Monday, 30 March 2026

বিএনপির অবস্থান গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধীরা ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য ‘আইনি মতামত’ ভাবা ভুল। বরং এটাই বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান, যার লক্ষ্য একটাই: গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার বা সীমাবদ্ধ করা এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। বিএনপি এই অবস্থান নিয়েছে কেন? কারণ যদি স্বীকার করা হয় যে জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে, তাহলে বিদ্যমান সংবিধান বা হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙে যায়। তখন সংসদ আর একমাত্র ক্ষমতার উৎস থাকে না; জনগণ নিজেই হয়ে ওঠে ক্ষমতার উৎস। আর ঠিক এই জায়গাটাই বিএনপি অস্বীকার করতে চাইছে। তাই আইনমন্ত্রী বলছেন, সংস্কার হবে, কিন্তু সংবিধানের ভেতরেই হবে; সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না। এটা কি যুক্তিসঙ্গত? না। এই যুক্তির ভেতরেই ফাঁকি আছে। কারণ গণঅভ্যুত্থান মানেই হলো সংবিধানের সীমা অতিক্রম করা। যদি সংবিধানই সবকিছুর শেষ কথা হয়, তাহলে জনগণ কেন রাস্তায় নামে? কেন জীবন দিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবি তোলে? বাস্তবতা হলো—গণঅভ্যুত্থান সেই মুহূর্ত, যখন জনগণ বলে: “এই সংবিধান আর আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা এই সংবিধান চাই না, আমরা নতুন গঠনতন্ত্র চাই। নতুন ভাবে বাংলাদেশ গড়তে চাই। তার মানে বিএনপি গণঅভিপ্রায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থানকেই আমি বিএনপির জন্য আত্মঘাতী মনে করি। অথচ সেকুলার ইসলাম বিদ্বেষী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির পতনের পর ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির মোকাবিলার মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত এবং যুদ্ধাক্রান্ত টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট জাতীয় সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু বিএনপির ভুল রাজনীতির জন্য তাকে আবার আওয়ামী লীগের মতো চরম মূল্য দিতে হতে পারে। বিএনপির এই অবস্থান বিএনপির অনুকুল নয়। আইনমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক অর্থ ও গাঠনিক তাৎপর্য অস্বীকার করেন। তিনি ঘটনাকে মানেন, কিন্তু তার পরিণতি মানেন না। অর্থাৎ তিনি বলতে চান—জনগণ আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা তাদের নাই; সেই ক্ষমতা থাকবে সংবিধান ও সংসদের হাতেই। এই যুক্তি পুরানা কৌশল—জনগণের শক্তিকে স্বীকার করে তাকে আবার আইনের ভেতরে বন্দি করা। এটাকে সরল ভাষায় বলা যায়: “সংবিধান দিয়ে গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ বা নিদেন পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা।” বিএনপি আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে জনগণ যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায়, তাহলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সেই হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার ব্যবস্থার ভেতরেই ফিরে যেতে হবে। আওয়ামী লীগের স্থান নিয়েছে বিএনপি। এখন যা বোঝার সেটা জনগণকেই বুঝতে ও করতে হবে। এখানে বিরোধীরা যে কথা বলছে, সেটি ভিন্ন। তারা বলছে—যদি গণঅভ্যুত্থান সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে জনগণের নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে। সেই অধিকার থেকে যদি কোনো “সংস্কার পরিষদ” বা “গণপরিষদ” তৈরি হয়, তাহলে সেটি সংবিধানের অধীন হবে না; বরং সংবিধানই তার অধীন হবে। বিরোধীরা সংস্কারবাদী হতে পারে, কিন্তু নিদেন পক্ষে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষেই অবস্থান নেবার চেষ্টা করছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট: আইনমন্ত্রী বলছেন সংবিধান আগে, জনগণ পরে; বিরোধীরা বলছে জনগণ আগে, সংবিধান পরে। যদি ধরে নেওয়া হয় বর্তমান সংবিধানই চূড়ান্ত, তাহলে তার কথা আইনের বই অনুযায়ী ঠিক। কিন্তু সমস্যাটা এখানেই—তাঁর পুরা যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি অঘোষিত ধারণার ওপর, সেটা হলো: সংবিধান এখনো অক্ষত এবং বৈধ। কিন্তু যদি বাস্তবতা এই হয় যে গণঅভ্যুত্থান সেই বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তাহলে এই যুক্তি টেঁকে না, ভেঙে পড়ে। তখন আর “সংবিধানের ভেতরে থাকো” বলা যায় না। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—সংবিধান থাকবে কি থাকবে না, সেটি ঠিক করার ক্ষমতাই জনগণের। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আসলে একটা জিনিস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন—রাষ্ট্রের শেষ কথা সংবিধান, জনগণ না। বিএনপি বলছে, জনগণ প্রতিবাদ করতে পারে, আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র নতুন করে গঠন করার ক্ষমতা জনগণের নাই। সেই ক্ষমতা কেবল সংবিধান-স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার। এটা কি ঠিক? অথচ সংবিধান নিজে কোনো আসমানি কিতাব না—এটি একটি রাজনৈতিক দলিল, যা কোনো এক সময়ে কোনো ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। যদি সেই ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে যায়, যদি জনগণ সেই কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেই সংবিধানের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তখন সংবিধানকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে সবকিছু বিচার করা মানে হলো বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করা। আইনমন্ত্রী বাস্তবতাকে নয়, কাগজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি বলছেন—সংবিধানে যা নেই, তা বৈধ না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে সংবিধান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার ভেতরে থেকে বৈধতা খোঁজা অন্ধকারে ইঁদুর তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টার অধিক কিছু না। বলা হচ্ছে—যারা নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছে, তারা ভুল বুঝছে; সঠিক বোঝাপড়া হলো সংবিধানের ভেতরে থেকেই পরিবর্তন করা। কিন্তু এই “সঠিক বোঝাপড়া” আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? জনগণের, নাকি আওয়ামী লিগ বা সেকুলার ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির? বিএনপিই কি তাহলে আওয়ামী লীগ? বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে বন্ধ করে দিচ্ছে। দেওয়া —জনগণের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা। যদি বলা হয় “সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না”, তাহলে জনগণ কোনো গণপরিষদ গঠন করতে পারবে না, কোনো নতুন গঠনতন্ত্রের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে না। সবকিছুই আবার ফিরে যাবে সংসদ, সরকার, এবং পুরোনো ক্ষমতার কেন্দ্রে। দিল্লীতে বসে শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই অট্টহাসি দিচ্ছেন। ইতিহাসও প্রহসনের রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের যে দরজা জনগণ খুলেছিল——সেটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আমাদের তিনটি বার্তা দিচ্ছে। এক. গণঅভ্যুত্থানকে একটি অতি সীমিত ঘটনা, শেখ হাসিনা সরকারের পতনেই তার শেষ এবং ওখানেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আটকে রাখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতা থেকে একজন ব্যক্তির অপসারণ, আর কোন পরিবর্তন না। দুই. জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা বিএনপি অস্বীকার করে, অর্থাৎ জনগণ ভোটার হতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে কিম্বা রাষ্ট্রের সংস্কারে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেটা থাকবে জাতীয় সংসদের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং জাতীয় সংসদের ক্ষমতা ৭০ অনুচ্ছেদের বলে একনায়কতান্ত্রিক ভাবে কেন্দ্রীভূত থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিন. কিন্তু ঘটনা হিশাবে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে না, কারন তা না হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারতো না। এই কারণেই “ভ্রান্ত ব্যাখ্যা”র অভিযোগ আসলে উলটা পড়া দরকার। প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভ্রান্ত ব্যাখ্যা কে দিচ্ছে? যারা বলছে জনগণের ক্ষমতা আছে রাষ্ট্র নতুন করে গঠনের, নাকি যারা বলছে জনগণ শুধু ভোটার। তারা ভোট দেবে, আর কিছু না। ক্ষমতার সবকিছু সংবিধানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ? এখানেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের আসল জায়গা। এটি কোনো টেকনিক্যাল আইনি বিতর্ক না—এটি ক্ষমতার উৎস নিয়ে দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার উৎস কি সংবিধান, নাকি জনগণ? আইনমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবিধানকেই সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। বিরোধীরা জনগণকে উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, কিন্তু বিরোধীরাও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাই গণতন্ত্রের সারকথা সেটা স্বীকার করে না। এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত “সংস্কার পরিষদ” নিয়ে বিতর্ক থামবে না। আসল প্রশ্ন পরিষদ কীভাবে গঠিত হবে সেটা না—আসল প্রশ্ন হলো, কার অধীনে গঠিত হবে। সংবিধানের অধীনে, নাকি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে? এখানেই বিএনপির অবস্থান মোটেও আইনী নয় আর, বরং একদমই স্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক, তাঁরা পরিবর্তন চান, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চান না। তাঁরা সংস্কারের কথা বলেন, কিন্তু গঠনের কথা এড়িয়ে যান। তাঁরা গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ব্যক্ত জনগণের ক্ষমতার আইনী ও রাজনৈতিক বৈধতা স্বীকার করতে রাজি না। সংসদে বিএনপি উপদেষ্টা সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল , সংশোধন বা শর্তাধীন যেভাবে করবে তা বিএনপির রাজনীতি থেকেই আন্দাজ করা যায়। সে বিষয়ে আমরা আসছি, পরে।

