Tuesday, 17 March 2026

শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে

ঠিক ৫২বছর আগে ১৯৭৪ সালের মার্চে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ, চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের দুর্নীতি, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির শ্রেণিশত্রু খতমের কর্মসূচি, জাসদের সরকারবিরোধী আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানামুখী তৎপরতায় টালমাটাল দেশের পরিস্থিতি। ওই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর মিন্টো রোডের বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেয় জাসদ। সেদিন জাসদের আন্দোলনকারী কর্মীরা ঢাকার রমনা এলাকায় অবস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করলে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী। এছাড়া আটক করা হয় জাসদের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে। প্রসংগত, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের পরপরই জাসদ নেতাকর্মীরা শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সেসময়ে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা বিরোধী রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, হত্যা, বিরোধী মতাদর্শীদের গুম করা সহ বহু বেআইনি কাজে যুক্ত থাকার ব্যাপারে অভিযুক্ত ছিলেন। আজ ১৭ই মার্চ। শেখ মুজিবের জন্মদিন। তার শাসনামলের এমন এক ১৭ই মার্চের কাহিনি বলি। ১৯৭৪ সাল। ফেব্রুয়ারী মাসে জাসদ একটা কর্মসূচি ঘোষণা করে। মুজিব সরকারের ২৫ মাসে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ, গণনির্যাতন, খামখেয়ালীপূর্ণ শাসন, অপদার্থতা ও বিদেশী দাসত্বকে উল্লেখ করে তারা বিবৃতি দেয়৷ নানা দাবীদাওয়া দিয়ে সরকারকে ১৫ই মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়। দাবীদাওয়াগুলো মেনে নেওয়ার জন্য। আল্টিমেটাম আরকি। কিন্তু মুজিব সরকার গুণেও না তাদেরকে! ফলে ১৭ মার্চ পল্টনে জাসদের উদ্যোগে জনসভা হয়। জলিল ও রব (বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলণকারী) অত্যন্ত জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সভা শেষ হতে না হতেই বিশাল মিছিল মিন্টো রোডের দিকে রওনা হয়। পুলিশ বাঁধা দিতে পারে এজন্য তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা এগিয়ে যায়। মিছিল গিয়ে থামে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাড়ির সামনে। চারিদিকে স্লোগান চলতে থাকে। জাসদ চাচ্ছে একটা স্মারকলিপি দিবে। কিন্তু মন্ত্রী বাড়িতে নেই। কেরানিগঞ্জে গেছেন জনসভায়। এতে করে নেতাকর্মীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়। দু'একজন অতি উৎসাহী হয়ে গেইটে আগুন দিতে যায়। কিন্তু গেট তো লোহার, আগুন কী আর ধরে! হঠাৎ কয়েক ট্রাক বোঝাই করা পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্য এসে হাজির। কথা নেই, বার্তা নেই, সরাসরি গোলাগুলি শুরু করে! জনতা এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। ইনু কমান্ড দেয়, 'সবাই শুয়ে পড়েন।' অনেকে তাই করে। কিন্তু গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়নি। ফলে একটার পর একটা বডি নিচে পড়তে থাকে। সরকারি প্রেস নোটে বলা হয়, তিনজন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে জলিল, রব, মমতাজ বেগম ও মাঈনউদ্দিন খান বাদল ছিলেন। আহত অবস্থাতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। জাসদ দাবি করে, অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন বর্ণনায় আসে ২২ থেকে ৩৫ জন নিহতের কথা। মাঈনউদ্দিন খান বাদলের বাবা আহমদউল্লাহ খান ছিলেন পুলিশের ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলের ডিএসপি। বাদল পরে তাঁর কাছে শুনেছিলেন, ৪০-৫০টি লাশ রক্ষীবাহিনী ট্রাকে করে নিয়ে গেছে। রেফারেন্সঃ জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ-সালাউদ্দিন আহমেদ।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন শিলংয়ের প্রিয় বড় ভাই মাননীয় মন্ত্রী জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যিনি তাদের শপথ পড়ালেন তিনিই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলে তাকে যারা শপথ পড়ানোর অধিকার দিয়েছে তারাই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছে। একজন আইনলঙ্ঘনকারীর হাতে, বেআইনি ব্যক্তির হাতে জাতীয় সংসদের শপথ বাক্য পাঠ করলে তাহলে বিএনপির সকল সংসদ সদস্যরাও এই আইন লঙ্ঘন করেছেন। সেই হিসেবে জাতীয় সংসদ এই মুহূর্তে অবৈধ এবং বেআইনি। বেআইনি সংসদে দাঁড়িয়ে কেউ মন্ত্রী দাবি করা তার চেয়েও বড় বেআইনি কাজ। এর চেয়েও বড় অপরাধ হচ্ছে—একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ বাদ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করা; যা আরও জঘন্য বেআইনি। সংসদের নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিবেকশূন্য হয় কিংবা বিকারগ্রস্ত হয়, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য এবং নির্বাচনেও অযোগ্য। সে হিসেবে আমার ধারণা, প্রিয় বড় ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব শিলং থেকে ফেরার সময় অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন। তিনি যখন শিলংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মানসিক অসুস্থতার কথা বলে কে বা কারা তাকে আইন মেনে সংবিধান অনুযায়ী সেখানে রেখে এসেছিলেন—এ বিষয়টি তিনি জানেন না বলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশে এসে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠকগুলোতে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, সেগুলো এখন আবার ভুলে যাচ্ছেন এবং অস্বীকার করছেন। যারা তিন মাসের মধ্যে কোনো বিষয় ভুলে যায় এবং অস্বীকার করে, নিশ্চয়ই তারা অক্ষম ও অসুস্থ—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধিহীনও। এই অবস্থায় আমার ধারণা অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব সংসদ সদস্য হওয়ার সকল আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সংবিধান নিয়ে এত বক্তব্য দেওয়া হলেও তার নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনী সমাবেশে গণভোটের পক্ষে রায় চেয়েছিলেন। গণপর্যায়ে যুক্ত হওয়ার ফলে সেই অর্থে তার কথার বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এখন সেটি বাস্তবায়নে বিরম্বনা সৃষ্টি করা এক ধরনের প্রতারণার শামিল। সংবিধান অনুযায়ী কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে তারা সংসদ সদস্য থাকতে পারেন কি না—সে প্রশ্ন রেখে গেলাম। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে শপথ পড়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই সংবিধানের কোথাও কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ পড়ানোর নিয়ম নেই। জুলাই সনদের ভিত্তিতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন—এবং সে অনুযায়ী দুটি শপথ পড়ানো হয়েছে: একটি মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি মাননীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এখানে শপথ যদি অবৈধ হয়, তাহলে দুটি শপথই অবৈধ হবে—না হলে একটিও হবে না। বরং সংবিধান অনুযায়ী দুটি শপথ গ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামি, এমসিপি-সহ যারা এই শপথ নিয়েছেন তারাই সংসদের বৈধ সদস্য; বাকিরা সংবিধান অনুযায়ী অবশ্যই অবৈধ। আপনি এত সংবিধানের কথা বলেন—তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদে ডেকে আনলেন না কেন? আমাদের মহামান্য “চুপ্পু” সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি দেখেননি। যদি তাই হয়, তাহলে তিনিই তো এখনো প্রধানমন্ত্রী। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে, কোন সংবিধানের ভিত্তিতে আপনারা এখন সরকারে বসেছেন? সংবিধান অনুযায়ী যারা এই অবৈধ কাজ করেছে তাদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আপনারা কি নিজেদের বিচার করছেন, নাকি যারা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে তাদের বিচার করছেন? যদি পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর বিচার করে থাকেন, তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করছেন? সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি চুপ্পু সাহেব হন, তাহলে তার হাতে দেওয়া অধ্যাদেশগুলো কীভাবে অবৈধ হয়? জুলাই সনদ, গণভোট, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং আইন-বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ—সবই তো বর্তমান মহামান্যের স্বাক্ষরে হয়েছে। তাহলে তিনি এগুলো কোন সংবিধানের ভিত্তিতে করলেন? বাংলাদেশে একই সঙ্গে দুইটি বৈধ ব্যবস্থা থাকতে পারে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব—আপনি যদি বৈধ হন, তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রেসিডেন্ট এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরা সবাই অবৈধ। আর আপনি যদি অবৈধ হন, তাহলে উপরে উল্লেখিত সবাই বৈধ। কারণ সংবিধান আপনার মনমতো বানানো কোনো বিষয়বস্তু নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের যা কিছু হচ্ছে—সবই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদের ভিত্তিতে হচ্ছে। অতএব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে জনতার রায় এসেছে। জনগণ যে বিষয়গুলোর ভিত্তিতে এই গণভোটে রায় দিয়েছে সেটাই এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংবিধানস্বরূপ। এই আইনকে প্রশ্ন করে কেউ যদি বক্তব্য দেয়, আমি মনে করি তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধ করেছে। একদিন না একদিন শক্তিশালী কোনো সরকার এলে অবশ্যই সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। কারণ রাষ্ট্র বলছে আপনাকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিতে, আর আপনি সেই শপথ না নিয়ে সংসদে বসে আবোলতাবোল ও গোয়ার্তুমি করবেন—এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। জামায়াতে ইসলামের নেতারা যেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, নিশ্চয়ই সেই শপথপত্র তারা নিজেরা ফটোকপি করে আনেননি। সেই কাগজ সংযুক্ত করে আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার তাদের শপথ পড়িয়েছেন। আপনার নিয়ম অনুযায়ী যদি এটা অবৈধ হয়, তাহলে সংসদে যারা এই কাগজটি প্রিন্ট করে এনেছেন তারাই সবচেয়ে বড় অপরাধী। পরীক্ষার হলে কেউ সামান্য নকল কাগজ নিয়ে গেলে যেমন তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়, তেমনি সেই নকল সরবরাহকারীও শাস্তি পায়। তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো একটি শপথপত্র যদি আইনে না থাকে, তবে বেআইনিভাবে কারা সেটি তৈরি করে সংসদ সদস্যদের দিয়ে সারা পৃথিবীর মিডিয়ার সামনে শপথ পড়ালেন—এটা নিশ্চয়ই চরম অন্যায় ও আইনবিরোধী কাজ। তাহলে তারা এখনো কোন আইনের ভিত্তিতে গ্রেফতার না হয়ে সাংবিধানিক পদে বসে আছেন? অতএব সালাউদ্দিন সাহেব, আগরবাগর কথা বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। আল্লাহর নামে সেজদা দিন, শুকরিয়া আদায় করুন। দেশনেত্রীর ওপর যে সকল জুলুম হয়েছে সেগুলো স্মরণ করুন। নতুন প্রজন্ম কিন্তু আগের মতো নেই। উল্টাপাল্টা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিলে তারা আর মেনে নেবে না। আপনাদের রেকর্ড এমনিতেই খুব ভালো নয়। তার ওপর সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই যে মাতলামি শুরু করেছেন, তাতে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে। সময় থাকতে জনতার রায় মেনে নিন—নচেৎ হাসিনার পরিণতির জন্যই অপেক্ষা করা শ্রেয়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ। ড. ফয়জুল হক।

