিল মূলত এক খুনিকে আইনি হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ প্রস্থানের সুযোগ করে দেয়ার রাষ্ট্রীয় নাটক।
সেই সময়ের অধিকাংশ সংবাদপত্র এই নির্মম কাহিনীর প্রকৃত সত্য প্রকাশ করতে পারেনি। বাংলার বাণী সহ কয়েকটি পত্রিকা প্রেস রিলিজের বরাত দিয়ে সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল।
একজন কথিত মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কীভাবে সশস্ত্র অবস্থায় একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির ক্যান্টনমেন্টের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পেরিয়ে বাসভবনে প্রবেশ করল—সেই প্রশ্নের জবাব কেউ খুঁজেনি।
বাসভবনের পাহারায় থাকা সশস্ত্র বাহিনী কেন এই খুনিকে বাধা দেয়নি, তা রহস্য রয়ে গেছে। বলা হয়, এরশাদের সরাসরি নির্দেশেই সবকিছু পরিচালিত হয়েছিল।
এই ঘটনার পর আন্দোলন আরও চাঙ্গা হয় এবং কয়েক দিনের মাথায় স্বৈরাচারী এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই রক্তাক্ত সকালের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের এই পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল।
যে তারেক রহমান সেদিন খুনি রশিদের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন, তিনি আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ ওই হামলায় তিনি মারাও যেতে পারতেন।
সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় হামলা হয় ১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বর।
তাঁর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও সাজাপ্রাপ্ত খুনি। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে; বিদেশে কোথায় তিনি পলাতক, তা এখনো অজানা।
Friday, 3 April 2026
২০৪১ সাল, তারেক জেলে বন্দী জাইমা লন্ডনে।
পুলিশ DGFI কাউকে গুম করলে, মানবাধিকার কমিসন, নিজে সিদ্বান্ত নিয়ে তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে পারবে। এটা ডঃ ইউনুস করেছিল। বিএনপি বলছে, এটা বাতিল করো। এ তদন্ত করতে গেলে সরকারের অনুমতি লাগবে।
বিএনপির যত নেতাদের গুম করেছিল হাসিনা, এই হাসিনার কাছেই যদি অনুমতি চায়তে হতো, হাসিনা দিতো?
সাল ২০৪১, আজকের বিএনপির সব বুড়ারা মরে কবরে পৌচেছে। আপনি আজ তরুন নেতা, তখন হয়তো যুবদল নেতা। ক্ষমতায় সজীব ওয়াজেদ জয় বা পুতুল। আপনাকে গুম করে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে ঘুরানো হচ্ছে। আপনার নুনুতে ওয়্যারিং দিয়ে পানিতে প্রস্রাব করতে বলা হচ্ছে। আপনার মাথায় কালো টুপি পড়ানো।
আপনি চিৎকার করে বলছেন, আহারে!!! কেন যে বিএনপি করার কারনে, সেদিন, এ গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের বিরুধীতা করলাম না।
হায়!!! আজকে আপনাকে বাচানোর কেউ নেই।
আপনাকে বাচাবে কে???
আপনার স্ত্রী ছোটাছোটি করছে কোর্টের বারান্দায় সুবিচারের আশায়। কেউ আপনার কেইস নিচ্ছে না। বাচ্চাগুলো নিয়ে তার ইচ্ছা হচ্ছে আত্নহত্যা করতে। কারন, এ দুঃখের দিনে কোন নেতা কর্মী পাশে নেই। বাংলাদেশের সরকার নিয়ন্ত্রিত বিচার ব্যবস্হা,আপনি গুম, তা শিকার ই করতে চাচ্ছে না। বরং বলছে, কোন দুনাম্বারী করে আপনি লুকিয়ে আছেন।
তখন, আপনার স্ত্রী কান্না করতে করতে ভাববে, যেদিন বিএনপি বিচারক নিয়োগে সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধের অধ্যাদেশ বাতিল করেছিলো, সেদিন কেন আমার স্বামীকে বললাম না, তোমার দলের বিরুদ্বে যাও প্রয়োজনে। কিন্তু দেশের ভাল যা হয, তার পক্ষ নাও।
এভাবেই বিএনপি , ডঃ ইউনুসের করা সংস্কার অধ্যাদেশগুলো বাতিল করছে। এখন দুর্নীতি দমন কমিসনের প্রধান নির্বাচিত হবে বিএনপির ইচ্ছায়। তার ঘাড়ে কয়টা মাথা, তারেক রহমান হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি করে পাচার করলে, তার বিরুদ্বে মামলা করবে? আপনি হয়তো মনে করছেন, আমার কি ক্ষতি?
৫ ব্যাংকের ঐসব গ্রাহকদের জিঙ্গাসা করেন, যারা নিজের কষ্টের টাকা ব্যাংকে রাখার পরেও তুলতে পারছে না। কেন ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকায় কিনতে হয় জানেন? কারন, ডলার পাচার হলে,মুদ্রাস্পীতি বাড়ে। আপনি বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে দেশে ডলার পাঠাবেন, নেতারা তা বিদেশে পাচার করে কেনাডায় বেগম পাড়া বানাবে।
২০০০ তরুন শহীদ হবার পরে, এমন বাংলাদেশ কি আপনি চেয়েছিলেন? এসবের বিরুদ্বে বিরুধীদল আইনগতভাবে কিছু বলতে ও পারবে না। কারন গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করে, বিরুধীদলকে উচ্চকক্ষে ভোটের অনুপাতে আসন দেয়া হবে না। বিরুধী দলের চায়তে ও মাত্র ৪-৫% ভোট বেশী পেয়ে ( চুরি করে, ভোট গননায়) বিএনপি এখন দেশের রাজা, দেশের মালিক।
আপনি, আর আমি,
তাদের গোলাম।
এ গোলামির শিকল ছিড়ে আপনাকে আমাকে এখনই বলতে হবে, এসব চলবে না। এ গাদ্দারদের জনগনই এরেস্ট করবে। এবং তা এখনই। এবার আর শ্লোগান হবে না, রক্ত দিবো। এবার প্রথম থেকেই নামতে হবে,
মশাল আর লম্বা বাশ নিয়ে। এবার মশালের আগুন আর কোন নেতার বাড়িতে পড়বে না, কোন সরকারী স্হাপনায় পড়বে না। ঐ মশাল, তাদের পশ্চাতে দিয়ে, সংসদ ভবনের ছাদে খাড়া করে রাখতে হবে। কোটি মানুষের গণভোটকে যারা তোয়াক্কা না করে, পাশের দেশের প্রেসক্রিপশনে দেশ চালায়, এবার তাদের আর পালাতে দেয়া হবে না।
শুনেন, তারেক রহমানকে ব্ল্যাকমেইল করে এসব করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ১/১১ সরকারের আমলে তিনি যখন বন্ধী ছিলেন, তাকে অত্যাচার করে কিছু রেকর্ডিং রাখা হয়েছিল। সেগুলো দিয়েই তাকে দিয়ে, এসব করতে বাধ্য করছে পাশের দেশ। নতুবা জিয়ার সন্তান, খালেদার সন্তান এসব করার কথা না। দেখছেন না, তিনি কিভাবে এসব বিষয়ে চুপ মেরে আছেন।
বিএনপি করেন তো কি হয়েছে? আপনার সমবয়সীরা এনসিপি করে এমপি হয়নি? আপনি কেন বুড়া নেতার পিছে ঘুরবেন?
