Wednesday, 16 September 2026

ভারতপন্থী নাকি পাকিস্তানপন্থী? এই বাইনারীর আবর্তে পুরো দেশ।

আপনি ভারতপন্থী নাকি পাকিস্তানপন্থী? এই বাইনারীর আবর্তে পুরো দেশ। মানে ভারতপন্থী চোখে দেখা যায়, শোনা যায়, পড়া যায়। কিন্তু ভারতপন্থী আছে বলে একটা প্রান্তিক অবস্থান কি আপনার নিতেই হবে পাকিস্তানপন্থী বলে? এটা অনেকটা এমন যে ছেলেবেলায় পাড়ার মাস্তান বাচ্চাদের মাইর খেয়ে আসতাম। কেঁদে কেঁদে মার কাছে আসলে মা বলতো, "ভাল হইছে। সাধু হইলে তোরে মারছে কেন?" মেরুকরণ। জোড়া। পাকিস্তানপন্থী কি ভাই? পাকিস্তান কি আপনার নদীতে বাঁধ দিয়েছে? পাকিস্তান কি আদানীর মতে আপনার বিদ্যুতের সুইচ নিয়ে বসে আছে? পাকিস্তান কি আপনার সীমান্তে মানুষ হত্যা করে? পাকিস্তানে কি বাংলাদেশী বলে ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে মবের মত মব হয়? পাকিস্তানে কি গরু বা শুকর খাওয়ার অপরাধে মানুষ হত্যা হয়? পাকিস্তানে কি আপনার ধর্ম ও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করবে? পাকিস্তানের সাথে কি আপনার বানিজ্য ঘাটতি ভারতের মত? ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলতে গেলে পাকিস্তানপন্থী ম্যাৎকার কেন করেন? হাসিনা ভারত পালাইছে। সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীসহ হুট করে ঢুকে যাওয়ার হুমকী দিচ্ছে। পনর বছর হাসিনার অত্যাচারে কোন বিএনপি জামাতের নেতা কি পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে? পাকিস্তান কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে হুমকী দিছে? নির্বাচনের সময় বিনা সিক্রির মতো কেউ এসে কি রাজনৈতিক নাক গলিয়েছে? ভারত ডেভিল আছে বলেই প্যারালাল একটা ডেভিল সৃষ্টি করতে হবে কেন? আধিপত্যবাদের নিন্দা করতে আপনার এত অজুহাত কেন ভাই? মুঘল, বৃটিশ যেমন গন কেইস, তেমনি পাকিস্তানও গন কেইস। ভারত এক্সিস্টিং কেইস। এক্সিস্টিং কেইস বুঝলে দেশের সার্বভৌমত্ব বুঝতে পারবেন। নচেৎ নয়।