Monday, 16 March 2026

প্রবীণ নেতারা চান না তরুণরা রাজনীতিতে আসুক।

ঠিক এই কারণেই প্রবীণ নেতারা চান না তরুণরা রাজনীতিতে আসুক। রাজনীতির একটা সিস্টেম আছে। একটা ট্র্যাডিশন আছে। দশকের পর দশক ধরে যত্ন করে গড়া। রক্ত-ঘাম দিয়ে না… ঘুষ, কমিশন আর তদবির বাণিজ্য দিয়ে। পোলাপাইন আইলেই এইডা ভাইঙ্গা ফালাইবো! এখন কথা হইলো সিস্টেমটা কী? সিস্টেম সহজ, তুই চুরি করবি। ছোট চুরি না, বড় চুরি। এমন চুরি যেন পরের পাঁচ পুরুষ বইসা খাইতে পারে। প্রজেক্টে ৪০%, টেন্ডারে ৩০%, আর বাকিটা "পার্টি ফান্ড", মানে নিজের ফান্ড। টাকা কমাবি। উন্নয়নের বরাদ্দ আসবো ১০০ কোটি, খরচ হইবো ৪০ কোটি, বাকি ৬০ কোটি "প্রশাসনিক জটিলতায়" হাওয়া। কাগজে সব ঠিকঠাক। অডিটর? সেও সিস্টেমের অংশ। বাচ্চাকাচ্চারে বিদ্যাস পড়াইবি। দেশের স্কুলে না অবশ্যই। লন্ডনে, টরন্টোতে, সিডনিতে। দেশের স্কুল? সেইটা জনগণের বাচ্চাদের জন্য। তোর বাচ্চা কি জনগণ? বেগমপাড়ায় বাড়ি কিনবি। গুলশানে ফ্ল্যাট, বনানীতে অফিস, গ্রামে বাড়ি, আর বেগমপাড়ায়... সেইটা বলতে হইবো না। সবাই বোঝে। না বুঝলেও বোঝার দরকার নাই। ভোট কিনবি। ইলেকশনের আগে মহল্লায় মহল্লায় খাম যাইবো। ৫০০ টাকা, ১০০০ টাকা। মানুষ বলবো "নেতা গরিবের বন্ধু।" কেউ জিজ্ঞেস করবো না এই টাকা আসলো কই থেইকা। জিজ্ঞেস করার সাহস নাই, আর থাকলেও সুযোগ নাই। এইটাই সিস্টেম। এইটাই ট্র্যাডিশন। - জনগণ হইলো তোর গোলাম - তুই হইলি রাজা। রাজার একটা ভাব থাকে। রাজা হাঁটলে পিছনে লোক থাকে, রাজা কথা বললে মাইক লাগে, রাজা হাসলে ছবি উঠে, রাজা রাগ করলে মামলা হয়। এই ভাব বজায় রাখতে হইবো!! তাহলে তুই কেন জবাবদিহিতা করবি? রাজার কাছে জবাব চায় কে? কার ঘাড়ে কয়টা মাথা? আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর মাথায় ব্রেন থাকবে কেন? মাথায় ব্রেন থাকলে প্রশ্ন করবি। প্রশ্ন করলে সিস্টেম নড়বে। সিস্টেম নড়লে অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। তোর মাথায় থাকবে গু 💩 আর তুই সারাদিন বইসা রেন্ডিয়ার দালালি করবি, নাইলে পাকিদের দালালি করবি। এই দুইটার মাঝখানে অপশন নাই। দেশের মানুষের কথা ভাবার সময় নাই, ওইটা তো "রাজনৈতিক দুর্বলতা"। যে নেতার বিদেশি প্রভু নাই, তার তো ফান্ডিং নাই। ফান্ডিং নাই মানে ইলেকশন নাই। ইলেকশন নাই মানে ক্ষমতা নাই। ক্ষমতা নাই মানে চুরির সুযোগ নাই। তাহলে এত কষ্ট করে রাজনীতিতে আসলি কেন? তাই প্রবীণ নেতারা চান তরুণরা ঘরে বসে থাকুক। ফেসবুকে রাজনীতি করুক। কমেন্টে বিপ্লব করুক। কিন্তু মাঠে নামুক না। কারণ মাঠে নামলে সিস্টেম টিকবে না। আর সিস্টেম না টিকলে বেগমপাড়ার বাড়ির কিস্তি যাবে কোথা থেকে? লন্ডনের টিউশন ফি আসবে কোথা থেকে? আর সবচেয়ে বড় কথা… এতদিন ধরে করা “ত্যাগ আর সংগ্রামের” হিসাবটা মিলবে কীভাবে?

Sunday, 8 March 2026

আস্থার দহন।

আস্থার দহন। ইতিহাসের দাবার বোর্ডে দাপুটে খেলোয়াড়ও কখনো কখনো নিজের সাজানো ঘুঁটির চালে নিজেই কুপোকাত হন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ এসেছে,যেখানে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিশ্ছিদ্র মনে হলেও সময়ের বিবর্তনে সেগুলোই তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চারজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন করার নেপথ্যে যে অগাধ আস্থা ও রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক করুণ নিয়তির পরিহাসে রূপ নিয়েছে। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে শেখ হাসিনা চাইলেন এক নিস্পৃহ অভিভাবক। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে বঙ্গভবনের শীর্ষাসনে বসিয়ে তিনি ভেবেছিলেন এক নিরাপদ ছায়া পেলেন। কিন্তু রাজনীতিতে ‘আদর্শিক নিরপেক্ষতা’ অনেক সময় শাসকের নিজস্ব এজেন্ডার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। শাহাবুদ্দিন আহমেদ নিজের নীতিতে অটল থেকে সরকারের অনেক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন।তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সেই আস্থার প্রতিদান মেলেনি; বরং ২০০১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের শাসনামলে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শালসা-র কারসাজি আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই আস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে যায়। নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে তিনি যে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন, তা আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। শেখ হাসিনা নিজেই পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন,এই নিয়োগ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় ভুল। এরপর ২০১৫ সালে সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ছিল তাঁর সরকারের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। সমালোচকদের মতে, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে স্পষ্ট প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও যাঁকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের চাবি দেওয়া হয়েছিল, সেই এস কে সিনহাই এক পর্যায়ে সরকারের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে তিনি যে ‘বিচারিক ক্যু’ বা ‘জুডিশিয়াল ক্যু’র নীল নকশা সাজিয়েছিলেন, তা ঢাকাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের এই নজিরবিহীন দ্বৈরথ কেবল সরকারকে অস্বস্তিতেই ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভারসাম্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছিল। কোনোমতে সেই বিচারিক ক্যু থেকে সরকার রক্ষা পেলেও, যাকে ভরসা করে শীর্ষাসনে বসানো হয়েছিল, তাঁর কলম থেকেই যখন শাসনের বৈধতা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ এল, তখন সেই ‘ভুল’ ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হিসেবে স্থায়ী রূপ নিল। ২০২৪ সালে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগ ছিল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও আত্মঘাতী জুয়া। নিয়োগের আগে ও পরে অনেক মহল থেকে তাঁর সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও, শেখ হাসিনা পারিবারিক আত্মীয়তা ও দীর্ঘদিনের চেনা আনুগত্যের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে সেই সতর্কতাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যাকে তিনি তাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ মনে করেছিলেন, সেই সেনাপ্রধানই হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যের মূল নায়ক। ৫ই আগস্টের সেই উত্তাল মুহূর্তে যখন জনস্রোত গণভবনমুখী, তখন সেনাপ্রধানের রহস্যময় ভূমিকা এবং শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল না, বরং অনেকের মতে এর গভীরে লুকিয়ে ছিল আরও ভয়াবহ কোনো ছক। অভিযোগ ওঠে, পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা কেবল ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাতে খোদ শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার বা হত্যার সূক্ষ্ম পরিকল্পনাও ছিল।যে ঢালকে তিনি সবচেয়ে মজবুত ভেবেছিলেন, সেই ঢালই শেষ মুহূর্তে ঘাতকের খড়গ হয়ে তাঁকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাল। সবশেষে মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি করা ছিল এক বিস্ময়কর ও তড়িঘড়ি নেওয়া সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পোড়খাওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অবহেলা করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একজনকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সিদ্ধান্তটি দলের ভেতরে ও বাইরে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আনুগত্যের বিনিময়ে পুরস্কার দেওয়ার এই কৌশলটি ছিল মারাত্মক ভুল; কারণ কোনো পোড়খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বঙ্গভবনে বসানো হলে ৫ই আগস্টের পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। সংকটকালীন সময়ে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক যে বিচক্ষণতা ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে পারতেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অসংলগ্ন ও দ্বিমুখী বক্তব্যে তার লেশমাত্র ছিল না। তাঁর দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক সাংবিধানিক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়, যা আওয়ামী লীগের পতন পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রাজনীতিতে অতি-বিশ্বাস অনেক সময় দূরদর্শিতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শেখ হাসিনা এই চারজন ব্যক্তিকে কেবল উচ্চপদেই বসাননি, বরং তাঁদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের একেকটি স্তম্ভের ভার তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন জনআকাঙ্ক্ষা আর রাষ্ট্রীয় সংকটের মুখোমুখি হন, তখন ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার চেয়ে নিজের অস্তিত্ব বা অন্তরে গচ্ছিত জিঘাংসা মুখ্য হয়ে ওঠে। এই চারজন ব্যক্তির নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এগুলো ছিল এক একটি রাজনৈতিক বাজি। আর ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, এই বাজিতে প্রতিবারই হারতে হয়েছে খোদ খেলোয়াড়কে। যে হাতগুলোকে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সিংহাসনের পায়া, সেই হাতগুলোই শেষমেশ সেই সিংহাসন উল্টে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।এই চারটি নিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার শীর্ষে বসে শেখ হাসিনা বারবার এমন ব্যক্তিদের ওপর বাজি ধরেছিলেন, যারা সংকটের মুহূর্তে হয় অতি-নিরপেক্ষ ছিলেন, না হয় সরাসরি বিনাশের পথ তৈরি করেছিলেন। ক্ষমতার মোহ অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে ব‍্যক্তিগত অনুগত মানুষের চেয়ে আদর্শীক অনুগত মানুষকে বেশি নিরাপদ মনে হয়।এই সিদ্ধান্তগুলো কেবল রাজনৈতিক ভুল ছিল না, বরং এগুলো ছিল নিয়তির সেই অমোঘ লিখন, যা তিলে তিলে এক দীর্ঘ শাসনের ভিত গুঁড়িয়ে দিয়ে এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যের জন্ম দিল।