#বিএনপি #এনসিপি #জামায়াত #ছাত্রদল #যুবদল
#BNP #BNPBangladesh #JamateIslami #Shibir #NCP
Monday, 30 March 2026
বিএনপির অবস্থান গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।
আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধীরা ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য ‘আইনি মতামত’ ভাবা ভুল। বরং এটাই বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান, যার লক্ষ্য একটাই: গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার বা সীমাবদ্ধ করা এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।
বিএনপি এই অবস্থান নিয়েছে কেন? কারণ যদি স্বীকার করা হয় যে জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে, তাহলে বিদ্যমান সংবিধান বা হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙে যায়। তখন সংসদ আর একমাত্র ক্ষমতার উৎস থাকে না; জনগণ নিজেই হয়ে ওঠে ক্ষমতার উৎস। আর ঠিক এই জায়গাটাই বিএনপি অস্বীকার করতে চাইছে। তাই আইনমন্ত্রী বলছেন, সংস্কার হবে, কিন্তু সংবিধানের ভেতরেই হবে; সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না।
এটা কি যুক্তিসঙ্গত? না। এই যুক্তির ভেতরেই ফাঁকি আছে। কারণ গণঅভ্যুত্থান মানেই হলো সংবিধানের সীমা অতিক্রম করা। যদি সংবিধানই সবকিছুর শেষ কথা হয়, তাহলে জনগণ কেন রাস্তায় নামে? কেন জীবন দিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবি তোলে? বাস্তবতা হলো—গণঅভ্যুত্থান সেই মুহূর্ত, যখন জনগণ বলে: “এই সংবিধান আর আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা এই সংবিধান চাই না, আমরা নতুন গঠনতন্ত্র চাই। নতুন ভাবে বাংলাদেশ গড়তে চাই। তার মানে বিএনপি গণঅভিপ্রায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থানকেই আমি বিএনপির জন্য আত্মঘাতী মনে করি। অথচ সেকুলার ইসলাম বিদ্বেষী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির পতনের পর ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির মোকাবিলার মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত এবং যুদ্ধাক্রান্ত টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট জাতীয় সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু বিএনপির ভুল রাজনীতির জন্য তাকে আবার আওয়ামী লীগের মতো চরম মূল্য দিতে হতে পারে।
বিএনপির এই অবস্থান বিএনপির অনুকুল নয়। আইনমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক অর্থ ও গাঠনিক তাৎপর্য অস্বীকার করেন। তিনি ঘটনাকে মানেন, কিন্তু তার পরিণতি মানেন না। অর্থাৎ তিনি বলতে চান—জনগণ আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা তাদের নাই; সেই ক্ষমতা থাকবে সংবিধান ও সংসদের হাতেই।
এই যুক্তি পুরানা কৌশল—জনগণের শক্তিকে স্বীকার করে তাকে আবার আইনের ভেতরে বন্দি করা। এটাকে সরল ভাষায় বলা যায়: “সংবিধান দিয়ে গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ বা নিদেন পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা।” বিএনপি আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে জনগণ যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায়, তাহলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সেই হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার ব্যবস্থার ভেতরেই ফিরে যেতে হবে। আওয়ামী লীগের স্থান নিয়েছে বিএনপি। এখন যা বোঝার সেটা জনগণকেই বুঝতে ও করতে হবে।
এখানে বিরোধীরা যে কথা বলছে, সেটি ভিন্ন। তারা বলছে—যদি গণঅভ্যুত্থান সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে জনগণের নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে। সেই অধিকার থেকে যদি কোনো “সংস্কার পরিষদ” বা “গণপরিষদ” তৈরি হয়, তাহলে সেটি সংবিধানের অধীন হবে না; বরং সংবিধানই তার অধীন হবে। বিরোধীরা সংস্কারবাদী হতে পারে, কিন্তু নিদেন পক্ষে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষেই অবস্থান নেবার চেষ্টা করছে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট: আইনমন্ত্রী বলছেন সংবিধান আগে, জনগণ পরে; বিরোধীরা বলছে জনগণ আগে, সংবিধান পরে।
যদি ধরে নেওয়া হয় বর্তমান সংবিধানই চূড়ান্ত, তাহলে তার কথা আইনের বই অনুযায়ী ঠিক। কিন্তু সমস্যাটা এখানেই—তাঁর পুরা যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি অঘোষিত ধারণার ওপর, সেটা হলো: সংবিধান এখনো অক্ষত এবং বৈধ।
কিন্তু যদি বাস্তবতা এই হয় যে গণঅভ্যুত্থান সেই বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তাহলে এই যুক্তি টেঁকে না, ভেঙে পড়ে। তখন আর “সংবিধানের ভেতরে থাকো” বলা যায় না। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—সংবিধান থাকবে কি থাকবে না, সেটি ঠিক করার ক্ষমতাই জনগণের।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আসলে একটা জিনিস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন—রাষ্ট্রের শেষ কথা সংবিধান, জনগণ না। বিএনপি বলছে, জনগণ প্রতিবাদ করতে পারে, আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র নতুন করে গঠন করার ক্ষমতা জনগণের নাই। সেই ক্ষমতা কেবল সংবিধান-স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার। এটা কি ঠিক?
অথচ সংবিধান নিজে কোনো আসমানি কিতাব না—এটি একটি রাজনৈতিক দলিল, যা কোনো এক সময়ে কোনো ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। যদি সেই ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে যায়, যদি জনগণ সেই কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেই সংবিধানের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তখন সংবিধানকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে সবকিছু বিচার করা মানে হলো বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করা। আইনমন্ত্রী বাস্তবতাকে নয়, কাগজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি বলছেন—সংবিধানে যা নেই, তা বৈধ না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে সংবিধান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার ভেতরে থেকে বৈধতা খোঁজা অন্ধকারে ইঁদুর তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টার অধিক কিছু না। বলা হচ্ছে—যারা নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছে, তারা ভুল বুঝছে; সঠিক বোঝাপড়া হলো সংবিধানের ভেতরে থেকেই পরিবর্তন করা। কিন্তু এই “সঠিক বোঝাপড়া” আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? জনগণের, নাকি আওয়ামী লিগ বা সেকুলার ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির? বিএনপিই কি তাহলে আওয়ামী লীগ?
বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে বন্ধ করে দিচ্ছে। দেওয়া —জনগণের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা। যদি বলা হয় “সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না”, তাহলে জনগণ কোনো গণপরিষদ গঠন করতে পারবে না, কোনো নতুন গঠনতন্ত্রের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে না। সবকিছুই আবার ফিরে যাবে সংসদ, সরকার, এবং পুরোনো ক্ষমতার কেন্দ্রে। দিল্লীতে বসে শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই অট্টহাসি দিচ্ছেন। ইতিহাসও প্রহসনের রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের যে দরজা জনগণ খুলেছিল——সেটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আমাদের তিনটি বার্তা দিচ্ছে।
এক. গণঅভ্যুত্থানকে একটি অতি সীমিত ঘটনা, শেখ হাসিনা সরকারের পতনেই তার শেষ এবং ওখানেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আটকে রাখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতা থেকে একজন ব্যক্তির অপসারণ, আর কোন পরিবর্তন না।
দুই. জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা বিএনপি অস্বীকার করে, অর্থাৎ জনগণ ভোটার হতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে কিম্বা রাষ্ট্রের সংস্কারে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেটা থাকবে জাতীয় সংসদের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং জাতীয় সংসদের ক্ষমতা ৭০ অনুচ্ছেদের বলে একনায়কতান্ত্রিক ভাবে কেন্দ্রীভূত থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
তিন. কিন্তু ঘটনা হিশাবে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে না, কারন তা না হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারতো না।
এই কারণেই “ভ্রান্ত ব্যাখ্যা”র অভিযোগ আসলে উলটা পড়া দরকার। প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভ্রান্ত ব্যাখ্যা কে দিচ্ছে? যারা বলছে জনগণের ক্ষমতা আছে রাষ্ট্র নতুন করে গঠনের, নাকি যারা বলছে জনগণ শুধু ভোটার। তারা ভোট দেবে, আর কিছু না। ক্ষমতার সবকিছু সংবিধানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ?
এখানেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের আসল জায়গা। এটি কোনো টেকনিক্যাল আইনি বিতর্ক না—এটি ক্ষমতার উৎস নিয়ে দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার উৎস কি সংবিধান, নাকি জনগণ?
আইনমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবিধানকেই সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। বিরোধীরা জনগণকে উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, কিন্তু বিরোধীরাও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাই গণতন্ত্রের সারকথা সেটা স্বীকার করে না।
এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত “সংস্কার পরিষদ” নিয়ে বিতর্ক থামবে না। আসল প্রশ্ন পরিষদ কীভাবে গঠিত হবে সেটা না—আসল প্রশ্ন হলো, কার অধীনে গঠিত হবে। সংবিধানের অধীনে, নাকি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে?
এখানেই বিএনপির অবস্থান মোটেও আইনী নয় আর, বরং একদমই স্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক, তাঁরা পরিবর্তন চান, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চান না। তাঁরা সংস্কারের কথা বলেন, কিন্তু গঠনের কথা এড়িয়ে যান। তাঁরা গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ব্যক্ত জনগণের ক্ষমতার আইনী ও রাজনৈতিক বৈধতা স্বীকার করতে রাজি না।
সংসদে বিএনপি উপদেষ্টা সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল , সংশোধন বা শর্তাধীন যেভাবে করবে তা বিএনপির রাজনীতি থেকেই আন্দাজ করা যায়। সে বিষয়ে আমরা আসছি, পরে।
Friday, 27 March 2026
বিএনপি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন এত ঝুঁকি নিতে চায়ছে?
আসলে বিএনপি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন এত ঝুঁকি নিতে চায়ছে?
সম্ভাব্য কারণ হতে পারে
গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া বিএনপির একার সিদ্ধান্ত নয়।দিল্লির প্রেসক্রিপশন।বিএনপি এই প্রেসক্রিপশন মেনে চলতে গিয়ে হয় দানব হয়ে উঠবে অথবা খুব দ্রুত নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করবে।
যদি গণভোট বাতিলের পক্ষে বিএনপি রায় পেয়ে যায় তবে
দানবীয় রুপে বিএনপিকে দেখা যাবে।আবার একটি আওয়ামী স্বৈরশাসন ফিরে আসবে।সেই আয়নাঘর,গু ম সব কিছু।
অপরদিকে ১১ দলীয় জোট যদি বিএনপির এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়,রাজপথে নেমে আসে তাহলে বিএনপির পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেন?
বিএনপির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে।সেনা হস্তক্ষেপ জায়েজ করার জন্য আওয়ামী লীগ জ্বালাও পোড়াও হ ত্যা শুরু করবে এবং পিছনের দরজা দিয়ে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে।
এই একটি মাত্র কারণে নির্বাচন জালিয়াতির প্রমাণ থাকার পরও জামায়াত ইসলামী আন্দোলনে যায়নি।
এখন কি করবে ১১ দলীয় জোট?
গণভোট অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার লিখিত প্রস্তাব করেছে বিএনপি, তৃতীয় শক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ভয়ে জামায়াত কি চুপচাপ তা মেনে নেবে, নাকি রাজপথে ফয়সালা করবে?