জিন্নাহকে “বাংলাদেশের শত্রু” বলা একপ্রকার কালানুক্রমিক ভুল।

জিন্নাহকে “বাংলাদেশের শত্রু” বলা একপ্রকার কালানুক্রমিক ভুল। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব তখন কেবল অস্তিত্বহীনই নয়—সেই নামে কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পও তার জীবদ্দশায় গঠিত হয়নি। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে মাত্র ১৩ মাস বেঁচেছিলেন। পূর্ববঙ্গ তখন পাকিস্তানের পূর্ব অংশ; জনসংখ্যায় তা পশ্চিম অংশের চেয়ে বড়। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ, অপারেশন সার্চলাইট, বা এমনকি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তপাত—এসব তার মৃত্যুর পরের ঘটনা। পূর্ববঙ্গের মুসলমান রাজনীতি পাকিস্তান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ ছিল। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক। ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ তীব্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক স্রোত পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের অংশে পরিণত করে, তার ভিত্তি বাঙালি মুসলমান নেতৃত্ব ও ভোটারদের সমর্থনেই গড়া। জিন্নাহ সেই স্রোতের সর্বভারতীয় মুখপাত্র ছিলেন, স্থানীয় উদ্যোক্তা নন। আরও একটি তথ্য প্রকাশ্য আলোচনায় আসে না। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল-মেতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু যুক্ত ও সার্বভৌম বঙ্গের প্রস্তাব তোলেন। জিন্নাহ সেই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিলেন। মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, কলকাতা ছাড়া বঙ্গের অর্থ কী—তারা একত্র ও স্বাধীন থাকলেই ভালো; পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। প্রস্তাবটি কংগ্রেস হাইকমান্ড ও হিন্দু মহাসভার বিরোধিতায় ভেঙে যায়, এবং বঙ্গ বিভক্ত হয়। অর্থাৎ জিন্নাহ “বাঙালি রাষ্ট্র” ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন না; তিনি একসময় তাকে পাকিস্তানের বাইরেও কল্পনা করতে পেরেছিলেন।  যে মানুষ বাংলাদেশ দেখেননি, তাকে বাংলাদেশের বিপক্ষে দাঁড় করানো তাই ইতিহাসের পূর্বাপর বিচার নয়—পরবর্তী রাজনীতির প্রয়োজনে তৈরি করা দায়িত্বারোপ। জিন্নাহর বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্র হচ্ছে ওনার ১৯৪৮ সালের মার্চের ঢাকা সফরের এক বক্তৃতা। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। যেখানে উনি ইংরেজিতেই বলেছিলেন, “Let me make it very clear to you that the State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan.” ছাত্ররা ওনার বক্তব্যের এই অংশের বিরোধিতা করে। কিন্তু একই ভাষণে তিনি আরও বলেন, প্রদেশের দাপ্তরিক ভাষা কী হবে তা প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই স্থির করবেন; বাংলা ভাষায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন স্পর্শ করা হবে না। সমাবর্তন ভাষণে তিনি আবার বলেন, প্রাদেশিক দাপ্তরিক ব্যবহারের জন্য প্রদেশের মানুষ যে ভাষা চান তাই বেছে নিতে পারেন; তবে প্রদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ভাষা—lingua franca—একটিই হতে পারে, তা উর্দু। একই ভাষণের এই অংশটুকু মানুষ ইচ্ছা করেই রাজনৈতিক কারণে তুলে ধরে না। জিন্নাহ উর্দুকে উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের লালিত ভাষা এবং ইসলামি সংস্কৃতির নিকটবর্তী মাধ্যম হিসেবে দেখছিলেন, ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। একইসঙ্গে ভাষা আন্দোলনকে তিনি প্রাদেশিকতা, পঞ্চম বাহিনী ও ভারতীয় ষড়যন্ত্রের খাতে ফেলেছিলেন। এই ফ্রেমিং ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। জিন্নাহ কিন্তু বাংলা নিষিদ্ধ করেননি; বাংলাকে প্রাদেশিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষাকে কেবল প্রাদেশিক মর্যাদায় রাখা কেন্দ্রীয় অভিজাতদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লক্ষণহিসাবে বাঙালিরা দেখে তার বিরোধিতা করে। বর্তমান পাকিস্তানে উর্দু জাতীয় lingua franca মানে যোগাযোগের ভাষা; পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, সরাইকি, বেলুচি প্রাদেশিক ভাষা। ভারতে হিন্দি ইউনিয়নের দাপ্তরিক ভাষা, ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের সহযোগী দাপ্তরিক ভাষা , এবং রাজ্যগুলোর নিজস্ব ভাষা আছে। একটি যোগাযোগ-ভাষা রেখে প্রাদেশিক ভাষা চালু রাখা বহুভাষী রাষ্ট্রে অস্বাভাবিক নয়। তবু এখানে থেমে গেলে ভুল হবে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালায় পূর্ববঙ্গেরই বাঙালি প্রশাসন—মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন, বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট, বাঙালি পুলিশ। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষা করা হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সামরিক শাসন, ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ১৯৭১-এর সেনা অভিযান—এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পরের রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ। লিয়াকত আলী খান, গোলাম মুহাম্মদ, ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান—এই ধারাকে ১৯৪৮ সালের এক নেতার ঘাড়ে চাপানো ঐতিহাসিক ভাবে ভুল। আমাদের পাঠ্যপুস্তক আর আলোচনা থেকে উধাও করে দেয়া হয়েছে যে ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি মুসলমানরাই পাকিস্তান আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনসহ পূর্ববঙ্গের অনেক নেতাই উর্দুর পক্ষে সক্রিয় ছিলেন; জিন্নাহকে ঢাকায় ডেকেছিলেন তাঁরাই। লাহোর প্রস্তাবের মূল পাঠে ছিল “independent states”—বহুবচন; পরে তা একক পাকিস্তানে সংকুচিত হয়। যুক্তবঙ্গের সম্ভাবনা জিন্নাহ একবার সমর্থনও করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন। ওদিকে আমাদের তথা বাংলাদেশিদের জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা-আখ্যানে ভাষা আন্দোলনকে দেখানো হয় বাঙালিদের প্রথম প্রতিরোধ হিসাবে; এরপর আসে ছয় দফা স্বায়ত্তশাসনের সনদ, ৭ই মার্চ ঘোষণা এবং ১৯৭১ যা বাঙালিদের স্বাধিকারের চূড়ান্ত রূপ। এই শৃঙ্খলার “আদি পাপ” হিসেবে এখনও তার জিন্নাহর উর্দু-ঘোষণাকে গণ্য করে। বাংলাদেশের জন্ম পাকিস্তানি রাষ্ট্রের দীর্ঘ ব্যর্থতার ফল— এবং পরিশেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতার পুরো দায় ১৯৪৮ সালের এক অসুস্থ, তাড়াহুড়োয় থাকা প্রতিষ্ঠাতার ঘাড়ে চাপানো প্রকৃত ইতিহাসকে দরিদ্র করে তোলে। জিন্নাহকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা রাজনৈতিক পছন্দ হতে পারে। কিন্তু তাঁকে “বাংলাদেশের বিপক্ষে” দাঁড় করানো তথ্যগতভাবে অসম্ভব। যা সম্ভব, তা হলো তাঁর সিদ্ধান্তের পরিণতি বিচার করা—কোনো পক্ষের ন্যারেটিভের খাতিরে নয, বরং ইতিহাসের খাতিরে। যদিও পাকিস্তান আমলেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে, বাংলা এবং উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করা হয়। ২০২৬ সালে যে জাতীয়তাবাদ কেবল শত্রু চিহ্নিত করে আনন্দ পায়, সেই জাতীয়তাবাদ ইতিহাস চর্চা করে না; সেখানে তাদের অজ্ঞতাই মূল কারণ। Photo: Quaid-i-Azam with Sir Fredrik, the governor of East Bengal, Miss Fatima Jinnah, and Dr Hasan, vice chancellor of Dacca University. The picture was taken in front of Curzon Hall in Dacca in 1948.

