Tuesday, 17 March 2026
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ-সালাউদ্দিন আহমেদ।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন শিলংয়ের প্রিয় বড় ভাই মাননীয় মন্ত্রী জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যিনি তাদের শপথ পড়ালেন তিনিই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলে তাকে যারা শপথ পড়ানোর অধিকার দিয়েছে তারাই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছে।
একজন আইনলঙ্ঘনকারীর হাতে, বেআইনি ব্যক্তির হাতে জাতীয় সংসদের শপথ বাক্য পাঠ করলে তাহলে বিএনপির সকল সংসদ সদস্যরাও এই আইন লঙ্ঘন করেছেন। সেই হিসেবে জাতীয় সংসদ এই মুহূর্তে অবৈধ এবং বেআইনি। বেআইনি সংসদে দাঁড়িয়ে কেউ মন্ত্রী দাবি করা তার চেয়েও বড় বেআইনি কাজ।
এর চেয়েও বড় অপরাধ হচ্ছে—একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ বাদ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করা; যা আরও জঘন্য বেআইনি।
সংসদের নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিবেকশূন্য হয় কিংবা বিকারগ্রস্ত হয়, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য এবং নির্বাচনেও অযোগ্য। সে হিসেবে আমার ধারণা, প্রিয় বড় ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব শিলং থেকে ফেরার সময় অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন।
তিনি যখন শিলংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মানসিক অসুস্থতার কথা বলে কে বা কারা তাকে আইন মেনে সংবিধান অনুযায়ী সেখানে রেখে এসেছিলেন—এ বিষয়টি তিনি জানেন না বলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।
দেশে এসে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠকগুলোতে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, সেগুলো এখন আবার ভুলে যাচ্ছেন এবং অস্বীকার করছেন। যারা তিন মাসের মধ্যে কোনো বিষয় ভুলে যায় এবং অস্বীকার করে, নিশ্চয়ই তারা অক্ষম ও অসুস্থ—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধিহীনও।
এই অবস্থায় আমার ধারণা অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব সংসদ সদস্য হওয়ার সকল আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছেন।
আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সংবিধান নিয়ে এত বক্তব্য দেওয়া হলেও তার নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনী সমাবেশে গণভোটের পক্ষে রায় চেয়েছিলেন। গণপর্যায়ে যুক্ত হওয়ার ফলে সেই অর্থে তার কথার বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এখন সেটি বাস্তবায়নে বিরম্বনা সৃষ্টি করা এক ধরনের প্রতারণার শামিল।
সংবিধান অনুযায়ী কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে তারা সংসদ সদস্য থাকতে পারেন কি না—সে প্রশ্ন রেখে গেলাম।
যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে শপথ পড়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই সংবিধানের কোথাও কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ পড়ানোর নিয়ম নেই। জুলাই সনদের ভিত্তিতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন—এবং সে অনুযায়ী দুটি শপথ পড়ানো হয়েছে:
একটি মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে,
আরেকটি মাননীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
এখানে শপথ যদি অবৈধ হয়, তাহলে দুটি শপথই অবৈধ হবে—না হলে একটিও হবে না। বরং সংবিধান অনুযায়ী দুটি শপথ গ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামি, এমসিপি-সহ যারা এই শপথ নিয়েছেন তারাই সংসদের বৈধ সদস্য; বাকিরা সংবিধান অনুযায়ী অবশ্যই অবৈধ।
আপনি এত সংবিধানের কথা বলেন—তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদে ডেকে আনলেন না কেন?
আমাদের মহামান্য “চুপ্পু” সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি দেখেননি। যদি তাই হয়, তাহলে তিনিই তো এখনো প্রধানমন্ত্রী। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে, কোন সংবিধানের ভিত্তিতে আপনারা এখন সরকারে বসেছেন?
সংবিধান অনুযায়ী যারা এই অবৈধ কাজ করেছে তাদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আপনারা কি নিজেদের বিচার করছেন, নাকি যারা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে তাদের বিচার করছেন?
যদি পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর বিচার করে থাকেন, তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করছেন?
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি চুপ্পু সাহেব হন, তাহলে তার হাতে দেওয়া অধ্যাদেশগুলো কীভাবে অবৈধ হয়? জুলাই সনদ, গণভোট, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং আইন-বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ—সবই তো বর্তমান মহামান্যের স্বাক্ষরে হয়েছে।
তাহলে তিনি এগুলো কোন সংবিধানের ভিত্তিতে করলেন?
বাংলাদেশে একই সঙ্গে দুইটি বৈধ ব্যবস্থা থাকতে পারে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব—আপনি যদি বৈধ হন, তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রেসিডেন্ট এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরা সবাই অবৈধ। আর আপনি যদি অবৈধ হন, তাহলে উপরে উল্লেখিত সবাই বৈধ।
কারণ সংবিধান আপনার মনমতো বানানো কোনো বিষয়বস্তু নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের যা কিছু হচ্ছে—সবই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদের ভিত্তিতে হচ্ছে।
অতএব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে জনতার রায় এসেছে। জনগণ যে বিষয়গুলোর ভিত্তিতে এই গণভোটে রায় দিয়েছে সেটাই এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংবিধানস্বরূপ।
এই আইনকে প্রশ্ন করে কেউ যদি বক্তব্য দেয়, আমি মনে করি তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধ করেছে। একদিন না একদিন শক্তিশালী কোনো সরকার এলে অবশ্যই সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হবে।
কারণ রাষ্ট্র বলছে আপনাকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিতে, আর আপনি সেই শপথ না নিয়ে সংসদে বসে আবোলতাবোল ও গোয়ার্তুমি করবেন—এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
জামায়াতে ইসলামের নেতারা যেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, নিশ্চয়ই সেই শপথপত্র তারা নিজেরা ফটোকপি করে আনেননি। সেই কাগজ সংযুক্ত করে আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার তাদের শপথ পড়িয়েছেন।
আপনার নিয়ম অনুযায়ী যদি এটা অবৈধ হয়, তাহলে সংসদে যারা এই কাগজটি প্রিন্ট করে এনেছেন তারাই সবচেয়ে বড় অপরাধী।
পরীক্ষার হলে কেউ সামান্য নকল কাগজ নিয়ে গেলে যেমন তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়, তেমনি সেই নকল সরবরাহকারীও শাস্তি পায়। তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো একটি শপথপত্র যদি আইনে না থাকে, তবে বেআইনিভাবে কারা সেটি তৈরি করে সংসদ সদস্যদের দিয়ে সারা পৃথিবীর মিডিয়ার সামনে শপথ পড়ালেন—এটা নিশ্চয়ই চরম অন্যায় ও আইনবিরোধী কাজ।
তাহলে তারা এখনো কোন আইনের ভিত্তিতে গ্রেফতার না হয়ে সাংবিধানিক পদে বসে আছেন?
অতএব সালাউদ্দিন সাহেব, আগরবাগর কথা বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। আল্লাহর নামে সেজদা দিন, শুকরিয়া আদায় করুন। দেশনেত্রীর ওপর যে সকল জুলুম হয়েছে সেগুলো স্মরণ করুন।
নতুন প্রজন্ম কিন্তু আগের মতো নেই। উল্টাপাল্টা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিলে তারা আর মেনে নেবে না।
আপনাদের রেকর্ড এমনিতেই খুব ভালো নয়। তার ওপর সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই যে মাতলামি শুরু করেছেন, তাতে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে।
সময় থাকতে জনতার রায় মেনে নিন—নচেৎ হাসিনার পরিণতির জন্যই অপেক্ষা করা শ্রেয়।
আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।
ড. ফয়জুল হক।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment