Sunday, 11 August 2019

ঈদ-দুরন্ত শৈশব : স্মৃতির ঝাঁপি থেকে কিছু কথা।

ঈদ-দুরন্ত শৈশব : স্মৃতির ঝাঁপি থেকে কিছু কথা।

 ঈদ
বাঙালি জীবনাচরণের অন্যতম একটি অনুসঙ্গ উৎসব এবং ভাতৃত্ববোধের দিন।
হাজার বছরের বাঙালি মুসলমানের এক অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় প্রথা। কালের বিবর্তনে কিংবা বিশ্বায়নের প্রভাবে হয়তো আগের মতো ভাব গাম্ভীর্যের সাথে পালন করা হয়না। কিন্তু এই উৎসবটির বিশালতা এবং প্রভাব এতটুকু কমেনি।
গ্রামে বেড়ে উঠেছি আমি। ডানপিঠে শৈশবের দিনগুলো ছিল দুরন্ত আনন্দময় এবং নিষ্কণ্ঠক। সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম কখন ঈদ আসবে কখন নতুন জামা কাপড় কিনবো। কুরবানীর ঈদে অপেক্ষায় থাকতাম গরু কেনার জন্য। আমার মা বলতেন রমজানের দুই মাস দশদিন পর কুরবানী আসবে। তারপর থেকে শুধু দিন গূনতাম কখন ঈদ আসবে চাচার সাথে বাজারে গিয়ে গরু কিনবো। কত অপেক্ষা কত প্রস্তুতি।

আমার শৈশব কৈশোরের দুরন্ত দিনগুলোতে মনে হতো ঈদ মানে বিশাল কিছু। ঈদের প্রস্তুতি শুরু হতো অনেক আগে থেকেই। কুরবানীর জন্য আমার বাবা টাকা পাঠাতেন পনেরো বিশ দিন আগেই। ড্রাফট করে টাকা পাঠাতেন সৌদি আরব থেকে। রেজিষ্টারী চিঠি নিয়ে বাড়িতে ডাক পিয়ন আসা মানেই ড্রাফট এসেছে বলে ধারণা করা হতো। পিয়নকে দশ বিশ টাকা দেয়া হতো চা পানি খাওয়ার জন্য। এখন জীবন অনেক সহজ পাঁচ মিনিটে টাকা পাওয়া যায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে। কিন্তু আমার বাবার পাঠানো সেই ড্রাফট সাথে পুত্রের প্রতি উপদেশমূলক চিঠির বিষয়বস্তু আজো আমাকে কর্তব্যপরায়ণ এবং নিষ্ঠাবান হওয়ার শিক্ষা দেয়। সততার ছিটেফোঁটাও যদি থাকে তবে সেটি পেয়েছি মা বাবার কাছ থেকে।

কয়েকটি পরিবার মিলে একসাথে কুরবানী করা হতো। আর্থিক সামর্থের কথা বিবেচনা করেই এটা করা হতো। মুরুব্বীরা বলতো "এবারে হাঁচ গিরি মিলি কোরবান দিমু" অর্থাৎ পাঁচ পরিবার মিলে একটি গরু কেনা হবে কুরবানীর জন্য। তারপর পাঁচ পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরু কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হতো।

গরু কেনার জন্য বাজারে যাওয়া ছিল রীতিমতো এক উৎসব। আমার চাচার সাথে বাজারে যেতাম যাওয়ার সময় আমার মা কিছু টাকা দিতেন বুট কিংবা চানাচুর খাওয়ার জন্য। কোথাও যেতে গেলে মা অতিরিক্ত কিছু টাকা দিতেন এবং বলে দিতেন "খরচ করিসনা এই টাকা যদি বিশেষ দরকার না হয়।"

গরু বাজারে গিয়েই আমার চাচা প্রথমে চা খেতেন। তারপর আস্তে আস্তে গরু দেখতেন। গরুর লেজ ধরে, গরুর গায়ে থাপ্পড় মেরে এবং লেজ মোচড় দিয়ে "ভালো গরু" পরখ করতেন। গরু বাজারের দালাল সম্পর্কে তিনি সবসময় সতর্ক থাকতেন। তিনি যে গরুর সামনে থাকতেন সেই গরু যদি অন্য কেউ দরকষাকষি করতো তাহলে তিনি সেই গরু কিনতেননা। তিনি বলতেন এই লোকটি গরু বিক্রেতার নিয়োগ করা দালাল। আমরা ছোটরা বলতাম চাচা অত্যন্ত বুদ্ধিমান। অতঃপর গরু কেনার বাড়িতে আসতাম। ছোটরা সবাই মিলে গরুর যত্নআত্তি নিতাম। কেউ ঘাস এনে দিচ্ছে,কেউ খড়, কেউবা ভাতের মাড়। চোরের ভয়ে উঠোনে গরু বাঁধা হতো রাতে বেশ কয়েকবার উঠে দেখতাম গরু আছে কিনা। বড়দের কাছে শুনেছিলাম ঈদের আগের রাতে বিশ/ত্রিশ বছর আগে আমাদের এলাকায় একবার গরু চুরি হয়েছিল। তাই এমন সতর্কতা।

ঈদের দুই তিন দিন আগে গরু কেনা হলে জবাই করার আগ পর্যন্ত সারাক্ষন আমরা গরুর সাথেই থাকতাম। বাড়ীর অন্য চাচাতো ভাইদের সাথে "কার গরু বড় কিংবা কার গরু ছোট" তা নিয়ে তর্কে লিপ্ত হতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছাই দিয়ে দাঁত মাজতাম পুকুর পাড়ে, সেখানে অন্য সব চাচাতো ভাইদের সাথে আলাপ হতো কোরবানী নিয়ে। কোরবানী শেষ না হওয়া পর্যন্ত পড়ালেখায় আর মনোযোগ নেই। সারাক্ষন কোরবানী নিয়ে আলাপ আলোচনা, ছুরিতে শান দেয়া,গরুর শিং সংগ্রহ করা কিংবা গরুর কান্না বিষয়ে নিরন্তর আলোচনা।
একবার এক চাচাতো ভাই বলেছিলো গরুর চামড়া দিয়ে নাকি ঢোল বানানো যায়। ঢোল বানানোর লক্ষ্যে একবার গরুর মাথার চামড়া লবণ দিয়ে মাটিতে পুঁতে রেখেছিলাম। ঢোল আর বানানো হয়নি চামড়া পঁচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায়।

ঈদের দিন খুব সকালে উঠতাম। মায়ের বানানো নাস্তা খেয়ে ঈদগাহে ছুটতাম। নামাজে আমাদের মনোযোগ ছিলোনা। কখন গরু জবাই হবে সেই অপেক্ষায় থাকতাম। নামাজ শেষ করেই কবর জেয়ারত তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমরা মাঝে মাঝে রশি টেনে ধরতাম গরুকে শোয়ানোর প্রচেষ্টায়। চিৎকার চেঁচামেচি তে অন্যরকম এক আবহ তৈরী হতো। মাংস কাটাকুটিতে বড়দের সাহায্য করা ছিল আমাদের কাজ। মাংস ভাগ হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ জবাইয়ের পর পরই কলিজা বন্টন করে দেয়া হতো। কে কার আগে গরুর কলিজা খেয়েছে তাই নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো।

ঈদের দিনের অন্যতম আকর্ষণ বিটিভির অনুষ্ঠান। বাংলা সিনেমা নাটক এবং ইত্যাদি ছিল আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।

আমার মায়ের হাতের রান্না অমৃতসম। পৃথিবীর সব সন্তানের কাছে এমন মনে হয়ে। আমার মা মাংস রান্না করে রাখতেন আমি কিছুক্ষন পর পর এসে এক টুকরো নিয়ে দৌঁড়ে আবার খেলতে যেতাম। আমার মা বলতেন "বৈ খা, এতো সুরভা খাছ কিল্লাই গোস্ত খা।" অর্থাৎ বসে খাও, ঝোল খেয়োনা মাংস খাও।

 বিকেলে নানা বাড়ী কিংবা খালার বাড়ী যাওয়া ছিল অন্যতম আনন্দের বিষয়। যাওয়ার সময় আমার মা টিফিন ক্যারিয়ারে চালের পিঠা এবং মাংস দিতেন। এই টিফিন ক্যারিয়ার আবার ফুফু, খালা এবং মামীরা রেখে দিতেন। পরদিন মামাতো ভাই, খালাতো ভাই কিংবা ফুফাতো ভাইয়েরা মাংস্ এবং পিঠা ভর্তি করে নিয়ে আসতেন। এসব রীতিনীতি গুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কৃত্রিমতা লোক দেখানো লৌকিকতায় ভরে গেছে মানুষের মন। খালা,ফুফুদের অনেকেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে ভালোবাসার মানুষগুলো।

দূর প্রবাসে ঈদের দিন ঈদ বলে মনে হয়না। কোনোকোনো ঈদের দিন কাজ থাকে। সকালে ঈদের নামাজ পরে কর্মের উদ্দেশ্যে আবার ছুটে চলা। ছুটে চলেছে হাজারো মানুষ।তবুও আমার মন পড়ে থাকে নিজের শিকড়ে নিজের অস্তিত্বে।
প্রিয় মানুষদের মুখে হাসি দেখতে এখন ভালো লাগে। নিজের জন্য কিছু কিনতে ইচ্ছে হয়না বরং আমার অর্জিত অর্থে ভালোবাসার মানুষেরা সুখে আছে ভাবতেই অদ্ভুত এক ভালোলাগায় আবিষ্ট হয় মন প্রাণ। এ যেন স্বর্গীয় এক বন্ধন।
আলোর শহর ভালোবাসার শহর কিছুই আমাকে টানেনা। মন পাখি পরে থাকে ছাপান্ন হাজার বর্গ মাইলের কোনো এক গ্রামে।  প্রিয় মানুষদের দেখার আকুলতা আমার ফুরোয়না, মনে হয়না কখনো ফুরাবে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রী দ্বিপ্রহর আরেকটি নতুন সকাল উদিত হওয়ার হাতছানি, ফরাসি দেশ আমাকে দুই হাত ভরে দিয়েছে অর্থ-প্রাচুর্য তবুও বুকের কোথায় জানি শূন্য অনুভূত হয়। তবু কার লাগিয়া মন পোড়ে ?

কায়মনোবাক্যে আমার কামনা পৃথিবীর সব মানুষ ভালো থাকুক।

ঈদ মুবারক

Paris
11 sunday2019

Wednesday, 3 July 2019

এদেশের মধ্যবিত্ত সমাজটা পঁচে গেছে। ——Taifur Rahman

এদেশের মধ্যবিত্ত সমাজটা পঁচে গেছে। একটা সময় এই মধ্যবিত্ত সমাজটাই এদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করতো।  এই মধ্যবিত্ত সমাজই বায়ান্ন এ ভাষার অধিকারের দাবীতে রাস্তায় নেমেছিল, ৬৯ এ স্বৈরাচার আয়ুবের বিরুদ্ধে লড়েছিল, একাত্তুরে এই মধ্যবিত্তরাই যুদ্ধে গিয়েছিল…৯০ তে এই মধ্যবিত্তরাই সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে নেমেছিল। সেই মধ্যবিত্ত শ্রেনিটি এই সময়ে এসে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়েছে, একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা রাজনীতি চর্চা করতো। তারাশঙ্কর, শরত চন্দ্র, হুমায়ুন আহমেদ কিংবা জীবনানন্দ দাশ পড়তো। আর এখনকার মধ্যবিত্ত নারীদের ভোর হয়  পার্লারে গিয়ে মেডিকিউর, পেডিকিউর আর ভ্রু প্লাগ করা চিন্তায়, সন্ধ্যে কাটে হিন্দি সিরিয়ালে বুঁদ হয়ে…!! আগের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পুরুষরা ভাবতো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে, প্রযুক্তির আকালেও তারা বিবিসি বাংলা খবর শুনতে জড়ো হতো পাড়ার মাতবরের দেউরী তে। চা এর টেবিলে, অফিসের ক্যান্টিনে চলতো শ্রেণিবাদ, মৌলিক অধিকার, রাজনীতির বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, কনজিউমারিজম আর  গণতন্ত্র ও সমাজ তন্ত্রের মধ্যকার পক্ষে বিপক্ষের কথার লড়াই, মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবকেরা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ক্যাম্পাসে শুধু পড়তে যেতনা, তারা লড়তেও যেত…তারা লড়তো নিজের ব্যক্তিগত জীবনের চাওয়া পাওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় নাগরিক চাহিদার দাবীতেও। তারা প্রেম, কবিতা, প্রকৃতির পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি আর শাসিত ও শোষিতদের নিয়ে ভাবিত হত। বায়ান্ন'এর রফিক জব্বার কিংবা সালামরা কেউ সোনার চামুচ মুখে নিয়ে  জন্মায়নি, কিংবা মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ করাদের ৯৮ভাগের  একে আজাদের মত তত্কালে শত ডলারে এলভিস প্রিসলি গানের এ্যালবাম কেনার সামর্থ ছিলনা।কীংবা নব্বই এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নামা যুবকদের কারো তত্কালে টয়োটা, প্রাডো কেনার সামর্থ ছিলনা কিন্তু ছিল গণতন্ত্র লাভের অধীর আগ্রহ। এরা সবাই ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিন্ম মধ্যবীত্ত ঘরের সন্তান। কিন্তু হায়! সে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি ঢুবে গেছে এই একুশ শতকে। প্রযুক্তির বাহুল্য এখন তাদের রাষ্ট্রচিন্তার দিকে ধাবিত করেনা। এদেশের মধ্যবিত্তরা এখন উত্সব বুঝে, ভোগ বুঝে, শ্রেণি বুঝে, লাভ-ক্ষতি বুঝে…তারা সবই বুঝে, সবই জানে বুঝেনা শুধু  রাষ্ট্রীয় লাভ-ক্ষতি টা, জানেনা ব্যক্তিগত ত্যাগ কী…তাই এক সময়কার স্বাধীণচেতা, রাজনীতি ভাবাপন্ন মধ্যবিত্ত সমাজটি মহান স্বৈরাচারী আমলটাকেও ভীষণ উপভোগ  করছেন। আগামীতেও করতে থাকবেন…

21Feb, 2016

Wednesday, 26 June 2019

Human trafficking

#ভিসা ছাড়া ইউরোপ- আমেরিকা- অস্ট্রেলিয়া।
(লেখাটি লম্বা হলেও বিদেশ যাত্রীদের পড়ার অনুরোধ)

#কোন ভুমিকা লিখছিনা।শুধু একটি কথা বলি।বাঁচার জন্য মানুষ প্রবাসের স্বপ্ন দেখে, কিন্ত যদি সেই প্রবাস যেতে মরে যাওয়াটা নিশ্চিত হয়? নিশ্চিত মৃত্যু জেনে কেও যাবে? যাবেনা।দালালের খপ্পরে পড়ে অধিকাংশরাই পাড়ি ধরে।

#ইউরোপ
অবৈধভাবে তিনটি পথে ইউরোপ ঢুকে মানুষ।লিবিয়া, মরক্কো, তুরস্কো।

১,#লিবিয়া।
লিবিয়া থেকে প্লাস্টিকের বোটে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি।যা অত্যন্ত বিপদজনক।বোটে কম্পেশার দিয়ে ছাড়া হয়।যেখানে বাতাস শেষ সেখানেই আপনার গন্তব্য।কখনো সাগরে ঢেউ থাকা অথবা বোটের কম্পেশার শেষ হওয়ায় শতসহস্র মানুষ সাগরের অতল গহীনে মারা যায়।ইতালি যখন লিবিয়ান স্মরনার্থী গ্রহন করে তখন বাংলাদেশি কিছু মানুষ ইতালি গিয়েছিল।সে সময় সাগরে ভেসে আসা লাশও কম দেখেনি বিশ্ব।বাংলাদেশিও কম মরেনি। Libya to Italy লিখে ইউটুউবে সার্চ দিলেই সেই সব করুন দৃশ্য দেখতে পারবেন।
এখন আর কোন দেশ শ্বরণার্থী গ্রহন করছেনা।
সুতরাং এই পথে যেন কেও পা না বাড়ায়।

২,#মরক্কো।
মরোক্কো থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেন।
স্পিটবোর্ড দিয়ে মরক্কো থেকে স্পেনে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায় অনেক দালাল।অথচ স্পেন সীমান্তে তাদের সীমান্তরক্ষীর কড়া টহল থাকে।অবৈধভাবে ঢুকার চেস্টা করলে সীমান্তরক্ষী গুলি করে। মরক্কো রয়েছে মাফিয়াদের ভয়ঙ্কর চক্র।দালালের খপ্পরে পড়ে কেও যদি মরক্কো আসে, বাস্তবতা দেখে যখন সাগরপথে না যাবার কথা বলে,দালাল তখন তাকে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে ফেলে।মাফিয়ার পিঠা খেয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে যখন মুক্তি পায় আবার কোন না কোন মাফিয়া ধরে নিয়ে যায়।এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে চলে জাহেলী যোগের পৈশাচিক খেলা।

৩,#তুরস্ক।
তুরস্ক থেকে সাদাখাল নামক নদী ও ভয়ঙ্কর জঙ্গল ও পাহাড় পর্বত পাড়ি দিয়ে গ্রীস।এপথে দালাল আপনাকে বলবে ২/৩ ঘন্টা হাটা লাগবে।কিন্ত ১৫-১৮ ঘন্টা হাটতেই হয়।হাটা নয়,দৌড়তে হয়।কখনো ৫-৭ দিন জঙ্গলে থাকতে হয়।গ্রীস ঢুকতে কপাল লাকী হলে ২/১ বারে গ্রীসে ঢুকা যায়।অন্যথায় ১০/১১ বারও লাগতে পারে।কারন, কখনো গ্রীসের পুলিশ কখনো তুর্কির পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। জঙ্গলে পাহাড়ে নদীতে পানি শূন্যতা, বরফে আটকে পড়া,গরমে স্ট্রোক করা সহ মরে যাওয়ার নানাবিধ কারন রয়েছে।
গ্রীসের বর্ডারে অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য ১৮'র নভেম্বর থেকে ফ্রান্স জার্মানি ও গ্রীসের যৌথ সীমান্তরক্ষী নিয়োগ করেছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন।

এই দুর্গমপথে কি বিনা পয়সায় আসা যায়? মোটেও না।দালাল আপনাকে ৫/৭ লাখ টাকায় ইউরোপে পৌছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখাবে।কিন্ত ঠিকই আপনার ১৩/১৪ লাখ টাকা গুনতে হবে।ধরে নিন দালাল আপনার সাথে চুক্তি করবে এক লাখ টাকা।কিন্ত আপনাকে জিম্মি করে তিন লাখ টাকা নেওয়াটা অসম্ভব নয়।অহরহ এমনই হয়ে থাকে।