Saturday, 7 March 2026

৭ই মার্চের দ্ব্যর্থতা : জয় বাংলা — জিয়ে পাকিস্তান

(০১) ===================== [সেই একই বাসি খিচুড়ি। সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সেই একই দ্ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। এজন্যই বলি ইতিহাস ক্ষমতা নির্ধারণ করেনা। ক্ষমতাই ইতিহাস তৈরি করে। যদি বলি আজ পলাশী দিবস কিংবা তিতুমীরের শাহাদাত দিবস কিংবা শামস-উদ-দীন ইলিয়াস শাহের মৃত্যু দিবস, তাহলে কী কারও কোনো হেলদোল হবে বা কোনো বিতর্ক বা কোনো উদযাপন? হবেনা। কারণ ক্ষমতার সাথে সেই ইতিহাসের সম্পর্ক চিরতরে চুকেবুকে গেছে। কিন্তু কেন আজ আওয়ামী পক্ষ কিংবা বিপক্ষ সবারই ৭ই মার্চ, মুজিব কিংবা একাত্তর নিয়ে কিছু না কিছু বলে ফেলার একটা তাড়না? কারণ আজও ক্ষমতার পেন্ডুলাম দোদুল্যমান। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেনা আওয়ামী লীগ শেষ। আওয়ামী লীগ মৃত। মুজিব-হাসিনা-বাকশালীদের কবর রচিত হয়ে গেছে। কারণ সবাই জানে যে কোনো পক্ষই তাদের স্বার্থেই আবার এই আওয়ামী লীগকেই ফিরিয়ে আনবে। আনবেই। তাই আজও ৭ই মার্চ প্রাসঙ্গিক। তার ইতিহাসও প্রাসঙ্গিক। ৭ই মার্চের খিচুড়িও প্রাসঙ্গিক। বিস্তারিত ইতিহাসের ছিন্নপত্রের ৩য় খন্ডে।] ০১. “... ৭ মার্চের মিটিং-এর বিশেষ বর্ণনা দেব না। লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল, মাথায় লাল ফিতা বাঁধা ও হাতে লাঙ্গল নিয়ে কৃষকেরাও সমবেত হয়েছিল। বন্ধু-বান্ধবের সাথেই উপস্থিত ছিলাম। সকলেই আশা করছিলাম যে সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হবে। আসলে আমাদের এ ধারণা ছিল আবেগপূর্ণ এবং বিতর্কিত। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সংসদের অধিবেশন এবং মন্ত্রিসভা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছিল। এটিই সঠিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। ৭ মার্চের সভায় তার বক্তব্য “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে শেষ করেছিলেন। তাতে তিনি তো কোন অন্যায় করেননি। পাকিস্তান অবিভক্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চলছিল জনমতের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সুতরাং রাজনীতিক হিসেবে তিনি তিনি তার ভাষণ সুষ্ঠুভাবে সমাপ্তও করেছিলেন। লক্ষাধিক লোক থেকে সেদিন কোন প্রতিবাদ আসেনি। অবশ্য শেষ করার পরমূহুর্তে ছাত্রনেতৃবৃন্দের পরামর্শে তিনি মাইকে ফিরে এসে “জয় বাংলা” ধ্বণিও উচ্চারণ করেছিলেন, যা সেদিন সমবেত জনগণকে উল্লসিত করেছিল। পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি এবং তার ভাষণ রাজনৈতিকভাবে সুষ্ঠু ও সঙ্গতিপূর্ণই ছিল। অথচ আজকাল ৭ মার্চের এই ভাষণ থেকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কথাটি মুছে ফেলা হয়েছে। কেন? কী কারণে? এতে আমি মনে করি মুজিবুর সাহেবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে খাটো করা হয়েছে। আরো বড় ক্ষতি হয়েছে, যে সম্প্রদায় এই কাজটি করেছেন তার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে॥” — কর্ণেল (অব:) কাজী নূর-উজ্জামান বীরউত্তম (৭নং সেক্টর কমান্ডার) / একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা ॥ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা । পৃ: ১২-১৩] ০২. “... একটা কথা বলি, শেখ সাহেব যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে “জয় বাংলার” সাথে সাথে “জয় পাকিস্তান” শব্দটিও উচ্চারণ করেছিলেন। এখন এই ভাষণ নিয়ে নানা বিতর্ক-বিতন্ডা চলছে। আমি ছোট্ট মানুষ। আমাকে সাক্ষ্য দিতে কেউ ডাকবে না। আমি যেমন শুনেছি, তেমনি বললাম। হতে পারে, আমার শ্রুতির বিভ্রম ঘটেছিল॥” — আহমদ ছফা / বেহাত বিপ্লব : ১৯৭১ । সম্পাদনা : সলিমুল্লাহ খান ॥ [আগামী প্রকাশনী - ডিসেম্বর, ২০১৩ । পৃ: ৮৪] ০৩. “… ’৭১-এর জনতার স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খাই নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে অগ্রগামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জনতার সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার ক্ষমতা তৎকালীন কোন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছিল না। আর তাই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম আপন পরিণতিতে ধাবিত হয়। ’৭১-এর ২৫শে মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ আলোচনা এক পাকিস্তানের ভিত্তিতেই ছিল। ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য যতই স্বাধীকারের পটভূমিতে বিশ্লেষিত হোক না কেন তাও ‘জয় বাংলা’ আর ‘জয় পাকিস্তানে’র উচ্চকিত শ্লোগানে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আপোষ মীমাংসার ধুম্র জালে আবদ্ধ ছিল। ’৭১-এর ২৫শে মার্চের আলোচনা শেষে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাক বাহিনীকে নিরস্ত্র বাঙালী জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে ভূট্টোসহ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে করাচির পথে ধাবমান তখন রাত ৮.৩০ মিনিটে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের সাংবাদিকদের নিকট প্রদত্ত বক্তব্য ‘আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে আর মাত্র ঘোষণা বাকি’-এই বক্তব্যের তাৎপর্য আর যা-ই হোক রাত ১২টায় শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার কোন প্রেক্ষাপটের সাক্ষ্য বহন করে না। … (পূর্ণাঙ্গ ভাষণ) প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্ত্তত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় পাকিস্তান। ... বাংলা জাতীয় লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম. এম. আনোয়ারের উদ্যোগে আগরতলা এসেম্বলি মেম্বার রেস্ট হাউসে আমার ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মালেক উকিলের মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর এক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্ত অবধি কোন নির্দেশ দান করেন নাই। এইদিকে মুজিব-ইয়াহিয়ার মার্চ-এর আলোচনার সূত্র ধরিয়া কনফেডারেশন প্রস্তাবের ভিত্তিতে সমঝােতার আলোচনা চলিতেছে। জনাব মালেক উকিল আমাকে ইহাও জানান যে, তিনি এই আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে আশাবাদী। প্রসঙ্গত ইহাও উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে আমি সর্বজনাব আবদুল মালেক উকিল, জহুর আহমদ চৌধুরী, আবদুল হান্নান চৌধুরী, আলী আজম, খালেদ মোহাম্মদ আলী, লুৎফুল হাই সাচ্চু প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতার সহিত বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাকালে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বা লক্ষ্য সম্পর্কে কোন নির্দেশ দিয়াছিলেন কিনা, জানিতে চাহিয়াছিলাম। তাহারা সবাই স্পষ্ট ভাষায় ও নিঃসঙ্কোচে জবাব দিলেন যে, ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর আকস্মিক অতর্কিত হামলার ফলে কোন নির্দেশ দান কিংবা পরামর্শ দান নেতার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। অথচ স্বাধীনতা উত্তরকালে বানোয়াটভাবে বলা হয় যে, তিনি পূর্বাহ্নেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। শুধু তাহাই নয়, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে, তিনি নির্দেশনামা জনাব জহুর আহমদ চৌধুরীকে পাঠাইয়াছিলেন। ... সময়োপযোগী নেতৃত্বদানের ব্যর্থতা ঢাকিবার জন্যই পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান অসত্যের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নির্দেশ প্রদানের একটি ঘোষণা পত্র ছাপাইয়া সাধারণ্যে বিলি করিয়াছিলেন। ইহা না করিয়া তাহার উচিত ছিল সময়োপযোগী অবদানের জন্য মেজর জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতিদান, ইহা হইত নেতাসুলভ আচরণ। তাঁহার মানসিকতার কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাভাবিকভাবেই তাহা করিতে ব্যর্থ হন। ইহা অতীব পরিতাপ এবং দুঃখের বিষয়॥” — অলি আহাদ / জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে '৭৫ [বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি - অক্টোবর, ২০১২ (পঞ্চম সংস্করণ) । পৃ: ১৭ (তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা) / ৩৮৬ / ৪০৬-৪০৭ / ৪০৯] ০৪. “... জাতির জনক বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষন প্রসংগেও একই ব্যাপার। জাষ্টিস মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সাহেবের বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলাদেশের তারিখ প্রথম সংস্করনে তিনি উল্লেখ করেছেন ভাষনের শেষে শেখ মুজিবুর রহমান বললেন ‘জয় বাংলা। জিয়ে পাকিস্তান’। দ্বিতীয় সংস্করনে তিনি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ অংশটি বাদ দিলেন। কবি শামসুর রহমানের লেখা আত্মজীবনী যা দৈনিক জনকন্ঠে ‘কালের ধূলোয় লেখা’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেখানেও তিনি বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ কথা ছিল ‘জিয়ে পাকিস্তান’। আরো অনেকের কাছে আমি এ ধরনের কথা শুনেছি, যারা আওয়ামী ভাবধারার মানুষ। সমস্যা হল আমি নিজে ৮ এবং ৯ই মার্চের সমস্ত পত্রিকা খুঁজে এরকম কোন তথ্য পাই নি। তাহলে একটি ভুল ধারনা কেন প্রবাহিত হচ্ছে? বংগবন্ধু যদি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে থাকেন তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। তিনি যা বলেছেন অবশ্যই ভেবে চিন্তেই বলেছেন। পাকিস্তানের সংগে তার আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। তাকে সময় নিতে হবে। ৭ই মার্চে যুদ্ধ ঘোষনার মত অবস্থা তার ছিল না। বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন গেটেসবার্গ এড্রেসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ন বলে আমি মনে করি। এখানে কোন অষ্পষ্টতা থাকা বাঞ্জনীয় না॥” — হুমায়ুন আহমেদ / জোছনা ও জননীর গল্প ॥ [অন্য প্রকাশ - ফেব্রুয়ারী, ২০০৪ । ভূমিকা (পূর্ব কথা)] ০ ৫. “... ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন - ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় পাকিস্তান’। এই ঘোষণা সেদিন মানুষকে উদ্দিপীত করেছিলো। মানুষকে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্রধারণে অনুপ্রাণিত করেছিলো। আজ শেখ সাহেবের সমর্থকরা সেদিনের ক্যাসেট থেকে ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি তুলে ফেলেছেন। আর তার বিরোধীরা বলছেন, শেখ সাহেব ওই শ্লোগানের মাধ্যমে পাকিস্তান রাখতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ কেউই তাকে বিশ্বাস করছে না। এমন করে কি অবিকৃত ইতিহাস লেখা যায়॥” — নির্মল সেন / স্বাধীনতার অবিকৃত ইতিহাস ॥ [সাপ্তাহিক বিচিত্রা - ১৪/০৪/১৯৯৪] ০৬. “... শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কীভাষণ! আর শেখ সাহেবের কী গগনবিদারী কণ্ঠ! গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান।” শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’। আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত। এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, “আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন? আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা aggressive হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না?” এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন॥” — নির্মল সেন / ৭ই মার্চের ভাষণ “জয় পাকিস্তান” বিতর্ক ॥ (সংগৃহীত) আমার জীবনে একাত্তর ॥ [বর্তমান সময় - ২০০৯ । পৃ: ১১] ০ ৭. “... আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদে কোনো দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনাই হয়নি বা আলোচনা করা সম্ভবও ছিল না। কারণ আওয়ামী লীগ কোনো গুপ্ত বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান নয়। অথচ স্লোগান দিয়েছে একটি দেশ স্বাধীন করার। শত্রু প্রস্তুতি নিয়ে আঘাত হানতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ শত্রুর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব চাচ্ছে। চাচ্ছে সংগ্রামের আহ্বান। কিন্তু সংগঠন হিসেবে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না আওয়ামী লীগের। সুতরাং সিদ্ধান্ত নিয়ে জনসভা ডেকে স্বাধীনতা ঘোষণা দেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এ ধরণের একটি সংগ্রামে যাবার কথা অন্তত: আওয়ামী লীগের নয়। কিন্তু তা হলে কী হবে? এ বিতর্কই হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ। ৭ মার্চ শেখ সাহেব জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলে ভাষণ শেষ করলেন। আমার মনে হলো এবার স্বাধীনতা হচ্ছে না। প্রস্তুতি নেই। সময় নিতে হবে। সাময়িককালের জন্য হলেও শেখ সাহেবকে আপোষ করতে হবে। বন্ধু রুহুল আমিন কায়সার বললেন, এবারেই স্বাধীনতা, আওয়ামী লীগ বুঝেই হোক না বুঝেই হোক, আগুনে হাত দিয়েছে। যাদের মাঠে নামিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া তাদের ঘরে ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। আমরা সংঘর্ষ চাই বা না চাই ওরা সংঘর্ষ চাপিয়ে দেবে। যেকোনো মূল্যেই হোক এবারই স্বাধীনতা। আমি একমত হলাম না। দু'জনে বাজি ধরলাম। বাজিতে আমি হেরেছিলাম। রুহুল আমিন কায়সার পঞ্চাশের দশকের ছাত্র আন্দোলনের একটি উজ্জল নাম। ছাত্র অবস্থায় বিপ্লবী দলের (আর এস পি) সংস্পর্শে আসেন। ষাটের দশকে চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বাজিতে তিনি জিতে গেলেন। কিন্তু আমার হিসাব কি ভুল ছিল? আমি বলেছিলাম, আমাদের প্রস্ততি বলতে বাংলাদেশের মানুষের প্রস্তুতির কথাই বুঝিয়েছিলাম। ভারতের সাহায্য এবং সহযোগিতার প্রশ্নটি আমার হিসেবে ছিল না। আমি বুঝেছিলাম, ভারত সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ভৌগলিক দিক থেকে স্বাধীন হতে পারে, কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। আর ভারতই বা আমাদের সাহায্য করবে কেন? তাই আগরতলা গিয়েই কংগ্রেস নেতাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আপনারা সীমান্ত খুলে দিলেন? আপনাদের কী লাভ বাংলাদেশকে স্বাধীন করে? মা, আমার খটকা লেগেছিল আগরতলা গিয়ে। ত্রিপুরাবাসী আমাদের দু'হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়েছে। এর অর্থ বুঝি। কিন্তু ভারত আমাদের সাহায্য দিচ্ছে কেন? কেন ট্রেনিং দিচ্ছে? ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কি সমঝোতা হয়েছে? এ সম্পর্কে সকলেই অন্ধকারে। একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমাকেও সেই অন্ধকারে ঝাঁপ দিতে হলো। সে মুহুর্তে ভিন্ন কোন বিকল্প ছিল না॥” — নির্মল সেন / মা জন্মভূমি ॥ [তরফদার প্রকাশনী - ডিসেম্বর, ২০০৭ । পৃ: ৬১-৬২] ০৮. “... আওয়ামী লীগ একটি সংসদীয় দল ছিল এবং শেখ মুজিব মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সময় বিরোধীদের বিরুদ্ধে শারিরীক শক্তি প্রয়োগে অভ্যস্ত হলেও সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা তার মাথায় কোনদিন থাকে নি। গোপন অবস্থায় থাকার ব্যাপারেও তার কোন চিন্তা ছিল না। বিশেষ বিশেষ জরুরী অবস্থায় জেলে যাওয়া ছাড়া তার করার মত কিছু ছিল না। সেটাই তিনি বরাবর করে এসেছিলেন। ১৯৭১ সালেও স্বাধীনতা যুদ্ধ ইত্যাদির কথা বললেও তার কোন চিন্তা বা প্রস্তুতি তার ছিল না। ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে তার বক্তৃতায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার পর তিনি যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন তা হলো, ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর সাথে আলোচনা। এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিশ্চিত করে পাকিস্তানের কাঠামো রক্ষা করা। তিনি নিজে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। সেটা সাধারণ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ছিল। এই চেষ্টা তিনি করেছিলেন। ৭ই মার্চের বক্তৃতার শেষে “জয় পাকিস্তান” বলা এদিক দিয়ে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এটা এখন আওয়ামী লীগের লোকেরা অস্বীকার করে কারণ তার কোন রেকর্ড নেই। ৭ই মার্চের পর রেডিও তাদের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকার সময় তারা ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি মুছে ফেলেছিলেন। তখন কোন ক্যাসেট রেকর্ডারের ব্যবহার ছিল না। একমাত্র রেকর্ড ছিল রেডিওতে। যারা শুনেছিল তাদের স্মৃতি ছাড়া এর অন্য কোন চিহ্ন নেই। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামক বইয়ের প্রথম সংস্করণে লিখেছিলেন যে, ৭ই মার্চ শেখ মুজিব “জিয়ে পাকিস্তান” বলেছিলেন। কিন্তু বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে এই সত্য ভাষণ বাদ দেয়া হয়েছে। অহিংস অসহযোগ আন্দোলন করলেও স্বাধীনতা যুদ্ধে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা তার ছিল না। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, তৎকালীন জরুরী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডেকে এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় নি। দেশের প্রশাসন তারা পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু নিজেদের সংগঠনে এ নিয়ে কোন আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন তারা বোধ করেন নি। সব কিছুই শেখ মুজিবের ‘হুকুম’ অনুযায়ী। তিনি তার ৭ই মার্চের বক্তৃতাতেও 'হুকুম' দেওয়ার কথা নিজেই বলেছিলেন।” — বদরুদ্দীন উমর / আমার জীবন (তৃতীয় খন্ড) ॥ [জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ - জুন, ২০০৯ । পৃ: ১৪১-১৪২] ০৯. “... Zaman (Quazi Nooruzzaman) talks about the famous 7 March speech of Sheikh Mujibur Rahman, an event where he was present, and heard the Father of the Nation ending his speech with “Pakistan Zindabad”, and, moments later, on the advice of the student leaders, “Joy Bangla”. Zaman takes no issue with the end salutations, reasoning that Pakistan was still politically undivided, but takes a dim view that the words “Pakistan Zindabad” have been expunged from the rendering of the speech with the observation that, “I believe this tampering with the speech diminishes Sheikh Mujib's political efforts.” And, over a particularly contentious issue that continues to deeply divide the nation against itself, Zaman is convinced, offering a number of arguments in support, that Ziaur Rahman first announced the independence of Bangladesh over the radio. He then reasons, “Let's say it was Ziaur Rahman who was the first announcer of independence. What does it matter? Does this announcement belittle the Awami League or Sheikh Mujibur Rahman? Not in the least.” — Shahid Alam / A freedom fighter's testament ( Review of “A Sector Commander Remembers Bangladesh Liberation War 1971” by Quazi Nooruzzaman)॥ [ The Daily Star - Saturday, November 27, 2010 ] ১০. “... সময়টি ছিল জটিল। আমরা সবাই এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু আজ যখন দীর্ঘকাল পরে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে চিন্তা করি, তখন একটি কথার সদুত্তর পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য সেটাই ছিল প্রকৃষ্ট সময়। পশ্চিমারা তাদের মরণযুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি তখনও সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি। এ প্রান্তে সৈন্যসামন্তও অপ্রতুল এবং বাঙালিই বেশি। সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা এলে বাংলাদেশের মানুষকে হয়ত এত বড় মূল্য দিতে হত না। ’৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে বক্তৃতা দিলেন তা যেমনি ছিল ঐতিহাসিক, তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বললেন বটে, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম — এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...” কিন্তু ঘোষণা দিলেন না আনুষ্ঠানিকভাবে । শেষ করলেন, “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলে॥” — শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন / বলেছি বলছি বলব ॥ [অনন্যা - মে, ২০১৫ । পৃ: ৩৭]

