Monday, 6 April 2026
কর্নেল রশিদের হামলার শিকার হন তারেক রহমান
বেগম খালেদা জিয়াকে কেন হত্যা করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশিদ?
আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেদিন সশস্ত্র হামলার শিকার হন। কর্নেল রশিদের লাঠি ও অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন।
১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বরের সেই ঘটনা আজ অনেকেই ভুলে গেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম জানে না—সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।
বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি কর্নেল রশিদ সেদিন সশস্ত্র অবস্থায় হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন খালেদা জিয়াকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।
সেই সকালেই ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবনে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কর্নেল রশিদ কীভাবে খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে ঢুকলেন, সেটাই বড় প্রশ্ন।
কর্নেল রশিদ পিস্তল হাতে প্রথমে যান খালেদা জিয়ার বেডরুমে। তাকে না পেয়ে চিৎকার করতে করতে ঘরের পর ঘর তছনছ করা হচ্ছিল; চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ভয় আর আতঙ্ক।
কিন্তু খালেদা জিয়া ভাগ্যক্রমে তখন বাসায় ছিলেন না—কর্নেল রশিদ ঢোকার মাত্র কিছুক্ষণ আগেই তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান এবং এরশাদ বিরোধী রাজপথের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
খালেদা জিয়াকে না পেয়ে হামলাকারীর আক্রোশ গিয়ে পড়ে তাঁর পরিবারের ওপর।
তারেক রহমান তখন টগবগে যুবক। বয়স মাত্র ২৪। হইচই-চিৎকার শুনে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে এসে কর্নেল রশিদের আক্রমণের শিকার হন।
কর্নেল রশিদ তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেন। হাতের অস্ত্র দিয়েও আঘাত করেন।
তারেক রহমানকে রক্ষার জন্য অন্যরা এগিয়ে এলে আরও কয়েকজনকে তিনি নির্মমভাবে প্রহার করেন। এতে আহত হন চারজন।
গুরুতর আহত তারেক রহমানকে পরে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া জনসভা থেকে ছুটে আসেন ক্যান্টনমেন্টের বাসায়। যা সেই সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে।
সেনানিবাসের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ভেতরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের ওপর এমন সশস্ত্র হামলা ছিল এক অভাবনীয় ষড়যন্ত্র।
১৯৯০ সালে বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর পতনের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রহসনটি মঞ্চস্থ হলো ঠিক এর পরেই। খুনি রশিদকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার বদলে তৎকালীন এরশাদ সরকার তাকে বাঁচানোর এক নির্লজ্জ ফন্দি আঁটল।
রাতারাতি রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করে দেয়া হলো—কর্নেল রশিদ নাকি হঠাৎ ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে পড়েছেন! সরকারিভাবে প্রেস রিলিজ জারি করে বলা হলো কর্নেল রশিদ মানসিক বিকারগ্রস্ত?
গ্রেফতার বা আটকের পরিবর্তে এই খুনিকে সসম্মানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) ভর্তি করে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হলো। এটি ছিল মূলত এক খুনিকে আইনি হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ প্রস্থানের সুযোগ করে দেয়ার রাষ্ট্রীয় নাটক।
সেই সময়ের অধিকাংশ সংবাদপত্র এই নির্মম কাহিনীর প্রকৃত সত্য প্রকাশ করতে পারেনি। বাংলার বাণী সহ কয়েকটি পত্রিকা প্রেস রিলিজের বরাত দিয়ে সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল।
একজন কথিত মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কীভাবে সশস্ত্র অবস্থায় একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির ক্যান্টনমেন্টের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পেরিয়ে বাসভবনে প্রবেশ করল—সেই প্রশ্নের জবাব কেউ খুঁজেনি।
বাসভবনের পাহারায় থাকা সশস্ত্র বাহিনী কেন এই খুনিকে বাধা দেয়নি, তা রহস্য রয়ে গেছে। বলা হয়, এরশাদের সরাসরি নির্দেশেই সবকিছু পরিচালিত হয়েছিল।
এই ঘটনার পর আন্দোলন আরও চাঙ্গা হয় এবং কয়েক দিনের মাথায় স্বৈরাচারী এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই রক্তাক্ত সকালের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের এই পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল।
যে তারেক রহমান সেদিন খুনি রশিদের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন, তিনি আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ ওই হামলায় তিনি মারাও যেতে পারতেন।
সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় হামলা হয় ১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বর।
তাঁর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশিদ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও সাজাপ্রাপ্ত খুনি। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে; বিদেশে কোথায় তিনি পলাতক, তা এখনো অজানা।
Subscribe to:
Comments (Atom)