#কিভাবে?
আপনাকে আটকিয়ে পিটিয়ে আইএস স্টাইলে ভিডিও করে আপনার বাড়িতে ভিডিও দিবে।তখন? বাড়িতে ওরা ভিটা বিক্রি করে হলেও আপনাকে মুক্তি করাতে চাইবে।মুক্তিপণ আসার আগ পর্যন্ত নির্মম সেই যাতনা সহ্য করে যেতে হবে।পিটা খেয়ে মরে গেলে কোন সমস্যা নেই।নিরাপদে যে কোন জঙ্গলে ফেলে আসলেই হলো।উন্নত এই দেশগুলোতে পাহাড় আর জঙ্গলের অভাব নেই।বাংলাদেশের মত এত ঘনবসতিও নয় যে জঙ্গলে লাশ নিয়ে যেতে কেও দেখে ফেলবে।

#এখন আসি তুরস্কে কিভাবে অবৈধপথে মানুষ আসে।
দুবাই এবং ওমান থেকে সাগরপথে স্পিটবোর্ডে ইরান।স্পিটবোর্ডের গতি প্রতি মিনিটে সাড়ে তিন কিলোমিটার। যত শক্তিধর পয়লোয়ান হোক বমিতো করবে করবে, মুখ দিয়ে পেটের নাড়িবুড়ি বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।কেও কেও মারা যায়।সাগেরই ফেলে দেওয়া হয়।সাগরে দুবাই ওমান ও ইরানের সীমান্তরক্ষীর টহল থাকে সর্বক্ষণ।ওদের চোখে ফাঁকি দেওয়াও সহজ কথা নয়।ধরলে খবর আছে।কখনো হেলিকপ্টার দিয়েও ধরে নিয়ে যায়।

#ইরান ঢুকতে পারলে ইরান থেকে তুরস্ক।ইরাক থেকেও তুরস্ক ঢুকা যায়।ইরান হোক বা ইরাক হোক দালাল আপনাকে বলবে দেড় দুই ঘন্টা হাটা লাগবে।কিন্ত ১২/১৫ ঘন্টার কম তুরস্কের ঘ্রাণও পাবেন না।আবার কখনো দিনের পর দিন। এমন কি পাঁচ সাত দিনও হাটা লাগতে পারে।আর শুধু হাটা নয়।দৌড়তে হয় সর্বক্ষণ।

#ইরান ইরাক তুরস্ক সীমান্তে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম উঁচু পাহাড়সমূহ রয়েছে।হিমালয়ের পরে ইরানের পর্বতগুলোর স্থান।
৩/৪ হাজার ফুট উচ্চতা সাধারন ব্যাপার?ইরান বা ইরাক থেকে তুরস্ক ঢুকতে এমন কত পাহাড় বেঁয়ে উঠা লাগে সে হিশাব না-ই দিলাম।উঠা নামা।উঠা নাম।দিনের পর দিন।রাতের পর রাত।খাদ্যশূণ্যতা পানিশূন্যতা ও স্ট্রোক করে অনেকে মারা যায়।

#আরেকটি কথা বলে রাখি, এই পথের পথপ্রদর্শককে বলা হয় ডঙ্কার।দালালের ভাড়াটে চাকর।ডঙ্কার পাকিস্তানি, ইরানি,কুর্দি হয়ে থাকে।মানুষ খুন তাদের কাছে পান্তা ভাত।ডঙ্কারের কাছে ধারালো ছুরি থাকে।
এই ভয়ঙ্কর পথে কেও যদি ক্লান্ত হয়ে নুয়ে পড়ে।পায়ের নলায় আঘাত করে মাঠিতে ফেলে দেয়।এর পর বুকের বাম পাশে ছুরি ঢুকিয়ে আপনাকে খতম করে দিবে।কালিমা পড়ার সুযোগ পাবেন না।প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করার শক্তি থাকেনা।সাথের কেও প্রতিবাদ করেনা।
চাচা যার যার জান বাঁচা।

#মানুষ মারার কারন হলো ৫০/১০০ জন মানুষ নিয়ে একজন ডঙ্কার ছুটে।একজন পিছনে পড়লে পুরো গ্রুপ ধরা খেতে পারে।তুরস্কে না ঢুকাইলেতো আর টাকা পাবেনা।একজনকে খতম করাই তার জন্য নিরাপদ।যত আগে পৌছবে সেটি ডঙ্কারের জন্য প্লাস পয়েন্ট।

#ইরানের অন্য সীমান্ত থেকে তুরস্ক সীমান্তে অথবা ইস্তাম্বুল শহর থেকে গ্রীস সীমান্তে তথা পাহাড়ের পাদদেশ নিয়ে আসা হয় ছোট্ট কার দিয়ে।
খুব আরামে? মোটেই নয়।ছোট্ট কারে করে ১০/১২ জন মানুষ নিয়ে আসে।কারের পিছনের বক্সে ৪/৫ জন মানুষ ঢুকিয়ে লক করে ফেলে।মরলে ওখানেই মরো।

#তুরস্কে আসতে পারলে সেখান থেকে গ্রীস।গ্রীসেও এমন হয়।ডঙ্কার মানুষ খুন করে।যত তাড়াতাড়ি পৌছবে ডঙ্কারের লাভ।একজনের কারনে পুরো গ্রুপ পাকড়াও হতে পারে।কেও এমনিতেই মারা যায়।কখনো ঠান্ডায়,কখনো বরফের পাহাড়ে আটকে।জঙ্গলে পাহাড়ে মরদেহ পঁচে গলে যায়।চিল কাকও হয়ত খোঁজে পাবেনা।দেও দানবও ঐসব রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করেনা এমন ভয়ঙ্কর রাস্তা।

#আমেরিকা।
কলম্বিয়ার পানামা 'ড্যারিয়ান গ্যাপ' জঙ্গল হয়ে মেক্সিকোর হাজার হাজার মাইল মরুভূমির উত্তপ্ত রোদে বা বরফগলা ঠান্ডায় পায়ে হেটে পাড়ি দিতে পারলে আমরিকা।সহজ ব্যাপার না?
দালাল বলবে ২/৪ দিন লাগবে। কিন্ত ২৫/৩০ দিন লাগাটা স্বাবাভিক। কয়জন বাঁচে!
সেপথেও ডঙ্কার সাথে থাকে।ডঙ্কার অনেককেই খুন করে।অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এমনিতেই।নিচের লিংকগুলো দেখে নিবেন,প্রমান পেয়ে যাবেন।