Thursday, 3 September 2026

নিউজপ্রিন্ট, হোয়াইটপ্রিন্ট এবং নব্বই দশক

নিউজপ্রিন্ট কাগজ ছিল ৫ টাকা দিস্তা। বাড়ির পাশের দোকান থেকে কাগজ না কিনে অনেকদূর হেঁটে জকিগঞ্জ বাজারের পাইকারী দোকান থেকে ৪ টাকায় কিনতে যেতাম। কর্ণফুলী হোয়াইটপ্রিন্ট কাগজ ছিল ৭/৮ টাকা দিস্তা। বাসায় নিউজপ্রিন্টে লেখা, স্কুলে হোয়াইটপ্রিন্ট। খাকি ঠোংগা, সিমেন্টের কাগজের বস্তা, শক্ত যে কোন কাগজ, ক্যালেন্ডারের পাতা কভার দিয়ে রঙ্গিন সূতায় বাঁধাই করতাম নিউজপ্রিন্ট খাতাগুলো। দোকান থেকে বাঁধাই করা খাতা কেনাটা নব্বই দশকের মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিলাসিতা ছিল। কালে ভদ্রে কিনে দিতো মা-বাবারা। অল্প ক'টা খাতার কথা মনে আছে, তাতে ম্যাকগাইভার, মেরাডোনা, সিন্দবাদ, টিপু সুলতানের ফটো ছাপা ছিল। ক'দিন পর দিস্তা কাগজের জন্য টাকা চাইতে গেলেই, শুনতে হতো- এইতো সেইদিন না কিনে দিলাম! গ্লাসের পানি ফেলে কতবার নিউজপ্রিন্ট খাতা ফুলিয়ে ঢোল করে ফেলেছিলাম! খুব অনুশোচনায় ভুগতাম! কেন এমন করলাম? এখন নতুন খাতার জন্য টাকা চাইবো কিভাবে? নিজের কাছেই প্রচন্ড লজ্জা লাগতো! ভেজা খাতা তারে ঝুলিয়ে চুলার উপর শুকিয়েও ব্যবহার করতে হতো। ক'দিন পরপর খাতা, কলম, পেন্সিলের টাকা আব্বার কাছে চাইতে গেলে মুখটা মলিন হয়ে যেতো! তখনকার পিতাদের উপার্জনের অংকটা এসময়ের সন্তানদের রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের নিয়ে উড়িয়ে দেয়া ভোজন বিলাসিতার সমান। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডের পেছনে দামী গিফট ক্রয়ের সমতূল্য। খাতা, কলম, পেনসিল, শার্পনার, রবার, স্কেল হারিয়ে গেলে আম্মা-আব্বা বকাঝকা, বেতের মাইর দিতেন, খুব রাগ করতেন। সৎ উপার্জনের স্বল্প আয়ে পুরো সংসার চালাতে হতো তাদের। যার ফলে হরহামেশাই টানাপোড়েন লেগে থাকতো! এখনকার কোটিপতি মধ্যবিত্ত তখন কল্পনাই করা যেতো না। আরও ছোটবেলায় চলে যাই। কাটায় কাটায় নব্বই কি একানব্বই। তখন নিউজপ্রিন্ট ছিল ৩ টাকা দিস্তা আর হোয়াইটপ্রিন্ট ৫ টাকা দিস্তা। বাংলা এবং ইংরেজী লেখা সোজা করে লেখার জন্য রঙ্গিন রুলটানা খাতা পাওয়া ছিল চাঁদ হাতে পাবার মত দু:সাধ্য ব্যাপার! আব্বা রাতে টিউশনি থেকে ফিরে স্কেল দিয়ে রুলটানা খাতা বানাতো। ৯৪/৯৫ সালের দিকে নিউজপ্রিন্ট এলো হোয়াইটপ্রিন্টের মত দেখতে, লিখতেও ছিল বেশ মসৃণ। এক দুই টাকার পার্থ্যক্যের জন্য দোকানে হাত দিয়ে দেখতাম শুধু। বেশ ক'বছর পরে কিনতে পেরেছিলাম। দোকান ঘুরে ঘুরে কমমূল্যের নিউজপ্রিন্ট দিস্তার ১টাকা বাচিয়ে এনে আম্মার হাতে তুলে দিতাম। মনে হতো যেন উপার্জনের টাকা হাতে তুলে দিচ্ছি! বেশ খুশি হতেন। আব্বা আম্মারা বই খাতা বাঁধাই করা নিজের হাতে শিখিয়ে দিতেন। ক্যালেন্ডারের পাতা কভার হিসেবে ব্যবহার করতেন । লাল সাদা মোটা সূতায় খাতাগুলো আড়াআড়ি বা উপরনিচে সেলাই বাঁধাই হতো। নিজের সেলাই করা খাতা, বইয়ের মলাট জ্যামিতি বক্সের সাথে পাওয়া প্লাস্টিকের ছাঁচের অক্ষর দিয়ে নাম, ক্লাস আর রোল লিখতাম। বড় বড় হরফে নিজের নাম, শ্রেনী, বিভাগ, রোল নং এবং নীচে একপাশে সাইনের মতো অটোগ্রাফে নিজেদের সেলিব্রিটি মনে হতো! একটা কলম দিয়ে সারা মাস পার করে দিতাম আর পরীক্ষার সময় দুইটা কলম একটা পেন্সিল একটা কাঠের স্কেল আর বোর্ড ১০ টাকা দামের। অতিরিক্ত কোনো কিছু পাইতাম না। সন্ধার সময় পড়তে বসতে হবে, নামাজ না পড়লে ভাত দিতো না নামাজ পড়ে ভাত রাত ১০/১১ টার মধ্যে ঘুম। টিফিনের জন্য ২ টাকা পাইতাম। ২ টা স্কুল শার্ট দিয়ে পুরা বছর চলে যাইতো। অভাবে ছিলাম না কখনো, তবে সুশাসনে ছিলাম! মনে পড়ে গেল সেই সব দিন গুলোর কথা! আহা কতো সুন্দরই না ছিল আমাদের শৈশব। আমার এখনও মনে পড়ে আমাদের সময় মিমি চকলেট ছিল ১০টাকা করে স্কুলে যাওয়া আসার সময় দোকানে দেখতাম কিন্তু কখনও আব্বুকে বলতে পারিনি লজ্জায় এত দাম দিয়ে মিমি চকলেট খাবো! বাবাদের কষ্ট'কে আমরা খুব ভালভাবে বুঝতে পারতাম। আহারে আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সোনালী দিনগুলো! আজ হঠাৎ করে হারানো শৈশবের কতো কিছু মনে পড়ে গেল! তবুও ভালো ছিলো সেই শৈশবকাল! #মোঃ_বাহার_উদ্দিন ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং ধোপাদিঘীরপাড়, সিলেট।