জামায়াত যে আশঙ্কায় নির্বাচন জালিয়াতি মেনে নিয়ে নীরব থেকেছে বিএনপি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আবার ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে।
Tuesday, 24 March 2026
স্বপ্নের রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'
তেইশে মার্চ ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব দিবস। পাকিস্তানীরা এ দিনটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস বা পাকিস্তান ডে হিসেবে পালন করে। পাকিস্তান আমলে আমরাও করতাম। এখন আর করিনা। করলেও দোষ ছিলনা। কেননা এই অভিন্ন ইতিহাস ও সংগ্রামের অংশীদার ছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরাও। ইতিহাসের কোনো ভূমিকা বা গৌরব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ইতিহাসকে খণ্ডিত করার ফল ভালো হয় না। আমরা কোনো দিবস পালন না করলেও এর তাৎপর্য নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাটা অন্তত থাকা উচিৎ। সব দেশেই সেটা হয়। রাজনীতিবিদেরা এড়িয়ে গেলেও একাডেমিশিয়ান, ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকেরা সেটা করেন। আমাদের দেশে সেটাও হয় না। আমরা হাজার বছরের চিরায়ত ইতিহাসের ভুয়া আওয়াজ দিয়ে আমাদের ভুল-ভাল ও মতলবি ইতিহাসের শুরুই করি বিংশ শতাব্দির পঞ্চাশের দশক থেকে।
লাহোর প্রস্তাব নিয়ে অনেকের অনেক রকম বিশ্লেষণ রয়েছে। বিশদ পর্যালোচনায় না গিয়ে এ সম্পর্কে আমি একটু তির্যক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমার নিজের সামান্য কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি।
🔴 ইতিহাসের অনেক ব্যাখ্যাহীন বাস্তবতা থাকে। 'লাহোর প্রস্তাব' হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক রেজুলিউশানটির মুসাবিদা রচনা করেছিলেন মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খান। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমির প্রস্তাবের খসড়া রচনাকারী জাফরুল্লাহ্ খান শিয়ালকোটের এক কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সন্তান ছিলেন। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির বিরোধিতাকারী ধর্মতাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী পরবর্তীকালে পাকিস্তানে এসে বসত গড়েন এবং কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। সেই আহমদিয়াদেরকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার পাকিস্তানে অমুসলিম ঘোষণা করে।
🔴 ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর কনফারেন্সে আমাদের শেরে বাঙ্গলা এ.কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব পাঠ করেন এবং লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি অর্জন করেন। লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও পরে এই প্রস্তাব 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও পরিচিতি অর্জন করে। বাঙলাভাষী মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল হক এই প্রস্তাবের উত্থাপক হলেও সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ এ প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা দেয় তার সঙ্গে মুসলিম লীগের বাঙলাভাষী অন্য তিন নেতা দ্বিমত পোষণ করেন। আবুল হাশিম দাবি করেন, লাহোর প্রস্তাব অনুসারে ইন্ডিয়ার পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দু'টি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গড়তে হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবিভাজনের বিরোধিতা করে অখণ্ড বাংলা প্রদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসামকেও পাকিস্তানভূক্ত করার দাবি জানান।
🔴 মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্'কে পাকিস্তানের রূপকার হিসেবে 'কায়েদে আযম' বা মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে তিনি পাকিস্তান নামটির উদ্ভাবক নন। কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনিই প্রথম ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে প্রদত্ব ভাষণে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তবে পাকিস্তান নামটি তাঁরও দেয়া নয়। ইকবালের স্বপ্নের ভারতীয় মুসলিমদের সেই রাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামো ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের সমন্বয়ে। বেঙ্গলের অন্তর্ভূক্তির কথা তাতে ছিল না।
🔴 ১৯৩৩ সালে কেম্ব্রিজ-এ আইন পড়ুয়া পাঞ্জাবি ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী ভারতীয় মুসলমানদের স্বপ্নের রাষ্ট্রের 'পাকিস্তান' নামটি প্রথম উদ্ভাবন করেন। পাঞ্জাবের P, আফগান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (আফগানিয়া)-এর A, কাশ্মিরের K, সিন্ধু বা Indus region-এর I (আই) এবং বেলুচিস্তানের STAN নিয়ে PAKISTAN রাষ্ট্রের নামকরণ করেছিলেন তিনি। এর ভেতরেও বেঙ্গল ছিল না। চৌধুরী রহমত পূর্বভারতে বাঙলাভাষী মুসলমানদের জন্য 'বাঙ্গিস্তান' নামে এবং দাক্ষিণাত্যের মুসলমানদের জন্য 'ওসমানিস্তান' নামে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাঙ্গিস্তান নামে না হলেও অন্য নামে আমরা সে রাষ্ট্র স্থাপন করি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইন্ডিয়ার সহায়তায় যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে।
🔴 পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল হাজার মাইল দূরের দু'টি অঞ্চল নিয়ে। ইন্ডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশ - পাঞ্জাবের অংশ বিশেষ, সিন্ধু, আফগানিস্তানের পাখতুন এলাকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বেঙ্গলের পূর্ব অংশের সমন্বয়ে। আমাদের প্রদেশটির নাম ছিল পূর্ব বঙ্গ বা ইস্ট বেঙ্গল। তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে, এই পূর্ব বঙ্গের লোক বলে পরিচিত দু'জন নেতাই কিন্তু এই পূর্ব বঙ্গ নামটাও মুছে দিয়ে এই প্রদেশের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। এরা হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ আলী এক ইউনিট ব্যবস্থা প্রবর্তন করে পশ্চিমের চার প্রদেশকে একত্র করে পশ্চিম পাকিস্তান নামে এক প্রদেশ বানান। আর পূর্ব বঙ্গের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। মোহাম্মদ আলীর আইন মন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনা করেন এবং তাতে এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দেন। ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন হিসেবে সৃষ্ট পাকিস্তান এই শাসনতন্ত্রের আলোকে রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা অর্জন করে। সোহরাওয়ার্দী রিপাব্লিকের প্রথম প্রধানমমন্ত্রী হন। সোহরাওয়ার্দীকে হটিয়ে ইস্কান্দর মীর্জা এবং তাকে হটিয়ে জেনারেল আইউব ক্ষমতা দখল করেন। আইউব শাসনতন্ত্র স্থগিত করলেও এক ইউনিট ও পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ ঠিক রাখেন এবং মূলতঃ তার হাতেই এই পরিকল্পনা কার্যকারিতা পায়।
🔴 পাকিস্তান শব্দটি উদ্ভাবন ও মুসলিম লীগ গঠনেরও আগে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য আলাদা বাসভূমির ধারণা প্রথম তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে তা বিকশিত হতে থাকে প্রধানত আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে। সেই আলীগড় বা উত্তর প্রদেশ স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমির বাইরে রয়ে যায়। পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ গঠনে শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা এবং বাঙলাভাষী মুসলমানেরা নেতৃস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু কালক্রমে এরা সকলেই পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের কাছে লাঞ্ছিত হতে থাকে। মুসলিম অধ্যুষিত ও মুসলিম শাসিত স্বাধীন বা স্বায়ত্বশাসিত দেশজ রাজ্যগুলো ভারত ছলে-বলে-কলে-কৌশলে দখল করে। ইন্ডিয়ার অন্যান্য প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা অবর্ননীয় দুর্দশার মুখে পড়ে।
🔴 নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আমরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্বেও আমাদের ওপর পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য-নির্যাতন যেমন সত্য ছিল, তেমনই সমান সত্য হচ্ছে, আজকের বাংলাদেশ যদি ১৯৪৭ সালে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান-এর অন্তর্ভুক্ত না হ'তো তা'হলে আমাদের পরিণতিও ইন্ডিয়ার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মতই হোতো। স্বাধীনতার স্বপ্ন আর দেখতে হতো না।
🔴 পাকিস্তানকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে যতই নিন্দা করা হোক না কেন, আসলে ব্রিটিশের ডিভাইড এন্ড রুল অপকৌশল উপমহাদেশে যে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু দলনের বাস্তবতা তৈরি করেছিল সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানেরা তার ভিক্টিম ছিল এবং এ থেকে রেহাই পেতেই স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। কেবল ধর্মীয় নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারসহ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব বিবেচনাতেই সে সময় পাকিস্তান অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। ইংরেজ শাসক ও উপমহাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল কংগ্রেসের পক্ষে সে বাস্তবতা অস্বীকার বা রোধ করা সম্ভব ছিল না।
🔴 ১৯৭১ সালে আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলকে যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ নামের আলাদা রাষ্ট্র গড়েছি। তবে এই রাষ্ট্রের চরিত্র, কোর ভ্যালুজ বা অন্তর্নিহিত মূল্যবোধসমূহ, জাতীয় ঐক্যসূত্র, রাজনীতি, শাসনপদ্ধতি, প্রতিবেশী সহ বিশ্বের নানান চরিত্রের তাবৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, নাগরিক অধিকার, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের অধিকার-মর্যাদা-নিরাপত্তা সহ কোনো কিছুই আমরা স্থির ও অটল ভাবে সুনির্ধারিত ও সুবিন্যস্ত করতে পারিনি। অনেক বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি বা নিরসন করতে পারিনি আমরা। জাতি ও রাষ্ট্রগঠন এবং এর পরিকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনো অসমাপ্ত ও চলমান। উপসংহারে পৌঁছাবার বাকি পথ এখনো সামনে পড়ে রয়েছে। 🟢
courtesy: Maruf kamal khan
Thursday, 19 March 2026
বিএনপির ২০৩১ সালের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল আয়োজন !
রেড এলার্ট !!
২০৩১ সালের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল আয়োজন এখনই সম্পন্ন করে রাখতেছে বিএনপি!
প্রথমে জুলাই সনদ ও গণভোটে জনগণের রায় প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি সরকার।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাই কোয়ালিফাইড ভিসিদের প্রত্যাহার করে দলীয় ভিসি নিয়োগ দিচ্ছে।
দ্যান, সিটি কর্পোরেশন ও ৪২ টি জেলা পরিষদে (মেয়র/কাউন্সিলর) নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে দলীয় প্রশাসক নিযুক্ত করেছে বিএনপি।
এবার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় একই কায়দায় দলীয় প্রশাসক নিয়োগের পথে হাঁটছে সরকার।
প্রশ্ন হচ্ছে তারা চাইলেই তো নির্বাচন প্রভাবিত করে তাদের লোকদের বসাতে পারে।
কিন্তু একেবারে কোন নির্বাচনই না দিয়ে এভাবে কোন স্বার্থে নিয়োগ দিতেছে! সেটাই তো?