#অস্ট্রেলিয়া।
মালয়েশিয়া বা ইন্দোনিশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার গুঞ্জনও আছে।
অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য মালয়েশিয়া থেকে বিমানে বা নৌযানে ইন্দোনিশিয়ায় নিয়ে যায় দালাল।ইন্দোনিশিয়ায় রয়েছে ৫ হাজার দ্বীপ।অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে নৌযানে করে যে কোন এক দ্বীপে নিয়ে যায় দালাল।সেখানে গিয়ে বলে তোমাদের স্বপ্নের দেশ অস্ট্রেলিয়া চলে এসেছো! টাকা পেমেন্ট করাও।টাকা পেয়ে দালাল উধাও হয়।ওদের ভাগ্যে যা হবার হয় তাই হয়।ভাগ্য ভালো থাকলে ইন্দোনিশিয়ায় ৬/৮ মাস জেলে খেটে দেশে আসেন কেও কেও।না হয় জেলেই পঁচতে হয় বছরের পর বছর।

#আবার কোন কোন দালাল সাহস করে সাগর হয়ে নৌযানে করে অস্ট্রেলিয়ার পথ ধরে। একটু একটু বলে বলে ১২/১৫ দিন সময় যায় সাগরেই! খাদ্য পানি সবই শেষ হয়ে যায় যাত্রীদের।শীতের মৌসুম হলে ঠান্ডায় মরে যায় অনেকে।সাগরেই ওদের মরদেহ ফেলে দেয়া হয়।
গরমের মৌসুমে এই দুর্গম পথে যখন খানি পানি শেষ হয়, শরীরের ঘামই হয় তাদের খাবার! পেটের যন্ত্রনায় কেও কাপড় ছিড়েও খায়।

#ভাগ্যক্রমে যদি কেও এই ভয়ঙ্কর পথ অতিক্রম করে অস্ট্রেলিয়ায় পৌছে যায় তাহলে সেখানকার সীমান্তরক্ষীর গ্রেপ্তারি কোন ক্রমেই এড়ানো সম্ভব নয়।গ্রেপ্তারির পর ফিরিয়ে দিবে ইন্দোনিশিয়া বা মালয়েশিয়ায়।অথবা জেলে খেটে বাড়ি থেকে টিকেটের টাকা নিয়ে ফেরত আসতে হবে।কোন অবস্থাতেই অস্ট্রেলিয়ার মুক্ত আকাশের বাতাস গ্রহন করতে পারবেন না।

#এত কষ্ট!এত ভয়ঙ্কর! কিন্ত যারা ভাগ্যক্রমে অবৈধ পথে ইউরোপে আসলো তারা কেনো এই সব বলছেনা?
কারন দুইটা।
১-কেও লজ্জায় বলেনা।বাঙালিরা স্বচক্ষে না দেখলে কোন কিছু বিশ্বাস করে?
২-যদি এইসব ভয়ঙ্কর যন্ত্রনার কথা শুনায় তাহলে আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব বলবে সে ইউরোপে গিয়ে বড় হচ্ছে।আমরা বড় হয়ে যাবো বলে কাহিনী শুনাচ্ছে।

#গতকয়েক দিন আগে লিবিয়া থেকে সাগরপথে তিউনিসিয়ার কাছে ৬০জন মৃত্যুবরণ করেছে। সাগরের অতলগহবরে তাদের স্বপ্নের সমাধী হয়েছে। তারমধ্যে বাংলাদেশের অনেকে আছে। সবাইকে আল্লাহ জান্নাতবাসী করুন।আমিন।

Collected

Sunday, 26 May 2019

একটি আত্মবিধ্বংসী জাতির ধ্বংসের উপাখ্যানঃ

একটি আত্মবিধ্বংসী জাতির ধ্বংসের উপাখ্যানঃ

১ - দুধে: ফরমালিন
২ - গরুর দুধ বৃদ্ধিতে: পিটুইটারী গ্ল্যান্ড ইনজেকশন
৩ - মাছে: ফরমালিন
৪ - শাকসবজি টাটকা রাখতে: কপার সালফেট
৫ - আম, লিচু জাম পাকাতে: কারবাইড
6 - আম, লিচু, জাম সংরক্ষণে: ফরমালিন
৭ - ফল গাছে থাকতেই: হরমোন ও কীটনাশক
৮ - তরমোজে সিরিন্জ দিয়ে দেয়: পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট
৯ কলা পাকানো হয়: ক্যালসিয়াম কারবাইড
১০ - কফি পাউডারে: তেঁতুলের বিচির গুড়া
১১ - মসলায়: ইটের গুড়া
১২ - হলুদে: লেড ক্রোমেট/ লেড আয়োডাইড
১৩ - মুড়িকে ধবধবে সাদা ও বড় করতে: হাইড্রোজ ও ইউরিয়া
১৪ - দীর্ঘক্ষন মচমচে রাখার জন্য জিলিপি, চানাচুরে: পোড়া মবিল
১৫ - আকর্ষণী করতে আইসক্রিম, বিস্কুট, সেমাই, নুডলস ও মিষ্টিতে: কাপড় ও চামড়ায় ব্যবহৃত রং
১৬ - ফলের রস তৈরী: ক্যামিকেলস দিয়ে
১৭ - বিদেশী মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য/ঔষধ/ক্যামিকেলস
১৮ - চাল চকচক করতে: ইউরিয়া
১৯ - পিয়াজু, জিলাপিতে: এমোনিয়া।

আরও আছে...

১ - পানি-২০ লিটার (২ টাকা গ্লাস) অধিকাংশই অটোমেশিনে নয় হাতে ঢালা হয়। পারক্সাইড দিয়ে নয় নাম মাত্র পানিতে ধুয়া হয়।
২ - কলায় ক্ষতিকর কার্বাইড দেওয়া হয়।
৩- ফলে হরমোন প্রয়োগ করা হয়।
৪ - সবুজ ফল ও শাকশব্জিতে কাপড়ের সবুজ রঙ ব্যাবহার হয়।
৫ - সসেও তাই।
৬ - খামারের মুরগিতে বিশাক্ত ক্রোমিয়াম, লেড আর এন্টিবায়োটিক তো আছেই।
৭ - চাষের মাছেও তাই।
৮ - ডিমতো মুরগি থেকেই আসে তো উপরের জিনিষ তো এখানে থাকবেই।
৯ - জুস, লাচ্ছি তো উচ্চ মাত্রার প্রিজারভেটিভ।
১০ - রুহ আফজাহ আর হরলিক্স তো প্রমানে অপারগ যে এতে আসলে কল্যাণকর কিছু আছে।
১১ - ভাজাপোড়া এক তেল ২ দিনেই দুষিত হয় আর তা চলে টানা ১ মাস (হাই এসিড লেভেল)।
১২ - মসল্লায় আলাদা রঙ (মেটালিক অক্সাইড)।
১৩ - সরিষার তেলে ঝাঁজালো ক্যামিকেল।
১৪ - সয়াবিনে পামওয়েল।
১৫ - শুটকিতে কিটনাশক।
১৬ - কসমেটিক্সে ক্যান্সারের উপাদান লেড, মারকারি ও ডাই।
১৭ - আর সবার সেরা 'ফরমালিন', তিনি তো আছেন সবখানেই।

বাঙালির আরো অনেক আবিষ্কার আছে যা আমরা হয়তো জানি না। আমরা এক রাতে ধনী হতে চাই এই জাতিকে ধ্বংস করার বিনিময়ে।
আসুন আমরা সবাই মিলে এই চক্রকে প্রতিহত করি। জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাই....

