Friday, 10 April 2026

গোল্ডফিশ আওয়ামীভক্ত সমীপে— (পর্ব ০১)

গোল্ডফিশ আওয়ামীভক্ত সমীপে— (পর্ব ০১) (এতকিছু পড়ার টাইম না থাকলে আমার কথাকেই ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে মেনে নেন। আমি আপনার হয়ে এই সবকিছুই মাথায় রেখেই কথা বলি। আপনি ভুলে গেলে আমি যা বলি চুপচাপ মেনে নেন আরকি) ২০০৯ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরবর্তী দেড় দশকে কীভাবে নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য কাঠামোগতভাবে উগ্র ডানপন্থী এবং ইসলামপন্থী মতাদর্শকে রাষ্ট্রযন্ত্রে একীভূত করেছিল, তা যেহেতু গোল্ডফিশ মেমরির আওয়ামীভক্তরা ভুলে গেছেন, এ নিয়ে আমি ফ্যাক্টবেজড এই লেখাটি রাখছি। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে যে দলটি নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, তারাই সময়ের পরিক্রমায় একটি “ধর্মনিরপেক্ষ” পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের গণতান্ত্রিক ঘাটতি পূরণের জন্য ধর্মীয় তোষণ নীতিকে রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়ায় সরকার ক্রমান্বয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়েছে। [১] এখানে শেখ হাসিনা আমলের (২০০৯-২০২৪) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামীকরণ, মুক্তচিন্তকদের ওপর আক্রমণ, ধর্মীয় অনুভূতির নামে আইনি কাঠামোর চরম অপপ্রয়োগ এবং এর বিপরীতে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের “মব ভায়োলেন্স” বা গণ-উচ্ছৃঙ্খলতার একটি বিস্তারিত ও তুলনামূলক চিত্র দেখানো যাক। ফ্যাক্টবেজড এই আলোচনায় এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আওয়ামী লীগ আমলের ইসলামীকরণ ছিল সম্পূর্ণভাবে “রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত” এবং প্রাতিষ্ঠানিক। সে সময়ে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, একনেক (ECNEC) থেকে মেগা প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম বোর্ডের মাধ্যমে সিলেবাস পরিবর্তনের মতো রাষ্ট্রীয় ম্যান্ডেট ব্যবহার করে উগ্রবাদকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। [১-৩] অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক শূন্যতা এবং পুলিশ বাহিনীর ভেঙে পড়ার সুযোগ নিয়ে যে সহিংসতাগুলো ঘটেছে, তা মূলত “অসংগঠিত মব ভায়োলেন্স” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা সংঘটিত অপরাধ, যার পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় ম্যান্ডেট বা কাঠামোগত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। [৪-৫] এই রিপোর্টটি তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক বক্তব্য, আইনি পরিসংখ্যান এবং কালানুক্রমিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই দুই ভিন্নধর্মী প্রেক্ষাপটের একটি বস্তনিষ্ঠ ও একাডেমিক ব্যবচ্ছেদ করবে। Competitive Islamization ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকার ২০১৩ সালের পর থেকে হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে একটি অঘোষিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর কৌশলগত আঁতাত গড়ে তোলে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামোতে ব্যাপক আদর্শিক পরিবর্তন সাধিত হয়। একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ তাদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর “ধর্মীয় কার্ড” অকার্যকর করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক ইসলামীকরণের (Competitive Islamization) পথ বেছে নেয়। ২.১ কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি এবং 'কওমি জননী' উপাধি ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির আন্দোলনের পর সরকার প্রাথমিকভাবে কঠোর অবস্থান নিলেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক মেরুকরণের স্বার্থে তাদের সাথে ব্যাপক আপসের পথ বেছে নেয়। [৬] ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই তোষণ নীতি চরম আকার ধারণ করে, যখন সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষার দুটি প্রধান ধারা রয়েছে: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত 'আলিয়া মাদ্রাসা' এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বেসরকারিভাবে পরিচালিত 'কওমি মাদ্রাসা'। [৭] কওমি মাদ্রাসাগুলো যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমের বাইরে নিজেদের তৈরি করা ধর্মীয় সিলেবাস অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে কোনো কাঠামোগত সমন্বয় বা আধুনিক পাঠ্যক্রম (যেমন- বিজ্ঞান, গণিত বা প্রযুক্তি) অন্তর্ভুক্ত করার শর্তারোপ ছাড়াই তাদের সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেওয়ার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। ১৩ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর 'দাওরায়ে হাদিস' (তাকমিল)-কে ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবি সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান প্রদান করে [৮]। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে জাতীয় সংসদে “কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮” সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় [৮]। এই আইনের মাধ্যমে দেশের প্রায় ১৪ হাজার কওমি মাদ্রাসার প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীকে রাতারাতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয় [৭]। এর ফলে কওমি মাদ্রাসার গ্র্যাজুয়েটরা কোনো আধুনিক বিজ্ঞান বা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার সংস্পর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রীয় চাকরিতে (যেমন- সরকারি স্কুল, কলেজ বা অন্যান্য দপ্তরে) প্রবেশের সুযোগ লাভ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে গভীর আদর্শিক প্রভাব ফেলার পথ সুগম করে [৭]। এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতির কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, ৪ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে 'আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ'-এর উদ্যোগে একটি বিশাল 'শোকরানা মাহফিল' বা সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয় [১০]। হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমির ও কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় 8। এই অনুষ্ঠানে লাখ লাখ কওমি ছাত্র ও আলেমের সামনে মাওলানা মুফতি রুহুল আমিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে “কওমি জননী” (Mother of Qawmi) উপাধিতে ভূষিত করেন [১০]। মুফতি রুহুল আমিন তার বক্তব্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি 'কওমি জননী'। আপনি যদি না থাকতেন, তবে সাহাবাদের শত্রু, আলেম-উলামাদের শত্রু এবং জামায়াতে ইসলামী ও আবুল আলা মওদুদীর অনুসারীরা এটি হতে দিত না” [১০]। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ রাজনৈতিক সংবর্ধনা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার সরকারের শীর্ষ নেত্রীর দ্বারা কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীর আদর্শিক বৈধতা গ্রহণের একটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত দলিল। ২.২ 'মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র' প্রকল্প: রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আদর্শিক আধিপত্য বিস্তার আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের ইসলামপন্থী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মীয় আবেদনকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে ব্যাপক ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণের এক নজিরবিহীন উদ্যোগ গ্রহণ করে। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাধারণত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনালয় নির্মাণে সরাসরি বিপুল অর্থায়ন করে না, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এই প্রথা ভেঙে দেয়। ১৫ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (ECNEC) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মোট ৫৬০টি “মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র” নির্মাণের মেগা প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। [২] এই প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট নির্ধারণ করা হয় ৯,০৬২ কোটি টাকা (যা প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য), যার মধ্যে সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। [২] পরবর্তীতে সৌদি আরব প্রতিশ্রুত ৮,১৬৯ কোটি টাকা প্রদানে অসম্মতি জানালে, সরকার সম্পূর্ণ নিজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা জাতীয় রাজস্ব থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। [১৩] ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুনিম হাসানের মতে, বিশ্বে এমন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই যিনি সরকারিভাবে এবং সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থায়নে এত বিপুল সংখ্যক মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। [২] বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় জনগণের নিজস্ব অর্থায়নেই মসজিদ নির্মিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই প্রথম রাষ্ট্র সরাসরি ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণে হস্তক্ষেপ করে। [২] এটি ছিল রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র থেকে সরে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি কাঠামোগত পদক্ষেপ। এই ৫৬০টি মডেল মসজিদে একত্রে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪৪০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ জন নারীর নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। এর পাশাপাশি এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর ১৪,০০০ শিক্ষার্থীকে কোরআনের হাফেজ হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি বছর ১৭,০০০ শিশুকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এই কেন্দ্রগুলোতে রাখা হয়। [২] সরকারের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ধর্মীয় বয়ান, খুতবা, হজ প্রশিক্ষণ এবং ইসলামিক সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুকৌশল প্রক্রিয়া ছিল। [২] এটি গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমন্বয়বাদী বা সিনক্রেটিক (syncretic) ধর্মীয় চর্চাকে কোণঠাসা করে রাষ্ট্র-অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট ও রক্ষণশীল ইসলামি আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ২.