Thursday, 27 August 2026

মক্কা প্যাক্ট, জিও-পলিটিকস এবং বাংলাদেশ ।

মক্কা প্যাক্টে যোগ দেয়ার জন্য জিও পলিটিক্যাল হিসাব নিকাশ দরকার। এই ব্যাপারে ন্যাশনাল ডায়লড দরকার। সেনাবাহিনীর অবস্থান জানা দরকার, তাদের এইখানে মেজর স্টেক থাকবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী বা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী ডিফেন্স প্যাক্টে যোগ দেয়া হবে এতো সহজ নয় ব্যাপারটা। এছাড়া ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে ডিফেন্স প্যাক্টে যোগ দিলে, পানি চুক্তি, বর্ডার কিলিং, করিডোর, ট্রেড, জ্বালানী - বিদ্যুৎ এর চুক্তির উপর ইমপ্লিকেশন কি হবে সেগুলোর ব্যাপারে ডিপ রিসার্চ আর এ্যানালিস দরকার। এটা শুধু আজকের জন্য নয় ২০ বছর পর - ৩০ বছর পর কি হবে সেই ব্যাপারে গেম থিওরী মডেল বানানো দরকার। এইখানে দেখার মতো ব্যাপার হচ্ছে মূল ইস্যুটা হচ্ছে একটা মুসলিম কোয়ালিশন তৈরি করা। ভারত যেমন সবচে বড়ো হিন্দু রাষ্ট্র আর পৃথিবীর ৯০% হিন্দু ভারতে থাকে তাদের পক্ষে হিন্দুদের অধিকার আদায় করা সহজ। মুসলিমদের রাষ্ট্রের সংখ্যা ৫০+। এবং এই রাষ্ট্র গুলো আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৮০ কোটি মুসলিম এক রাষ্ট্রে থাকলে মুসলিমদের উপর অত্যাচার - অনাচার কমে যেতো। এইখানে দেখার ব্যাপার হচ্ছে -> ইসলামিক ন্যাটো যে বলা হচ্ছে সেখানার সদস্য গুলো মুসলিমদের রক্ষার ব্যাপারে ভুমিকা কি? প্যালেস্টাইনে মুসলিম নিধনের ব্যাপারে সৌদি আরবের কোন কার্যকর ভুমিকা নাই, পাকিস্তানের নাই, তুরস্কের নাই। কাশ্মীরে মুসলিম উপর অত্যাচারের ব্যাপারে সৌদি আরবের কোন ভুমিকা নাই, তারা বরং ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। প্যালেস্টাইনে ইসরায়েল আর আমেরিকা যৌথ ভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে। সৌদি আরব, আমেরিকার সবচে কাছে এ্যালাই গুলোর একটা। সুতরাং মুসলিম দেশ হলেই এরা যে মুসলমানদের ব্যাপারে আগ্রহী এটা ভুল চিন্তা। এদের সেই মানসিকতা, শক্তি, সদিচ্ছা কোনটাই কখনো নাই, ছিলো না। সুতরাং মক্কা প্যাক্ট হলেই মুসলিমদের সুবিধা হবে এটা ভাবা ভুল। বরং জিও পলিটিক্সের এঙ্গেল থেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনা করা উচিত। ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হবে সবচে বড়ো ভুল। স্বার্থ বিবেচনা করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আরো দেখার ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তান নিজেই বাংলাদেশের উপর একটা গণহত্যা চালিয়েছে। এদের বাংলাদেশের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা চেঞ্জ হয়েছে এটা আশা করা উচিত হবে না। হ্যা, ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে হয়তো পাকিস্তান হেল্প করবে। সেটা কতোটুকু সেটা এক্সপার্টরাই এস্টিমেট করতে পারবে। ___ ডিফেন্স প্যাক্টের সবচে গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার হচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে ডিটারেন্স। ভারত ৩-৪টা ইলেকশনে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। নিজেদের এজেন্ট বসিয়ে ভেসেল স্টেট তৈরি করতে চেয়েছে। যারা এই প্যাক্টের বিরুদ্ধে তাদের এই পয়েন্টের বিরুদ্ধে কোন আলোচনা করতে দেখলাম না। বাংলাদেশের এই প্যাক্টের যোগ দেয়ার সবচে বড়ো কারন ভারতের বিরুদ্ধে শক্তিমত্তা অর্জন। ___ বাংলাদেশ যদি ডিফেন্স প্যাক্টে না থেকে সৈন্য সাপ্লাই দিতে পারে, অস্ত্র, প্রযুক্তি সাপ্লাই দিতে পারে, প্রযুক্তি-অস্ত্র নিতে পারে। সৌদির প্রতিরক্ষায়, তাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচারে শুধু শ্রমিক না পাঠিয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠি সাপ্লাই দিতে পারে সেটা হবে বাংলাদেশের জন্য উইন উইন সিচুয়েশন। ভারতকে যদি ডিটারেন্সের জন্য ভয়ে রাখা যায় সেটাও আরেক উইন উইন সিচুয়েশন হবে জয়েন না করেই। অনেকে র‍্যান্ডমলি জিজ্ঞেস করছেন ফেসবুক এক্টিভিস্ট/নেটিজেনদের কাছে। যেন তাদের পজিটিভ অপিনিয়ন দিলে মক্কা প্যাক্টে ঢুকে যাওয়া নিশ্চিত। তারপরো আলোচনা হচ্ছে এটা ভালো একটা দিক। এই ব্যাপারে জিও পলিটিক্স এক্সপার্ট না, কিন্তু এ আই রচিত অনেক গুলো আর্টিকেল পড়লাম। সেখানে প্রোস এন্ড কনস দেয়া। এক্সপার্টদের অপিনিয়ন এইখানে মিসিং। মক্কা প্যাক্টের ব্যাপারে অনেককেই বলতে শুনলাম, বাংলাদেশ ৫০ বছর স্বাধীন থেকে, সার্বভৌম ভাবে পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করেছে। গেলো ১৭ বছর তো ভারতের পররাষ্ট্রনীতিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিলো। বাংলাদেশ কি আজকে আমেরিকার বিরুদ্ধে কোন পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করতে পারবে? সেই অর্থে আমার বড়ো ডাউট আছে এই মন্তব্যের ব্যাপারে যে বাংলাদেশের কখনোই কারো অধিনে যাবে না। ভুল। বাংলাদেশে আগেও অধীনে ছিলো, যতোদিন অর্থনৈতিক যোগ্যতা অর্জন না করতে পারে বাংলাদেশে বড়ো বড়ো দেশ গুলোরই অধীনে আছে আর থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন নয়, আমরা স্বাধীনতার অভিনয় করতে পারি মাত্র। বাংলাদেশীদের এতে দুঃখ পাবার কিছু নাই, তথাকথিত শক্তিশালী রাষ্ট্র পাকিস্তান সম্পূর্ন ভাবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রনে, বিশেষ করে তাদের সেনাবাহিনী। সৌদী আরবের পেট্রোডলার বেসিক্যালি আমেরিকার মানি প্রিন্টিং মেশিন। সৌদী আরবের মতো রাষ্ট্রও আমেরিকার অধীনে। ইভেন মক্কা প্যাক্ট আসলে ব্যাকড বাই আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই এই প্যাক্টকে স্বাগত জানিয়েছে, প্রশংসা করেছে। আমেরিকা যদি কোন রাষ্ট্রকে এ্যাটাক করে মক্কা প্যাক্টের রাষ্ট্র গুলো কি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? কখনোই না। তাহলে এটা কিসের বিরুদ্ধে কার বিরুদ্ধে ডিফেন্স প্যাক্ট? ইসরায়েল যদি টার্কি আক্রমন করে তাহলে আমেরিকা কি এই প্যাক্টের সদস্যের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গিয়ে সাপোর্ট দিবে? প্রশ্ন আসে খুব সহজেই। ____________ আমি জিও পলেটীক্স বা ডিফেন্স এক্সপার্ট নই। আমার মতামতও গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত হবে না। আমি শুধু কিছু পয়েন্ট টুকে রাখলাম।

