Sunday, 3 September 2017

“বাংলাদেশের সাবমেরিন রাজনীতিঃ স্নায়ুচাপে ভারত ও চীন”

ঢাকা টু রেঙ্গুন ভায়া দিল্লীকা আন্ডা,
.
মাত্র গত বছর ডেভলপমেন্ট গোল বাস্তবায়ণে দুটি সাবমেরিন চীনের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল বাংলাদেশ। যথাক্রমে নবযাত্রা ও জয়যাত্রা ২২ ডিসেম্বর চীন থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে এর আগে গত ১৪ নভেম্বর এ দুই সাবমেরিন বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
.
১২ মার ১৭ তে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনিং করে ঈশা খাঁ ঘাঁটির জেটি থেকে মিশন শুরু করে। আমাদের টেরিটরির দেশ গুলোর ভেতর ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ইরান ও মালোয়েসিয়ার হাতে সাবমেরিন থাকলেও মিয়ানমার, শ্রীলংকার হাতে নেই। ফলে নৌশক্তির মানদন্ডে পিছিয়ে যায় মিয়ানমার।  
.
কিন্তু UN Security Council reform এর আওতাতে স্থায়ী আসনের স্বপ্ন দেখা ভারতের কি প্রতিক্রিয়া ছিল আমাদের সাবমেরিন অর্জনের পথে?
.
দেখুন পত্রিকার লীড
১) “বাংলাদেশের সাবমেরিন রাজনীতিঃ স্নায়ুচাপে ভারত ও চীন”
http://bit.ly/2evubwC
.
২)চীনা সাবমেরিন ক্রয় ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
http://bit.ly/2xHFXN0
.
৩) বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয় এবং সন্দিগ্ধ ভারত
http://bit.ly/2eA1Nxj
.
এ ধরণের হতাশাজনক মন্তব্যের পর ভারত তার পলিসি চেঞ্জ করে বাংলাদেশের সাথে সামরিক বানিজ্যে গূরুত্ব দিতে শুরু করে।
এপ্রিলে সংবাদ আসেঃ
"বাংলাদেশে অস্ত্র বিক্রিতে ভাগ চায় ভারত"
http://bit.ly/2iTuy9m
.
এর পর বহুল বিতর্কিত ভারত বাংলাদেশ সামরিক মেমোরেন্ডাম স্বাক্ষর। লিংক
“সামরিক-চুক্তি-আত্মঘাতী-হবে”
http://bit.ly/2nohxpl
.
এরপরেও আমাদের সাবমেরিন সার্ভিসিং ও সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণে উদগ্রীব ছিল ইন্ডায়ান নেভী। তবে সেই আশা পূরণ হয়নি Bangladesh Navy এর বাস্তবসম্মত যুক্তিতে।
.
এর আগে বাংলাদেশ আর্মীর ওয়ার প্রাক্টিসের ডামি হিসাবে প্রতিবেশী শত্রুভাবাপন্ন ভারতের সীমান্ত ডামি বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ভারতীয় সৈনিকদের হাতে বাংলাদেশী হত্যা প্রকল্প বন্ধ করেনি ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। সীমান্তে ভারতীয়দের হাতে বাংলাদেশী হত্যার ভয়াবহ পরিসংখ্যান পাবেন এখানে:        http://bit.ly/2guIeDe
.
সীমান্ত হত্যার এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতে কিভাবে ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্ব সুসময় পারি দিচ্ছে আমার বুঝে আসে না। সংবাদ পত্র গুলোও এই অসম অশুভ বন্ধুতকে সরল চোখে দেখছে। কিন্তু কেন?
http://bit.ly/2vCbcvo
.
ভারত শুধু নিজে সরাসরি বন্ধুত্বের আড়ালে বিশেষ অনুগত দলের জন্য বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা আচারণ করছে তাই নয় বরং প্রতিবেশীদেশ গুলোকে উষ্কানি ও সাহায্যদান করছে  কাবু করার চেষ্টাতে।
.
*ঢাকার সাবমেরিন ক্রয়ের পর, ভারত সাবমেরিন বিধ্বংসী টর্পেডো বিক্রয়ের অর্ডার নিয়েছে বার্মার কাছ থেকে। ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছিল “ভারত থেকে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলার দিয়ে রেংগুন শাইনা টর্পেডো সংগ্রহ করছে। টর্পেডো  ডিজাইন করেছে ভারতের ডিফেন্স রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। ভারত ডাইনামিক্স লিমিটেড নামের একটি ডিফেন্স ম্যানুফাকচারিং প্রতিষ্ঠান এটি তৈরি করছে। এ টর্পেডো শক্তিশালী বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
.
এর আগে বাংলাদেশ যখন সাবমেরিন ক্র‍য় নিশ্চিত করেছে তঝন সাবমেরিন খুঁজে বের করার জন্য মিয়ানমারের কাছে দ্রুততম সময়ে ভারত সোনার এবং রাডার বিক্রি করেছে।
.
উল্ফা নেতাদের বাংলাদেশ নিষ্ক্রয় করে দিলেও পার্বত্য শান্তি বাহিনীকে নিষ্ক্রয় করেনি ভারত। লিংকঃ
“বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়ের পর মিয়ানমারকে সাবমেরিন বিধ্বংসী টর্পেডো দিয়েছে ভারতঃ
১) http://bit.ly/2xH8ger
২) http://bit.ly/2gDpFkh
.
মায়ানমার বাংলাদেশ ইস্যুতে যে অতি গূরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আমরা অনেকেই জানতাম না, তা ডকুমেন্ট সহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় Altaf Parvez ভাই। মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার শাষনামলে স্বাক্ষরিত মিয়ানমার বাংলাদেশ চুক্তি বিষয়ে আলতাফ পারভেজ ভায়ের একটি পোষ্টটির লিংক সংযুক্ত করে দিলাম। যা জিয়ার উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন পররাস্ট্র জ্ঞানের প্রমান। লিংকঃ
http://bit.ly/2guTGPl
.
ভারত বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বাষ্পীভূত চার্মে মিয়ানমারের পশ্চাৎগামী টর্পেড কোন দিকে টার্গেট করে তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকাই ভালো।
.
কার্টেসিঃ Wasim Iftekhar ভাই