৩ স্কুল পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন: হেফাজতে ইসলামের দাবির কাছে কাঠামোগত আত্মসমর্পণ ২০১৭ সালের শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়, তা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছে রাষ্ট্রীয় আত্মসমর্পণের সবচেয়ে নগ্ন ও সমালোচিত উদাহরণ। [৩] হেফাজতে ইসলাম এবং কওমি ওলামা পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল, সেকুলার এবং হিন্দু লেখকদের লেখা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। তারা অভিযোগ করেছিল যে, পাঠ্যবইয়ে “নাস্তিক্যবাদী” এবং “হিন্দুত্ববাদী” ধারণা ছড়ানো হচ্ছে। [১৬] সরকার ভোটব্যাংকের কথা মাথায় রেখে তাদের প্রায় সব দাবি মেনে নেয়। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে 'ও' অক্ষর চেনাতে যুগ যুগ ধরে 'ও-তে ওল' (এক প্রকার কচু) ব্যবহার করা হতো। ২০১৭ সালের নতুন সংস্করণে তা পরিবর্তন করে 'ও-তে ওড়না' করা হয়। একটি ছোট্ট মেয়ে শিশুর ছবিতে ওড়না পরিয়ে এই শিক্ষা দেওয়া হয়, যা শিশু-শিক্ষার্থীদের মনে শৈশব থেকেই লিঙ্গ বৈষম্য এবং রক্ষণশীল ধর্মীয় পোশাকের ধারণা প্রবেশ করানোর একটি সচেতন রাষ্ট্রীয় চেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। [১৬] হেফাজতে ইসলামের সরাসরি দাবির প্রেক্ষিতে হিন্দু ও ধর্মনিরপেক্ষ লেখকদের রচিত ১৭টি কবিতা ও গল্প পাঠ্যপুস্তক থেকে কোনো প্রকার শিক্ষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছাড়াই সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলা হয়। [৩] এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী লেখক হুমায়ুন আজাদের লেখা কবিতা “বই”, যা পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ হেফাজতের দাবি ছিল এটি পবিত্র কোরআনের অবমাননা করে। [১৮] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্বকবির নাম এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী চরিত্রগুলোর নাম বিভিন্ন গল্প থেকে সুকৌশলে বাদ বা পরিবর্তন করা হয়। [১৬] পাঠ্যবইয়ের চিত্রায়নে ব্যাপক রক্ষণশীল পরিবর্তন আনা হয়। ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে স্বাভাবিক কথোপকথনের চিত্রগুলো মুছে ফেলা হয় এবং মেয়েদের ছবিতে বাধ্যতামূলকভাবে ওড়না বা হিজাব যুক্ত করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল, বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের বই থেকে মেয়েদের ঋতুস্রাব (period) সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরিভাষা এবং বয়ঃসন্ধিকালীন বৈজ্ঞানিক আলোচনা সরিয়ে ফেলা হয়, যা জনস্বাস্থ্য শিক্ষার পরিপন্থী। [১৬] শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলো (যেমন- উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ) এই পরিবর্তনের তীব্র প্রতিবাদ জানালেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। সমালোচনার মুখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) এই গভীর আদর্শিক পরিবর্তনগুলোকে শুধুমাত্র “ব্যাকরণগত সংশোধন” বা “পঠনযোগ্যতা বৃদ্ধি” বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। [৩] পরবর্তীতে জনরোষ প্রশমিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবি'র প্রধান সম্পাদক প্রীতিশ কুমার সরকার এবং সিনিয়র বিশেষজ্ঞ লানা হুমায়রা খানকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করে বলির পাঁঠা বানায়, যদিও কাঠামোগত সিদ্ধান্তগুলো সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই এসেছিল। [১৮] মূলত, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় ভোটব্যাংক নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে এভাবে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছিল। [১৭] ৩. মুক্তচিন্তা দমন ও ব্লগার হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তা এবং ভিকটিম ব্লেমিং (আওয়ামী লীগ আমল) ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সেকুলার ব্লগার, বিজ্ঞান লেখক, প্রকাশক এবং প্রগতিশীল অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর এক ভয়াবহ ও পদ্ধতিগত আক্রমণ শুরু হয়। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT), আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS) এবং ইসলামিক স্টেট (IS)-এর মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এই হত্যাকাণ্ডগুলোর দায় স্বীকার করে ২১। এই সময়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা ছিল চরম হতাশাজনক; তারা নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ছিল। ৩.