Friday, 6 March 2026

৭ই মার্চের ভাষণ—উন্মুক্ত পাঠ নাকি দলীয় পাণ্ডুলিপি?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে যতগুলো রাজনৈতিক প্রতীক গড়ে তোলা হয়েছে, তার মধ্যে ৭ই মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত একটি টেক্সট। এই ভাষণকে একদিকে “জাতির মুক্তির রূপরেখা” এবং “স্বাধীনতার কার্যকর ঘোষণা” হিসেবে মূর্ত করে দেখা হয়েছে, অন্যদিকে এটাকে পাকিস্তানের ভেতরে সমাধান খোঁজার শেষ প্রচেষ্টা, এমনকি কৌশলগত দ্বিধার নিদর্শন হিসেবেও পাঠ করা হয়েছে। এভাবে একই ভাষণকে বিপরীত রাজনৈতিক শিবির ভিন্ন ভিন্নভাবে মালিকানা নেওয়ার চেষ্টা করেছে—কেউ এটিকে নায়ক–পূজার কেন্দ্রে বসিয়ে, কেউ আবার এটিকে ইতিহাস মুছে ফেলার রিসেট বাটনের বিপরীত দিক থেকে ব্যবহার করে। ফলে ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনার প্রথম শর্তই হলো—এটাকে কেবল পবিত্র প্রতীক বা নিখুঁত দলিল হিসেবে নয়, বরং তার সময়, সীমাবদ্ধতা, কৌশল, পরবর্তী দলীয় ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় বিকৃতির পুরো প্রক্রিয়াসহ একটি রাজনৈতিক টেক্সট হিসেবে দেখা। এই প্রবন্ধ সেই জায়গা থেকেই ভাষণের মাহাত্ম্যকে অস্বীকার না করে, বরং এর চারপাশে নির্মিত ক্ষমতার রাজনীতি, আখ্যানের একচেটিয়াকরণ ও স্মৃতির উপর দখলদারিত্বের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবে। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে সমালোচনামুখর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ভাষণ নিজে যতটা ঐতিহাসিক, তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় ও দলীয় আখ্যান ঠিক ততটাই রাজনৈতিকভাবে নির্মিত এবং বিতর্ক–উদ্রেককারী। ১. ইতিহাস নয়, আখ্যান নির্মাণ: ভাষণের চারপাশে দেয়াল ৭ই মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে এক উত্তাল ইতিহাসের কেন্দ্রীয় মুহূর্ত—অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভাষাগত জাতীয়তাবাদ, কৃষি ও শ্রম-আন্দোলনের দীর্ঘ সঞ্চিত ক্ষোভের বিস্ফোরণকে সেখানে একটি রাজনৈতিক ভাষা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে এই ভাষণকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সাতই মার্চ কেবল একক নেতার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফল, আর তার বাইরের বহুমাত্রিক সামাজিক শক্তিগুলো যেন ইতিহাসের প্রান্তিক ফুটনোট মাত্র। এই “ব্যক্তিকেন্দ্রিক” আখ্যান দুইভাবে সমস্যাজনক। - প্রথমত, এটি জনগণের সংগ্রামকে এক ব্যক্তির ক্যারিশমায় সংকুচিত করে, ইতিহাসকে জীবন্ত প্রক্রিয়া থেকে “নায়ক–কেন্দ্রিক কাহিনি”তে নামিয়ে আনে। - দ্বিতীয়ত, একই ইতিহাসকে ভিন্নভাবে পড়ার, সমালোচনা করার বা নতুন করে ব্যাখ্যার যেকোনো চেষ্টাকে “বঙ্গবন্ধু–বিরোধী” বা “মুক্তিযুদ্ধ–বিরোধী” বলে দমন করা সহজ হয়ে যায়। খুন যোগ্য করে তোলা হয়। একই ভাষণকে সামরিক শাসনামলে “সংযমের মুহূর্ত” হিসেবে, আর আওয়ামী লীগ আমলে “বিপ্লবের চূড়ান্ত ডাক” হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এ থেকে বোঝা যায়, ইতিহাসের ঘটনাটি যেমন আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কে কীভাবে সেটি রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগাচ্ছে। ২. স্বাধীনতার ঘোষণা বনাম দ্বিধার রাজনীতি ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক: এটি কি স্বাধীনতার ঘোষণা, নাকি পাকিস্তানের ভেতর ক্ষমতা আদায়ের এক কৌশলী বক্তৃতা? একদিকে, আওয়ামী লীগ ঘরানা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা যুক্তি দেন—মুজিব আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিচ্ছিন্নতাবাদী ট্যাগ এড়াতে শব্দে “স্বাধীনতা” উচ্চারণ করেননি, কিন্তু বাস্তবে চার দফা দাবি, অসহযোগ, কর–বর্জন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও “প্রতিটি ঘরে দুর্গ গড়ে তোল” আহ্বানের মাধ্যমে কার্যত স্বাধীনতারই ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের পাঠে, কৌশলগত অস্পষ্টতা ছিল আন্তর্জাতিক ও সামরিক বাস্তবতা বিচার করে নেওয়া এক দূরদর্শী অবস্থান; ছাত্রনেতাদের সরাসরি ঘোষণার দাবি তিনি ঠেকিয়ে দিয়েছেন গণহত্যা ঠেকানোর জন্য। অন্যদিকে, সমালোচক এবং কিছু বিকল্প ধারার গবেষকরা অভিযোগ করেন, ৭ই মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতর থেকেই ক্ষমতা নেওয়া—চার দফা ছিল আসলে সামরিক জান্তা ও ভুট্টোর উপর চাপ তৈরি করার হাতিয়ার। বিবিসি বাংলা–তে উদ্ধৃত এক গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, মুজিব ২৪ মার্চ পর্যন্তও পাকিস্তানের ভেতরে ক্ষমতা হস্তান্তরের সমাধানের পথ খোলা রাখতে চেয়েছিলেন; তাই ভাষণটি “চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দলিল” হিসেবে পড়া এক ধরনের রেট্রো–অ্যাকটিভ নায়ক বানানোর চেষ্টা। এই দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক ফল স্পষ্ট: - আওয়ামী লীগ লাইন: “ঘোষক একটাই—মুজিব; ৭ই মার্চই স্বাধীনতার কার্যকর ঘোষণা।” - প্রতিপক্ষ ন্যারেটিভ: “৭ই মার্চ ছিল অর্ধেক পথ; ২৫–২৬ মার্চের সামরিক আক্রমণ ও ২৭ মার্চের চট্টগ্রাম ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ বাস্তবে শুরু।” ফলে ভাষণটি একদিকে বিপ্লবী অনুপ্রেরণার পাঠ্য, অন্যদিকে স্বাধীনতার “অথেনটিক ঘোষক” নিয়ে অন্তহীন রাজনৈতিক টানাটানির ইন্ধন। ৩. রাষ্ট্রীয় দিবস, পরিবার–কেন্দ্রিকীকরণ এবং প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি ৭ই মার্চকে দীর্ঘদিন কোনো রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়নি; হটাৎ করে ২০২০ সালে হাইকোর্টের নির্দেশের পর তা জাতীয় দিবসের তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঢোকে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারকালীন সময় থেকে ৭ই মার্চ ঘিরে ব্যাপক মঞ্চ, শো, বিজ্ঞাপন, সরকারি প্রচার শুরু হয়—যা দিনটিকে শুধু ঐতিহাসিক স্মরণ নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ব্র্যান্ড–ব্যবস্থাপনার অংশে পরিণত করে। সমালোচনা এসেছে দুইদিকে থেকে: - এক, “এক পরিবারকে ঘিরে অতিরিক্ত সংখ্যক দিবস”—১০ই জানুয়ারি, ১৫ আগস্ট, ৭ই মার্চ, জন্মদিন, মুজিববর্ষ ইত্যাদি—রাষ্ট্রীয় অর্থে পালন করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে একধরনের পারিবারিক পুজো–ব্যবস্থায় নামিয়ে আনা হচ্ছে। - দুই, দিবসের সংখ্যা বাড়ানো এবং অতিরিক্ত আড়ম্বর সাধারণ মানুষের মধ্যে “উৎসব ক্লান্তি” এবং বিরক্তি তৈরি করেছে; ঐতিহাসিক স্মরণ আর রাজনৈতিক প্রচারের সীমারেখা মুছে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪–২৫ সালে ৭ই মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত এলো একেবারে বিপরীত মেরুতে—এবার অনেকে এটাকে “ইতিহাসের রিসেট বাটন” বলে ব্যাখ্যা করলেন, যেখানে পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এখানে সমালোচনা উভয় দিকে: আওয়ামী লীগ আমলে অতিরিক্ত পার্টি–সেন্ট্রিকীকরণ যেমন সমস্যা ছিল, তেমনি নতুন সরকার এটিকে সহনশীল সমালোচনার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল মুছে–ফেলার মাধ্যমে এক ধরনের “উল্টো রিভিশনিজম”-এ যাচ্ছিল। ৪. সংবিধানে ভাষণের বিকৃত পাঠ: স্মৃতির ওপর অবহেলার ছাপ যে ভাষণকে ইউনেসকো “মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” নিবন্ধনে স্থান দিয়েছে, সেই একই ভাষণের পাঠ যখন দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন দেখা যায় সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে শতাধিক ভুল, বাদ–বাকী আর বিকৃতি রয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত কমিটি সংবিধানে থাকা পাঠে প্রায় ১৩০টি ভুল বা অমিল শনাক্ত করে—কোথাও বাক্যাংশ বাদ গেছে, কোথাও শব্দ বদলে গেছে, কোথাও পুরো লাইন নেই। দুই দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে “৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু” নিয়ে অভূতপূর্ব প্রচারণা চললেও ভাষণের সবচেয়ে মৌলিক কাজ—এর নির্ভুল টেক্সট দায়িত্ব নিয়ে সংরক্ষণ—রাষ্ট্র এবং দল দুপক্ষই করেনি; এটা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, স্মৃতির প্রতি গভীর অবহেলার লক্ষণ। সমালোচকেরা এখানে তির্যক প্রশ্ন তুলেছেন: যে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত এই ভাষণের নাম নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের “ইতিহাস–বিরোধী” বলে, তারা নিজেরাই যদি সংবিধানে বিকৃত ভাষণ রেখে দেয়, তাহলে প্রকৃত ইতিহাসবিরোধী কে? ৫. ইউনেসকো, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অভ্যন্তরীণ বন্ধ–দরজা ৭ই মার্চের ভাষণ ২০১৭ সালে ইউনেসকোর “মেমরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড” রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচারণায় এটাকে প্রায় একধরনের আন্তর্জাতিক সীলমোহর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—“বিশ্ব স্বীকৃত ঐতিহ্য” এখন সমালোচনার উর্দ্ধে। কিন্তু সমালোচকেরা মনে করিয়ে দেন, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কোনো দলিলকে “ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান” বললে তা সমালোচনাহীন বা সর্বসম্মত হয়ে যায় না; বরং সেই স্বীকৃতি গবেষণা, বিতর্ক ও নতুন পাঠকে উৎসাহিত করার কথা, থামিয়ে দেওয়ার নয়। যখনই কেউ ৭ই মার্চের ভাষণে মুজিবের কৌশলগত দ্বিধা, পাকিস্তানের ভেতরে সমাধান খোঁজার চেষ্টা বা সহিংসতার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেন, তাকে দ্রুত “ইউনেসকো স্বীকৃত ইতিহাস অস্বীকারকারী” বলে ট্যাগ করা হয়। ফলে ইউনেসকোর মতো আন্তর্জাতিক ফোরামের স্বীকৃতি একধরনের “বন্ধ–দরজা” যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হয়—যেখানে গবেষণা বা বিকল্প পাঠ আর নিরাপদ থাকে না। ৬. স্মৃতি মুছে ফেলা বনাম একচেটিয়া স্মৃতি: দু’পাশের একই রোগ ডেইলি স্টার–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৭ই মার্চের তাৎপর্য কখনো সরাসরি মুছে ফেলা হয়েছে (সামরিক শাসন, ২১ বছরের নিষেধাজ্ঞা), কখনো আবার একক আখ্যানের মধ্যে বন্দী করে রাখা হয়েছে (আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্র অনুমোদিত বয়ান)। এক ক্ষেত্রে ভাষণ নেই, অন্য ক্ষেত্রে ভাষণ আছে কিন্তু ভিন্ন পাঠের অবকাশ নেই—দু’ক্ষেত্রেই সমস্যাটা একই: ক্ষমতাসীন পক্ষ ইতিহাসকে বহুবচন থেকে একবচনে নামিয়ে আনে। আজকের বিতর্ক—৭ই মার্চ জাতীয় দিবস বাতিল, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা, “রিসেট বাটন”–এর ভাষ্য—দেখায়, নতুন ক্ষমতাসীন পক্ষও একই খেলাটা উল্টো দিক থেকে খেলছে।[7][8][1] এবার প্রশ্ন কেবল “মুজিব বনাম অন্য কেউ” নয়; প্রশ্ন দাঁড়ায়—রাষ্ট্র কি কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিকে বহুত্ববাদীভাবে ধারণ করবে, নাকি প্রতি সরকার নিজের সুবিধামতো অধ্যায় কেটে দেবে আর নতুন অধ্যায় লিখবে? ৭. উপসংহার:
৭ই মার্চের ভাষণকে সমালোচনামূলক চোখে দেখলে তিনটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি— - ভাষণটি ছিল এক বাস্তব রাজনৈতিক সঙ্কটের মুহূর্তে, কৌশলগত অস্পষ্টতা ও বিপ্লবী আহ্বানের এক জটিল মিশ্রণ; এতে যেমন সাহসের ভাষা ছিল, তেমনই ছিল আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনায় কম–বেশি দ্বিধা। - ভাষণ–পরবর্তী রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় ব্যবহারে এটিকে ব্যক্তিপূজার কেন্দ্রে বসানো হয়েছে, যা জনগণের সংগ্রামকে ছাপিয়ে গেছে এবং সমালোচনাকে অপরাধসমতুল্য করে তুলেছে। - নতুন সরকার এই একচেটিয়া স্মৃতির প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি দিবস বাতিল, গুরুত্ব কমানো ইত্যাদির মাধ্যমে ঠিক একই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ইতিহাস–রাজনীতি করছে, কেবল নায়ক বদলে। সব তর্ক–বিতর্ক ছেঁকে দেখলে স্পষ্ট হয়, ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে দ্বন্দ্ব মূলত ভাষণের ভেতর কিংবা ঐতিহাসিক মুহূর্তের জটিলতায় যতটা, তার চেয়েও বেশি এই ভাষণকে ঘিরে পরবর্তী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার ও অপব্যবহারে। একদিকে যখন এই ভাষণকে ব্যক্তিপূজা ও দলীয় ব্র্যান্ডিংয়ের প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে, তখন অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীলভাবে দিবস বাতিল, মর্যাদা কমানো বা বিকল্প নায়ক বানানোর প্রতিযোগিতা একই ইতিহাসকে আবারো ক্ষমতার দাঁড়িপাল্লায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাই একযোগে দু’টি কাজ দাবি করে: প্রথমত, শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে তার সময়ের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক কৌশলের ভেতরে রেখে পড়া; দ্বিতীয়ত, এই ভাষণকে দলীয় পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধার করে একটি উন্মুক্ত ঐতিহাসিক সম্পদে পরিণত করা, যেখানে ভক্তি যেমন বৈধ, তেমনি বৈধ প্রশ্ন, বিরোধিতা এবং বিকল্প ব্যাখ্যাও। যতক্ষণ না রাষ্ট্র এবং রাজনীতি এই বহুত্ববাদী পাঠের সুযোগ তৈরি করছে, ততক্ষণ ৭ই মার্চের ভাষণ ইতিহাসের দলিলের চেয়ে বেশি হবে—এটি থাকবে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে, এবং তার চারপাশের বিতর্কও থামবে না, বরং আরও নতুন আকারে ফিরে আসবে।