Friday, 27 March 2026

বিএনপি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন এত ঝুঁকি নিতে চায়ছে?

আসলে বিএনপি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন এত ঝুঁকি নিতে চায়ছে? সম্ভাব্য কারণ হতে পারে গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া বিএনপির একার সিদ্ধান্ত নয়।দিল্লির প্রেসক্রিপশন।বিএনপি এই প্রেসক্রিপশন মেনে চলতে গিয়ে হয় দানব হয়ে উঠবে অথবা খুব দ্রুত নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করবে। যদি গণভোট বাতিলের পক্ষে বিএনপি রায় পেয়ে যায় তবে দানবীয় রুপে বিএনপিকে দেখা যাবে।আবার একটি আওয়ামী স্বৈরশাসন ফিরে আসবে।সেই আয়নাঘর,গু ম সব কিছু। অপরদিকে ১১ দলীয় জোট যদি বিএনপির এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়,রাজপথে নেমে আসে তাহলে বিএনপির পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেন? বিএনপির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে।সেনা হস্তক্ষেপ জায়েজ করার জন্য আওয়ামী লীগ জ্বালাও পোড়াও হ ত্যা শুরু করবে এবং পিছনের দরজা দিয়ে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। এই একটি মাত্র কারণে নির্বাচন জালিয়াতির প্রমাণ থাকার পরও জামায়াত ইসলামী আন্দোলনে যায়নি। এখন কি করবে ১১ দলীয় জোট? গণভোট অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার লিখিত প্রস্তাব করেছে বিএনপি, তৃতীয় শক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ভয়ে জামায়াত কি চুপচাপ তা মেনে নেবে, নাকি রাজপথে ফয়সালা করবে? জামায়াত যে আশঙ্কায় নির্বাচন জালিয়াতি মেনে নিয়ে নীরব থেকেছে বিএনপি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আবার ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে।

Tuesday, 24 March 2026

স্বপ্নের রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'