১ নিহত সেকুলার ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের কালানুক্রমিক তালিকা (২০১৩-২০১৬) ২০১৩ সালে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ৮৪ জন সেকুলার ব্লগারের একটি “হিট লিস্ট” বা হত্যা-তালিকা প্রকাশ করে ২২। সরকার এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। নিচে চরমপন্থীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত প্রগতিশীল এবং ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের একটি কাঠামোগত কালানুক্রমিক চিত্র তুলে ধরা হলো [২২]: হত্যার তারিখ নিহতের নাম পরিচয়, প্রেক্ষাপট ও হত্যার ধরন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আহমেদ রাজীব হায়দার স্থপতি, সেকুলার ব্লগার এবং শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ঢাকার মিরপুরে নিজ বাড়ির সামনে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৫ নভেম্বর ২০১৪ শফিউল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বাউল মতাদর্শের অনুসারী। কট্টরপন্থীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞান লেখক, মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা। একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৩০ মার্চ ২০১৫ ওয়াশিকুর রহমান (বাবু) ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও লেখক। ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় দিনের বেলায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১২ মে ২০১৫ অনন্ত বিজয় দাশ বিজ্ঞান লেখক, মুক্তমনা ব্লগের লেখক এবং বিজ্ঞানমনস্ক কর্মী। সিলেটের সুবিদবাজারে নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর চারজন মুখোশধারী তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ৭ আগস্ট ২০১৫ নিলয় চট্টোপাধ্যায় (নিলয় নীল) সেকুলার ব্লগার। ঢাকার গোড়ানে নিজ বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ৩১ অক্টোবর ২০১৫ ফয়সাল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী (যিনি অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করেছিলেন)। শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৬ এপ্রিল ২০১৬ নাজিমুদ্দিন সামাদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ এক্টিভিস্ট। সূত্রাপুরে তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৫ এপ্রিল ২০১৬ জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয় জুলহাজ ছিলেন ইউএসএআইডি-র প্রাক্তন কর্মী, সমকামী অধিকার কর্মী এবং 'রূপবান' ম্যাগাজিনের সম্পাদক। কলাবাগানের বাসায় কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয়ে ঢুকে জুলহাজ ও তার বন্ধু তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৩.২ হত্যাকাণ্ডের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming) এই ধারাবাহিক ও বীভৎস হত্যাকাণ্ডের সময় সরকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা মুক্তচিন্তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। খুনিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা উল্টো ভিকটিমদেরই (নিহত ব্লগারদের) দায়ী করতে শুরু করেন। তাদের মূল কৌশল ছিল রাজনৈতিকভাবে “ধর্মবিরোধী” বা “নাস্তিকদের রক্ষক” তকমা থেকে নিজেদের দূরে রাখা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ও প্রশাসনিক শাস্তির হুমকি: ২০১৫ ও ২০১৬ সালে যখন একের পর এক ব্লগার খুন হচ্ছেন, তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “আমরা এটি বরদাস্ত করব না যদি কেউ অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসে আক্রমণ করে” (We will not tolerate it if you attack other's religious belief) ২৬। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, ধর্মের সমালোচনা করা বাকস্বাধীনতার অংশ নয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য “প্রশাসনিক শাস্তি” (administrative punishment) ভোগ করতে হবে [২৬]। এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান মূলত খুনিদের একটি প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছিলেন এবং মুক্তচিন্তকদের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়্গ নেমে আসার পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন [২৫]। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রতিক্রিয়া: ৬ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল খুনিদের বিচারের সুস্পষ্ট আশ্বাস দেওয়ার আগে বলেন, সরকার তদন্ত করে দেখবে যে সামাদ তার ব্লগে কোনো “আপত্তিকর” বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কিছু লিখেছিলেন কি না [২৯]। এটি ছিল ক্লাসিক ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming), যেখানে হত্যার শিকার ব্যক্তির লেখাকেই হত্যার যৌক্তিকতা বা কারণ হিসেবে আগে যাচাই করা হচ্ছিল। সজীব ওয়াজেদ জয়ের রয়টার্স সাক্ষাৎকার: নভেম্বর ২০১৫ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র এবং আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সরকারের রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও কৌশলগত আপসের বিষয়টি খোলাখুলি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমরা এখানে একটি সূক্ষ্ম সুতোর ওপর হাঁটছি (walking a fine line)... আমরা নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমাদের বিরোধী দল প্রতিনিয়ত আমাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করে, তাই আমরা জোরালোভাবে তার (অভিজিৎ রায়ের) পক্ষে অবস্থান নিতে পারি না। এটি বাস্তবতার চেয়েও পারসেপশনের (উপলব্ধি) বিষয়” [৩০]। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই বক্তব্যগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আওয়ামী লীগ তার ঐতিহাসিক সেকুলার ইমেজ বিসর্জন দিয়ে উগ্রপন্থীদের খুশি রাখতে এবং নিজেদের ভোটব্যাংক সুরক্ষিত করতে মুক্তচিন্তকদের বলির পাঁঠা বানিয়েছিল। রাষ্ট্রের এই নীতির ফলে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে চরম ভীতি এবং সেলফ-সেন্সরশিপ (Self-censorship) তৈরি হয়, এবং অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন [২১]। ৪. ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে আইনের অপপ্রয়োগ এবং কাঠামোগত নিপীড়ন (আওয়ামী লীগ আমল) আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্নমত দমনের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিবর্তনমূলক সাইবার আইন প্রণয়ন করেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ২০১৮ এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) ২০২৩-এর মাধ্যমে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”-এর মতো অস্পষ্ট ও বিস্তৃত দোহাই দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হয়রানি, বিনা বিচারে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে [৩১]। ৪.১ আইসিটি অ্যাক্ট (ধারা ৫৭), DSA এবং CSA-এর পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট ব্রিটিশ আমলের প্যানেল কোড ১৮৬০-এ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও, আওয়ামী লীগ সরকার সাইবার আইনগুলোর মাধ্যমে এর শাস্তি এবং অপপ্রয়োগের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় [৩১]। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা: ২০০৬ সালে প্রণীত এই আইনের ৫৭ ধারাটিকে সরকার ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরও ভয়ংকর রূপ দেয়। এটিকে আমলযোগ্য (cognizable) ও অজামিনযোগ্য (non-bailable) করা হয় এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয় [৩৩]। এই ধারায় বলা হয়েছিল, কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ করা যা “ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত বা মে কজ হার্ট টু রিলিজিয়াস বিলিফ” করতে পারে, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শুধুমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৫৭ ধারার অধীনে ১,২৭১টি চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। [৩১] সাইবার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মো. নজরুল ইসলাম শামীম ২০১৭ সালে স্বীকার করেন যে, এই মামলাগুলোর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আদালতে প্রমাণ করা যায়নি, অর্থাৎ এগুলো মূলত মানুষকে হয়রানি করার জন্য “বানোয়াট” মামলা ছিল। [৩৩] ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ২০১৮: দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার ৫৭ ধারা বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে সরকার আরও কঠোর ও ড্রাকোনিয়ান 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA)' প্রণয়ন করে [৩৩]। এই আইনের ২৮ ধারায় “ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধের ওপর আঘাত” হানার শাস্তি হিসেবে অত্যন্ত কড়া বিধান রাখা হয়, যা মূলত বাকস্বাধীনতা হরণের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয় [৩১]। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই কালো আইনে ৭,০০০-এর বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় [৩১]। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে সরকার নাম পরিবর্তন করে 'সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA)' আনলেও, দমনমূলক ধারাগুলো প্রায় অপরিবর্তিত থাকে [৩১]। [দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য] তথ্যসূত্র তালিকা [১] বিটিআই (BTI), ২০২৬ বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট: বিটিআই ২০২৬, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://bti-project.org/en/reports/country-report/BGD [২] মডেল মসজিদ - সিরামিক বাংলাদেশ ম্যাগাজিন, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://ceramicbangladesh.com/wp-content/uploads/2024/09/6th-Issue.pdf [৩] সংশোধন, কিন্তু স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে কোনো পরিবর্তন নেই - ঢাকা ট্রিবিউন, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.dhakatribune.com/bangladesh/education/37092/corrections-but-no-changes-in-school-textbooks [৪] আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মার্কিন কমিশন (USCIRF), ২০২৫ ফ্যাক্টশিট: বাংলাদেশ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.uscirf.gov/sites/default/files/2025-07/2025%20Factsheet%20Bangladesh.pdf [৫] বাংলাদেশ পদত্যাগ-পরবর্তী সহিংসতা (২০২৪–২০২৬) - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_post-resignation_violence_(2024%E2%80%932026 [৬] বিশ্লেষণ | হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশে মোদি-বিরোধী বিক্ষোভের নেপথ্যে থাকা গোষ্ঠী - দ্য হিন্দু, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.thehindu.com/news/international/analysis-hefazat-e-islam-the-group-behind-anti-modi-protests-in-bangladesh/article34199332.ece [৭] বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে শ্বেতপত্র, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://bdplatform4sdgs.net/wp-content/uploads/2025/02/Final-Draft_Unedited_0911-hrs_Compiled-Report-without-Front-and-Back-Cover.pdf [৮] কওমি ডিগ্রির স্বীকৃতি: প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার পরিকল্পনা করছেন হেফাজত নেতা শফি - বাংলা ট্রিবিউন, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.banglatribune.com/others/news/14845/Qawmi-degree-recognition-Hifazat%E2%80%99s-Shafi-plans [৯] বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/Bangladesh_Qawmi_Madrasa_Education_Commission [১০] শুকরানা মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীকে 'কওমি জননী' উপাধি প্রদান, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.banglanews24.com/national/news/bd/71993.details [১১] কন্টেন্ট সূচি, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://objectstorage.ap-dcc-gazipur-1.oraclecloud15.com/n/axvjbnqprylg/b/V2Ministry/o/office-bard/2024/12/eb31a98ba85745f6b7b954a4bf826821.pdf [১২] রাষ্ট্র, কওমি মাদ্রাসা এবং বাংলাদেশের শিশু: একটি সামাজিক সুরক্ষা দৃষ্টিভঙ্গি, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.academia.edu/95131313/State_Qawmi_Madrasas_and_Children_in_Bangladesh_From_a_Social_Protection_Perspective [১৩] একনেক প্রতিটি উপজেলায় মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করেছে, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.albd.org/articles/news/28894/ECNEC-okays-project-to-build-model-mosques-and-Islamic-Cultural-Centres-in-every-upazila [১৪] মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণে বাংলাদেশ সরকার ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে: ডেপুটি হাই কমিশনার, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.brecorder.com/news/40238332 [১৫] পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধ: "ধর্মনিরপেক্ষতা" নাকি "অ-ধর্মনিরপেক্ষতা"? বাংলাদেশের একটি জটিল মামলা, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.tandfonline.com/doi/full/[১০].[১০]80/23311886.2021.1928979 [১৬] আপনি স্কুলে কী শিখেছেন? 'B' তে কি ব্যানানা (কলা)? নাকি বোরকা? - ওয়ার্ল্ড এডুকেশন ব্লগ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://world-education-blog.org/2017/02/08/what-did-you-learn-in-school-is-b-for-banana-or-burka/ [১৭] বাংলাদেশ: ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে খুশি করতে পাঠ্যপুস্তক কি পরিবর্তন করা হচ্ছে? - প্রতিবেদন ও মন্তব্য, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.sacw.net/article13130.html [১৮] ২০১৭ বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক সমালোচনা - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/2017_Bangladesh_textbooks_criticism [১৯] রিসার্চ রিপোর্ট ৮ - হেফাজতে ইসলাম এবং বাংলাদেশে ইসলামি চ্যালেঞ্জ - SADF, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.sadf.online/research-report-8-the-hefazat-e-islam-and-the-islamist-challenge-in-bangladesh/ [২০] হেফাজতে ইসলাম এবং বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি - MP-IDSA, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://idsa.in/publisher/issuebrief/hefajat-e-islami-and-the-politics-of-islamism-in-bangladesh [২১] বাংলাদেশে ব্লগার, অ্যাক্টিভিস্ট এবং অধ্যাপকদের হত্যার নেপথ্যে কী? | পিবিএস নিউজ (PBS News), সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.pbs.org/newshour/world/whats-behind-the-killings-of-bloggers-activists-and-professors-in-bangladesh [২২] বাংলাদেশে ইসলামি চরমপন্থীদের হামলা - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/Attacks_by_Islamic_extremists_in_Bangladesh [২৩] বাংলাদেশে ব্লগিং করার কারণে আপনি প্রাণ হারাতে পারেন - অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.amnesty.org/en/latest/campaigns/2015/11/in-bangladesh-blogging-can-get-you-killed/ [২৪] বাংলাদেশ: ব্লগার হত্যাকাণ্ড বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত | হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.hrw.org/news/2015/05/12/bangladesh-killing-blogger-blow-free-speech [২৫] বাংলাদেশের ব্লগাররা রাষ্ট্রীয় হুমকির আশঙ্কায় রয়েছেন - ভিওএ (VOA), সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.voanews.com/a/bangladesh-bloggers-fear-threat-from-the-state/2960088.html [২৬] ২০২৪ মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক কান্ট্রি রিপোর্ট: বাংলাদেশ - মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.state.gov/reports/2024-country-reports-on-human-rights-practices/bangladesh [২৭] ২০১৪ মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক কান্ট্রি রিপোর্ট - বাংলাদেশ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.refworld.org/reference/annualreport/usdos/2015/[১০]5881 [২৮] মানবাধিকার রিপোর্ট: কাস্টম রিপোর্ট সারাংশ - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্টেট ডিপার্টমেন্ট, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.state.gov/report/custom/22dab0e95a [২৯] স্থিতিস্থাপকতার পথ: দক্ষিণ এশিয়ায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ২০১৫-১৬, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://unesdoc.unesco.org/ark:/48223/pf0000244731 [৩০] এশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক রিভিউ ২০১৬ - IDSA, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://idsa.in/system/files/book/book_ASR2016.pdf [৩১] দমন-পীড়নের নতুন মোড়ক: সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং চলমান... - অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.amnesty.org/en/wp-content/uploads/2024/08/ASA1383322024ENGLISH.pdf [৩২] দমন-পীড়নের নতুন মোড়ক: সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং বাংলাদেশে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে চলমান আইনি লড়াই - রিলিফওয়েব, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://reliefweb.int/report/bangladesh/repackaging-repression-cyber-security-act-and-continuing-lawfare-against-dissent-bangladesh [৩৩] সমালোচনার কোনো জায়গা নেই: বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া মন্তব্যের ওপর দমন-পীড়ন... - হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.hrw.org/report/2018/05/[১০]/no-place-criticism/bangladesh-crackdown-social-media-commentary [৩৪] ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন: বাংলাদেশের জম্বি সাইবার সিকিউরিটি আইন - ক্লুনি ফাউন্ডেশন ফর জাস্টিস, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://cfj.org/wp-content/uploads/2024/11/Bangladesh-ICT-Act-Report_November-2024-1.pdf [৩৫] বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে | আল জাজিরা মিডিয়া ইনস্টিটিউট, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://institute.aljazeera.net/en/ajr/article/1872 [৩৬] বাংলাদেশ - ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডারস, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.frontlinedefenders.org/sites/default/files/dsa_report.pdf [৩৭] ডিএসএ (DSA) বাতিল হলেও ভুক্তভোগীরা অনিশ্চয়তায় - নেত্র নিউজ, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://netra.news/2025/dsa-repealed-but-victims-suffer/ [৩৮] কান্ট্রি পলিসি এবং ইনফরমেশন নোট: ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং নাস্তিক, বাংলাদেশ, জুন ২০২৫ - GOV.UK, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.gov.uk/government/publications/bangladesh-country-policy-and-information-notes/country-policy-and-information-note-religious-minorities-and-atheists-bangladesh-june-2025 [৩৯] বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে - ভিওএ (VOA), সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.voanews.com/a/in-bangladesh-religious-minorities-targeted-during-political-unrest/7750077.html [৪০] ২০২৪ বাংলাদেশ হিন্দু-বিরোধী সহিংসতা - উইকিপিডিয়া, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://en.wikipedia.org/wiki/2024_Bangladesh_anti-Hindu_violence [৪১] বাংলাদেশ: হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে - অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.amnesty.org/en/latest/news/2024/08/bangladesh-interim-government-must-take-immediate-actions-to-protect-hindu-and-other-minority-communities/ [৪২] 'আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই': হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে হামলার মুখে হিন্দুরা - আল জাজিরা, সংগৃহীত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, https://www.aljazeera.com/features/2024/12/12/our-lives-dont-matter-in-post-hasina-bangladesh-hindus-fear-future

No comments:

Post a Comment