সোশ্যাল ডিজাস্টার এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা।
তবু বেহুশ।

সূত্র: ইত্তেফাক, পৃষ্ঠা: ২
তারিখ: ২৬।০৫।২০১৮

Saturday, 25 May 2019

শেখ কামাল ব্যালট বাক্স ছিনতাই

 পড়ুন তাহলে: ১/  ৭ই  মারচ ১৯৭৩ সালের  সাধারন  নির্বাচনের দিন সকালের ঘটনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা ইনস্টিউটের ভোট কেন্দ্রে ভোট দিয়ে জাসদ ছাএলীগের নেতা মহাবুবুল হক ও গনকন্ঠ পএিকার সম্পাদক আফতাব উদ্দিন কলাভবনের একতলায় রেলিংয়ের উপর বসে ছিলেন। বেলা ১১ টার দিকে হটাৎ শেখ কামাল তার কয়েকজন সহযোগীসহ তাদের দুইজনকে ধরে চোখ বেঁধে গাড়ীতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় এবং শারিরীকভাবে নির্যাতন করে। পরে রাত ৯ টায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আফতাব উদ্দিন পরে বলেছিলেন তাদের আবাহনী ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। [তথ্যসুএ জাসদের উথথান পতন-অস্থির সময়ের রাজনীতি বইয়ের পৃষ্ঠা নং ৯৮ লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ]
২/   ১৯৭৩ আগষ্টের ডাকসু নির্বাচন। সন্ধায় দেখা গেল জাসদ সমর্থিত প্যানেল বিপুল ভোটে এগিয়ে। হল সংসদেও একিই অবস্থা। রাত ৮ টার দিকে মুজিব পন্থী পরিষদের নিশ্চিত পরাজয় হতে চলেছে জানতে পেরে শেখ কামাল ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে। শেখ কামাল ও তার সহযোগীরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে এক হল থেকে অন্য হলে যায়। প্রতিপক্ষ দলের ছাত্ররা এবং ভোট গণনার কাজে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা আতংকিত হয়ে যে যেদিকে পারেন পালিয়ে যান। এ প্রসংগে মুজিববাদী ছাএলীগের একজন কর্মীর দেখা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উদ্ধৃত করা যেতে পারে। সন্ধার পর আমরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় দেখি শেখ কামাল বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে কালো কাপড় বাঁধা, তার পায়ের কাছে কয়কটি ব্যালট বাক্স, আরো কয়েকজন বন্দুকধারী তার চারপাশে। মিছিল বের করার আগে আমরা ধারনা করতেও পারিনি যে শেখ কামাল ইতিমধ্যেই ডাকসু নির্বাচনের ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে ফেলেছে। [তথ্যসুএ জাসদের উথথান পতন-অস্থির সময়ের রাজনীতি বইয়ের পৃষ্ঠা নং ১০৫- ১০৬ লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ] [ বিটু, ইজাজ আহমেদ (২০১৩), হতভাগা জনগন-পেক্ষাপট বাংলাদেশ, রাঢ়বংগ, রাজশাহী, পৃষ্টা ৪৬]

Sunday, 19 May 2019

মুরগীর খোপে আমার দিনলিপি। পর্ব-৫

মুরগীর খোপে আমার দিনলিপি। পর্ব-৫

মুরগির খোপ ছেড়েছি প্রায় বছর খানেক হলো। সেইসব বৈচিত্রময় দিনগুলো আজো আমার হৃদয় মানসপটে অম্লান। বঙ্গদেশ থেকে আগত মুরগিরা মুরগির খোপকে বৈচিত্রময় করে তুলেছেন তাদের চিন্তা এবং প্রাত্যহিক কর্ম দিয়ে।
সকালে মুরগিদের হাঁক ডাক আর শুনিনা, আকাশ-পাতাল সমতুল্য চাপাবাজি, নিত্য বিবি তালাকের ঝগড়া, মূর্খ আমিলিক-বিম্পির নেতাদের সস্তা গল্প, দ্বিতল খাটে শুয়ে প্রেমিকার কাছে ফরাসি দেশ কিনে ফেলার গল্প। একসময় এসব শুনে বিনোদিত হতাম।

চালন বাটি করা লাগবো
........................................
এইতো কিছুদিন আগে প্যারিসের বাঙালি পাড়া খ্যাত গার দে নর্ডে‘র রাস্তা দিয়ে হাটছি। মাঝ বয়সী বাঙালি চাচা আমার সামনে দিয়ে দ্রুত হেটে যাচ্ছেন, এক হাতে বাজার সদাইয়ের ব্যাগ অন্য হাতে ফোনে কথা বলছেন। ফোনের অপর প্রান্তের লোকটির উপর চাচা খুব বিরক্ত। বুঝলাম বাসায় যাওয়ার খুব তাড়া, পারলে হাওয়াই জাহাজে চড়ে যেতে চান। কিন্তু কেন এতো তাড়া ?
কিছুটা বিরক্ত হয়েই চাচা ফোনে লোকটিকে বললেন
“হেটার ঘরর হেটা, খল দেয়ার আর টাইম পাইসসনা। ঘরো গিয়া চালন বাটি করতাম, বাদে মাতুমনে। “
বুঝতে আমার আর অসুবিধা হলোনা, চাচা একটি মুরগীর খোপের দায়িত্বে আছেন, মুরগীর খাদ্য বন্টনের মহান কর্মে  নিয়োজিত। রাত ১০ টা বাজলে মুরগীরা খোপে ফিরতে শুরু করে। তার আগেই ছোট ছোট বাটিতে চালন (তরকারি) বন্টন শেষ করতে হবে। তরকারি সমভাবে বন্টন না হলে মুরগীদের মধ্যে কাজিয়া লাগার সম্ভাবনা আছে। এমনকি এ কাজিয়া রাতের ঘুম নষ্ট করে খুনোখুনি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। তবে মুরগী ব্যবসাtয়ীরা কাজিয়া বাড়তে দেননা।

