Sunday, 9 August 2026
‘জুলাই ব্যর্থ হয়েছে’ বেশ আজগুবি একটা বয়ান।
১
একজন ইউটিউবার আমাকে অনুরোধ করেছিলেন ‘জুলাই’র ব্যর্থতাগুলো’ নিয়ে তার ইউটিউব চ্যানেলে কিছু কথা বলার জন্য । বলেছিলাম—'স্যরি ভাই, আমি নিজেও জানতে এবং শিখতে চাই। অন্য কাউকে আনুন। যিনি ব্যর্থতাগুলো ভাল ধরতে পারবেন। আমার সঙ্গে ভিডিও লিংকটি শেয়ার করবেন। আমার খুব বোঝার আগ্রহ!’
তিনি এখনো শেয়ার করেননি। ফলে আমার জ্ঞানার্জন এখনো বাকি।
তবে স্বল্প জ্ঞানে যেটুকু বুঝি—‘জুলাই ব্যর্থ হয়েছে’ বেশ আজগুবি একটা বয়ান। ঠিক আজগুবি নয়; মতলবি।
জুলাই ব্যর্থ হলে রাতে ভোট কেন হলো না? গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলো কীভাবে? নতুন সরকার দেশ চালাচ্ছে কীভাবে? শেখ হাসিনা দেশে নাই কেন? পালালো কেন? তার সীমাহীন ক্ষমতার প্রাসাদ ধ্বসে গেল কেন? পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজ, হেভিওয়েট নেতানেত্রী, যুব-ছাত্র-ওলামা-মুন্সি বিশাল সাঙ্গাতকূল গর্তে কেন?
কেউ কেউ দেখছি বয়ানটিকে যতোভাবে সম্ভব প্রতিষ্ঠিত করতে জানপ্রাণ বাজি রেখে নেমেছে। আমার ধারনা পেছনের উদ্দেশ্য বিশাল একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করা—যে জনগোষ্ঠীটি থাকবে সন্দিগ্ধ, হতাশ ও বিভ্রান্ত। সবসময় ভাববে—‘আমরা বোধ হয় ২০২৪-এ আসলে ভুলই করেছিলাম’!
২
যারা আরেকটু চালাক চতুর, তারাই সম্ভবত আরেকটু কৌশলী বয়ান এস্টাব্লিশ করতে নেমেছে। তারা বলে—বলতে চাইছি জুলাই স্পিরিট বিচারে--প্রত্যাশা, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি মানদন্ডে ব্যর্থ হয়েছে।
চাওয়া-পাওয়ার মিসম্যাচ হলেই জুলাই ব্যর্থ?
প্রত্যাশা করেছিলাম দাওয়াতকারী কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়াবে। কিন্তু খাওয়াল মুরগি পোলাও। এখন ‘কিছুই খেতে দিল না’ বা ‘খাইনি’ বা ‘দাওয়াতটিই ব্যর্থ’ বলব? এ রকম ভাষ্য-বয়ান চাতুরি ছাড়িয়ে শঠতার পর্যায়ের নয় কি? না কি নেহাতই নাদানি, না বুঝে, না ভেবেচিন্তেই কনক্লুশনে জাম্প করা?
গুম-খুন কি হচ্ছে? ক্রসফায়ার? আয়নাঘর? কমনরুম কালচার, গেস্ট রুম অত্যাচার? সংসদে রাজবন্দনার গানবাজনা? ফেসবুকে তীর্যক কিছু লিখলেই ১৪টি মামলা? পুলিশ-ডিবি-র্যাবের আত্মীয়-স্বজন ভাইবোনদের বাড়িতে পৌঁছে যাওয়া? মিটমাটের জন্য থানায় এত্তেলা? নগদ নারায়নসহ যথাসময়ে যাবার আল্টিমেটাম। ইত্যাদি ইত্যাদি? (তালিকা দিতে গেলে হাজারটা দেওয়া যাবে!)
প্রত্যাশা তো কতো কী-ই থাকে! কার না থাকে? নিজের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গেলেও দেখি টেনেটুনে দশ ভাগের কাছাকাছিও মেটেনি। বলব আমি এবং আমার জীবন ব্যর্থ? দশভাগ সাফল্য নিয়েও শোকর আলহামদুলিল্লাহ বলতে থাকার মত অনেক অনেক বিষয়ই কি আমার প্রাপ্তির ঝুলিতে নেই?
অনেকেরই বোধ হয় প্রত্যাশা ছিল জুলাই বাংলাদেশকে একটি ফেরেশতানগর-এ পরিণত করবে! অথচ, বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথীবির যে কোনো দেশেই গণঅভ্যুত্থানের পর গড়ে কমপক্ষে দুইটি বছর থাকে চরম বিশৃংখলার। অন্তর্ঘাত-প্রতিবিপ্লব-গৃহযুদ্ধ, রক্তপাত ইত্যাদির উদাহরণও অনেক।
ফরাসি বিপ্লবে আস্ত রাজতন্ত্রের পতনের পরও গৃহযুদ্ধ ছিল দশ বছর।
স্পেনে ১৯৩১ সালে রাজতন্ত্রের পতনের পর স্পেনীয় দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৩৬ সালে জেনারেল ফ্রাঙ্কো অভ্যুত্থান ঘটায়। পরের তিন বছরের গৃহযুদ্ধে মারা পড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ।
মিশরে ২০১১র আরব বসন্তের পর ২০১৩ পর্যন্ত কী হয়েছে, এখনো কি চলছে?
সুদান ২০১৯এ ওমর আল-বশির-এর পতন হতে ২০২৩ পর্যন্ত চার বছর নরক হয়ে ছিল।
২০০১-এ কাবুলে তালেবানদের পতনের পর নরক হয়ে ছিল পরের কুড়ি বছর।
লিবিয়ায় ২০১১তে গাদ্দাফির পতনের পর পনের বছর চলছে। হাফতার বাহিনী চালাচ্ছে সমান্তরাল সরকার।
আর কত উদাহরণ লাগবে? ইয়েমেন ভুগেছে ২০১১ হতে ২০১৭ পর্যন্ত, নিকারাগুয়া ১৯৭৯ হতে ১৯৯০ পর্যন্ত, কম্বোডিয়ায় ১৯৭৯ হতে ১৯৯৮, মিয়ানমারে তো ২০২১ সালে অগণিত ছাত্রের প্রাণহানির পরও গণআন্দোলনটি সাফল্যই পেল না। গণঅভ্যুত্থানও হয়ে উঠতে পারল না।
৩
‘জুলাই ব্যর্থ’ বা ‘জুলাই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ’ বয়ানগুলো কি সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার টেকনিক নয়?
টেকনিকটির লক্ষ্য কি বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে শক্তিমত্তার দিকটি দূর্বল করে দেওয়া নয়? যাতে জুলাই-এর শত্রুপক্ষ জোরদার প্রত্যাঘাত দিয়ে ফেরার বা মাঠ দখলে নেবার চেষ্টাকালেও বিশাল একটি গোষ্ঠী নিষ্ক্রিয় থাকে? যাতে ভাবে—ধূর, আমার কী! আগে একবার ভুল করেছিলাম, আবারো ভুল করব?
এ রকম বিভাজিত একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করার প্রকল্পটি পরাজিতদের সজ্ঞান ও সুপরিকল্পিত কৌশল নয় তো?
‘ব্যর্থ’ লেবেলটি ক্লাসিকাল ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’এর প্রো ভার্সন নয় তো? শেখ হাসিনা ষোলো বছর টিকে ছিল ‘বিভাজন’এর রাজনীতি দিয়েই।
নিস্পৃহ, নির্বিকার, হতাশ ও ঝিমুনিবাদী জনগোষ্ঠী তৈরির চলতি প্রজেক্টটি একই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ ধরণের সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার-এর সময়োপযোগী মডিফাইড ভার্সন সন্দেহ করা কি ভুল হবে?
‘পলাশীর আম্রকাননে সিরাউদ্দৌলাহর বাহিনী যখন কচূকাটা হচ্ছিল, অদূরেই ক্ষেত-খামারে কৃষকেরা ছিল নির্বিকার ও নিরুৎসাহী। নিত্যদিনের মতই তারা নিড়ানী দিচ্ছিল, হালচাষ করছিল। ভাবছিল, ধুর আমার কী! এগুলো রাজা-উজিরের ব্যাপার। ওদের সাপোর্ট দিয়ে আগে অনেক ভূল করেছি’।
ফলাফল দুইশ’ বছরের গোলামি। ব্রিটিশরা না কি ‘বিভাজন’ টেকনিকটির সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিল পলাশি তৈরির আগে আগেই! অন্যভাবে বলা যায়, এই টেকনিকেই ব্রিটিশরা পলাশি জেতে, ভারতবর্ষ দখলে নেয়!