Friday, 1 September 2017

the last view of the loving ones tortured to death by Burmese Military

Leaving the land of her birth, having the last view of the loving ones tortured to death by Burmese goons before running for sanctuary. This one picture is worth a billion words to speak the enormity of her people's tragedy.

Sunday, 27 August 2017

সুত্র: বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেঃ অন্তরালের শেখ মুজিব / ডা. কালিদাস বৈদ্য

এক চিলতে ইতিহাস জেনে নেই। এবার থাকছে, তখনকার অনেক হিন্দু নেতাদের চোখে শেখ মুজিব।
*******
দেশ ভাগের সময় কালিদাস ছিলেন ছাত্র, অন্যদের সঙ্গে কোলকাতায় চলেও এসেছিলেন। কিন্তু ১৯৫০ সালেই তিনি ফিরে গিয়েছিলেন ঢাকায়, পাকিস্তানকে ভেঙে দেওয়ার ব্রত নিয়ে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে তিনি এম.বি.বি.এস পাশ করেন, ঢাকাতেই ডাক্তারি প্রাকটিস শুরু করে ভালো পসার জমিয়ে ফেলেন। কিন্তু তিনি মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র থাকার সময় ছাত্র রাজনীতি সংগঠিত করতে শুরু করেছিলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে উল্লে­খযোগ্য ভুমিকা নিয়েছিলেন। শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে ওঠে তখন থেকেই।

মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষনা প্রসঙ্গে কালিদাস বৈদ্য লিখেছেন, “ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা না করে মুজিবের স্বেচ্ছায় গ্রেফতার বরণ ও যুদ্ধকালে বাংলাদেশ সরকারসহ নেতাদের আচরণ দেখে আমরা বুঝেছিলাম, আমাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ।

তাই যুদ্ধ শেষ হবার আগেই আমরা চোদ্দো জন হিন্দু নেতা একত্রে বসে নতুন করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। পরে Law Continuation order of 1971 জারি করে মুজিব বুঝিয়ে দিলেন যে তার সরকার পাকিস্তানের Successor সরকার। তাতে সেখানে ইসলামিক জাতীয়তাবাদ স্বীকৃতি পেল। মুছে গেল বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস”।

শেখ মুজিবের গ্রাম, বেঁড়ে ওঠা ও কলকাতার কলেজ জীবন নিয়ে এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সংগঠিত কুখ্যাত দাঙ্গায় (যেখানে প্রায় ৫০০০ মানুষ খুন যার ৭৫% ছিল মুসলমান) শেখ মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে লেখক কালিদাস বৈদ্য লিখেন-

‘‘গোপালগঞ্জ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় ইসলামিয়া (বর্তমান মৌলানা আজাদ) কলেজে ভর্তি হন। …এইভাবে কলেজ শিক্ষার সাথে মাদ্রাসায় ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এবং প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দির কাছে রাজনৈতিক শিক্ষা পেয়ে মুজিব গড়ে উঠলেন ইসলামের এক নির্ভীক সেনাপতি রূপে। এভাবে ইসলামের সেনাপতি রূপেই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে নামলেন এবং ১৯৪৬ সালের ১৬ ই আগষ্টের নৃশংস কলকাতার দাঙ্গায় নেতৃত্ব দিলেন। পাকিস্তান সংগ্রামের তিনিই হলেন পূর্বাঞ্চলের প্রধান সৈনিক। সুরাবর্দির প্রধান সেনাপতি ও ডান হাত শেখ মুজিব। সেই সঙ্গে মুসলিম ছাত্র লিগের একজন অন্যতম নেতা। যখন স্বাধীনতা আন্দোলনে হাজার হাজার হিন্দু যুবক হাসিমুখে প্রাণ দিচ্ছিল,হাজার হাজার হিন্দু দেশপ্রেমিক কারা অন্তরালে কাঁদছিল এবং হাজার হাজার আহত পঙ্গু যুবক মৃতুর দিন গুনছিল, তখন যুবক শেখ মুজিব স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ না দিয়ে হিন্দুর বিরুদ্ধে জেহাদের পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন। এভাবে জেহাদের ডাক দিয়ে হিন্দুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর ব্রিটিশের সঙ্গে সেই ঘৃণ্য দেশভাগ চক্রান্তে লিপ্ত ছিলেন। ’’

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্সের জনসভা প্রসঙ্গে বাবু কালিদাস বৈদ্য লেখেন, “ বাড়িতে বসেই তিনি খবর পান যে, সেখানে স্বাধীনতা ঘোষণার পরিবেশ ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে তৈরি। সেদিন স্বাধীনতা ঘোষণা না করলে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী সেটা বুঝতে তাঁর বাকি থাকল না। কাজেই পরিস্থিতি তাঁকে ভীষণ এক চাপের মুখে ঠেলে দিল। তিনি বিশেষ একটি খবরের অপেক্ষায় ছিলেন এবং খবরটি পেতে দেরি হচ্ছিল। খবরটি তার কাছে ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। সভায় যাত্রা করার নির্দিষ্ট সময়ের কিছু পরে সেই খবরটিও তিনি পেয়ে যান। এই বিশেষ খবরটি কি তা আমার জানা থাকলেও এখন তা বলা সম্ভব নয়। এই বিশেষ কারণটি ছিল বাস্তব, অন্যগুলি অনুমান” (পৃষ্ঠা-১২৯)।

শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে কালিদাস বৈদ্য লেখেন,
“বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এত দিন মুজিব ৬ দফা দাবি করে ও স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধিতা না করে যে জনসমর্থন ও জাগরণ গড়ে তুলেছিলেন তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া প্রধানমন্ত্রী হয়ে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা পূরণ করা। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া নয়। তার মাথায় পূর্বের চিন্তা স্বাধীনতা থাকলেও নির্বাচনের পরে পাকিস্তানকে অটুট রেখে তিনি তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন নতুন করে দেখতে শুরু করেছিলেন। তিনি খুব ভালো করে বুঝছিলেন যে, বর্তমান আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই তাঁর মতো নিজ হাতে পাকিস্তান গড়েনি বা পাকিস্তান গড়ার জন্য জেহাদে অংশগ্রহণ করেনি। তাই পাকিস্তানের প্রতি যে প্রাণের টান তাঁর মধ্যে আছে, তাদের মধ্যে তা থাকতে পারে না। তাই তাদের পক্ষে পাকিস্তান তথা ইসলামি জাতীয়তাবাদকে পরিত্যাগ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদে গা ভাসিয়ে দেওয়া খুবই সহজ। তাই অখণ্ড পাকিস্তানের অস্তিত্ব মূল্যবান নয় তাদের কাছে। কিন্তু মুজিব তা করেত পারেন না। পাকিস্তান সৃষ্টির এক নেতা মুস্তাক আহম্মদের সঙ্গে তিনি লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান বলে আন্দোলন করেছেন। পাকিস্তান আদায় করেছেন। সেই সব স্মৃতি আজও তাঁর মনে দৃঢ়মূল ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাকে কিভাবে তিনি পরিত্যাগ করবেন”
(পৃষ্ঠা-১৩৩)

সুত্র: বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেঃ অন্তরালের শেখ মুজিব / ডা. কালিদাস বৈদ্য
*******

আপনাদের কারও কি বইটা পড়ার ইচ্ছা আছে? তাহলে এখানে

https://drive.google.com/file/d/0B4wDsget9PQuV1dRZHVDcmNlQ00/view

Monday, 10 July 2017

https://drive.google.com/file/d/0B4wDsget9PQuV1dRZHVDcmNlQ00/view

ইউনেস্কো কী বলেছে, কী বলেনি


১. ইউনেস্কোর বক্তব্য বা অবস্থানকে কেন্দ্র করে রামপাল আবার আলোচনায়, আবার বিতর্কে। বিষয়টি বোঝার সুবিধার্থে শুরুতে দেখে নেওয়া যাক ইউনেস্কো কী বলেছে আর কী বলেনি।
ইউনেস্কোর অবস্থান:

ইউনেস্কোর আগের অবস্থান, ‘স্ট্রাটেজিক এনভায়ারমেন্টাল এসেসমেন্ট (এসইএ) সম্পন্ন হওয়ার আগে ওই এলাকায় বড় ধরনের শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো (রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ) নির্মাণের অনুমোদন না দেওয়া।’
ইউনেস্কোর এখনকার অবস্থান, ‘এসইএ সম্পন্ন হওয়ার আগে ওই এলাকায় বড় ধরনের শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন না দেওয়া।’ এর অর্থ হচ্ছে সুনির্দিষ্ট করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামটা এখন নেই, কিন্তু ‘বড় ধরনের শিল্প কারখানা’র অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়ে কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি।
সরকারের বক্তব্য:
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রথমে বলল, ‘ইউনেস্কো রামপালের উপর থেকে আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।’ তারপর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বললেন , ‘ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্পে কিছু শর্ত দিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী বললেন, ‘সুন্দরবনের পাশে ‘আর’ কোনো ভারী শিল্প বা অবকাঠামো নির্মাণে সরকার অনুমোদন দিচ্ছে না। ইউনেস্কোর এই সুপারিশ ভবিষ্যতের অবকাঠামোর জন্যে বলা হয়েছে।’
ইউনেস্কোর অবস্থান আর সরকারের বক্তব্য:
ক. ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্প থেকে আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সরকারের এই বক্তব্যে ইউনেস্কোর বক্তব্য বা অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি।
খ.  রামপাল প্রকল্প নিয়ে ইউনেস্কোর শর্ত আগেও ছিল, এখনও আছে। সরকারের বক্তব্যের ধরন এমন যে, আগের ‘আপত্তি’ প্রত্যাহার করে এখন ‘শর্ত’ দিয়েছে, বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। পূর্বের ‘আপত্তি-শর্ত’র ভাষাগত কিছু পরিবর্তন করেছে ইউনেস্কো।
গ.  আগে ইউনেস্কোর আপত্তিতে রামপালের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ ছিল। এখন রামপালের কথা সুনির্দিষ্ট করে বলেনি। সরকারকে বলেছে ‘বড় ধরনের শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন না দিতে।’ এই অবস্থানকে সরকার বলছে, ইউনেস্কো রামপালের উপর থেকে আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। প্রকৃত অর্থে, রামপাল প্রকল্পের উপর আরও জোরালো আপত্তি দেওয়া হয়েছে। কারণ সুন্দরবনের পাশে শুধু রামপাল প্রকল্প নয়, আরও অনেক বড় শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করছিল সরকার। রামপাল এবং সেইসব বড় শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও ক্ষতি হবে সুন্দরবনের। শুধু রামপাল নয়, সরকার যাতে কোনও বড় শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো সুন্দরবনের পাশে নির্মাণের উদ্যোগ না নেয়, অনুমোদন না দেয়- সে কারণে ‘আপত্তি’র পরিধি অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। ‘আপত্তি’ বা ‘শর্তে’ শুধু রামপালকে সুনির্দিষ্ট না করে, সকল অবকাঠামোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রামপালকে ‘আপত্তি’ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। আরও জোরালো ‘আপত্তি’ বা শর্তারোপ করা হয়েছে।
ঘ.  সরকার ইউনেস্কোর বক্তব্য বা অবস্থানের ভেতরে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি বাড়তি শব্দ ‘আর’ যোগ করেছে। বাড়তি একটি শব্দ ‘আর’ দিয়ে ইউনেস্কোর বক্তব্যের অর্থ প্রায় সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়েছে। এটাকে কৌশল না বলে, চতুরতা বলাটা সম্ভবত বেশি যুক্তিপূর্ণ। ইউনেস্কোর বক্তব্যে সুন্দরবনের পাশে ‘বড় ধরনের শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো’ নির্মাণ না করার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়নি, রামপাল প্রকল্পের কাজ চলবে। এও বলা হয়নি রামপাল বাদে ‘আর’ কোনো বড় ধরনের শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো নির্মাণ না করা বা নির্মাণের অনুমতি না দিতে।
