Monday, 13 April 2026

ইউনুস থেকে তারেকে ক্ষমতার হাতবদলের এক অনিবার্য পরিণতি

গুম বিরোধী অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হবে না এবং সেটাকে বাতিল করা হবে—এটা ইউনুস থেকে তারেকে ক্ষমতার হাতবদলের এক অনিবার্য পরিণতি ছিলো। যারা আজকে খুব ‘শকড’ হয়েছেন, তাদের অবস্থা দেখে করুণা করবো নাকি আমিও ‘শকড’ হবো—ঠিক বুঝতে পারছি না। এ তো কেবল শুরু; সামনে আরো কী কী আসছে, সেটার আগাম বার্তাও বটে—যারা চোখ খোলা রেখে দেখেননি, তাদের জন্যে এই ‘শকড’ হওয়াটাই বরং এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। গুমের সাথে যুক্ত সেনা অফিসারদের ক্যান্টনমেন্টের কথিত সাব-জেলে রাখা—এটা কি ইউনুস সরকার থামাতে পেরেছিলো? সরকার ও জন-আকাঙ্খাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওয়াকার এন্ড গং গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের সাধারণ কারাগারে স্থানান্তর করেনি। কাউকে কিছু না জানিয়েই তড়িগড়ি করে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ক্যান্টনমেন্টে অফিসারদের বিলাসবহুল ভবনকে সাব-জেল ঘোষণা করেছিলো। সেখানে শুধু ইন্টারনেট, টেলিফোন ও বাহারি খাবারের আয়োজনই ছিলো না—বৌদের নিয়ে থাকার ব্যবস্থাও ছিলো। চমৎকার জেল, তাই না? বিশ্বের অন্য কোথাও এ রকম ‘মানবিক’ জেল আছে কিনা আমার জানা নেই—যেখানে অভিযুক্তরা শাস্তি ভোগ করে না, বরং আরাম-আয়েশের জীবন কাটায়। শুধু তাই নয়—জাতির সাথে তামাশা করার জন্যে বিলাসবহুল এয়ার কন্ডিশন্ড বাসে করে খুনি সেনা অফিসারদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিলো। আশা করি সবুজ রঙের সেই বহুল আলোচিত প্রিজন বাসটিকে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাননি। বিচার প্রক্রিয়াকে এভাবে সার্কাসে পরিণত করার নজির খুব কমই আছে—যেখানে অপরাধী যেন অভিযুক্ত নয়, বরং ভিআইপি অতিথি। এসব কেন সম্ভব হয়েছিলো? কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো? কোন সমঝোতার ভিত্তিতে হয়েছিলো?—এসব প্রশ্ন যারা করেননি, গুম বিরোধী অধ্যাদেশ বাতিলের কারণে তারাই আজকে ‘শকড’ হয়েছেন। প্রশ্ন না করা, হিসাব না চাওয়া, ক্ষমতার এই নোংরা আপসকে মেনে নেয়া—এসবেরই যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে আজকের এই বাস্তবতা। জুলাই বিপ্লবের পর ওয়াকার ও চুপ্পুকে কেন সরানো হয়নি? সরল উত্তর—বিএনপি সেটা চায়নি। এটা কোনো অনুমান কিংবা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; নির্মম বাস্তবতা। আপনার আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। ‘বুকে পাথর চাপা দিয়ে’ ড. ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেয়া ওয়াকার কি একদিনের জন্যেও জুলাইয়ের রক্তস্নাত বিপ্লবের পর জন-আকাঙ্খা ও অনুরোধের কারণে প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হওয়া ড. ইউনুসের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে? রাওয়া ক্লাবে যখন আঙ্গুল তুলে নাম ধরে ড. ইউনুসকে সম্বোধন করেছিলো—তখন সেই ঔদ্ধত্য শুধুই কি ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে ছিলো, নাকি আপামর জনগণের বিরুদ্ধে ছিলো? সেই প্রশ্ন কি কখনো করেছেন? প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী—সে ওয়াকার হোক বা অন্য কেউ—দায়িত্বরত কোনো প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা সমমানের কাউকে পদবী ছাড়া নাম ধরে সম্বোধন করা নিছক ধৃষ্টতা নয়, এটা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা। প্রধান উপদেষ্টার অনুমতি না নিয়ে দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে বৈরী রাষ্ট্র ভারতের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির সাথে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ মিটিং করেছিলো ওয়াকার। সরকারকে পাশ কাটিয়ে সেনাপ্রধান বৈরী রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সাথে ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ কোন ক্ষমতা বলে ওয়াকার করেছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে যে বাস্তবতা সামনে আসে, তা অনেকের জন্যই অস্বস্তিকর—কারণ সেখানে রাষ্ট্র নয়, সমঝোতাই নিয়ন্ত্রক শক্তি। শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া চাকর-বাকর ও ফ্যাসিবাদের দোসর সরকারি আমলা ও সচিবরা প্রধান উপদেষ্টার কথা শুনছিলো না—সে কথা তো প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে ড. ইউনুস নিজেই বলেছিলেন। অর্থাৎ, ক্ষমতার চেয়ারে বসা মানেই ক্ষমতা হাতে থাকা নয়—এই নির্মম সত্যটি তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। হাসিনার রেখে যাওয়া সামরিক ও বেসামরিক আমলা—যাদের ‘টিকি দিল্লিতে বাঁধা’—তারাই দিল্লীর মধ্যস্থতায় তারেককে ক্ষমতায় বসিয়েছে; তাদের ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ নিয়েই লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছিলো তারেক। খালেদা জিয়া ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ হওয়া সত্ত্বেও এই ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’ না থাকার কারণে ঢাকায় আসতে পারেনি তারেক—অর্থাৎ, আসতে দেয়া হয়নি। কে আসবে, কে আসবে না—এই সিদ্ধান্ত যদি অন্য কোথাও নেয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বড় বড় বক্তৃতা নিছক প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। দিল্লীর হয়ে এসবের সকল মধ্যস্থতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই শিলং উদ্দিন। শিলং উদ্দিনের দাপটে বিএনপি’র ত্যাগী শীর্ষনেতারা কপোকাত। শুধু কি তাই—প্রধানমন্ত্রীকে বসিয়ে রেখে তার সামনেই সংসদে প্রধানমন্ত্রীর হয়ে বক্তব্য দেয় শিলং উদ্দিন। তারেকের মা খালেদা যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন তিনি তো সংসদীয় কায়দায় ঠিকমতো কথাই বলতে পারতেন না; জাতিসংঘের এক অনুষ্ঠানে কোনো রকমে, তড়িগড়ি করে ‘রিডিং’ পড়ে বক্তব্য শেষ করেছিলেন—এসব ভিডিও এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়। কিন্তু তারপরও তিনি নিজের হয়ে অন্য কাউকে দাঁড় করিয়ে বক্তৃতা দেননি। অর্ধশিক্ষিত এই মহিলা তো কখনো সংসদে বা বিদেশে নিজে বসে থেকে তার পক্ষ থেকে কাউকে দিয়ে বক্তৃতা দিতে দেননি। এইটুকু আত্মসম্মানবোধ খালেদারও ছিলো। তারেকের সমস্যাটা কি শুধুই আত্মসম্মানহীনতা, নাকি হাত-পা শিকলে বাঁধা? নাকি শুধুই পুতুল প্রধানমন্ত্রী হয়ে চেয়ার তা’ দেয়াকেই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ও গৌরব বলে মনে করছেন? এই প্রশ্নগুলো এখন আর ব্যক্তিগত নয়—এগুলো রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তারেকের আত্মসম্মানহীনতা কিংবা অথর্বপনা এখন আর নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে। তার এই আত্মসম্মানহীনতা ও অথর্বপনা বাংলাদেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে ইতিমধ্যেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে—এটা শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় বিপদের আলামত। জুলাই বিপ্লব ও জন-আকাঙ্খার কবর রচনা করার জন্যে যা যা করা দরকার, তার সবকিছু করার বিনিময়েই তারেককে লন্ডন থেকে ঢাকায় এনে অতঃপর পাপেট হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছে। ক্ষমতার এই লেনদেনের ভেতরে গণতন্ত্রের কোনো স্থান ছিলো না—ছিলো শুধু নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। ‘বিশ্ববাটপার’ আসিফ নজরুল, শিলং উদ্দিন ও ওয়াকার—এই ত্রিভূজের মধ্যে তারেককে বন্দি করে খেলা চালিয়ে ছিলো ভারত। আগে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর সওয়ার ছিলো, এখন ‘নতুন গাধা’ তারেক ও মূর্খ বিএনপি’র ওপর সওয়ার হয়ে জাতির কুলাঙ্গার সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের মাধ্যমে (যাদেরকে অনেকে ‘ডীপ-স্টেইট’ বলে রাজনীতিক প্রজ্ঞা জাহির করে) বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে বাফার স্টেইট বানিয়ে রেখেছে ভারত। খেলোয়াড় বদলায়, খেলা বদলায় না—এই বাস্তবতাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আর ভারতকে এসব করার সুযোগ করে দেয় ‘দলদাস’, ‘আত্ম-সম্মানহীন’ ও ‘অথর্ব’ লোকগুলো—যারা ব্যক্তি ও যোগ্যতা দেখে না, দেখে মার্কা। যাদের কাছে রাজনীতি হলো বর্বর চর দখলের লড়াই; যে লড়াইয়ে বিজয়ীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে তারা আদিম অসভ্য সুখ অনুভব করে। কিংবা সেই সব লোকগুলো—যাদের কেউ ভোটের বাজারে হাঁস-মুরগির দামে বিক্রি হয়, কেউবা ‘বুদ্ধি-বেশ্যা’ বৃত্তিতে লিপ্ত, আর কেউবা ‘স্তনমৈথনের মতো করে বিবেক বিলিয়ে’ দিয়ে দুই পয়সা কামিয়ে নেয়। এই প্রজাতির ইতরগুলোর কাছে দেশপ্রেম কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়—সামান্য স্বার্থের জন্যে তারা সব করতে পারে, এবং করছে। মইনুল হক ডেট্রয়েট, মিশিগান।

No comments:

Post a Comment