মূলত ১ বছর বা তার কিছু বেশি মেয়াদের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে। এরপর নির্বাচন দিবে এবং নিজেদের লোকদের জিতিয়ে আনবে।
কারণ ৫ বছর পর যখন সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, স্থানীয় প্রতিনিধিদের মেয়াদ আরও ১ বছর অবশিষ্ট থাকবে।
তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসলেও প্রশাসন কে কন্ট্রোল করা কোন ব্যপারই হবে না।
আবার চুপ্পুকেও রেখে দিতেছে বিএনপি। ১ বছর পর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিবে।
সে হিসেবে তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতির মেয়াদও অবশিষ্ট থাকবে নির্বাচনে।
ফলাফল হচ্ছে, নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসলেও সেটা হবে পুতুল সরকার।
পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বিএনপি কব্জায় ই থাকবে। সো, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে কোন চ্যালেঞ্জ ই ফেস করতে হবে না তখন।
দেশে আবারও ঝেঁকে বসলো পুরনো ফ্যাসিবাদ।
লড়াই-সংগ্রাম ই হয়তো এ যমিনের নিশ্চল নিয়তি!
Tuesday, 17 March 2026
একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে।
"শেখ হাসিনা দিল্লীতে পালিয়ে গিয়েছে, সংসদ ডিসল্ভ করে দেওয়া হয়েছে , সবাই রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছে...” ইত্যাদি। জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কি ঠিক কিছু বলেছেন? (কমেন্টে দেখুন) । মোটেও না।
গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি—এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারণ ঘটনাগুলো খুব পরিষ্কার: একটি সরকার পতন হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন, সংসদ ভেঙে গেছে—অর্থাৎ পুরানা রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—এখন রাষ্ট্র কে গড়বে? কীভাবে গড়বে? জনগণের ভূমিকা কী হবে?
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে নতুন রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া শুরু না করে, পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই আবার জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি তথাকথিত “উপদেষ্টা সরকার” গঠন করা হয়েছে—যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তিই নাই। এখানে একটা বড় ধরনের দ্বিচারিতা দেখা যায়: একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। তাহলে আসলে কোনটা মানা হচ্ছে? —সংবিধান, না ক্ষমতা? কাদের ক্ষমতা? সেনাবাহিনী, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতা ও রাষ্ট্রপতির? কালের কন্ঠে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার পড়লে পরিষ্কার এটাই বাস্তব হিশাব?
আরও বড় প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই সংবিধান মানা হয়, তাহলে নির্বাচন হওয়ার কথা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২০২৯ সালে। এখন নির্বাচন করার কথা উঠছে কেন? আবার যদি বলা হয় এটি গণঅভ্যুত্থানের ফল, তাহলে পুরানা সংবিধানের প্রশ্ন আসে কেন? , পুরানা সংবিধানের বৈধতা নিয়েই বা এত টানাটানি কেন? এই দুই অবস্থান একসাথে সত্য হতে পারে না।
এই জায়গাটাতেই জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ। তিনি ঠিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন—সংবিধান সবকিছুর উপরে নয়। কিন্তু তিনি বলেননি কেন এই সংবিধানই আবার রক্ষা করা হলো? কারা তা রক্ষা করলো? এবং কাদের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?
বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা কখনো শূন্য থাকে না। যখন একটি সরকার ভেঙে পড়ে, তখন নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হয়। সেই মুহূর্তে জনগণের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে—কিন্তু সেই সুযোগটাই সবচেয়ে বেশি দখল করে নেয় সংগঠিত শক্তিগুলো: সেনাবাহিনী, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক এলিট।
বাংলাদেশেও সেটাই হয়েছে। একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও, সেই শূন্যতা জনগণ পূরণ করতে পারেনি। বরং রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো মিলে এমন একটি ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যাতে পু্রানা ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত থাকে—শুধু মুখ বদলায়।
এখানে “লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণী” কথাটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান না—এর বাস্তব অর্থ আছে। যারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পদ দখল করেছে, ব্যাংক লুট করেছে, অর্থ পাচার করেছে—তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো একটি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। কারণ সেই প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা আসতে পারে, আইনবিহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও আয়নাঘরের জন্য বিচার হতে পারে, লুট করে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পদ ফেরত আনার প্রশ্ন উঠতে পারে। যারা গুম, খুন, ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের সঙ্গে জড়িত—তাদের জন্যও পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার টিকে থাকা ও টিকিয়ে রাখা নিরাপদ ও জরুরি। কারণ নতুন করে জনগণের রাষ্ট্র গঠন হলে তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ও শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব ত্রাণকর্তা হিশাবে জনাব সালাহ উদ্দিন আছেন। ভয় কি?
তাই একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—সংবিধান রক্ষা করা হয়েছে “আইনের প্রতি শ্রদ্ধা” থেকে নয়, বরং গণবিরোধী নির্দিষ্ট ক্ষমতার চরিত্র ও কাঠামোকে অক্ষত রাখার জন্য। এই সংবিধান এমনভাবে তৈরি, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রায় সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এই কেন্দ্রীভুত ক্ষমতা ভাঙা মানে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন—যা বর্তমান ক্ষমতাধারীরা কখনোই চাইবে না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—গণঅভ্যুত্থান মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভিত্তি নতুন ভাবে গঠনের সুযোগ। সেই সুযোগে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হতো একটি গণপরিষদ নির্বাচন—যেখানে জনগণ সরাসরি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ করবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, এমনকি বিএনপির সাধারণ কর্মীসহ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষই ভূমিকা রাখতে পারতো।
কিন্তু সেই পথ নেওয়া হয়নি। কেন? কারণ সেই পথ অনিশ্চিত, নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর ভীতির কারন হলো সেই পথ নেওয়া হলে বাস্তব ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরে আসতে পারে।
সবশেষে প্রশ্নটা নৈতিকও। যারা জীবন দিয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে, যারা রাস্তায় নেমে রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন দেখেছে—তাদের সেই ত্যাগ কি শুধু একটি সরকার বদলের জন্য ছিল? নাকি একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে “সংবিধান মানতে হবে”—এই কথাটা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একদিকে সংবিধান ভেঙে সরকার বানানো, অন্যদিকে সেই সংবিধান রক্ষার কথা বলা—এটা কোনো নীতির রাজনীতি না, এটা ক্ষমতার রাজনীতি।
আমরা কি পুরান ক্ষমতা ব্যবস্থা ও কাঠামোর মধ্যে সামান্য একটি সংস্কার চাই, নাকি সত্যিকারের অর্থে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবে গড়তে চাই?
জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ আসলে কি চান?
শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে
ঠিক ৫২বছর আগে ১৯৭৪ সালের মার্চে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ, চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের দুর্নীতি, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির শ্রেণিশত্রু খতমের কর্মসূচি, জাসদের সরকারবিরোধী আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানামুখী তৎপরতায় টালমাটাল দেশের পরিস্থিতি। ওই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর মিন্টো রোডের বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেয় জাসদ।
সেদিন জাসদের আন্দোলনকারী কর্মীরা ঢাকার রমনা এলাকায় অবস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করলে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী। এছাড়া আটক করা হয় জাসদের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে।
প্রসংগত, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের পরপরই জাসদ নেতাকর্মীরা শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সেসময়ে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা বিরোধী রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, হত্যা, বিরোধী মতাদর্শীদের গুম করা সহ বহু বেআইনি কাজে যুক্ত থাকার ব্যাপারে অভিযুক্ত ছিলেন।
আজ ১৭ই মার্চ। শেখ মুজিবের জন্মদিন। তার শাসনামলের এমন এক ১৭ই মার্চের কাহিনি বলি।
১৯৭৪ সাল। ফেব্রুয়ারী মাসে জাসদ একটা কর্মসূচি ঘোষণা করে। মুজিব সরকারের ২৫ মাসে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ, গণনির্যাতন, খামখেয়ালীপূর্ণ শাসন, অপদার্থতা ও বিদেশী দাসত্বকে উল্লেখ করে তারা বিবৃতি দেয়৷
নানা দাবীদাওয়া দিয়ে সরকারকে ১৫ই মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়। দাবীদাওয়াগুলো মেনে নেওয়ার জন্য। আল্টিমেটাম আরকি। কিন্তু মুজিব সরকার গুণেও না তাদেরকে!
ফলে ১৭ মার্চ পল্টনে জাসদের উদ্যোগে জনসভা হয়। জলিল ও রব (বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলণকারী) অত্যন্ত জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সভা শেষ হতে না হতেই বিশাল মিছিল মিন্টো রোডের দিকে রওনা হয়। পুলিশ বাঁধা দিতে পারে এজন্য তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা এগিয়ে যায়।
মিছিল গিয়ে থামে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাড়ির সামনে। চারিদিকে স্লোগান চলতে থাকে। জাসদ চাচ্ছে একটা স্মারকলিপি দিবে। কিন্তু মন্ত্রী বাড়িতে নেই। কেরানিগঞ্জে গেছেন জনসভায়।
এতে করে নেতাকর্মীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়। দু'একজন অতি উৎসাহী হয়ে গেইটে আগুন দিতে যায়। কিন্তু গেট তো লোহার, আগুন কী আর ধরে!
হঠাৎ কয়েক ট্রাক বোঝাই করা পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্য এসে হাজির। কথা নেই, বার্তা নেই, সরাসরি গোলাগুলি শুরু করে! জনতা এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। ইনু কমান্ড দেয়, 'সবাই শুয়ে পড়েন।' অনেকে তাই করে। কিন্তু গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়নি। ফলে একটার পর একটা বডি নিচে পড়তে থাকে।
সরকারি প্রেস নোটে বলা হয়, তিনজন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে জলিল, রব, মমতাজ বেগম ও মাঈনউদ্দিন খান বাদল ছিলেন। আহত অবস্থাতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
জাসদ দাবি করে, অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন বর্ণনায় আসে ২২ থেকে ৩৫ জন নিহতের কথা। মাঈনউদ্দিন খান বাদলের বাবা আহমদউল্লাহ খান ছিলেন পুলিশের ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলের ডিএসপি। বাদল পরে তাঁর কাছে শুনেছিলেন, ৪০-৫০টি লাশ রক্ষীবাহিনী ট্রাকে করে নিয়ে গেছে।
রেফারেন্সঃ জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ-সালাউদ্দিন আহমেদ।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন শিলংয়ের প্রিয় বড় ভাই মাননীয় মন্ত্রী জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যিনি তাদের শপথ পড়ালেন তিনিই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলে তাকে যারা শপথ পড়ানোর অধিকার দিয়েছে তারাই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছে।
একজন আইনলঙ্ঘনকারীর হাতে, বেআইনি ব্যক্তির হাতে জাতীয় সংসদের শপথ বাক্য পাঠ করলে তাহলে বিএনপির সকল সংসদ সদস্যরাও এই আইন লঙ্ঘন করেছেন। সেই হিসেবে জাতীয় সংসদ এই মুহূর্তে অবৈধ এবং বেআইনি। বেআইনি সংসদে দাঁড়িয়ে কেউ মন্ত্রী দাবি করা তার চেয়েও বড় বেআইনি কাজ।
এর চেয়েও বড় অপরাধ হচ্ছে—একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ বাদ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করা; যা আরও জঘন্য বেআইনি।
সংসদের নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিবেকশূন্য হয় কিংবা বিকারগ্রস্ত হয়, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য এবং নির্বাচনেও অযোগ্য। সে হিসেবে আমার ধারণা, প্রিয় বড় ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব শিলং থেকে ফেরার সময় অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন।
তিনি যখন শিলংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মানসিক অসুস্থতার কথা বলে কে বা কারা তাকে আইন মেনে সংবিধান অনুযায়ী সেখানে রেখে এসেছিলেন—এ বিষয়টি তিনি জানেন না বলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।
দেশে এসে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠকগুলোতে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, সেগুলো এখন আবার ভুলে যাচ্ছেন এবং অস্বীকার করছেন। যারা তিন মাসের মধ্যে কোনো বিষয় ভুলে যায় এবং অস্বীকার করে, নিশ্চয়ই তারা অক্ষম ও অসুস্থ—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধিহীনও।
এই অবস্থায় আমার ধারণা অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব সংসদ সদস্য হওয়ার সকল আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছেন।
আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সংবিধান নিয়ে এত বক্তব্য দেওয়া হলেও তার নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনী সমাবেশে গণভোটের পক্ষে রায় চেয়েছিলেন। গণপর্যায়ে যুক্ত হওয়ার ফলে সেই অর্থে তার কথার বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এখন সেটি বাস্তবায়নে বিরম্বনা সৃষ্টি করা এক ধরনের প্রতারণার শামিল।
সংবিধান অনুযায়ী কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে তারা সংসদ সদস্য থাকতে পারেন কি না—সে প্রশ্ন রেখে গেলাম।
যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে শপথ পড়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই সংবিধানের কোথাও কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ পড়ানোর নিয়ম নেই। জুলাই সনদের ভিত্তিতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন—এবং সে অনুযায়ী দুটি শপথ পড়ানো হয়েছে:
একটি মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে,
আরেকটি মাননীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
এখানে শপথ যদি অবৈধ হয়, তাহলে দুটি শপথই অবৈধ হবে—না হলে একটিও হবে না। বরং সংবিধান অনুযায়ী দুটি শপথ গ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামি, এমসিপি-সহ যারা এই শপথ নিয়েছেন তারাই সংসদের বৈধ সদস্য; বাকিরা সংবিধান অনুযায়ী অবশ্যই অবৈধ।
আপনি এত সংবিধানের কথা বলেন—তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদে ডেকে আনলেন না কেন?
আমাদের মহামান্য “চুপ্পু” সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি দেখেননি। যদি তাই হয়, তাহলে তিনিই তো এখনো প্রধানমন্ত্রী। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে, কোন সংবিধানের ভিত্তিতে আপনারা এখন সরকারে বসেছেন?
সংবিধান অনুযায়ী যারা এই অবৈধ কাজ করেছে তাদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আপনারা কি নিজেদের বিচার করছেন, নাকি যারা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে তাদের বিচার করছেন?
যদি পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর বিচার করে থাকেন, তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করছেন?
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি চুপ্পু সাহেব হন, তাহলে তার হাতে দেওয়া অধ্যাদেশগুলো কীভাবে অবৈধ হয়? জুলাই সনদ, গণভোট, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং আইন-বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ—সবই তো বর্তমান মহামান্যের স্বাক্ষরে হয়েছে।
তাহলে তিনি এগুলো কোন সংবিধানের ভিত্তিতে করলেন?
বাংলাদেশে একই সঙ্গে দুইটি বৈধ ব্যবস্থা থাকতে পারে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব—আপনি যদি বৈধ হন, তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রেসিডেন্ট এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরা সবাই অবৈধ। আর আপনি যদি অবৈধ হন, তাহলে উপরে উল্লেখিত সবাই বৈধ।
কারণ সংবিধান আপনার মনমতো বানানো কোনো বিষয়বস্তু নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের যা কিছু হচ্ছে—সবই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদের ভিত্তিতে হচ্ছে।
অতএব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে জনতার রায় এসেছে। জনগণ যে বিষয়গুলোর ভিত্তিতে এই গণভোটে রায় দিয়েছে সেটাই এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংবিধানস্বরূপ।
এই আইনকে প্রশ্ন করে কেউ যদি বক্তব্য দেয়, আমি মনে করি তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধ করেছে। একদিন না একদিন শক্তিশালী কোনো সরকার এলে অবশ্যই সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হবে।
কারণ রাষ্ট্র বলছে আপনাকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিতে, আর আপনি সেই শপথ না নিয়ে সংসদে বসে আবোলতাবোল ও গোয়ার্তুমি করবেন—এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
জামায়াতে ইসলামের নেতারা যেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, নিশ্চয়ই সেই শপথপত্র তারা নিজেরা ফটোকপি করে আনেননি। সেই কাগজ সংযুক্ত করে আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার তাদের শপথ পড়িয়েছেন।
আপনার নিয়ম অনুযায়ী যদি এটা অবৈধ হয়, তাহলে সংসদে যারা এই কাগজটি প্রিন্ট করে এনেছেন তারাই সবচেয়ে বড় অপরাধী।
পরীক্ষার হলে কেউ সামান্য নকল কাগজ নিয়ে গেলে যেমন তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়, তেমনি সেই নকল সরবরাহকারীও শাস্তি পায়। তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো একটি শপথপত্র যদি আইনে না থাকে, তবে বেআইনিভাবে কারা সেটি তৈরি করে সংসদ সদস্যদের দিয়ে সারা পৃথিবীর মিডিয়ার সামনে শপথ পড়ালেন—এটা নিশ্চয়ই চরম অন্যায় ও আইনবিরোধী কাজ।
তাহলে তারা এখনো কোন আইনের ভিত্তিতে গ্রেফতার না হয়ে সাংবিধানিক পদে বসে আছেন?
অতএব সালাউদ্দিন সাহেব, আগরবাগর কথা বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। আল্লাহর নামে সেজদা দিন, শুকরিয়া আদায় করুন। দেশনেত্রীর ওপর যে সকল জুলুম হয়েছে সেগুলো স্মরণ করুন।
নতুন প্রজন্ম কিন্তু আগের মতো নেই। উল্টাপাল্টা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিলে তারা আর মেনে নেবে না।
আপনাদের রেকর্ড এমনিতেই খুব ভালো নয়। তার ওপর সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই যে মাতলামি শুরু করেছেন, তাতে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে।
সময় থাকতে জনতার রায় মেনে নিন—নচেৎ হাসিনার পরিণতির জন্যই অপেক্ষা করা শ্রেয়।
আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।
ড. ফয়জুল হক।
Monday, 16 March 2026
প্রবীণ নেতারা চান না তরুণরা রাজনীতিতে আসুক।
ঠিক এই কারণেই প্রবীণ নেতারা চান না তরুণরা রাজনীতিতে আসুক।
রাজনীতির একটা সিস্টেম আছে।
একটা ট্র্যাডিশন আছে।
দশকের পর দশক ধরে যত্ন করে গড়া।
রক্ত-ঘাম দিয়ে না… ঘুষ, কমিশন আর তদবির বাণিজ্য দিয়ে।
পোলাপাইন আইলেই এইডা ভাইঙ্গা ফালাইবো!
এখন কথা হইলো সিস্টেমটা কী? সিস্টেম সহজ,
তুই চুরি করবি। ছোট চুরি না, বড় চুরি। এমন চুরি যেন পরের পাঁচ পুরুষ বইসা খাইতে পারে। প্রজেক্টে ৪০%, টেন্ডারে ৩০%, আর বাকিটা "পার্টি ফান্ড", মানে নিজের ফান্ড।
টাকা কমাবি। উন্নয়নের বরাদ্দ আসবো ১০০ কোটি, খরচ হইবো ৪০ কোটি, বাকি ৬০ কোটি "প্রশাসনিক জটিলতায়" হাওয়া। কাগজে সব ঠিকঠাক। অডিটর? সেও সিস্টেমের অংশ।
বাচ্চাকাচ্চারে বিদ্যাস পড়াইবি। দেশের স্কুলে না অবশ্যই। লন্ডনে, টরন্টোতে, সিডনিতে। দেশের স্কুল? সেইটা জনগণের বাচ্চাদের জন্য। তোর বাচ্চা কি জনগণ?
বেগমপাড়ায় বাড়ি কিনবি। গুলশানে ফ্ল্যাট, বনানীতে অফিস, গ্রামে বাড়ি, আর বেগমপাড়ায়... সেইটা বলতে হইবো না। সবাই বোঝে। না বুঝলেও বোঝার দরকার নাই।
ভোট কিনবি। ইলেকশনের আগে মহল্লায় মহল্লায় খাম যাইবো। ৫০০ টাকা, ১০০০ টাকা। মানুষ বলবো "নেতা গরিবের বন্ধু।" কেউ জিজ্ঞেস করবো না এই টাকা আসলো কই থেইকা। জিজ্ঞেস করার সাহস নাই, আর থাকলেও সুযোগ নাই।
এইটাই সিস্টেম। এইটাই ট্র্যাডিশন।
-
জনগণ হইলো তোর গোলাম - তুই হইলি রাজা।
রাজার একটা ভাব থাকে। রাজা হাঁটলে পিছনে লোক থাকে, রাজা কথা বললে মাইক লাগে, রাজা হাসলে ছবি উঠে, রাজা রাগ করলে মামলা হয়। এই ভাব বজায় রাখতে হইবো!!
তাহলে তুই কেন জবাবদিহিতা করবি? রাজার কাছে জবাব চায় কে? কার ঘাড়ে কয়টা মাথা?
আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর মাথায় ব্রেন থাকবে কেন?
মাথায় ব্রেন থাকলে প্রশ্ন করবি। প্রশ্ন করলে সিস্টেম নড়বে। সিস্টেম নড়লে অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।
তোর মাথায় থাকবে গু 💩
আর তুই সারাদিন বইসা রেন্ডিয়ার দালালি করবি, নাইলে পাকিদের দালালি করবি। এই দুইটার মাঝখানে অপশন নাই। দেশের মানুষের কথা ভাবার সময় নাই, ওইটা তো "রাজনৈতিক দুর্বলতা"।
যে নেতার বিদেশি প্রভু নাই, তার তো ফান্ডিং নাই। ফান্ডিং নাই মানে ইলেকশন নাই। ইলেকশন নাই মানে ক্ষমতা নাই। ক্ষমতা নাই মানে চুরির সুযোগ নাই। তাহলে এত কষ্ট করে রাজনীতিতে আসলি কেন?
তাই প্রবীণ নেতারা চান তরুণরা ঘরে বসে থাকুক।
ফেসবুকে রাজনীতি করুক।
কমেন্টে বিপ্লব করুক।
কিন্তু মাঠে নামুক না।
কারণ মাঠে নামলে সিস্টেম টিকবে না।
আর সিস্টেম না টিকলে
বেগমপাড়ার বাড়ির কিস্তি যাবে কোথা থেকে?
লন্ডনের টিউশন ফি আসবে কোথা থেকে?
আর সবচেয়ে বড় কথা…
এতদিন ধরে করা “ত্যাগ আর সংগ্রামের” হিসাবটা মিলবে কীভাবে?
Sunday, 8 March 2026
আস্থার দহন।
আস্থার দহন।
ইতিহাসের দাবার বোর্ডে দাপুটে খেলোয়াড়ও কখনো কখনো নিজের সাজানো ঘুঁটির চালে নিজেই কুপোকাত হন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ এসেছে,যেখানে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিশ্ছিদ্র মনে হলেও সময়ের বিবর্তনে সেগুলোই তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চারজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন করার নেপথ্যে যে অগাধ আস্থা ও রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক করুণ নিয়তির পরিহাসে রূপ নিয়েছে।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে শেখ হাসিনা চাইলেন এক নিস্পৃহ অভিভাবক। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে বঙ্গভবনের শীর্ষাসনে বসিয়ে তিনি ভেবেছিলেন এক নিরাপদ ছায়া পেলেন। কিন্তু রাজনীতিতে ‘আদর্শিক নিরপেক্ষতা’ অনেক সময় শাসকের নিজস্ব এজেন্ডার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। শাহাবুদ্দিন আহমেদ নিজের নীতিতে অটল থেকে সরকারের অনেক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন।তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সেই আস্থার প্রতিদান মেলেনি; বরং ২০০১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের শাসনামলে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শালসা-র কারসাজি আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই আস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে যায়। নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে তিনি যে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন, তা আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। শেখ হাসিনা নিজেই পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন,এই নিয়োগ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় ভুল।
এরপর ২০১৫ সালে সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ছিল তাঁর সরকারের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। সমালোচকদের মতে, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে স্পষ্ট প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও যাঁকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের চাবি দেওয়া হয়েছিল, সেই এস কে সিনহাই এক পর্যায়ে সরকারের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে তিনি যে ‘বিচারিক ক্যু’ বা ‘জুডিশিয়াল ক্যু’র নীল নকশা সাজিয়েছিলেন, তা ঢাকাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের এই নজিরবিহীন দ্বৈরথ কেবল সরকারকে অস্বস্তিতেই ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভারসাম্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছিল। কোনোমতে সেই বিচারিক ক্যু থেকে সরকার রক্ষা পেলেও, যাকে ভরসা করে শীর্ষাসনে বসানো হয়েছিল, তাঁর কলম থেকেই যখন শাসনের বৈধতা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ এল, তখন সেই ‘ভুল’ ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হিসেবে স্থায়ী রূপ নিল।
২০২৪ সালে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগ ছিল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও আত্মঘাতী জুয়া। নিয়োগের আগে ও পরে অনেক মহল থেকে তাঁর সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও, শেখ হাসিনা পারিবারিক আত্মীয়তা ও দীর্ঘদিনের চেনা আনুগত্যের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে সেই সতর্কতাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যাকে তিনি তাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ মনে করেছিলেন, সেই সেনাপ্রধানই হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যের মূল নায়ক। ৫ই আগস্টের সেই উত্তাল মুহূর্তে যখন জনস্রোত গণভবনমুখী, তখন সেনাপ্রধানের রহস্যময় ভূমিকা এবং শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল না, বরং অনেকের মতে এর গভীরে লুকিয়ে ছিল আরও ভয়াবহ কোনো ছক। অভিযোগ ওঠে, পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা কেবল ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাতে খোদ শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার বা হত্যার সূক্ষ্ম পরিকল্পনাও ছিল।যে ঢালকে তিনি সবচেয়ে মজবুত ভেবেছিলেন, সেই ঢালই শেষ মুহূর্তে ঘাতকের খড়গ হয়ে তাঁকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাল।
সবশেষে মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি করা ছিল এক বিস্ময়কর ও তড়িঘড়ি নেওয়া সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পোড়খাওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অবহেলা করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একজনকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সিদ্ধান্তটি দলের ভেতরে ও বাইরে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আনুগত্যের বিনিময়ে পুরস্কার দেওয়ার এই কৌশলটি ছিল মারাত্মক ভুল; কারণ কোনো পোড়খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বঙ্গভবনে বসানো হলে ৫ই আগস্টের পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। সংকটকালীন সময়ে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক যে বিচক্ষণতা ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে পারতেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অসংলগ্ন ও দ্বিমুখী বক্তব্যে তার লেশমাত্র ছিল না। তাঁর দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক সাংবিধানিক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়, যা আওয়ামী লীগের পতন পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
রাজনীতিতে অতি-বিশ্বাস অনেক সময় দূরদর্শিতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শেখ হাসিনা এই চারজন ব্যক্তিকে কেবল উচ্চপদেই বসাননি, বরং তাঁদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের একেকটি স্তম্ভের ভার তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন জনআকাঙ্ক্ষা আর রাষ্ট্রীয় সংকটের মুখোমুখি হন, তখন ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার চেয়ে নিজের অস্তিত্ব বা অন্তরে গচ্ছিত জিঘাংসা মুখ্য হয়ে ওঠে। এই চারজন ব্যক্তির নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এগুলো ছিল এক একটি রাজনৈতিক বাজি। আর ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, এই বাজিতে প্রতিবারই হারতে হয়েছে খোদ খেলোয়াড়কে। যে হাতগুলোকে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সিংহাসনের পায়া, সেই হাতগুলোই শেষমেশ সেই সিংহাসন উল্টে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।এই চারটি নিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার শীর্ষে বসে শেখ হাসিনা বারবার এমন ব্যক্তিদের ওপর বাজি ধরেছিলেন, যারা সংকটের মুহূর্তে হয় অতি-নিরপেক্ষ ছিলেন, না হয় সরাসরি বিনাশের পথ তৈরি করেছিলেন। ক্ষমতার মোহ অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে ব্যক্তিগত অনুগত মানুষের চেয়ে আদর্শীক অনুগত মানুষকে বেশি নিরাপদ মনে হয়।এই সিদ্ধান্তগুলো কেবল রাজনৈতিক ভুল ছিল না, বরং এগুলো ছিল নিয়তির সেই অমোঘ লিখন, যা তিলে তিলে এক দীর্ঘ শাসনের ভিত গুঁড়িয়ে দিয়ে এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যের জন্ম দিল।
Saturday, 7 March 2026
৭ই মার্চের দ্ব্যর্থতা : জয় বাংলা — জিয়ে পাকিস্তান
(০১)
=====================
[সেই একই বাসি খিচুড়ি। সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সেই একই দ্ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। এজন্যই বলি ইতিহাস ক্ষমতা নির্ধারণ করেনা। ক্ষমতাই ইতিহাস তৈরি করে। যদি বলি আজ পলাশী দিবস কিংবা তিতুমীরের শাহাদাত দিবস কিংবা শামস-উদ-দীন ইলিয়াস শাহের মৃত্যু দিবস, তাহলে কী কারও কোনো হেলদোল হবে বা কোনো বিতর্ক বা কোনো উদযাপন? হবেনা। কারণ ক্ষমতার সাথে সেই ইতিহাসের সম্পর্ক চিরতরে চুকেবুকে গেছে। কিন্তু কেন আজ আওয়ামী পক্ষ কিংবা বিপক্ষ সবারই ৭ই মার্চ, মুজিব কিংবা একাত্তর নিয়ে কিছু না কিছু বলে ফেলার একটা তাড়না? কারণ আজও ক্ষমতার পেন্ডুলাম দোদুল্যমান। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেনা আওয়ামী লীগ শেষ। আওয়ামী লীগ মৃত। মুজিব-হাসিনা-বাকশালীদের কবর রচিত হয়ে গেছে। কারণ সবাই জানে যে কোনো পক্ষই তাদের স্বার্থেই আবার এই আওয়ামী লীগকেই ফিরিয়ে আনবে। আনবেই। তাই আজও ৭ই মার্চ প্রাসঙ্গিক। তার ইতিহাসও প্রাসঙ্গিক। ৭ই মার্চের খিচুড়িও প্রাসঙ্গিক। বিস্তারিত ইতিহাসের ছিন্নপত্রের ৩য় খন্ডে।]
০১.