সব ধরনের বড় শিল্পকারখানা বা অবকাঠামো নির্মাণ না করার কথা যখন বলা হয়, তার মধ্যে রামপালও পরে। সুনির্দিষ্ট করে না বললে কোনো অর্থেই এটা বোঝায় না যে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে যার থেকে সেই রামপাল কয়ালাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলবে, কিন্তু অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না।
২. রামপাল বিষয়ে অসত্য বা আংশিক অসত্য, বিভ্রান্তিকর তথ্যের অবতারণা যে এই প্রথম করা হলো, তেমন নয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরিবেশের ক্ষতি হবে না, আজকে পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়নি। অথচ সরকার প্রমাণ করতে মরিয়া যে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরিবেশ বা সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। সঠিক তথ্য দিয়ে তা যেহেতু প্রমাণ করা সম্ভব নয়, সেহেতু আংশিক সত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য হাজির করছে বারবার।
সরকার বিজ্ঞাপন বানিয়ে প্রচার করতে শুরু করল, পৃথিবীর ‘সর্বোচ্চ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রামপাল প্রকল্প নির্মাণ করা হবে।
‘সর্বোচ্চ’ প্রযুক্তি বলে পৃথিবীতে কোনো প্রযুক্তি নেই। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি বলতে বোঝানো হয় ‘আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি’কে। যদিও বর্তমানে ‘অ্যাডভান্স আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি’র ব্যবহার আমেরিকা- ইউরোপের কোথাও কোথাও হচ্ছে। শুরু থেকে সরকার বলছিল, রামপাল প্রকল্প হবে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে। হঠাৎ করে বিজ্ঞাপন বানানোর সময় ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি’র কথা বাদ দিয়ে, ‘সর্বোচ্চ’ প্রযুক্তি শব্দ ব্যবহার করল কেন? প্রশ্নটি তখনই এসেছিল। উত্তর পাওয়া গেল তার কিছুদিন পর।
রামপাল প্রকল্প নির্মাণের বাংলাদেশ- ভারতের যৌথ কোম্পানি বিআইপিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভারতীয় নাগরিক উজ্জ্বল কান্তি ভট্টাচার্য উত্তর দিলেন পরিষ্কার করে, ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলে কোনো প্রযুক্তি পৃথিবীতে নেই। মূলত সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির আধুনিক সংস্করণকে কেউ কেউ আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলে থাকে।’
তাহলে আপনারা কেন আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের কথা এত দিন বলে এসেছেন—এ প্রশ্নের জবাবে উজ্জ্বল কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘আপনাদের এখানে এত পণ্ডিত, এটি জানতাম না। রামপাল বিরোধিতাকারীরা না জেনেই এর বিরোধিতা করছে। আমাদের এত নাটক করার দরকার নেই। আপনাদের এখানে নাটকবাজি হয় বলে প্রথমে বলেছিলাম আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হবে।’ (২৯ অক্টোবর ২০১৬, কালের কণ্ঠ)
৩. তারপরও সরকার এবং সরকার সংশ্লিষ্টরা বলা অব্যাহত রাখলেন, আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেই রামপাল প্রকল্প নির্মাণ করা হবে। ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই’- উজ্জ্বল কান্তির এই বক্তব্যও সঠিক নয়। এই প্রযুক্তি পৃথিবীতে বেশ কিছু বছর আগে থেকেই আছে।
কোম্পানির এমডির স্পষ্ট এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য অসম্মানজনক বক্তব্যের পরও, সরকার আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কথা বলতেই থাকলো। ইতিমধ্যে রামপাল প্রকল্পের প্রযুক্তি আমদানির টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করল বিআইপিসিএল। সেই টেন্ডার পর্যালোচনা করে স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমামসহ আরও অনেকে দেখালেন, সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি আমদানি করা হচ্ছে, আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি নয়।
সুপার ক্রিটিক্যাল ৩০ বছর আগের প্রযুক্তি। আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতেও দূষণ হয়। তবে সুপার ক্রটিক্যাল প্রযুক্তি চেয়ে কম হয়।
৪. রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির যুক্তি তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও, খুব বেশি কিছু যায় আসে না। ‘সুপার’ আর ‘আলট্রা’র মধ্যে দূষণের বেশি- কম ৪% থেকে ৫%। বিষয়টির অবতারণার কারণ যে, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বারবার অসত্য তথ্য দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। সরকার কাজটি হয়ত পরিকল্পিতভাবেই করছে। সর্বশেষ ইউনেস্কোর তথ্যের ক্ষেত্রেও তার প্রমাণ পাওয়া গেল।

Tuesday, 27 June 2017

মুজিব নন্দিত নন, নিন্দিত॥

বাঙলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে সব জায়গাতেই এক বিশ্রী অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। এই রঙের পাসপোর্ট দেখলেই কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাবে। তাদের দোষ দিই না, সৌদি বা পাকিস্তানের পাসপোর্ট ভেবে তারা ভুল করতেই পারে। পাকিস্তান সৌদি এসব দেশের মুমিন মুসলমানগণ বিশ্বে অনেক সুনাম অর্জন করেছে তো, সেই কারণে! কিন্তু বাঙলাদেশের পাসপোর্টের রঙ পাকিস্তানের মত সবুজ কেন? কোন বলদে এই আকামটা করেছিল?

পাসপোর্টের নকশা এবং রঙ কেমন হবে তা নির্ধারণ করে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে তাদের পাসপোর্টের রঙ এবং নকশা বেছে নিতে বলে, সেই সাথে কেন এমন নকশা এবং রঙ তাও জানাতে বলে।

সাধারণত কমিউনিস্ট বা সোশ্যালিস্ট দেশগুলো কিছুটা লাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর পাসপোর্টের রং কিছুটা লালচে খয়েরি। স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের দাবীদার কিছু দেশের পাসপোর্টের রঙ নীল। আর হাদিসের বর্ণনা অনুসারে মহানবীর প্রিয় রঙ সবুজ বলে কথিত থাকায় সৌদি, পাকিস্তান সহ মুসলিম দেশগুলো সবুজ পাসপোর্ট নেয় বলে জানা যায়।

১৯৭৩ সালে বাঙলাদশের সরকার প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বাঙলাদেশকে আরেকটি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য জোর লবিং শুরু করেন। সৌদি বাদশাদের কাছে নিয়মিত ধর্ণা দিতেন, হজ্বের অনুমতি এবং অশিক্ষিত শ্রমিকদের যেন সৌদি আরব কামলা হিসেবে নেয় তার জন্য অনেক চেষ্টাই করেছেন শেখ মুজিব। সেই সাথে একাত্তরের গণহত্যাকারী ভুট্টোকে ঢাকায় এনে চুম্মাচাট্টি করে আদিখ্যেতাও কম দেখান নি। সবই ছিল নিজেদের মুসলমান প্রমাণের চেষ্টা। রাজাকারদের অনেককেই পরিবারের সদস্য হওয়ায় ছেড়েছেন নিজেই। অনেক বড় বড় কুখ্যাত রাজাকারের সাথেই ছিল শেখ মুজিবের গলায় গলায় বন্ধুত্ব। কিন্তু সৌদি আর পাকিস্তান যেখ মুজিবকে দুই পয়সারও দাম দেয় নি। সবসময় গোলামের জাতই ভেবে গেছে। মেরুদণ্ডহীন মুজিব সাহস করে নি সৌদি লবিকে ক্ষেপাতে। ওআইসিতে যুক্ত হওয়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন করা, অনেক কিছু করেই সৌদি বাপদের মন ভোলাতে চেয়েছেন। কিন্তু মুজিবের সৌদি ইসলামী আব্বারা মুজিবকে বন্ধু ভাবে নি। গোপনে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদেরই সাহায্য করে গেছে।

সেই সময়ে সৌদি এবং পাকিস্তানের কাছে ভাল মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টার একটা অংশই ছিল সবুজ পাসপোর্ট। এবং সেখানে ইসরাইলকে নিষিদ্ধ করা। বুঝতে সমস্যা হয় না, সাম্প্রদায়িক চরিত্রের শেখ মুজিব বাঙলাদেশকে আরেকটি মিনি পাকিস্তান বানিয়ে রাখার পরিকল্পনাই করেছিলেন। যার প্রমাণ অসংখ্য। আহমদ শরীফ যথার্থই বলেছিলেন,

