Tuesday, 17 March 2026

একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে।

"শেখ হাসিনা দিল্লীতে পালিয়ে গিয়েছে, সংসদ ডিসল্ভ করে দেওয়া হয়েছে , সবাই রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছে...” ইত্যাদি। জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কি ঠিক কিছু বলেছেন? (কমেন্টে দেখুন) । মোটেও না। গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি—এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারণ ঘটনাগুলো খুব পরিষ্কার: একটি সরকার পতন হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন, সংসদ ভেঙে গেছে—অর্থাৎ পুরানা রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—এখন রাষ্ট্র কে গড়বে? কীভাবে গড়বে? জনগণের ভূমিকা কী হবে? কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে নতুন রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া শুরু না করে, পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই আবার জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি তথাকথিত “উপদেষ্টা সরকার” গঠন করা হয়েছে—যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তিই নাই। এখানে একটা বড় ধরনের দ্বিচারিতা দেখা যায়: একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। তাহলে আসলে কোনটা মানা হচ্ছে? —সংবিধান, না ক্ষমতা? কাদের ক্ষমতা? সেনাবাহিনী, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতা ও রাষ্ট্রপতির? কালের কন্ঠে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার পড়লে পরিষ্কার এটাই বাস্তব হিশাব? আরও বড় প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই সংবিধান মানা হয়, তাহলে নির্বাচন হওয়ার কথা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২০২৯ সালে। এখন নির্বাচন করার কথা উঠছে কেন? আবার যদি বলা হয় এটি গণঅভ্যুত্থানের ফল, তাহলে পুরানা সংবিধানের প্রশ্ন আসে কেন? , পুরানা সংবিধানের বৈধতা নিয়েই বা এত টানাটানি কেন? এই দুই অবস্থান একসাথে সত্য হতে পারে না। এই জায়গাটাতেই জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ। তিনি ঠিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন—সংবিধান সবকিছুর উপরে নয়। কিন্তু তিনি বলেননি কেন এই সংবিধানই আবার রক্ষা করা হলো? কারা তা রক্ষা করলো? এবং কাদের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা কখনো শূন্য থাকে না। যখন একটি সরকার ভেঙে পড়ে, তখন নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হয়। সেই মুহূর্তে জনগণের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে—কিন্তু সেই সুযোগটাই সবচেয়ে বেশি দখল করে নেয় সংগঠিত শক্তিগুলো: সেনাবাহিনী, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক এলিট। বাংলাদেশেও সেটাই হয়েছে। একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও, সেই শূন্যতা জনগণ পূরণ করতে পারেনি। বরং রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো মিলে এমন একটি ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যাতে পু্রানা ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত থাকে—শুধু মুখ বদলায়। এখানে “লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণী” কথাটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান না—এর বাস্তব অর্থ আছে। যারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পদ দখল করেছে, ব্যাংক লুট করেছে, অর্থ পাচার করেছে—তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো একটি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। কারণ সেই প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা আসতে পারে, আইনবিহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও আয়নাঘরের জন্য বিচার হতে পারে, লুট করে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পদ ফেরত আনার প্রশ্ন উঠতে পারে। যারা গুম, খুন, ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের সঙ্গে জড়িত—তাদের জন্যও পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার টিকে থাকা ও টিকিয়ে রাখা নিরাপদ ও জরুরি। কারণ নতুন করে জনগণের রাষ্ট্র গঠন হলে তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ও শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব ত্রাণকর্তা হিশাবে জনাব সালাহ উদ্দিন আছেন। ভয় কি? তাই একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—সংবিধান রক্ষা করা হয়েছে “আইনের প্রতি শ্রদ্ধা” থেকে নয়, বরং গণবিরোধী নির্দিষ্ট ক্ষমতার চরিত্র ও কাঠামোকে অক্ষত রাখার জন্য। এই সংবিধান এমনভাবে তৈরি, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রায় সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এই কেন্দ্রীভুত ক্ষমতা ভাঙা মানে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন—যা বর্তমান ক্ষমতাধারীরা কখনোই চাইবে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—গণঅভ্যুত্থান মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভিত্তি নতুন ভাবে গঠনের সুযোগ। সেই সুযোগে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হতো একটি গণপরিষদ নির্বাচন—যেখানে জনগণ সরাসরি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ করবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, এমনকি বিএনপির সাধারণ কর্মীসহ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষই ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু সেই পথ নেওয়া হয়নি। কেন? কারণ সেই পথ অনিশ্চিত, নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর ভীতির কারন হলো সেই পথ নেওয়া হলে বাস্তব ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরে আসতে পারে। সবশেষে প্রশ্নটা নৈতিকও। যারা জীবন দিয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে, যারা রাস্তায় নেমে রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন দেখেছে—তাদের সেই ত্যাগ কি শুধু একটি সরকার বদলের জন্য ছিল? নাকি একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে “সংবিধান মানতে হবে”—এই কথাটা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একদিকে সংবিধান ভেঙে সরকার বানানো, অন্যদিকে সেই সংবিধান রক্ষার কথা বলা—এটা কোনো নীতির রাজনীতি না, এটা ক্ষমতার রাজনীতি। আমরা কি পুরান ক্ষমতা ব্যবস্থা ও কাঠামোর মধ্যে সামান্য একটি সংস্কার চাই, নাকি সত্যিকারের অর্থে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবে গড়তে চাই? জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ আসলে কি চান?

No comments:

Post a Comment