“... ৭ মার্চের মিটিং-এর বিশেষ বর্ণনা দেব না। লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল, মাথায় লাল ফিতা বাঁধা ও হাতে লাঙ্গল নিয়ে কৃষকেরাও সমবেত হয়েছিল। বন্ধু-বান্ধবের সাথেই উপস্থিত ছিলাম। সকলেই আশা করছিলাম যে সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হবে। আসলে আমাদের এ ধারণা ছিল আবেগপূর্ণ এবং বিতর্কিত। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সংসদের অধিবেশন এবং মন্ত্রিসভা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছিল। এটিই সঠিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
৭ মার্চের সভায় তার বক্তব্য “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে শেষ করেছিলেন। তাতে তিনি তো কোন অন্যায় করেননি। পাকিস্তান অবিভক্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চলছিল জনমতের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সুতরাং রাজনীতিক হিসেবে তিনি তিনি তার ভাষণ সুষ্ঠুভাবে সমাপ্তও করেছিলেন। লক্ষাধিক লোক থেকে সেদিন কোন প্রতিবাদ আসেনি। অবশ্য শেষ করার পরমূহুর্তে ছাত্রনেতৃবৃন্দের পরামর্শে তিনি মাইকে ফিরে এসে “জয় বাংলা” ধ্বণিও উচ্চারণ করেছিলেন, যা সেদিন সমবেত জনগণকে উল্লসিত করেছিল। পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি এবং তার ভাষণ রাজনৈতিকভাবে সুষ্ঠু ও সঙ্গতিপূর্ণই ছিল।
অথচ আজকাল ৭ মার্চের এই ভাষণ থেকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কথাটি মুছে ফেলা হয়েছে। কেন? কী কারণে? এতে আমি মনে করি মুজিবুর সাহেবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে খাটো করা হয়েছে। আরো বড় ক্ষতি হয়েছে, যে সম্প্রদায় এই কাজটি করেছেন তার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে॥”
— কর্ণেল (অব:) কাজী নূর-উজ্জামান বীরউত্তম (৭নং সেক্টর কমান্ডার) / একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা ॥ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা । পৃ: ১২-১৩]
০২.
“... একটা কথা বলি, শেখ সাহেব যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে “জয় বাংলার” সাথে সাথে “জয় পাকিস্তান” শব্দটিও উচ্চারণ করেছিলেন। এখন এই ভাষণ নিয়ে নানা বিতর্ক-বিতন্ডা চলছে। আমি ছোট্ট মানুষ। আমাকে সাক্ষ্য দিতে কেউ ডাকবে না। আমি যেমন শুনেছি, তেমনি বললাম। হতে পারে, আমার শ্রুতির বিভ্রম ঘটেছিল॥”
— আহমদ ছফা / বেহাত বিপ্লব : ১৯৭১ । সম্পাদনা : সলিমুল্লাহ খান ॥ [আগামী প্রকাশনী - ডিসেম্বর, ২০১৩ । পৃ: ৮৪]
০৩.
“… ’৭১-এর জনতার স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খাই নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে অগ্রগামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জনতার সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার ক্ষমতা তৎকালীন কোন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছিল না। আর তাই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম আপন পরিণতিতে ধাবিত হয়।
’৭১-এর ২৫শে মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ আলোচনা এক পাকিস্তানের ভিত্তিতেই ছিল। ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য যতই স্বাধীকারের পটভূমিতে বিশ্লেষিত হোক না কেন তাও ‘জয় বাংলা’ আর ‘জয় পাকিস্তানে’র উচ্চকিত শ্লোগানে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আপোষ মীমাংসার ধুম্র জালে আবদ্ধ ছিল।
’৭১-এর ২৫শে মার্চের আলোচনা শেষে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাক বাহিনীকে নিরস্ত্র বাঙালী জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে ভূট্টোসহ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে করাচির পথে ধাবমান তখন রাত ৮.৩০ মিনিটে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের সাংবাদিকদের নিকট প্রদত্ত বক্তব্য ‘আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে আর মাত্র ঘোষণা বাকি’-এই বক্তব্যের তাৎপর্য আর যা-ই হোক রাত ১২টায় শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার কোন প্রেক্ষাপটের সাক্ষ্য বহন করে না।
… (পূর্ণাঙ্গ ভাষণ) প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্ত্তত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় পাকিস্তান।
... বাংলা জাতীয় লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম. এম. আনোয়ারের উদ্যোগে আগরতলা এসেম্বলি মেম্বার রেস্ট হাউসে আমার ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মালেক উকিলের মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর এক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্ত অবধি কোন নির্দেশ দান করেন নাই। এইদিকে মুজিব-ইয়াহিয়ার মার্চ-এর আলোচনার সূত্র ধরিয়া কনফেডারেশন প্রস্তাবের ভিত্তিতে সমঝােতার আলোচনা চলিতেছে। জনাব মালেক উকিল আমাকে ইহাও জানান যে, তিনি এই আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে আশাবাদী।
প্রসঙ্গত ইহাও উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে আমি সর্বজনাব আবদুল মালেক উকিল, জহুর আহমদ চৌধুরী, আবদুল হান্নান চৌধুরী, আলী আজম, খালেদ মোহাম্মদ আলী, লুৎফুল হাই সাচ্চু প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতার সহিত বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাকালে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বা লক্ষ্য সম্পর্কে কোন নির্দেশ দিয়াছিলেন কিনা, জানিতে চাহিয়াছিলাম। তাহারা সবাই স্পষ্ট ভাষায় ও নিঃসঙ্কোচে জবাব দিলেন যে, ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর আকস্মিক অতর্কিত হামলার ফলে কোন নির্দেশ দান কিংবা পরামর্শ দান নেতার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। অথচ স্বাধীনতা উত্তরকালে বানোয়াটভাবে বলা হয় যে, তিনি পূর্বাহ্নেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। শুধু তাহাই নয়, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে, তিনি নির্দেশনামা জনাব জহুর আহমদ চৌধুরীকে পাঠাইয়াছিলেন।
... সময়োপযোগী নেতৃত্বদানের ব্যর্থতা ঢাকিবার জন্যই পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান অসত্যের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নির্দেশ প্রদানের একটি ঘোষণা পত্র ছাপাইয়া সাধারণ্যে বিলি করিয়াছিলেন। ইহা না করিয়া তাহার উচিত ছিল সময়োপযোগী অবদানের জন্য মেজর জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতিদান, ইহা হইত নেতাসুলভ আচরণ। তাঁহার মানসিকতার কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাভাবিকভাবেই তাহা করিতে ব্যর্থ হন। ইহা অতীব পরিতাপ এবং দুঃখের বিষয়॥”
— অলি আহাদ / জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে '৭৫ [বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি - অক্টোবর, ২০১২ (পঞ্চম সংস্করণ) । পৃ: ১৭ (তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা) / ৩৮৬ / ৪০৬-৪০৭ / ৪০৯]
০৪.
“... জাতির জনক বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষন প্রসংগেও একই ব্যাপার। জাষ্টিস মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সাহেবের বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলাদেশের তারিখ প্রথম সংস্করনে তিনি উল্লেখ করেছেন ভাষনের শেষে শেখ মুজিবুর রহমান বললেন ‘জয় বাংলা। জিয়ে পাকিস্তান’। দ্বিতীয় সংস্করনে তিনি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ অংশটি বাদ দিলেন। কবি শামসুর রহমানের লেখা আত্মজীবনী যা দৈনিক জনকন্ঠে ‘কালের ধূলোয় লেখা’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেখানেও তিনি বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ কথা ছিল ‘জিয়ে পাকিস্তান’। আরো অনেকের কাছে আমি এ ধরনের কথা শুনেছি, যারা আওয়ামী ভাবধারার মানুষ। সমস্যা হল আমি নিজে ৮ এবং ৯ই মার্চের সমস্ত পত্রিকা খুঁজে এরকম কোন তথ্য পাই নি। তাহলে একটি ভুল ধারনা কেন প্রবাহিত হচ্ছে?
বংগবন্ধু যদি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে থাকেন তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। তিনি যা বলেছেন অবশ্যই ভেবে চিন্তেই বলেছেন। পাকিস্তানের সংগে তার আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। তাকে সময় নিতে হবে। ৭ই মার্চে যুদ্ধ ঘোষনার মত অবস্থা তার ছিল না। বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন গেটেসবার্গ এড্রেসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ন বলে আমি মনে করি। এখানে কোন অষ্পষ্টতা থাকা বাঞ্জনীয় না॥”
— হুমায়ুন আহমেদ / জোছনা ও জননীর গল্প ॥ [অন্য প্রকাশ - ফেব্রুয়ারী, ২০০৪ । ভূমিকা (পূর্ব কথা)]
০ ৫.
“... ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন - ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় পাকিস্তান’। এই ঘোষণা সেদিন মানুষকে উদ্দিপীত করেছিলো। মানুষকে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্রধারণে অনুপ্রাণিত করেছিলো। আজ শেখ সাহেবের সমর্থকরা সেদিনের ক্যাসেট থেকে ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি তুলে ফেলেছেন। আর তার বিরোধীরা বলছেন, শেখ সাহেব ওই শ্লোগানের মাধ্যমে পাকিস্তান রাখতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ কেউই তাকে বিশ্বাস করছে না। এমন করে কি অবিকৃত ইতিহাস লেখা যায়॥”
— নির্মল সেন / স্বাধীনতার অবিকৃত ইতিহাস ॥ [সাপ্তাহিক বিচিত্রা - ১৪/০৪/১৯৯৪]
০৬.
“... শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না।
এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কীভাষণ! আর শেখ সাহেবের কী গগনবিদারী কণ্ঠ! গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান।”
শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’।
আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।
এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, “আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন? আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা aggressive হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না?”
এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন॥”
— নির্মল সেন / ৭ই মার্চের ভাষণ “জয় পাকিস্তান” বিতর্ক ॥ (সংগৃহীত) আমার জীবনে একাত্তর ॥ [বর্তমান সময় - ২০০৯ । পৃ: ১১]
০ ৭.
“... আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদে কোনো দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনাই হয়নি বা আলোচনা করা সম্ভবও ছিল না। কারণ আওয়ামী লীগ কোনো গুপ্ত বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান নয়। অথচ স্লোগান দিয়েছে একটি দেশ স্বাধীন করার। শত্রু প্রস্তুতি নিয়ে আঘাত হানতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ শত্রুর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব চাচ্ছে। চাচ্ছে সংগ্রামের আহ্বান। কিন্তু সংগঠন হিসেবে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না আওয়ামী লীগের। সুতরাং সিদ্ধান্ত নিয়ে জনসভা ডেকে স্বাধীনতা ঘোষণা দেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এ ধরণের একটি সংগ্রামে যাবার কথা অন্তত: আওয়ামী লীগের নয়।
কিন্তু তা হলে কী হবে? এ বিতর্কই হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ। ৭ মার্চ শেখ সাহেব জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলে ভাষণ শেষ করলেন। আমার মনে হলো এবার স্বাধীনতা হচ্ছে না। প্রস্তুতি নেই। সময় নিতে হবে। সাময়িককালের জন্য হলেও শেখ সাহেবকে আপোষ করতে হবে। বন্ধু রুহুল আমিন কায়সার বললেন, এবারেই স্বাধীনতা, আওয়ামী লীগ বুঝেই হোক না বুঝেই হোক, আগুনে হাত দিয়েছে। যাদের মাঠে নামিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া তাদের ঘরে ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। আমরা সংঘর্ষ চাই বা না চাই ওরা সংঘর্ষ চাপিয়ে দেবে। যেকোনো মূল্যেই হোক এবারই স্বাধীনতা।
আমি একমত হলাম না। দু'জনে বাজি ধরলাম। বাজিতে আমি হেরেছিলাম। রুহুল আমিন কায়সার পঞ্চাশের দশকের ছাত্র আন্দোলনের একটি উজ্জল নাম। ছাত্র অবস্থায় বিপ্লবী দলের (আর এস পি) সংস্পর্শে আসেন। ষাটের দশকে চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বাজিতে তিনি জিতে গেলেন। কিন্তু আমার হিসাব কি ভুল ছিল? আমি বলেছিলাম, আমাদের প্রস্ততি বলতে বাংলাদেশের মানুষের প্রস্তুতির কথাই বুঝিয়েছিলাম। ভারতের সাহায্য এবং সহযোগিতার প্রশ্নটি আমার হিসেবে ছিল না। আমি বুঝেছিলাম, ভারত সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ভৌগলিক দিক থেকে স্বাধীন হতে পারে, কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। আর ভারতই বা আমাদের সাহায্য করবে কেন? তাই আগরতলা গিয়েই কংগ্রেস নেতাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আপনারা সীমান্ত খুলে দিলেন? আপনাদের কী লাভ বাংলাদেশকে স্বাধীন করে?
মা, আমার খটকা লেগেছিল আগরতলা গিয়ে। ত্রিপুরাবাসী আমাদের দু'হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়েছে। এর অর্থ বুঝি। কিন্তু ভারত আমাদের সাহায্য দিচ্ছে কেন? কেন ট্রেনিং দিচ্ছে? ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কি সমঝোতা হয়েছে? এ সম্পর্কে সকলেই অন্ধকারে। একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমাকেও সেই অন্ধকারে ঝাঁপ দিতে হলো। সে মুহুর্তে ভিন্ন কোন বিকল্প ছিল না॥”
— নির্মল সেন / মা জন্মভূমি ॥ [তরফদার প্রকাশনী - ডিসেম্বর, ২০০৭ । পৃ: ৬১-৬২]
০৮.
“... আওয়ামী লীগ একটি সংসদীয় দল ছিল এবং শেখ মুজিব মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সময় বিরোধীদের বিরুদ্ধে শারিরীক শক্তি প্রয়োগে অভ্যস্ত হলেও সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা তার মাথায় কোনদিন থাকে নি। গোপন অবস্থায় থাকার ব্যাপারেও তার কোন চিন্তা ছিল না। বিশেষ বিশেষ জরুরী অবস্থায় জেলে যাওয়া ছাড়া তার করার মত কিছু ছিল না। সেটাই তিনি বরাবর করে এসেছিলেন।
১৯৭১ সালেও স্বাধীনতা যুদ্ধ ইত্যাদির কথা বললেও তার কোন চিন্তা বা প্রস্তুতি তার ছিল না। ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে তার বক্তৃতায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার পর তিনি যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন তা হলো, ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর সাথে আলোচনা। এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিশ্চিত করে পাকিস্তানের কাঠামো রক্ষা করা। তিনি নিজে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। সেটা সাধারণ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ছিল। এই চেষ্টা তিনি করেছিলেন।
৭ই মার্চের বক্তৃতার শেষে “জয় পাকিস্তান” বলা এদিক দিয়ে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এটা এখন আওয়ামী লীগের লোকেরা অস্বীকার করে কারণ তার কোন রেকর্ড নেই। ৭ই মার্চের পর রেডিও তাদের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকার সময় তারা ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি মুছে ফেলেছিলেন। তখন কোন ক্যাসেট রেকর্ডারের ব্যবহার ছিল না। একমাত্র রেকর্ড ছিল রেডিওতে। যারা শুনেছিল তাদের স্মৃতি ছাড়া এর অন্য কোন চিহ্ন নেই।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামক বইয়ের প্রথম সংস্করণে লিখেছিলেন যে, ৭ই মার্চ শেখ মুজিব “জিয়ে পাকিস্তান” বলেছিলেন। কিন্তু বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে এই সত্য ভাষণ বাদ দেয়া হয়েছে।
অহিংস অসহযোগ আন্দোলন করলেও স্বাধীনতা যুদ্ধে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা তার ছিল না। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, তৎকালীন জরুরী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডেকে এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় নি। দেশের প্রশাসন তারা পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু নিজেদের সংগঠনে এ নিয়ে কোন আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন তারা বোধ করেন নি। সব কিছুই শেখ মুজিবের ‘হুকুম’ অনুযায়ী। তিনি তার ৭ই মার্চের বক্তৃতাতেও 'হুকুম' দেওয়ার কথা নিজেই বলেছিলেন।”
— বদরুদ্দীন উমর / আমার জীবন (তৃতীয় খন্ড) ॥ [জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ - জুন, ২০০৯ । পৃ: ১৪১-১৪২]
০৯.
“... Zaman (Quazi Nooruzzaman) talks about the famous 7 March speech of Sheikh Mujibur Rahman, an event where he was present, and heard the Father of the Nation ending his speech with “Pakistan Zindabad”, and, moments later, on the advice of the student leaders, “Joy Bangla”. Zaman takes no issue with the end salutations, reasoning that Pakistan was still politically undivided, but takes a dim view that the words “Pakistan Zindabad” have been expunged from the rendering of the speech with the observation that, “I believe this tampering with the speech diminishes Sheikh Mujib's political efforts.” And, over a particularly contentious issue that continues to deeply divide the nation against itself, Zaman is convinced, offering a number of arguments in support, that Ziaur Rahman first announced the independence of Bangladesh over the radio. He then reasons, “Let's say it was Ziaur Rahman who was the first announcer of independence. What does it matter? Does this announcement belittle the Awami League or Sheikh Mujibur Rahman? Not in the least.”
— Shahid Alam / A freedom fighter's testament ( Review of “A Sector Commander Remembers Bangladesh Liberation War 1971” by Quazi Nooruzzaman)॥ [ The Daily Star - Saturday, November 27, 2010 ]
১০.
“... সময়টি ছিল জটিল। আমরা সবাই এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু আজ যখন দীর্ঘকাল পরে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে চিন্তা করি, তখন একটি কথার সদুত্তর পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য সেটাই ছিল প্রকৃষ্ট সময়। পশ্চিমারা তাদের মরণযুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি তখনও সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি। এ প্রান্তে সৈন্যসামন্তও অপ্রতুল এবং বাঙালিই বেশি। সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা এলে বাংলাদেশের মানুষকে হয়ত এত বড় মূল্য দিতে হত না।
’৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে বক্তৃতা দিলেন তা যেমনি ছিল ঐতিহাসিক, তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বললেন বটে, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম — এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...” কিন্তু ঘোষণা দিলেন না আনুষ্ঠানিকভাবে । শেষ করলেন, “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলে॥”
— শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন / বলেছি বলছি বলব ॥ [অনন্যা - মে, ২০১৫ । পৃ: ৩৭]
Subscribe to:
Comments (Atom)