Friday, 21 August 2026

বিএনপি কখনোই চিন্তা করেনি জুলাইয়ের মতো একটা বিপ্লব হবে।

বিএনপি আসলে কখনোই চিন্তা করেনি যে দেশে জুলাইয়ের মতো একটা বিপ্লব হবে। তারা নিজেরা এইটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কারণ বিগত বছরগুলোতে তারা আন্দোলন দিয়েও রাস্তায় লোক পেতো না, তাই ফখরুল ঈদের পরের আন্দোলনের কথা বলে বলেই বছরের পর বছর পার করেছে। তাদের আসলে সামনে কখনো দেশ চালানো লাগবে এইটা তারা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি। তাই সেরকম কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। সেই ২০০০ সালের অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীর বাইরে আর কাউকে প্রডিউস করতে পারেনি তারা। শুরুর দিকে বিএনপিও চেয়েছিলো ইন্টেরিমকে একটু টাইম দিয়ে নিজেরা গুছিয়ে নিতে। কিন্তু, ওরা যখন দেখলো যে ইউনূস সব গুছিয়ে নিচ্ছে, রিজার্ভ দ্বিগুণ করে ফেলেছে, ভেঙে পড়া অর্থনীতি সামাল দিতে ২-৩ বিলিয়ন বাজেট সহায়তাও এনেছিলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে স্টেবল রাখতে পেরেছিলেন ফাওজুল কবির খান। এসব দেখে বিএনপি নিজেদের অযোগ্যতা ভুলে গিয়ে মরিয়া হয়ে উঠলো ক্ষমতার জন্য। নিজেরাই বিভিন্ন আন্দোলন উসকে দিয়ে ইন্টেরিমকে যথাসাধ্য অসহযোগিতা করলো। ভেবেছিলো ইউনূস পারলে আমরাও পারবো। ইউনূসের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বানালো। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বেসামাল অবস্থা। চীন সফর করেও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফও বাজেট সাপোর্ট দিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তাই ইউনূসকে প্রেসিডেন্ট বানানোর জন্য দৌড়-ঝাপ শুরু করলো। কিন্তু ইউনূস তো ওদের চিনে ফেলেছে, তাকে তাই কোনোভাবেই কনভেন্স করা যায়নি। বিএনপি মাঠ গরম করে ২০২৬ এ নির্বাচন আদায় করাটা নিজেদের সেরা অর্জন ভেবেছিলো, কিন্তু এইটাই এখন ওদের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হইলো। দেশের চলমান সংকট ওরা দ্রুত কাটিয়ে উঠবে তারও কোনো সম্ভাবনা নাই, অলরেডি তাদের মন্ত্রী, উপদেষ্টারা বলতেছে এই সংকট অন্তত ২ বছর চলমান থাকবে। স্বঘোষিত প্রতারক বিএনপির ভবিষ্যৎ খুবই করুণ।