তেইশে মার্চ ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব দিবস। পাকিস্তানীরা এ দিনটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস বা পাকিস্তান ডে হিসেবে পালন করে। পাকিস্তান আমলে আমরাও করতাম। এখন আর করিনা। করলেও দোষ ছিলনা। কেননা এই অভিন্ন ইতিহাস ও সংগ্রামের অংশীদার ছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরাও। ইতিহাসের কোনো ভূমিকা বা গৌরব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ইতিহাসকে খণ্ডিত করার ফল ভালো হয় না। আমরা কোনো দিবস পালন না করলেও এর তাৎপর্য নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাটা অন্তত থাকা উচিৎ। সব দেশেই সেটা হয়। রাজনীতিবিদেরা এড়িয়ে গেলেও একাডেমিশিয়ান, ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকেরা সেটা করেন। আমাদের দেশে সেটাও হয় না। আমরা হাজার বছরের চিরায়ত ইতিহাসের ভুয়া আওয়াজ দিয়ে আমাদের ভুল-ভাল ও মতলবি ইতিহাসের শুরুই করি বিংশ শতাব্দির পঞ্চাশের দশক থেকে। লাহোর প্রস্তাব নিয়ে অনেকের অনেক রকম বিশ্লেষণ রয়েছে। বিশদ পর্যালোচনায় না গিয়ে এ সম্পর্কে আমি একটু তির্যক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমার নিজের সামান্য কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। 🔴 ইতিহাসের অনেক ব্যাখ্যাহীন বাস্তবতা থাকে। 'লাহোর প্রস্তাব' হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক রেজুলিউশানটির মুসাবিদা রচনা করেছিলেন মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খান। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমির প্রস্তাবের খসড়া রচনাকারী জাফরুল্লাহ্ খান শিয়ালকোটের এক কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সন্তান ছিলেন। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির বিরোধিতাকারী ধর্মতাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী পরবর্তীকালে পাকিস্তানে এসে বসত গড়েন এবং কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। সেই আহমদিয়াদেরকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার পাকিস্তানে অমুসলিম ঘোষণা করে। 🔴 ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর কনফারেন্সে আমাদের শেরে বাঙ্গলা এ.কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব পাঠ করেন এবং লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি অর্জন করেন। লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও পরে এই প্রস্তাব 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও পরিচিতি অর্জন করে। বাঙলাভাষী মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল হক এই প্রস্তাবের উত্থাপক হলেও সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ এ প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা দেয় তার সঙ্গে মুসলিম লীগের বাঙলাভাষী অন্য তিন নেতা দ্বিমত পোষণ করেন। আবুল হাশিম দাবি করেন, লাহোর প্রস্তাব অনুসারে ইন্ডিয়ার পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দু'টি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গড়তে হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবিভাজনের বিরোধিতা করে অখণ্ড বাংলা প্রদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসামকেও পাকিস্তানভূক্ত করার দাবি জানান। 🔴 মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্'কে পাকিস্তানের রূপকার হিসেবে 'কায়েদে আযম' বা মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে তিনি পাকিস্তান নামটির উদ্ভাবক নন। কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনিই প্রথম ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে প্রদত্ব ভাষণে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তবে পাকিস্তান নামটি তাঁরও দেয়া নয়। ইকবালের স্বপ্নের ভারতীয় মুসলিমদের সেই রাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামো ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের সমন্বয়ে। বেঙ্গলের অন্তর্ভূক্তির কথা তাতে ছিল না। 🔴 ১৯৩৩ সালে কেম্ব্রিজ-এ আইন পড়ুয়া পাঞ্জাবি ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী ভারতীয় মুসলমানদের স্বপ্নের রাষ্ট্রের 'পাকিস্তান' নামটি প্রথম উদ্ভাবন করেন। পাঞ্জাবের P, আফগান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (আফগানিয়া)-এর A, কাশ্মিরের K, সিন্ধু বা Indus region-এর I (আই) এবং বেলুচিস্তানের STAN নিয়ে PAKISTAN রাষ্ট্রের নামকরণ করেছিলেন তিনি। এর ভেতরেও বেঙ্গল ছিল না। চৌধুরী রহমত পূর্বভারতে বাঙলাভাষী মুসলমানদের জন্য 'বাঙ্গিস্তান' নামে এবং দাক্ষিণাত্যের মুসলমানদের জন্য 'ওসমানিস্তান' নামে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাঙ্গিস্তান নামে না হলেও অন্য নামে আমরা সে রাষ্ট্র স্থাপন করি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইন্ডিয়ার সহায়তায় যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে। 🔴 পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল হাজার মাইল দূরের দু'টি অঞ্চল নিয়ে। ইন্ডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশ - পাঞ্জাবের অংশ বিশেষ, সিন্ধু, আফগানিস্তানের পাখতুন এলাকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বেঙ্গলের পূর্ব অংশের সমন্বয়ে। আমাদের প্রদেশটির নাম ছিল পূর্ব বঙ্গ বা ইস্ট বেঙ্গল। তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে, এই পূর্ব বঙ্গের লোক বলে পরিচিত দু'জন নেতাই কিন্তু এই পূর্ব বঙ্গ নামটাও মুছে দিয়ে এই প্রদেশের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। এরা হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ আলী এক ইউনিট ব্যবস্থা প্রবর্তন করে পশ্চিমের চার প্রদেশকে একত্র করে পশ্চিম পাকিস্তান নামে এক প্রদেশ বানান। আর পূর্ব বঙ্গের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। মোহাম্মদ আলীর আইন মন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনা করেন এবং তাতে এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দেন। ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন হিসেবে সৃষ্ট পাকিস্তান এই শাসনতন্ত্রের আলোকে রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা অর্জন করে। সোহরাওয়ার্দী রিপাব্লিকের প্রথম প্রধানমমন্ত্রী হন। সোহরাওয়ার্দীকে হটিয়ে ইস্কান্দর মীর্জা এবং তাকে হটিয়ে জেনারেল আইউব ক্ষমতা দখল করেন। আইউব শাসনতন্ত্র স্থগিত করলেও এক ইউনিট ও পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ ঠিক রাখেন এবং মূলতঃ তার হাতেই এই পরিকল্পনা কার্যকারিতা পায়। 🔴 পাকিস্তান শব্দটি উদ্ভাবন ও মুসলিম লীগ গঠনেরও আগে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য আলাদা বাসভূমির ধারণা প্রথম তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে তা বিকশিত হতে থাকে প্রধানত আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে। সেই আলীগড় বা উত্তর প্রদেশ স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমির বাইরে রয়ে যায়। পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ গঠনে শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা এবং বাঙলাভাষী মুসলমানেরা নেতৃস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু কালক্রমে এরা সকলেই পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের কাছে লাঞ্ছিত হতে থাকে। মুসলিম অধ্যুষিত ও মুসলিম শাসিত স্বাধীন বা স্বায়ত্বশাসিত দেশজ রাজ্যগুলো ভারত ছলে-বলে-কলে-কৌশলে দখল করে। ইন্ডিয়ার অন্যান্য প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা অবর্ননীয় দুর্দশার মুখে পড়ে। 🔴 নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আমরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্বেও আমাদের ওপর পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য-নির্যাতন যেমন সত্য ছিল, তেমনই সমান সত্য হচ্ছে, আজকের বাংলাদেশ যদি ১৯৪৭ সালে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান-এর অন্তর্ভুক্ত না হ'তো তা'হলে আমাদের পরিণতিও ইন্ডিয়ার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মতই হোতো। স্বাধীনতার স্বপ্ন আর দেখতে হতো না। 🔴 পাকিস্তানকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে যতই নিন্দা করা হোক না কেন, আসলে ব্রিটিশের ডিভাইড এন্ড রুল অপকৌশল উপমহাদেশে যে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু দলনের বাস্তবতা তৈরি করেছিল সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানেরা তার ভিক্টিম ছিল এবং এ থেকে রেহাই পেতেই স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। কেবল ধর্মীয় নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারসহ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব বিবেচনাতেই সে সময় পাকিস্তান অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। ইংরেজ শাসক ও উপমহাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল কংগ্রেসের পক্ষে সে বাস্তবতা অস্বীকার বা রোধ করা সম্ভব ছিল না। 🔴 ১৯৭১ সালে আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলকে যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ নামের আলাদা রাষ্ট্র গড়েছি। তবে এই রাষ্ট্রের চরিত্র, কোর ভ্যালুজ বা অন্তর্নিহিত মূল্যবোধসমূহ, জাতীয় ঐক্যসূত্র, রাজনীতি, শাসনপদ্ধতি, প্রতিবেশী সহ বিশ্বের নানান চরিত্রের তাবৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, নাগরিক অধিকার, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের অধিকার-মর্যাদা-নিরাপত্তা সহ কোনো কিছুই আমরা স্থির ও অটল ভাবে সুনির্ধারিত ও সুবিন্যস্ত করতে পারিনি। অনেক বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি বা নিরসন করতে পারিনি আমরা। জাতি ও রাষ্ট্রগঠন এবং এর পরিকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনো অসমাপ্ত ও চলমান। উপসংহারে পৌঁছাবার বাকি পথ এখনো সামনে পড়ে রয়েছে। 🟢 courtesy: Maruf kamal khan