মুরগির খোপে রাজনীতি
........................................
সভ্যতার বিবর্তনে মানুষ একস্থান থেকে অন্যস্থানে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে। সেইসাথে নিয়ে যায় নিজস্ব সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ।
বাঙালি পৃথিবীর যে দেশে গিয়েছে, সে দেশেই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গিয়েছে। শুনেছি পরবর্তী টার্গেট নাকি চাঁন্দের দেশ। ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জাপানে আমিলিক-বিম্পির রাজনীতির পর এবারের টার্গেট নাকি উগান্ডা আর ঘানা !!!! তো মুরগির খোপ কেন রাজনীতির বাহিরে থাকবে। মুরগির খোপে আমার থাকার বন্দোবস্ত হবার পর বুঝলাম দুই ধরণের রাজনীতির চর্চা হয় এখানে। প্রথমত, মুরগির খোপের আধিপত্য এবং ঘুমের বেপারীকে তেল মারার রাজনীতি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ -বিএনপির রাজনীতি।
মুরগির খোপে গ্রূপিং থেকে রাজনীতির সূত্রপাত হয়। অনেক কারণে গ্রূপিং হয় যেমন আঞ্চলিকতা, আমিলিক-বিন্পি এবং কাগজধারী সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে মুরগি ব্যবসায়ীর কান ভারী করে। অমুকের তরকারি মজা হয়নি, একজনের চালন আরেকজন খেয়ে ফেলছে, টয়লেট ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ করেনি, নাক ডাকা সহ এমন অভিযোগ এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায়ই করে। তবে ঘুমের বেপারী (মুরগি ব্যবসায়ী) এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ। ঘুমের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে নিরপেক্ষ থাকতেই হবে।

পুলিশে ধরবে
....................................
ফ্রান্সে বাঙালি সমাজে স্বদেশী কুতুবদের কাজকর্ম অত্যন্ত হাস্যকর। কুতুবদের কেউ কেউ নিজেকে আওয়ামীলীগের, কেউ বিএনপির, কেউ কমিউনিটি নেতা দাবি করে। কেউ মুরগী পালন করেন, অনেকে সাংবাদিক ( পড়ুন সাংঘাতিক) লালন পালন করে, আবার কেউ চামচা পোষে। একজন আরেকজনকে ভয় দেখিয়ে নিবৃত করে, অনৈতিক সুবিধা আদায় করে। মুরগীর খোপে পুরাতন মুরগীরা নতুন মুরগীকে ভয় দেখায়, নতুন কেউ আসলে সবাই মিলে মিশে ভয় দেখায়। এটা করবেননা, সেটা করবেননা, করলে পুলিশে ধরবে।

ফরাসি দেশে আসার আগেই আমি রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন এবং পর্যাপ্ত তথ্য নিয়ে আসি। কেনো এসব তথ্য আমি জানি, এ নিয়ে মুরগির খোপের আদি বাসিন্দাদের প্রবল ক্ষোভ !!! কেনো আমি তাদের কাছে তথ্য জানতে চাইনা !!!
নতুন মুরগীকে(মেস মেম্বার) দিয়ে রান্নার কাজ করানো প্যারিসের বাংলাদেশী মেস গুলোর অন্যতম বদঅভ্যাস। কিছুদিন আগে নোয়াখালীর একজনের সাথে কথা হলো এ বিষয়ে। ৬ বছর আগে তিনি ফ্রান্সে আসেন। এসেই তিনি মুরগির খোপে উঠেন, পুরাতন মুরগিরা তাকে ঘর থেকে বের হতে দিতোনা পুলিশের ভয় দেখিয়ে।  অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে তিনি তাঁর মেসের মেম্বারদের সম্পর্কে বললেন “ মা******র হুতেরা আঁরে দি ৩ মাস ভাত রান্দাইছে” 😁 (অর্থাৎ  মা******র পোলারা তাকে দিয়ে প্রতিদিন রান্না করিয়েছে।) মেসের কথা উঠলেই তিনি গালি দেন। মনে তার অনেক ক্ষোভ, ব্যথা। মুরগির খোপের মালিক এবং মুরগি ব্যবসার প্রতি তার আজন্ম ঘৃণা।

হারামি খোর
......................
ফরাসী দেশে বাঙালি সমাজে একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো ”হারামি খোর”😁 যারা সরকারি ভাতা খায় তাদেরকে এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সহজ বাংলায় এটা হলো “বেকার ভাতা“
অনেকে বছরের পর বছর বেকার ভাতা খেয়েই যাচ্ছে কাজ কর্ম ছাড়া। অনেকে আবার সরকারকে ট্যাক্স না দিয়েই নগদ বেতনে কাজ করছেন সাথে বেকার ভাতাও পাচ্ছেন। যারা “বেকার ভাতা“ পাননা অথবা ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন, তারাই মূলত “হারামি খোর“ বলে অভিহিত করেন। আবার ব্যক্তিগত রেষারেষির এবং প্রতিহিংসার কারণেও একজন আরেকজনকে ”হারামি খোর” বলেন। মুরগি খোপে এই বিষয়ে বহু বিতর্ক এবং ঝগড়া বিবাদ হতে দেখেছি। ২০১৬ সালের দিকে আমার দ্বিতীয় মুরগির খোপে এ নিয়ে বিশাল বিরোধের সূত্রপাত  হয়েছিল। বিতর্ক সহিংসতায় রূপ নিলে, মধ্যরাতে আমাকে মধ্যস্থতা করে দুপক্ষকে শান্ত করতে হয়েছে।