Monday, 17 August 2026

লো আইকিউর লোকেরাই মূলত আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিব শেখ মুজিব করে।

লো আইকিউর লোকেরাই মূলত আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিব শেখ মুজিব করে। আমি একবার এক ছেলেকে ভিক্ষা দিয়েছিলাম। ঘটনাটা ঘটেছিল নীলক্ষেতে। পহেলা বৈশাখে। আমরা বৈশাখী র‍্যালি শেষ করে মল চত্বরে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে মিরপুর ফিরছিলাম। ছেলেটার বাম হাতে ছিল দগদগে ক্ষত। দেখে যে কারো মায়া হবে। ইচ্ছে হবে এক্ষুণি হাসপাতাল নিয়ে চিকিৎসা করাই। কিন্তু ছেলেটা যাবে না। বলল, কয়টা টাকা দেন দুই দিন ধইরা কিচ্ছু খাই নাই। বাসায় যাবার তাড়া থাকায় আর কথা না বাড়িয়ে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিয়ে চলে আসতে চাইলাম। কয়েক পা এগুতেই আমাকে এক ছেলে থামালো। বলল, আপনাকে দেখে তো সচেতন লোক মনে হয়। এইটা কি করলেন আপনি? বললাম, কি করেছি? বলল, এই ছেলেকে টাকা দিয়ে আপনি আরও কয়েক শ ছেলেকে ভিক্ষুক বানানোয় উৎসাহ দিয়েছেন। আসলেই সেদিন ব্যস্ত ছিলাম। ওই ছেলের কথা শোনার মত সময় ছিল না। ওকে বলেছিলাম, তাইলে তুমি ওর কাছ থেকে টাকা কাইড়া নেও। তোমার সাথে গ্যাজানোর মত সময় আমার নাই। সেদিন চলে আসলেও কথাটা মনে দাগ কেটেছিল। পরে জেনেছি, ঢাকা শহরে ইন্ডিভিজুয়াল ভিক্ষুকের সংখ্যা একেবারে নগন্য। অধিকাংশ ভিক্ষুকই কোন না কোন ভিক্ষুক ব্যবসায়ীর প্রতিনিধি। ভিক্ষুক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে নিজ নিজ কেনা ভিক্ষুককে দিয়ে সেখানে ভিক্ষা করায়। ওই এলাকায় অন্য কোনও ব্যবসায়ীর ভিক্ষুক বা স্বাধীন কোনও ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে চাইলে তারা বাধা দেয়। এজন্য এমনকি মারামারি পর্যন্ত করে। ভিক্ষুক ব্যবসায়ীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে জেনেছে, মানুষের আবেগে হিট করতে না পারলে ভিক্ষা পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের ভিক্ষা ইন্ডাস্ট্রির মূল শক্তিই হল ইামোশনাল ম্যানেজমেন্ট বা আবেগ ব্যবস্থাপনা। কোনও ভিক্ষুক যদি মানুষের মনে দাগ কাটতে না পারে তাহলে সে ভিক্ষা পায় না। যেই ভিক্ষুক মানুষের মনে যত দাগ কাটতে পারে তার ভিক্ষা পাবার হার তত বেশি। ভিক্ষুক ব্যবসায়ীদের কাছেও তার দাম তত বেশি। ভিক্ষুক ব্যবসায়ীরা যখন নিজেদের মধ্যে ভিক্ষুক কেনা বেচা করে তখন এই ধরণের ভিক্ষুকের দাম অন্যদের তুলনায় বেশি নির্ধারণ করে। সাধারণ একজন হাত-পা ওয়ালা সুস্থ পুরুষ ভিক্ষুককে মানুষ ভিক্ষা দিতে চায় না। ফলে তাদের দাম থাকে সবচেয়ে কম। তবে কারো যদি হাত বা পায়ে দগদগে ক্ষত থাকে তাইলে সেটা দেখায়া ভিক্ষা পাবার হার বাইড়া যায়। ফলে ভিক্ষুক ব্যবসায়ীদের নিকট তার দামও বাইড়া যায়। ভিক্ষুক যদি নারী হয় তার ভিক্ষা পাবার হার পুরুষের চেয়ে বেশি থাকে। তার হাত পায়ে ঘা থাকলে তার ভিক্ষা পাবার সম্ভাবনা আরও বেশি থাকে। যদি নারীর কোলে বাচ্চা থাকে তাহলে তার ভিক্ষা পাবার সম্ভাবনা আরেকটু বেশি হয়। যদি সে প্রেগন্যান্ট হয় তাহলে তার ভিক্ষা পাবার সম্ভাবনা আরও বেশি থাকে। এই ভিক্ষুকদের দামও সেভাবে নির্ধারিত হয়। ভিক্ষুক যদি হয় শিশু তাইলে তার ভিক্ষা পাবার হার প্রাপ্ত বয়স্কদের থেকে বেশি থাকে। আর যদি সেই শিশুর শরীরে থাকে দগদগে ক্ষত তাইলে তার ভিক্ষা পাবার হার আরও বেড়ে যায়। তার যদি একটা হাত বা পা কাটা থাকে কিংবা চোখ অন্ধ থাকে তাইলে তার ভিক্ষা পাবার হার আরও বেড়ে যায়। আর ভিক্ষুক ব্যবসায়ীরা যখন দেখে, ভিক্ষা ইন্ডাস্ট্রিতে এই রকম শিশুর চাহিদা বেশি তখন তারা একের পর এক শিশুদের ধরে এভাবে অঙ্গহানি ঘটিয়ে ভিক্ষা করতে বাধ্য করে। আপনাদের মনে থাকার কথা, বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ পুলিশ এই রকম কিছু শিশুকে উদ্ধার করেছিল। তাইলে ব্যাপারটা কি ঘটছে খেয়াল করেন, আপনি আপনার আবেগের জায়গা থেকে একটা অঙ্গহীন শিশুকে ভিক্ষা দিলেন। তার ফলে ভিক্ষা ব্যবসায়ীরা উৎসাহী হয়ে আরও একশটা ছেলের অঙ্গহানি ঘটিয়ে ভিক্ষা করতে নামায়া দিল। এখন বলেন, এই যে নতুন নতুন শিশুর অঙ্গহানি ঘটিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা হল, এই জন্য আপনি