৪
জুলাই-এর অব্যবহিত পরের অন্তর্বর্তি সরকার দেবরাজ জিউসের পারিষদ ছিল না। ভুলভাল তাদেরও ছিল। থাকা স্বাভাবিক। ভোটে নির্বাচিত চলতি গণতান্ত্রিক সরকারও নানা হাবিজাবি কাজকর্ম ও ভুলভাল করছে। লক্ষণ বলছে আরো অনেক ব্লান্ডারই করবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সহজ নিয়ম--সরকার প্রতিবাদযোগ্য কাজ করলে প্রতিবাদ হবে, প্রতিরোধযোগ্য হলে প্রতিরোধ হবে। বাংলাদেশের চলতি সরকারও ফের শেখ হাসিনার শাসনের স্টাইল ধরলে পরিণতি হবে শেখ হাসিনার মতই। এ সবই ইতিহাসের পরম্পরা।
সরকারে থাকলে দায়িত্ব, বিবেচনাবোধ, সহনশীলতা, সহ্যক্ষমতা অনেক বেশি থাকা বাধ্যতামূলক। গন্ডারের চামড়াও হতে হয় সময় সময়। বিরোধীদের জন্য বিষয়টা অতোটা বাধ্যতামূলক নয়। বিরোধীপক্ষ বিরোধিতার খাতিরে, মাঠ গরম রাখার প্রয়োজনে, প্রাসঙ্গিক ও দৃশ্যমান থাকার প্রয়োজনে; শুধুই বিরোধিতার জন্য হলেও বিরোধিতা চালিয়ে যাবেই।
বিরোধীপক্ষের ভাগে যেহেতু পুলিশ-মিলিটারি, ক্ষমতা, আমলা, প্রশাসন, বিদেশভ্রমণ, অর্থকড়ির সুযোগ-সুবিধার কিছুই নেই—তারা এমনিতেই আশিভাগ ব্যাকফুটে থাকে। তাই তাদের ‘কম্পেন্সেটরি এলাউন্স’ হিসেবে সরকারকে অনেক ছাড় দিতে হয়, অনেক কিছু এলাউ করতে হয়। তারা ঘেউ করলেই সরকারপক্ষকে পালটা ঘেউ করতে হয় না। ‘ক্ষতিপূরণ’ ধরে নিয়ে এলাঊ করতে হয়। অর্থাৎ, দাঁত্-মুখ খিঁচে হলেও অনেক উৎপাত সহ্য করে যেতে হয়।
কিন্তু, সরকারি দলের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে এই সামান্য সিভিক পলিটিক্যাল সেন্সটুকু তৈরির চেষ্টাটুকুই তো নেই সরকার মহলের। মাঠের এবং ফেসবুকের গরম দেখে মনে হচ্ছে—'যেমন বুনো ওল, তেমন বাঘা তেঁতুল' অবস্থা। সরকারি অবস্থান ‘যেমন কুকুর, তেমন মুগুর’! তো এই ব্যর্থতার দায় তো সরকারের!
৫
জুলাইযোদ্ধারা সবাই কি ফেরেশতা? এটা কি কখনো সম্ভব? তাদের অনেকেই জুলাই বেচেছে, নানারকম ধান্দাবাজির চেষ্টা করছে, অপরাধ-অপকর্মে নেমেছে, বাড়াবাড়ি আচরণ করেছে, অপরিপক্ক ও অপরিণত আচরণ দেখিয়েছে, আবার সবকিছুতে অ্যামনেস্টি চাওয়ার মানসিকতাও দেখিয়েছে।
তাতে কি জুলাই ব্যর্থ হয়ে যায়? না কি জুলাইশক্তির সকলকেই পাইকারি হারে দায়ী করা যায়?
শুধু পাটোয়ারিই নয়, আরো অনেক রাজনীতিকেরই মাঠের ভাষা-ব্যবহার করার পাঠ নিতে হবে। এনসিপি সমর্থকদের কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি--পাটোয়ারি তার নিজস্ব ভাষাশৈলি, ম্যানারিজম ও প্রকাশভঙ্গি দিয়ে একটা স্বতন্ত্র পার্সোনা তৈরি করতে পেরেছে, অনেকেই এই স্টাইল পছন্দও করে। আমার সোজাসাপ্টা কথা—এই ধরণের হাটুরে চিন্তার জগদ্দল হতে বেরিয়ে আসতে হবে।
বের হয়ে আসতে হবে কারণ, এই সময়ে এসে রাজনীতিবিদের ভিশন লাগবে ‘স্টেটসম্যান’-এর। বিনোদনদাতা বা বানর নাচ দেখানো ক্যানভাসারদের মত আকর্ষণীয় না হয়ে যাবার।
একবিংশ শতকের এই সময়ে এসে কেউ যদি আঞ্চলিক রাজনীতি বা স্থানীয় রাজনীতিই করে যাব ভেবে থাকে, সে এমপি-মন্ত্রি হলেও মানে-জ্ঞানে হবে বড়জোর ইয়াবা বদি বা মমতাজ, বড়জোর জয়নাল হাজারি গোছের।
তাদের ভাবনায় যদি না থাকে পৃথীবির যে কোনো ফোরামে ও আসরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকদের টেবিলে-পোডিয়ামে সমান দর্শনদারী ও গুণবিচারি হিসেবে উপস্থিত হতে হবে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বা জুলাইয়ের সফলতা-ব্যর্থতা—সকল আলোচনাই বৃথা!
৬
লাস্ট বাট নট লিস্ট, আমার কাছে বছরের সেরা অবিশ্বাস্য ঘটনা মনে হয়েছে রাশেদ খান ও নূর-এর পদায়ন।
প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনাবোধের পারমূটেশন-কম্বিনেশন-কম্প্রিহেনশন তো আর আমি বুঝব না। হয়ত তিনি সজ্ঞানেই কাজটি করেছেন ভেবে তাদের পারফরমেন্সের কিছু নমূনা (এই যেমন টিভি উপস্থিতি ইত্যাদি) দেখলাম।
দেখেটেখে আমার আশ্চর্য হওয়া না কমে আরো বাড়ল। উল্টো নতুন ভাবনা বাড়ল—এইরকম ভাই-বেরাদার পন্থার পরিণামে গিয়াস মামুন বিষয়ক তাঁর মহাভোগান্তির ঘটনাটিও কি তিনি বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন?
Subscribe to:
Posts (Atom)