Thursday, 19 March 2026

বিএনপির ২০৩১ সালের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল আয়োজন !

রেড এলার্ট !! ২০৩১ সালের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল আয়োজন এখনই সম্পন্ন করে রাখতেছে বিএনপি! প্রথমে জুলাই সনদ ও গণভোটে জনগণের রায় প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি সরকার। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাই কোয়ালিফাইড ভিসিদের প্রত্যাহার করে দলীয় ভিসি নিয়োগ দিচ্ছে। দ্যান, সিটি কর্পোরেশন ও ৪২ টি জেলা পরিষদে (মেয়র/কাউন্সিলর) নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে দলীয় প্রশাসক নিযুক্ত করেছে বিএনপি। এবার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় একই কায়দায় দলীয় প্রশাসক নিয়োগের পথে হাঁটছে সরকার। প্রশ্ন হচ্ছে তারা চাইলেই তো নির্বাচন প্রভাবিত করে তাদের লোকদের বসাতে পারে। কিন্তু একেবারে কোন নির্বাচনই না দিয়ে এভাবে কোন স্বার্থে নিয়োগ দিতেছে! সেটাই তো? মূলত ১ বছর বা তার কিছু বেশি মেয়াদের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে। এরপর নির্বাচন দিবে এবং নিজেদের লোকদের জিতিয়ে আনবে। কারণ ৫ বছর পর যখন সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, স্থানীয় প্রতিনিধিদের মেয়াদ আরও ১ বছর অবশিষ্ট থাকবে। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসলেও প্রশাসন কে কন্ট্রোল করা কোন ব্যপারই হবে না। আবার চুপ্পুকেও রেখে দিতেছে বিএনপি। ১ বছর পর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিবে। সে হিসেবে তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতির মেয়াদও অবশিষ্ট থাকবে নির্বাচনে। ফলাফল হচ্ছে, নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসলেও সেটা হবে পুতুল সরকার। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বিএনপি কব্জায় ই থাকবে। সো, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে কোন চ্যালেঞ্জ ই ফেস করতে হবে না তখন। দেশে আবারও ঝেঁকে বসলো পুরনো ফ্যাসিবাদ। লড়াই-সংগ্রাম ই হয়তো এ যমিনের নিশ্চল নিয়তি!