ও সুন্নীদের মধ্যে কেনো মতপার্থক্য ?

ইসলাম ধর্মে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় সৃষ্টি হয় নবীজীর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর। শিয়া এবং সুন্নীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতিষ্ঠিত মুসলমান সমাজের কে হবেন পরবর্তী নেতা তা নিয়ে। গোড়ার দিকে ইসলামে কিভাবে গোষ্ঠী সৃষ্টি হলো তা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করলে আজকের আধুনিক মুসলিম সমাজকে বুঝতে সুবিধা হবে। এই বিভক্তি ১৩শ’বছর ধরে মুসলমানদের কাছ থেকে মুসলমানদেরকে পৃথক করে রেখেছে। রাসুলুল্লাহ(সঃ)-এর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর মুসলমানদের যারা শাসন করেছেন তাদের খলিফা বলা হয়। শিয়ারা বিশ্বাস করে যে প্রথম খলিফা ছিলেন হজরত আলী। আলী ছিলেন রাসুল (সঃ)-এর চাচাতো ভাই এবং নবীজির কন্যা ফাতিমাকে বিয়ে করেছিলেন। হজরত আলী হলেন রাসুলের দৌহিত্রদের পিতা। কিন্তু সুন্নীরা আবু বকরকেই প্রথম খলিফা বলে মনে করে। শিয়া এবং সুন্নীরা হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় দুটি গোষ্ঠী। তাদের ধর্মীয় মতবাদ এবং ইতিহাস জানা ও বোঝা জরুরি। শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয় নবী মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত মুসলমান সমাজের কে হবেন পরবর্তী নেতা তা নিয়ে। শিয়ারা দাবি করে, নবী মুহাম্মদ শেষবার হিজরতকালে পথিমধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং তার সহযাত্রীদের সম্মুখে ঘোষণা করেন হজরত আলী হবেন পরবর্তী উত্তরাধিকারী। কিন্তু সুন্নীরা বিশ্বাস করে, দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় নবী তার আরেক স্ত্রীর পিতা আবু বকরকে উত্তরাধিকার নির্বাচন করেন। শিয়াদের বক্তব্য হলো, আলী যখন নবীকে কবর দিতে ব্যস্ত তখন হজরত উমর (পরবর্তীতে ২য় খলিফা নির্বাচিত হন) সাহাবাদেরকে ডাকেন এবং আবু বকরকে নেতা নির্বাচিত করেন। সুন্নী মুসলমানরা বলে, আবু বকরের নির্বাচনই সঠিক। শিয়ারা বলে প্রকৃতপক্ষে আলী প্রথম খলিফা এবং ইমাম। আবু বকরের পর উমর এবং উসমান খলিফা নির্বাচিত হন। উসমানের হত্যাকাণ্ডের পর আলী চতুর্থ খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সকলেই তা মেনে নেন, শুধু বর্তমান সিরিয়ার তখনকার বাসিন্দারা ব্যতীত। ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উসমানের হত্যার পর আলী ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু তার শাসনকাল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অবশেষে আলী ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে আততায়ীর হাতে নিহত হন এবং তার পুত্র ও নবীর দৌহিত্র হোসেন ক্ষমতারোহন করেন। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের নেতা হয়ে উঠা মোয়াবিয়া তাকে অস্বীকার করেন। মোয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। তৎকালীন ইরাকিরা আলীর দ্বিতীয় পুত্র হুসেনকে সমর্থন করেন। হুসেন ইরাকের নগরী কুফায় গমন করেন এবং খিলাফতের দাবিতে রাজধানী দামাস্কাস অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। পথে কারবালা নামক স্থানে তিনি ইয়াজিদ বাহিনীর হামলার শিকার হন। ইয়াজিদ বাহিনী হুসেনের পরিবারসহ শিশুদের খাবার পানি সরবরাহ করতে অস্বীকার করেন এবং তাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হুসেনের শিরচ্ছেদ করা হয় এবং তার বোন জয়নাবকে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। শিয়ারা এই ঘটনাকে তাদের ইতিহাসের উৎস মনে করে। তারা আলী, হুসেন এবং নবী পরিবারের যারা নিহত হয়েছেন তাদেরকে জীবন্ত প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে। এখান থেকেই তারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের চিন্তায় থেকে যায় অত্যাচার, করুণ ঘটনা এবং শহীদ হওয়ার কাহিনী। সুন্নী ইসলামে আইন বিষয়ক চারটি তরিকা রয়েছে — হানাফি, সাফি, মালিকি এবং হানবালি। অন্য একটি উঠে আসা গোষ্ঠী হলো ওয়াহাবি গোষ্ঠী। এই ওয়াহাবিরাই আজকের সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাশীল। ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ আবদ আল ওয়াহাব (১৭০৩–১৭৯২)। তিনি মূলত হানবালি মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। ওয়াহাব আরব প্রধান ইবনে সৌদের সঙ্গে হাত মেলান এবং তারা দু’জনে মিলে আরব উপদ্বীপ দখল করেন। পরে সৌদের পরিবার আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজ্যের ইসলাম চর্চা শুরু হয় ওয়াহাবি মতবাদ অনুসারে। তারা জামাতে উপস্থিত হওয়াকে বাধ্যতামূলক করে। ওয়াহাবিরা শিয়াদের সহ্য করতে পারেনি। ১৮০২ সালে আধুনিক ইরাকের কারবালা তারা ধ্বংস করে এবং যত শিয়া পুরুষ, নারী ও শিশু পাওয়া যায় তাদের হত্যা করে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে কারবালা একটি পবিত্র শহর। ওয়াহাবি মতবাদের অনুসারীরা একটি কট্টর ও উগ্র সম্প্রদায়। তারা মুসলমানদের কিছু সম্প্রদায়কে স্বধর্মত্যাগী মনে করে এবং শিয়াদের হত্যা করা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করে। এই কারণে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র রক্তাক্ত হয়েছে এবং গৃহযুদ্ধ বেঁধেছে বারবার। অধিকাংশ সুন্নী মনে করে, বিরোধীতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ওয়াহাবিদের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের সহিংসতা, যা পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।