কি একটুও দায়ী নন? অথচ আপনি নিজেকে একজন মানবিক মানুষ মনে করেন আর যেই লোকটি ভিক্ষা ইন্ডাস্ট্রির এই নোংরামি জানে বলে আপনাকে ভিক্ষা দিতে নিষেধ করে তাকে মনে করেন নিষ্ঠুর মানুষ। এর সাথে আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ মুজিবের সম্পর্ক কি- তাই ভাবছেন? বাংলাদেশে চেতনা ব্যবসা তথা আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবের ইমেজও এই ইমোশনাল ম্যানেজমেন্ট বা আবেগ ব্যবস্থাপনার উপর খাড়ায়া আছে। আপনি যখন পনের আগস্টের হত্যার জাস্টিফিকেশন দেয়ার জন্য বলবেন, এই লোকটার কারণে দুর্ভিক্ষে এত লাখ লোক মারা গেছে। এই লোকটা এত হাজার বিরোধী দলীয় মানুষ হত্যা করেছে। এত হাজার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করেছে। তখন একদল আইসা বলবে, মানলাম শেখ মুজিব অপরাধ করেছে। কিন্তু শিশু রাসেল কি অপরাধ করেছে? অথবা বাড়ির নারীরা কি অপরাধ করেছে? কিংবা গর্ভবতী নারী কি অপরাধ করেছে? এই কথা বইলা তারা শুধু শিশু রাসেল বা বাড়ির মেয়েদের হত্যাকে অপরাধ বলে না। মুজিবকে হত্যাও অপরাধ বলে। আজ পর্যন্ত একজন চেতনা ব্যবসায়ীকেও পাই নাই যে বলেছে, মুজিবকে হত্যা করা ঠিক ছিল। সেই জন্য আমি পঁচাত্তরের বিপ্লবীদের সাধুবাদ জানাই। তবে বাড়ির মেয়ে এবং শিশুদের হত্যা করার কারণে আমি তাদের ঘৃণা করি। তারা যুক্তি দেয়, শিশু রাসেল অপরাধ করেনি অতএব তাকে হত্যা করা ঠিক হয়নি। কিন্তু উপসংহার টানে, অতএব বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করাও ঠিক হয়নি। এখন এইখানে কি ঘটছে খেয়াল করেন। শিশু রাসেলের কথা ভেবে আপনি আবেগে পঁচাত্তর বিপ্লবীদের খুনী ভাবছেন। নারীদের হত্যা করছে বইলা আপনার মুক্তিদূতদের খুনী ভাবছেন। গর্ভবতী নারী হত্যা করছে বইলা বীরদের ভিলেন ভাবছেন। আর এই আবেগের তলে হারায়া যায়, মুজিবের দুর্নীতির খতিয়ান। হারায়া যায় তার অবাধ লুটপাটের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু। হারায়া যায়, হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা হত্যার ঘটনা, হাজার হাজার বিরোধী দলীয় কর্মী হত্যার ঘটনা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ভোট ডাকাতির ঘটনা, সংবাদ পত্রের কন্ঠরোধ করার ঘটনা, গণতন্ত্র হত্যা কইরা দেশের প্রথম ফ্যাসিস্ট শাসক হইয়া ওঠার ঘটনা। আপনি বুঝতে পারেন না, শিশু রাসেল মূলত সেই ভিক্ষুক ছেলেটি যাকে দেখে আপনি আবেগের কারণে তারে ভিক্ষা দিচ্ছেন। আর সেই ভিক্ষা দেবার কারণে রাসেলের বাবার হাতে তৈরি দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার শিশু নিহতের কথা চাপা পড়ে যায়। আপনি বুঝতে পারেন না পনের আগস্ট রাতে নিহত নারীরা হল সেই ভিক্ষুক নারী যাদেরকে ভিক্ষা দেবার কারণে দুর্ভিক্ষে নিহত লাখ লাখ মা-বোনের কথা চাপা পড়ে যায়। ফলে আপনি নিজেকে খুব মানবিক ভাবেন। আর যারা শিশু রাসেলের আবেগ ব্যবহার করে আওয়ামীলীগের দানব হইয়া ওঠার কাহিনী বোঝে বইলা আপনাদেরকে এই আবেগে ভেসে যেতে নিষেধ করে তারা হইয়া যায় অমানবিক নিষ্ঠুর। তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো? বিষয়টা দাঁড়ালো, চেতনা ব্যবসায়ী এবং ভিক্ষুক ব্যবসায়ীরা মূলত একই মডেলে মানুষের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করে। আর লো আই কিউর লোকেরা একই মডেলে ভিক্ষুক ব্যবসায়ী এবং চেতনা ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হয়। তবে এই দুই প্রতারণার মধ্যে পার্থক্য হল, ভিক্ষার ক্ষেত্রে আপনি একাই প্রতারিত হন। কিন্তু চেতনা ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতারণার ফলে আপনার দেশে শাপলা গণহ*-ত্যা নাইমা আসে, পিলখানা ম্যা*সা*কার নাইমা আসে, শেয়ার বাজার-ব্যাংক লুটপাট হয়, হাজার হাজার মানুষ গু*ম-খু*নের শিকার হয়, ধ*র্ষণের শিকার হয়। সবশেষে আপনার চোখের সামনে আপনার সন্তানকে হ*ত্যা করা হয় এবং দেশে জুলাই নেমে আসে। সুতরাং হে প্রিয় লো আইকিউর পাবলিকবৃন্দ! চেতনা ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ার আগে সাবধান। খুব সাবধান। দিস ইজ ভেরি ডেঞ্জারাস। ভেরি রিস্কি গেম। জুলাইয়ে আপনার সন্তান জীবন দিসে। আবারও চেতনা ব্যবসার ফাঁদে পড়লে এইবারের জীবনটা আপনাকেই দিতে হবে।