Tuesday, 17 March 2026

একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে।

"শেখ হাসিনা দিল্লীতে পালিয়ে গিয়েছে, সংসদ ডিসল্ভ করে দেওয়া হয়েছে , সবাই রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছে...” ইত্যাদি। জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কি ঠিক কিছু বলেছেন? (কমেন্টে দেখুন) । মোটেও না। গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি—এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারণ ঘটনাগুলো খুব পরিষ্কার: একটি সরকার পতন হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন, সংসদ ভেঙে গেছে—অর্থাৎ পুরানা রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—এখন রাষ্ট্র কে গড়বে? কীভাবে গড়বে? জনগণের ভূমিকা কী হবে? কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে নতুন রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া শুরু না করে, পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই আবার জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি তথাকথিত “উপদেষ্টা সরকার” গঠন করা হয়েছে—যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তিই নাই। এখানে একটা বড় ধরনের দ্বিচারিতা দেখা যায়: একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। তাহলে আসলে কোনটা মানা হচ্ছে? —সংবিধান, না ক্ষমতা? কাদের ক্ষমতা? সেনাবাহিনী, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতা ও রাষ্ট্রপতির? কালের কন্ঠে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার পড়লে পরিষ্কার এটাই বাস্তব হিশাব? আরও বড় প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই সংবিধান মানা হয়, তাহলে নির্বাচন হওয়ার কথা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২০২৯ সালে। এখন নির্বাচন করার কথা উঠছে কেন? আবার যদি বলা হয় এটি গণঅভ্যুত্থানের ফল, তাহলে পুরানা সংবিধানের প্রশ্ন আসে কেন? , পুরানা সংবিধানের বৈধতা নিয়েই বা এত টানাটানি কেন? এই দুই অবস্থান একসাথে সত্য হতে পারে না। এই জায়গাটাতেই জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ। তিনি ঠিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন—সংবিধান সবকিছুর উপরে নয়। কিন্তু তিনি বলেননি কেন এই সংবিধানই আবার রক্ষা করা হলো? কারা তা রক্ষা করলো? এবং কাদের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা কখনো শূন্য থাকে না। যখন একটি সরকার ভেঙে পড়ে, তখন নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হয়। সেই মুহূর্তে জনগণের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে—কিন্তু সেই সুযোগটাই সবচেয়ে বেশি দখল করে নেয় সংগঠিত শক্তিগুলো: সেনাবাহিনী, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক এলিট। বাংলাদেশেও সেটাই হয়েছে। একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও, সেই শূন্যতা জনগণ পূরণ করতে পারেনি। বরং রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো মিলে এমন একটি ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যাতে পু্রানা ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত থাকে—শুধু মুখ বদলায়। এখানে “লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণী” কথাটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান না—এর বাস্তব অর্থ আছে। যারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পদ দখল করেছে, ব্যাংক লুট করেছে, অর্থ পাচার করেছে—তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো একটি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। কারণ সেই প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা আসতে পারে, আইনবিহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও আয়নাঘরের জন্য বিচার হতে পারে, লুট করে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পদ ফেরত আনার প্রশ্ন উঠতে পারে। যারা গুম, খুন, ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের সঙ্গে জড়িত—তাদের জন্যও পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার টিকে থাকা ও টিকিয়ে রাখা নিরাপদ ও জরুরি। কারণ নতুন করে জনগণের রাষ্ট্র গঠন হলে তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ও শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব ত্রাণকর্তা হিশাবে জনাব সালাহ উদ্দিন আছেন। ভয় কি? তাই একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—সংবিধান রক্ষা করা হয়েছে “আইনের প্রতি শ্রদ্ধা” থেকে নয়, বরং গণবিরোধী নির্দিষ্ট ক্ষমতার চরিত্র ও কাঠামোকে অক্ষত রাখার জন্য। এই সংবিধান এমনভাবে তৈরি, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রায় সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এই কেন্দ্রীভুত ক্ষমতা ভাঙা মানে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন—যা বর্তমান ক্ষমতাধারীরা কখনোই চাইবে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—গণঅভ্যুত্থান মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভিত্তি নতুন ভাবে গঠনের সুযোগ। সেই সুযোগে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হতো একটি গণপরিষদ নির্বাচন—যেখানে জনগণ সরাসরি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ করবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, এমনকি বিএনপির সাধারণ কর্মীসহ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষই ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু সেই পথ নেওয়া হয়নি। কেন? কারণ সেই পথ অনিশ্চিত, নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর ভীতির কারন হলো সেই পথ নেওয়া হলে বাস্তব ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরে আসতে পারে। সবশেষে প্রশ্নটা নৈতিকও। যারা জীবন দিয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে, যারা রাস্তায় নেমে রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন দেখেছে—তাদের সেই ত্যাগ কি শুধু একটি সরকার বদলের জন্য ছিল? নাকি একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে “সংবিধান মানতে হবে”—এই কথাটা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একদিকে সংবিধান ভেঙে সরকার বানানো, অন্যদিকে সেই সংবিধান রক্ষার কথা বলা—এটা কোনো নীতির রাজনীতি না, এটা ক্ষমতার রাজনীতি। আমরা কি পুরান ক্ষমতা ব্যবস্থা ও কাঠামোর মধ্যে সামান্য একটি সংস্কার চাই, নাকি সত্যিকারের অর্থে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবে গড়তে চাই? জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ আসলে কি চান?

শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে

ঠিক ৫২বছর আগে ১৯৭৪ সালের মার্চে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ, চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের দুর্নীতি, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির শ্রেণিশত্রু খতমের কর্মসূচি, জাসদের সরকারবিরোধী আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানামুখী তৎপরতায় টালমাটাল দেশের পরিস্থিতি। ওই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর মিন্টো রোডের বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেয় জাসদ। সেদিন জাসদের আন্দোলনকারী কর্মীরা ঢাকার রমনা এলাকায় অবস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করলে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী। এছাড়া আটক করা হয় জাসদের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে। প্রসংগত, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের পরপরই জাসদ নেতাকর্মীরা শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সেসময়ে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা বিরোধী রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, হত্যা, বিরোধী মতাদর্শীদের গুম করা সহ বহু বেআইনি কাজে যুক্ত থাকার ব্যাপারে অভিযুক্ত ছিলেন। আজ ১৭ই মার্চ। শেখ মুজিবের জন্মদিন। তার শাসনামলের এমন এক ১৭ই মার্চের কাহিনি বলি। ১৯৭৪ সাল। ফেব্রুয়ারী মাসে জাসদ একটা কর্মসূচি ঘোষণা করে। মুজিব সরকারের ২৫ মাসে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ, গণনির্যাতন, খামখেয়ালীপূর্ণ শাসন, অপদার্থতা ও বিদেশী দাসত্বকে উল্লেখ করে তারা বিবৃতি দেয়৷ নানা দাবীদাওয়া দিয়ে সরকারকে ১৫ই মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়। দাবীদাওয়াগুলো মেনে নেওয়ার জন্য। আল্টিমেটাম আরকি। কিন্তু মুজিব সরকার গুণেও না তাদেরকে! ফলে ১৭ মার্চ পল্টনে জাসদের উদ্যোগে জনসভা হয়। জলিল ও রব (বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলণকারী) অত্যন্ত জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সভা শেষ হতে না হতেই বিশাল মিছিল মিন্টো রোডের দিকে রওনা হয়। পুলিশ বাঁধা দিতে পারে এজন্য তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা এগিয়ে যায়। মিছিল গিয়ে থামে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাড়ির সামনে। চারিদিকে স্লোগান চলতে থাকে। জাসদ চাচ্ছে একটা স্মারকলিপি দিবে। কিন্তু মন্ত্রী বাড়িতে নেই। কেরানিগঞ্জে গেছেন জনসভায়। এতে করে নেতাকর্মীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়। দু'একজন অতি উৎসাহী হয়ে গেইটে আগুন দিতে যায়। কিন্তু গেট তো লোহার, আগুন কী আর ধরে! হঠাৎ কয়েক ট্রাক বোঝাই করা পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্য এসে হাজির। কথা নেই, বার্তা নেই, সরাসরি গোলাগুলি শুরু করে! জনতা এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। ইনু কমান্ড দেয়, 'সবাই শুয়ে পড়েন।' অনেকে তাই করে। কিন্তু গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়নি। ফলে একটার পর একটা বডি নিচে পড়তে থাকে। সরকারি প্রেস নোটে বলা হয়, তিনজন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে জলিল, রব, মমতাজ বেগম ও মাঈনউদ্দিন খান বাদল ছিলেন। আহত অবস্থাতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। জাসদ দাবি করে, অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন বর্ণনায় আসে ২২ থেকে ৩৫ জন নিহতের কথা। মাঈনউদ্দিন খান বাদলের বাবা আহমদউল্লাহ খান ছিলেন পুলিশের ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলের ডিএসপি। বাদল পরে তাঁর কাছে শুনেছিলেন, ৪০-৫০টি লাশ রক্ষীবাহিনী ট্রাকে করে নিয়ে গেছে। রেফারেন্সঃ জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ-সালাউদ্দিন আহমেদ।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন শিলংয়ের প্রিয় বড় ভাই মাননীয় মন্ত্রী জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যিনি তাদের শপথ পড়ালেন তিনিই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলে তাকে যারা শপথ পড়ানোর অধিকার দিয়েছে তারাই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছে। একজন আইনলঙ্ঘনকারীর হাতে, বেআইনি ব্যক্তির হাতে জাতীয় সংসদের শপথ বাক্য পাঠ করলে তাহলে বিএনপির সকল সংসদ সদস্যরাও এই আইন লঙ্ঘন করেছেন। সেই হিসেবে জাতীয় সংসদ এই মুহূর্তে অবৈধ এবং বেআইনি। বেআইনি সংসদে দাঁড়িয়ে কেউ মন্ত্রী দাবি করা তার চেয়েও বড় বেআইনি কাজ। এর চেয়েও বড় অপরাধ হচ্ছে—একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ বাদ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করা; যা আরও জঘন্য বেআইনি। সংসদের নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিবেকশূন্য হয় কিংবা বিকারগ্রস্ত হয়, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য এবং নির্বাচনেও অযোগ্য। সে হিসেবে আমার ধারণা, প্রিয় বড় ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব শিলং থেকে ফেরার সময় অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন। তিনি যখন শিলংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মানসিক অসুস্থতার কথা বলে কে বা কারা তাকে আইন মেনে সংবিধান অনুযায়ী সেখানে রেখে এসেছিলেন—এ বিষয়টি তিনি জানেন না বলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশে এসে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠকগুলোতে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, সেগুলো এখন আবার ভুলে যাচ্ছেন এবং অস্বীকার করছেন। যারা তিন মাসের মধ্যে কোনো বিষয় ভুলে যায় এবং অস্বীকার করে, নিশ্চয়ই তারা অক্ষম ও অসুস্থ—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধিহীনও। এই অবস্থায় আমার ধারণা অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব সংসদ সদস্য হওয়ার সকল আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সংবিধান নিয়ে এত বক্তব্য দেওয়া হলেও তার নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনী সমাবেশে গণভোটের পক্ষে রায় চেয়েছিলেন। গণপর্যায়ে যুক্ত হওয়ার ফলে সেই অর্থে তার কথার বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এখন সেটি বাস্তবায়নে বিরম্বনা সৃষ্টি করা এক ধরনের প্রতারণার শামিল। সংবিধান অনুযায়ী কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে তারা সংসদ সদস্য থাকতে পারেন কি না—সে প্রশ্ন রেখে গেলাম। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে শপথ পড়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই সংবিধানের কোথাও কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ পড়ানোর নিয়ম নেই। জুলাই সনদের ভিত্তিতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন—এবং সে অনুযায়ী দুটি শপথ পড়ানো হয়েছে: একটি মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি মাননীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এখানে শপথ যদি অবৈধ হয়, তাহলে দুটি শপথই অবৈধ হবে—না হলে একটিও হবে না। বরং সংবিধান অনুযায়ী দুটি শপথ গ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামি, এমসিপি-সহ যারা এই শপথ নিয়েছেন তারাই সংসদের বৈধ সদস্য; বাকিরা সংবিধান অনুযায়ী অবশ্যই অবৈধ। আপনি এত সংবিধানের কথা বলেন—তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদে ডেকে আনলেন না কেন? আমাদের মহামান্য “চুপ্পু” সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি দেখেননি। যদি তাই হয়, তাহলে তিনিই তো এখনো প্রধানমন্ত্রী। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে, কোন সংবিধানের ভিত্তিতে আপনারা এখন সরকারে বসেছেন? সংবিধান অনুযায়ী যারা এই অবৈধ কাজ করেছে তাদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আপনারা কি নিজেদের বিচার করছেন, নাকি যারা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে তাদের বিচার করছেন? যদি পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর বিচার করে থাকেন, তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করছেন? সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি চুপ্পু সাহেব হন, তাহলে তার হাতে দেওয়া অধ্যাদেশগুলো কীভাবে অবৈধ হয়? জুলাই সনদ, গণভোট, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং আইন-বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ—সবই তো বর্তমান মহামান্যের স্বাক্ষরে হয়েছে। তাহলে তিনি এগুলো কোন সংবিধানের ভিত্তিতে করলেন? বাংলাদেশে একই সঙ্গে দুইটি বৈধ ব্যবস্থা থাকতে পারে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব—আপনি যদি বৈধ হন, তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রেসিডেন্ট এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরা সবাই অবৈধ। আর আপনি যদি অবৈধ হন, তাহলে উপরে উল্লেখিত সবাই বৈধ। কারণ সংবিধান আপনার মনমতো বানানো কোনো বিষয়বস্তু নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের যা কিছু হচ্ছে—সবই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদের ভিত্তিতে হচ্ছে। অতএব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে জনতার রায় এসেছে। জনগণ যে বিষয়গুলোর ভিত্তিতে এই গণভোটে রায় দিয়েছে সেটাই এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংবিধানস্বরূপ। এই আইনকে প্রশ্ন করে কেউ যদি বক্তব্য দেয়, আমি মনে করি তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধ করেছে। একদিন না একদিন শক্তিশালী কোনো সরকার এলে অবশ্যই সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। কারণ রাষ্ট্র বলছে আপনাকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিতে, আর আপনি সেই শপথ না নিয়ে সংসদে বসে আবোলতাবোল ও গোয়ার্তুমি করবেন—এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। জামায়াতে ইসলামের নেতারা যেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, নিশ্চয়ই সেই শপথপত্র তারা নিজেরা ফটোকপি করে আনেননি। সেই কাগজ সংযুক্ত করে আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার তাদের শপথ পড়িয়েছেন। আপনার নিয়ম অনুযায়ী যদি এটা অবৈধ হয়, তাহলে সংসদে যারা এই কাগজটি প্রিন্ট করে এনেছেন তারাই সবচেয়ে বড় অপরাধী। পরীক্ষার হলে কেউ সামান্য নকল কাগজ নিয়ে গেলে যেমন তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়, তেমনি সেই নকল সরবরাহকারীও শাস্তি পায়। তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো একটি শপথপত্র যদি আইনে না থাকে, তবে বেআইনিভাবে কারা সেটি তৈরি করে সংসদ সদস্যদের দিয়ে সারা পৃথিবীর মিডিয়ার সামনে শপথ পড়ালেন—এটা নিশ্চয়ই চরম অন্যায় ও আইনবিরোধী কাজ। তাহলে তারা এখনো কোন আইনের ভিত্তিতে গ্রেফতার না হয়ে সাংবিধানিক পদে বসে আছেন? অতএব সালাউদ্দিন সাহেব, আগরবাগর কথা বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। আল্লাহর নামে সেজদা দিন, শুকরিয়া আদায় করুন। দেশনেত্রীর ওপর যে সকল জুলুম হয়েছে সেগুলো স্মরণ করুন। নতুন প্রজন্ম কিন্তু আগের মতো নেই। উল্টাপাল্টা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিলে তারা আর মেনে নেবে না। আপনাদের রেকর্ড এমনিতেই খুব ভালো নয়। তার ওপর সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই যে মাতলামি শুরু করেছেন, তাতে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে। সময় থাকতে জনতার রায় মেনে নিন—নচেৎ হাসিনার পরিণতির জন্যই অপেক্ষা করা শ্রেয়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ। ড. ফয়জুল হক।