Tuesday, 24 March 2026
স্বপ্নের রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'
তেইশে মার্চ ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব দিবস। পাকিস্তানীরা এ দিনটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস বা পাকিস্তান ডে হিসেবে পালন করে। পাকিস্তান আমলে আমরাও করতাম। এখন আর করিনা। করলেও দোষ ছিলনা। কেননা এই অভিন্ন ইতিহাস ও সংগ্রামের অংশীদার ছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরাও। ইতিহাসের কোনো ভূমিকা বা গৌরব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ইতিহাসকে খণ্ডিত করার ফল ভালো হয় না। আমরা কোনো দিবস পালন না করলেও এর তাৎপর্য নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাটা অন্তত থাকা উচিৎ। সব দেশেই সেটা হয়। রাজনীতিবিদেরা এড়িয়ে গেলেও একাডেমিশিয়ান, ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকেরা সেটা করেন। আমাদের দেশে সেটাও হয় না। আমরা হাজার বছরের চিরায়ত ইতিহাসের ভুয়া আওয়াজ দিয়ে আমাদের ভুল-ভাল ও মতলবি ইতিহাসের শুরুই করি বিংশ শতাব্দির পঞ্চাশের দশক থেকে।
লাহোর প্রস্তাব নিয়ে অনেকের অনেক রকম বিশ্লেষণ রয়েছে। বিশদ পর্যালোচনায় না গিয়ে এ সম্পর্কে আমি একটু তির্যক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমার নিজের সামান্য কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি।
🔴 ইতিহাসের অনেক ব্যাখ্যাহীন বাস্তবতা থাকে। 'লাহোর প্রস্তাব' হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক রেজুলিউশানটির মুসাবিদা রচনা করেছিলেন মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খান। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমির প্রস্তাবের খসড়া রচনাকারী জাফরুল্লাহ্ খান শিয়ালকোটের এক কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সন্তান ছিলেন। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির বিরোধিতাকারী ধর্মতাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী পরবর্তীকালে পাকিস্তানে এসে বসত গড়েন এবং কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। সেই আহমদিয়াদেরকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার পাকিস্তানে অমুসলিম ঘোষণা করে।
🔴 ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর কনফারেন্সে আমাদের শেরে বাঙ্গলা এ.কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব পাঠ করেন এবং লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি অর্জন করেন। লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও পরে এই প্রস্তাব 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও পরিচিতি অর্জন করে। বাঙলাভাষী মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল হক এই প্রস্তাবের উত্থাপক হলেও সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ এ প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা দেয় তার সঙ্গে মুসলিম লীগের বাঙলাভাষী অন্য তিন নেতা দ্বিমত পোষণ করেন। আবুল হাশিম দাবি করেন, লাহোর প্রস্তাব অনুসারে ইন্ডিয়ার পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দু'টি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গড়তে হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবিভাজনের বিরোধিতা করে অখণ্ড বাংলা প্রদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসামকেও পাকিস্তানভূক্ত করার দাবি জানান।
🔴 মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্'কে পাকিস্তানের রূপকার হিসেবে 'কায়েদে আযম' বা মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে তিনি পাকিস্তান নামটির উদ্ভাবক নন। কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনিই প্রথম ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে প্রদত্ব ভাষণে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তবে পাকিস্তান নামটি তাঁরও দেয়া নয়। ইকবালের স্বপ্নের ভারতীয় মুসলিমদের সেই রাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামো ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের সমন্বয়ে। বেঙ্গলের অন্তর্ভূক্তির কথা তাতে ছিল না।
🔴 ১৯৩৩ সালে কেম্ব্রিজ-এ আইন পড়ুয়া পাঞ্জাবি ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী ভারতীয় মুসলমানদের স্বপ্নের রাষ্ট্রের 'পাকিস্তান' নামটি প্রথম উদ্ভাবন করেন। পাঞ্জাবের P, আফগান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (আফগানিয়া)-এর A, কাশ্মিরের K, সিন্ধু বা Indus region-এর I (আই) এবং বেলুচিস্তানের STAN নিয়ে PAKISTAN রাষ্ট্রের নামকরণ করেছিলেন তিনি। এর ভেতরেও বেঙ্গল ছিল না। চৌধুরী রহমত পূর্বভারতে বাঙলাভাষী মুসলমানদের জন্য 'বাঙ্গিস্তান' নামে এবং দাক্ষিণাত্যের মুসলমানদের জন্য 'ওসমানিস্তান' নামে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাঙ্গিস্তান নামে না হলেও অন্য নামে আমরা সে রাষ্ট্র স্থাপন করি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইন্ডিয়ার সহায়তায় যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে।
🔴 পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল হাজার মাইল দূরের দু'টি অঞ্চল নিয়ে। ইন্ডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশ - পাঞ্জাবের অংশ বিশেষ, সিন্ধু, আফগানিস্তানের পাখতুন এলাকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বেঙ্গলের পূর্ব অংশের সমন্বয়ে। আমাদের প্রদেশটির নাম ছিল পূর্ব বঙ্গ বা ইস্ট বেঙ্গল। তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে, এই পূর্ব বঙ্গের লোক বলে পরিচিত দু'জন নেতাই কিন্তু এই পূর্ব বঙ্গ নামটাও মুছে দিয়ে এই প্রদেশের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। এরা হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ আলী এক ইউনিট ব্যবস্থা প্রবর্তন করে পশ্চিমের চার প্রদেশকে একত্র করে পশ্চিম পাকিস্তান নামে এক প্রদেশ বানান। আর পূর্ব বঙ্গের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। মোহাম্মদ আলীর আইন মন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনা করেন এবং তাতে এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দেন। ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন হিসেবে সৃষ্ট পাকিস্তান এই শাসনতন্ত্রের আলোকে রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা অর্জন করে। সোহরাওয়ার্দী রিপাব্লিকের প্রথম প্রধানমমন্ত্রী হন। সোহরাওয়ার্দীকে হটিয়ে ইস্কান্দর মীর্জা এবং তাকে হটিয়ে জেনারেল আইউব ক্ষমতা দখল করেন। আইউব শাসনতন্ত্র স্থগিত করলেও এক ইউনিট ও পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ ঠিক রাখেন এবং মূলতঃ তার হাতেই এই পরিকল্পনা কার্যকারিতা পায়।
🔴 পাকিস্তান শব্দটি উদ্ভাবন ও মুসলিম লীগ গঠনেরও আগে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য আলাদা বাসভূমির ধারণা প্রথম তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে তা বিকশিত হতে থাকে প্রধানত আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে। সেই আলীগড় বা উত্তর প্রদেশ স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমির বাইরে রয়ে যায়। পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ গঠনে শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা এবং বাঙলাভাষী মুসলমানেরা নেতৃস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু কালক্রমে এরা সকলেই পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের কাছে লাঞ্ছিত হতে থাকে। মুসলিম অধ্যুষিত ও মুসলিম শাসিত স্বাধীন বা স্বায়ত্বশাসিত দেশজ রাজ্যগুলো ভারত ছলে-বলে-কলে-কৌশলে দখল করে। ইন্ডিয়ার অন্যান্য প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা অবর্ননীয় দুর্দশার মুখে পড়ে।
🔴 নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আমরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্বেও আমাদের ওপর পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য-নির্যাতন যেমন সত্য ছিল, তেমনই সমান সত্য হচ্ছে, আজকের বাংলাদেশ যদি ১৯৪৭ সালে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান-এর অন্তর্ভুক্ত না হ'তো তা'হলে আমাদের পরিণতিও ইন্ডিয়ার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মতই হোতো। স্বাধীনতার স্বপ্ন আর দেখতে হতো না।
🔴 পাকিস্তানকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে যতই নিন্দা করা হোক না কেন, আসলে ব্রিটিশের ডিভাইড এন্ড রুল অপকৌশল উপমহাদেশে যে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু দলনের বাস্তবতা তৈরি করেছিল সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানেরা তার ভিক্টিম ছিল এবং এ থেকে রেহাই পেতেই স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। কেবল ধর্মীয় নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারসহ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব বিবেচনাতেই সে সময় পাকিস্তান অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। ইংরেজ শাসক ও উপমহাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল কংগ্রেসের পক্ষে সে বাস্তবতা অস্বীকার বা রোধ করা সম্ভব ছিল না।
🔴 ১৯৭১ সালে আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলকে যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ নামের আলাদা রাষ্ট্র গড়েছি। তবে এই রাষ্ট্রের চরিত্র, কোর ভ্যালুজ বা অন্তর্নিহিত মূল্যবোধসমূহ, জাতীয় ঐক্যসূত্র, রাজনীতি, শাসনপদ্ধতি, প্রতিবেশী সহ বিশ্বের নানান চরিত্রের তাবৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, নাগরিক অধিকার, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের অধিকার-মর্যাদা-নিরাপত্তা সহ কোনো কিছুই আমরা স্থির ও অটল ভাবে সুনির্ধারিত ও সুবিন্যস্ত করতে পারিনি। অনেক বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি বা নিরসন করতে পারিনি আমরা। জাতি ও রাষ্ট্রগঠন এবং এর পরিকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনো অসমাপ্ত ও চলমান। উপসংহারে পৌঁছাবার বাকি পথ এখনো সামনে পড়ে রয়েছে। 🟢
courtesy: Maruf kamal khan
Subscribe to:
Comments (Atom)