মুজিব হইল ভারতের বিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট।

দুর্নীতি কইরা খাদ্য সংকট সৃষ্টি কইরা লাখ লাখ লোক মারার পরও বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুই রইয়া যায়। কেউ তারে বঙ্গখুনী বলে না। না রাজনীতিবিদরা বলে। না সাহিত্যিকরা বলে। কেন বলে না জানেন? কারণ এই খু*নী লোকটারে নায়ক বানায়া হাজার হাজার সাহিত্য রচিত হইছে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস রচিত হইছে। সিনেমা, নাটক, ডকুমেন্টারি হইছে। কিন্তু সে যাদের হ*ত্যা করেছে, তার দুর্নীতির বলি হয়ে যারা না খেয়ে মারা গেছে সেই শিশু, নারী, পুরুষদের নিয়ে কেউ দুই কলম লিখেনি। তারা বিস্মৃতির গর্ভে হারায়া গেছে। আমরা শুধু দুর্ভিক্ষপিরীত এক বাসন্তির নাম জানি। এক বাসন্তিই মুজিবশাহীর ভিত কাঁপায়া দিছিল। সেই বাসন্তির ছবি যে তুলছিল তারে গত আওয়ামী জামানায়া নৃশংসভাবে খু*ন করা হয়। কেন করা হয় জানেন? কারণ মুজিব হইল পার্শ্ববর্তী দেশের বিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট। এই লোক যতদিন স্বমহিমায় থাকবে ততদিন পার্শ্ববর্তী দেশের প্রভুত্ব থাকবে। সুতরাং মুজিবের মহিমায় যারাই কালিমা লেপন করবে তাদেরকে তারা সহ্য করবে না, নৃশংস ভাবে নিকেশ করবে। আপনি তার হাতে খু*ন হওয়া এক ডেপুটি স্পিকার আর এক সিরাজ শিকদারের বাইরে আর কারো নাম জানেন না। তার ভিকটিম কাউরে নিয়া সাহিত্য রচিত হয় না। সিনেমা নাটক ডকুমেন্টারি তো আরও দূরের ব্যাপার। আপনি গালি দিয়া সাহিত্যের মোকাবেলা করতে পারবেন না। মুর্তি ভাইঙ্গা প্রতিষ্ঠিত ইমেজ ইরেজ করতে পারবেন না। তার মিথ্যা ইমেজ প্রতিষ্ঠায় যেভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সাংস্কৃতিক বয়ান নির্মাণ করা হইছে সেভাবেই তার সত্য ইমেজ স্টাবলিস্ট করার জন্য কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এই কারণেই দেখেন মুজিবের কারণে দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়া লাখ লাখ শিশু, নারী, পুরুষের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হইয়া ওঠে হারামের টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা একটা পরিবার। মুজিব পরিবারের এক রাসেলের শোকই এই লাখ লাখ লোকের মৃত্যুর শোক থিকা বড় হইয়া ওঠে। আপনি দেখেন শহীদ জিয়ার বিরুদ্ধে ওরা কি পরিমাণ সাহিত্য নির্মাণ করছে। ইমতিয়ার শামীম তার বিরুদ্ধে উপন্যাস লেখছে। শাহাদুজ্জামান ক্রাচের কর্নেল লিখছে তারে ভিলেন বানানোর জন্য। তারেক জিয়ার আমলে একুশে পদক পাওয়া নব্য বিএনপি কবি মোহন রায়হান তার বিরুদ্ধে কবিতা লিখছে। কারণ কি? কারণ বাংলাদেশে মুজিবের ইমেজের চেয়ে বড় কোনও ইমেজ ওরা তৈরি হতে দিবে না। বিপরীতে দেখেন লাখ লাখ লোক হ*ত্যা করা মুজিবের বিরুদ্ধে কোনও কবিতা নাই, গল্প নাই, উপন্যাস নাই, সাহিত্য নাই। আছে শুধু সাব অল্টার্ন মানুষের কয়েকটা গালি। সুতরাং বাংলাদেশকে রাইট ট্রাকে ফেরাতে হলে মুজিবের মিথ্যা ইমেজ ভাঙতে হবে। এজন্য সাংস্কৃতিক বয়ান নির্মাণ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রকৃত হিরোদের নিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া আপাতত মুক্তির আর কোনও পথ নাই।