... মুজিববাদী আঁতেলরা এমন বেহায়া চাটুকার যে কোন মিথ্যাভাষণে তাদের কোন লজ্জা-শরম নেই। তারা জানেন মুজিবের পাকিস্তান ভাঙার কোন স্বপ্ন বা সাধ ছিল না, তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর চেলা এবং মুসলিম লীগার ও হিন্দুবিদ্বেষী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল তাকে ১৯৭০ সনের নির্বাচন। কেননা আগরতলা মামলা তাকে অপমানিত ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ বাঙালীর হিরো বানিয়ে দিয়েছিল। শেখ মুজিব ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ অবধি প্রধানমন্ত্রীত্বের জন্যে দরকষাকষি করছিলেন, যদিও সে লক্ষ্যে ছাত্রনেতাদের পরামর্শে তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ও মুক্তির সংগ্রামের কথা উচ্চারণ করেছিলেন তার প্রধানমন্ত্রীত্বপ্রাপ্তি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই। প্রমাণ তিনি ঐ সভার পরেই দ্রোহী হননি, ছাত্ররাও ধরেনি অস্ত্র।

২৫শে মার্চে পাকিস্তান সরকারই বাঙালীকে প্রতারিত করে হত্যাকান্ড চালাতে থাকে। বিপন্ন ও অস্ত্রচ্যুত সেনানিরা, পুলিশেরা এবং ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ তরুণেরা অনন্যোপায় হয়ে অস্ত্র ধারণ করে, তাদের সঙ্গে জুটে যায় আওয়ামীলীগারেরা এবং ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ স্বাধীনতাকামী জনগণ গাঁ-গঞ্জ থেকে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে। শেখ মুজিব যে মুক্তি বা স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরনা-প্রণোদনাপ্রবর্তনা দাতা তা কেউ অস্বীকার করে না। যদিও সবটা তাৎক্ষণিক এবং অবস্থার ও অবস্থানের পরিণাম, পরিকল্পিত নয়, উদ্দিষ্ট ছিল না বলেই।

কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সনের আগস্ট অবধি মুজিব শাসন হচ্ছে ত্রাসের, হuত্যার, কাড়ার, মারার, জোর-জুলুমের, স্বৈরাচারের, দুর্ভিক্ষের, পীড়নের, শোষনের, জবরদখলের ও জবরদস্তির হৃৎকাঁপানো বীভৎস রূপের। তাই তার সপরিবার হত্যায়ও কেউ দু:খশোক পায়নি। তাই মুজিব নন্দিত নন, নিন্দিত॥" - ১৬/১২/১৯৯৭

সূত্রঃ আহমদ শরীফ / আহমদ শরীফের ডায়েরি : ভাব-বুদ্বুদ ॥ [ জাগৃতি প্রকাশনী - ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ১৭৩ ]

Tuesday, 30 May 2017

ধর্ষকদের জন্য বাংলাদেশ এখন একটি স্বর্গরাজ্য

সুইডেনের বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্ট্রম এক সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১০ সালে তিনি একবার আফ্রিকার দেশ কঙ্গো সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পর সফরের বিস্তারিত নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করার সময় ওয়ালস্ট্রম বলেন, বিশ্বে ধর্ষণের রাজধানী হলো আফ্রিকার দেশ কঙ্গো। সেখানে নারীরা অব্যাহতভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে এটা এই কারণে নয় যে তাঁদের রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত আইন নেই। বরং আইন প্রয়োগের অভাবে এসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

ওয়ালস্ট্রম যখন কঙ্গো সফরে যান তখন দেশটি গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত। ১৯৯৮ সালে এ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও এর জের ছিল বহুদিন। অর্থাৎ একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সেই সময় প্রতিদিন গড়ে ১১’শ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে৷ অর্থাৎ প্রতি ঘন্টায় ধর্ষিত হয়েছে ৪৮ জন৷ তবে এখন যে পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়েছে , এমন নয়। এখনও সেখানকার মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে।

আমাদের এই বাংলাদেশে কতজন নারী প্রতিদিন যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে প্রায় প্রতিদিন গণমাধ্যমে যেভাবে মেয়েদের ওপর যৌন নিপীড়নের খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই আমরা এদিক দিয়ে কঙ্গোকে ধরে ফেলব। আবার পেছনেও ফেলে দিতে পারি-এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া এক তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিন হাজার ৯২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। পাঠক, আপনারাই হিসাব করুন এই চার বছরে দৈনিক কতজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এত ধর্ষণ? কঙ্গোয় যেমন নারীদের রক্ষার জন্য অনেক আইন আছে, কিন্তু সেসব আইনের প্রয়োগ নেই। তেমনি মতো আমাদের দেশেও ধর্ষণবিরোধী আইন আছে। কিন্তু আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। ফলে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষকদের জন্য বাংলাদেশ এখন একটি স্বর্গরাজ্য-এটা এখন বলা যেতেই পারে। সব বয়সের নারীকেই ধর্ষণ করা হচ্ছে। গৃহবধূ, শিক্ষিকা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কলেজ ছাত্রী, স্কুলছাত্রী, এমনকি কোলের শিশুকেও ধর্ষণ করা হচ্ছে। গত বছর গাজীপুরে ধর্ষণ করা হয়েছে আট মাসের এক শিশুকে। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ধর্ষণ করা হয়েছে ৫ বছরের এক শিশুকে। শরিয়তপুরে ৩ বছরের শিশু ধর্ষিত হয়েছ। এ রকম বহু ঘটেছে। এই হিসাব আঙুলের কড়ে গুনে বলা যাবে না।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৩২৫টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ৩২৫ শিশুর মধ্যে ৪৮ জন শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, । এদের মধ্যে ১৫ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৫৪ শিশুকে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩৫টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এসব হিসাব পড়ে কি পাঠকের মনে হচ্ছে না যে আসলেই বাংলাদেশ ধর্ষকদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে? যার যখন মন চাইছে ধর্ষণ করছে। গত বছরের ঘটনা। গ্রাম থেকে রাজধানীতে এসেছিল একটি পরিবার। মিরপুরে একটি বাসা ভাড়া করে তাতে উঠেছিল। কিন্তু একদিন না যেতেই স্থানীয় এক সন্ত্রাসী তার সঙ্গী সাথিদের নিয়ে এসে ওই বাড়িতে ঢুকে সব জিনিসপত্র লুটপাট করে। আর যাওয়ার সময় ওই পরিবারের কিশোরী মেয়েটিকে ধর্ষণ করে চলে যায়। পত্রিকার পাতায় এ ধরনের খবর প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন নির্বিকার। কারও যেন কিছু করার নেই।

এখন বনানীর হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় দেশ উত্তাল। এ ঘটনায় ধর্ষকদের বিরুদ্ধে জোরালো জনমত তৈরি হয়েছে। কিন্তু যারা এই দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা বেশ ধনী এবং সমাজে প্রভাব রয়েছ। তাই অনেকের মনে সংশয় আদৌ কি শাস্তি হবে এই ধর্ষকদের। গ্রামে গঞ্জে ধর্ষণ করেও যেখানে ধর্ষকেরা পার পেয়ে যাচ্ছে সেখানে সমাজের প্রভাবশালীদের শাস্তি হবে—চিন্তাটাই একটু কেমন না!

আসল সমস্যা হচ্ছে নারী নির্যাতন, নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ এগুলো এখনো জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারেনি। ধর্ষণকে লঘু অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। দুই তরুণী ধর্ষণের পর আমার পরিচিত অনেককে বলতে শুনেছি কেন তারা ওই যুবকদের আহ্বানে হোটেলে গেলেন। তাদের বোঝা উচিত ছিল এভাবে যেতে নেই। অর্থাৎ দোষ যা করেছে মেয়েরাই। ছেলেদের কোনো দোষ নেই। ছেলেরাতো ধর্ষণ করবেই। তুমি মেয়ে জেনেশুনে তার কাছে যাও কেন? অনেকে আবার ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করে। জানতে ইচ্ছে করে একটি ছোট শিশুর পরনে কী পোশাক থাকে যা দেখে পুরুষেরা উত্তেজিত হয়ে তাকে ধর্ষণ করে। কোনো সমাজে যদি এইরকম মনোভাবের মানুষ থাকে। তাহলে সে সমাজে ধর্ষকের বিচার না হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবুও আমরা আশাবাদী এই ধর্ষকদের বিচার হবে। তারা দৃষ্টান্তমূলক সাজা পাবে। আমরা চাই না ধর্ষণ করার দিক দিয়ে আমার দেশ কঙ্গোর সমকক্ষ হোক বা কঙ্গোকে ছাড়িয়ে যাক।