টাহা দিয়া খাইতেয়াছি
..............................
খেলাধুলায়, ব্যবসায় কিংবা নির্বাচনে প্রতিযোগিতা আমরা প্রায়ই দেখি। এটা একটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। ফরাসি দেশে বাঙালি মুরগির খোপে খাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা আমাকে আশ্চর্য করেছে। কে কার চাইতে বেশি খাবে তা নিয়ে চরম প্রতিযোগিতা !!!
 ৬ জনের মুরগির খোপে ৫ কেজি মাংস মুহূর্তেই নাই !!!
তাজ্জব হয়ে গেলাম 🙄 রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে “ডক ডক ডক“ করে গ্লাসে দুধ খাচ্ছে !!!
এরপর একজন আরেকজনকে দোষ দেয় “অমুকে বেশি খায়, তমুকে বেশি খায়” । মুরগিদের মনোভাব ”টাকা দিয়ে খাই, কম খামু কেনো” !!!!
প্রতিযোগিতা করে খাওয়া নিয়ে একদিন মুরগির খোপে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লো। সকাল ৮ টা, গভীর নিদ্রা মগ্ন আমি। হটাৎ ঘুম ভেঙে গেলো মুরগিদের হাঁকডাকে। কান খাড়া করে শুনলাম দুধ খাওয়া নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। কেউ একজন দুধ বেশি খেয়েছে, সকালে  অন্যদের জন্য নাই, তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ। তিনজন মিলে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে “বেশি দুধ“ খায় বলে। তবে আমার মনে হলো “অভিযুক্ত ব্যক্তি“ রাজনীতি কিংবা ষড়যন্ত্রের শিকার। সাতসকালে আমি প্রস্তাব করলাম এ বিষয়ে রাতে রাতে বৈঠক হবে। অভিযোগকারী তিনজন এটি মেনে নিতে নারাজ, তাদের দাবি একটাই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যেন মুরগির খোপ থেকে বের করে দেয়া হয়। অবশেষে রাতের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো ”নাস্তা” উঠিয়ে দেয়ার। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বলতে শুনলাম “মুই টাহা দিয়া খাইতেয়াছি, মাগনা খাই ?”

সম্বাদিক  বনাম  সাংবাদিক
........................................
প্যারিসে বাংলা সাংবাদিকতার সংজ্ঞা : মানুষের মুখের সামনে বুম/মাইক ধরে ভিডিও করাকে সাংবাদিকতা বলে। ধারণকৃত ছবি এবং ভিডিও পরদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ”ইউরো ভর্তি খাম” নেয়াকেও সাংবাদিকতা বলে। 😁
চারিদিকে শুধু সম্বাদিক, কিন্তু সাংবাদিক দেখিনা। গত কয়েক বছরে ফ্রান্সে বাংলা সাংবাদিকতার বাম্পার ফলন হয়েছে। প্যারিসের অলিতে-গলিতে বাঙালি সম্বাদিক। সবাই শুধু সম্বাদিক হতে চায় !!! ফেইসবুক লাইভের সম্বাদিক, অনলাইন পোর্টালের সম্বাদিক, টেলিভিশন চ্যানেলের সম্বাদিক। সম্বাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে অনেকে গৌরব বোধ করেন।
অনেকের মতে প্যারিসে বাংলা “সাংবাদিকতা” একটি গালি। সাংবাদিকতার অপর নাম চ বর্গীয় গালি 😁

“সাংবাদিকতা”র পশ্চাৎদেশ মেরে দিয়েছেন এই বিশিষ্ট সম্বাদিকরা 😁। সেদিনই বুঝেছি সাংবাদিকতা ধর্ষিত  হয়েছে, যেদিন ভাতের হোটেলের মালিক এবং মুদি  দোকানদারকে বানিয়েছে অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক !!!
ফরাসি দেশে আসার পর কয়েকটি সভা-সেমিনারে গিয়ে “সম্বাদিক“ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।সভা শেষ হওয়া পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে ভিডিও/ছবি ধারণ করেন। দুই /তিনটা প্রোগ্রাম একসাথে থাকলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন এবং যাওয়ার সময় আয়োজকদের বলে যান “আচ্ছা ভাই দেখা হবে“😁 অর্থাৎ “টাকা ওয়ালা খাম“ সম্পর্কে কিছু বলেন 😁 আয়োজকরা চুপি চুপি একটা কোনায় গিয়ে “খাম“ হস্তান্তর করেন অথবা বলেন “আচ্ছা আমি বিকেলে দেখা করবো“ 😁😁😁
প্যারিসে সাংবাদিকতার (পড়ুন সম্বাদিকতা) ব্যবসা চলে মূলত টেলিভিশনে খোমা দেখানো নিয়ে। কমিউনিটি নেতা নামক বীর পুঙ্গব গুলো টেলিভিশনে খোমা দেখালেই খুশী 😁। টেলিভিশনে প্রবাসী নিউজে ২০ সেকেন্ড দেখালেই সফল।  খুশীতে গদ গদ হয়ে সম্বাদিক নামের প্রাণী গুলোকে টাকা দেয়। দুই পক্ষই খুশী !!! পরেরদিন কমিউনিটি  ন্যাতা-খ্যাতা গুলো নিজের ফেসবুকে ওই নিউজ শেয়ার করে। এতেই নিহিত সুখ। এটাই সমাজ সেবা !!! সম্বাদিক খুশী, নেতাও খুশী 😁
মাস ছয়েক আগে এমনি এক সম্বাদিকের সাথে দেখা হলো  বাঙালিপাড়া খ্যাত গার দে নর্ডে। স্বল্প পরিচিত এক লোক পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশিষ্ট সম্বাদিকের সাথে !!!! জিজ্ঞেস করলাম কোন পত্রিকায় কাজ করেন। “অনলাইন পত্রিকায়“ সম্বাদিকতা করেন বলে জানালেন। ২/৩ লাইন বলার পর আর শুদ্ধ আসেনা। “সাংবাদিক” শব্দটাকে উচ্চারণ করেন “সম্বাদিক“ বলে 😁। আর সাংবাদিকতা  সম্পর্কে যা বলছেন সব উদ্ভট, অপ্রাসঙ্গিক এবং বালখিল্যতা। পরে বিশিষ্ট বীর পুঙ্গব সাংবাদিকের ফেইসবুক একাউন্টে গিয়ে দেখলাম অন্যের নিউজ শেয়ার করে ওয়াল ভরিয়ে ফেলেছেন। নিজের হ্যাডম নাই এক লাইন লেখার। মনে মনে বলি ”আপনারাই সাংবাদিকতার পো.....ঙ্গা মেরে দিয়েছেন ” 😁।

কালের বিবর্তনে সাংবাদিক হয়েছে সম্বাদিক, পরবর্তী যাত্রা সম্বাদিক থেকে হাম্বাদিক। জয় হোক হাম্বাদিকতার।

(চলবে)

বিঃ দ্রঃ নিজ দায়িত্বে পড়িবেন। কোনো বিষয় অযথা নিজের উপর টানিয়া লইয়া লেখককে দায়ী করা যাইবেনা।