Wednesday, 16 September 2026

জিন্নাহকে “বাংলাদেশের শত্রু” বলা একপ্রকার কালানুক্রমিক ভুল।

জিন্নাহকে “বাংলাদেশের শত্রু” বলা একপ্রকার কালানুক্রমিক ভুল। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব তখন কেবল অস্তিত্বহীনই নয়—সেই নামে কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পও তার জীবদ্দশায় গঠিত হয়নি। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে মাত্র ১৩ মাস বেঁচেছিলেন। পূর্ববঙ্গ তখন পাকিস্তানের পূর্ব অংশ; জনসংখ্যায় তা পশ্চিম অংশের চেয়ে বড়। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র, মুক্তিযুদ্ধ, অপারেশন সার্চলাইট, বা এমনকি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তপাত—এসব তার মৃত্যুর পরের ঘটনা। পূর্ববঙ্গের মুসলমান রাজনীতি পাকিস্তান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ ছিল। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক। ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ তীব্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক স্রোত পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের অংশে পরিণত করে, তার ভিত্তি বাঙালি মুসলমান নেতৃত্ব ও ভোটারদের সমর্থনেই গড়া। জিন্নাহ সেই স্রোতের সর্বভারতীয় মুখপাত্র ছিলেন, স্থানীয় উদ্যোক্তা নন। আরও একটি তথ্য প্রকাশ্য আলোচনায় আসে না। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল-মেতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু যুক্ত ও সার্বভৌম বঙ্গের প্রস্তাব তোলেন। জিন্নাহ সেই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিলেন। মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, কলকাতা ছাড়া বঙ্গের অর্থ কী—তারা একত্র ও স্বাধীন থাকলেই ভালো; পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। প্রস্তাবটি কংগ্রেস হাইকমান্ড ও হিন্দু মহাসভার বিরোধিতায় ভেঙে যায়, এবং বঙ্গ বিভক্ত হয়। অর্থাৎ জিন্নাহ “বাঙালি রাষ্ট্র” ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন না; তিনি একসময় তাকে পাকিস্তানের বাইরেও কল্পনা করতে পেরেছিলেন।  যে মানুষ বাংলাদেশ দেখেননি, তাকে বাংলাদেশের বিপক্ষে দাঁড় করানো তাই ইতিহাসের পূর্বাপর বিচার নয়—পরবর্তী রাজনীতির প্রয়োজনে তৈরি করা দায়িত্বারোপ। জিন্নাহর বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্র হচ্ছে ওনার ১৯৪৮ সালের মার্চের ঢাকা সফরের এক বক্তৃতা। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। যেখানে উনি ইংরেজিতেই বলেছিলেন, “Let me make it very clear to you that the State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan.” ছাত্ররা ওনার বক্তব্যের এই অংশের বিরোধিতা করে। কিন্তু একই ভাষণে তিনি আরও বলেন, প্রদেশের দাপ্তরিক ভাষা কী হবে তা প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই স্থির করবেন; বাংলা ভাষায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন স্পর্শ করা হবে না। সমাবর্তন ভাষণে তিনি আবার বলেন, প্রাদেশিক দাপ্তরিক ব্যবহারের জন্য প্রদেশের মানুষ যে ভাষা চান তাই বেছে নিতে পারেন; তবে প্রদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ভাষা—lingua franca—একটিই হতে পারে, তা উর্দু। একই ভাষণের এই অংশটুকু মানুষ ইচ্ছা করেই রাজনৈতিক কারণে তুলে ধরে না। জিন্নাহ উর্দুকে উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের লালিত ভাষা এবং ইসলামি সংস্কৃতির নিকটবর্তী মাধ্যম হিসেবে দেখছিলেন, ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। একইসঙ্গে ভাষা আন্দোলনকে তিনি প্রাদেশিকতা, পঞ্চম বাহিনী ও ভারতীয় ষড়যন্ত্রের খাতে ফেলেছিলেন। এই ফ্রেমিং ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। জিন্নাহ কিন্তু বাংলা নিষিদ্ধ করেননি; বাংলাকে প্রাদেশিক মর্যাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষাকে কেবল প্রাদেশিক মর্যাদায় রাখা কেন্দ্রীয় অভিজাতদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লক্ষণহিসাবে বাঙালিরা দেখে তার বিরোধিতা করে। বর্তমান পাকিস্তানে উর্দু জাতীয় lingua franca মানে যোগাযোগের ভাষা; পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, সরাইকি, বেলুচি প্রাদেশিক ভাষা। ভারতে হিন্দি ইউনিয়নের দাপ্তরিক ভাষা, ইংরেজি অনির্দিষ্টকালের সহযোগী দাপ্তরিক ভাষা , এবং রাজ্যগুলোর নিজস্ব ভাষা আছে। একটি যোগাযোগ-ভাষা রেখে প্রাদেশিক ভাষা চালু রাখা বহুভাষী রাষ্ট্রে অস্বাভাবিক নয়। তবু এখানে থেমে গেলে ভুল হবে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালায় পূর্ববঙ্গেরই বাঙালি প্রশাসন—মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন, বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট, বাঙালি পুলিশ। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষা করা হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সামরিক শাসন, ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ১৯৭১-এর সেনা অভিযান—এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পরের রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ। লিয়াকত আলী খান, গোলাম মুহাম্মদ, ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান—এই ধারাকে ১৯৪৮ সালের এক নেতার ঘাড়ে চাপানো ঐতিহাসিক ভাবে ভুল। আমাদের পাঠ্যপুস্তক আর আলোচনা থেকে উধাও করে দেয়া হয়েছে যে ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি মুসলমানরাই পাকিস্তান আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনসহ পূর্ববঙ্গের অনেক নেতাই উর্দুর পক্ষে সক্রিয় ছিলেন; জিন্নাহকে ঢাকায় ডেকেছিলেন তাঁরাই। লাহোর প্রস্তাবের মূল পাঠে ছিল “independent states”—বহুবচন; পরে তা একক পাকিস্তানে সংকুচিত হয়। যুক্তবঙ্গের সম্ভাবনা জিন্নাহ একবার সমর্থনও করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন। ওদিকে আমাদের তথা বাংলাদেশিদের জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা-আখ্যানে ভাষা আন্দোলনকে দেখানো হয় বাঙালিদের প্রথম প্রতিরোধ হিসাবে; এরপর আসে ছয় দফা স্বায়ত্তশাসনের সনদ, ৭ই মার্চ ঘোষণা এবং ১৯৭১ যা বাঙালিদের স্বাধিকারের চূড়ান্ত রূপ। এই শৃঙ্খলার “আদি পাপ” হিসেবে এখনও তার জিন্নাহর উর্দু-ঘোষণাকে গণ্য করে। বাংলাদেশের জন্ম পাকিস্তানি রাষ্ট্রের দীর্ঘ ব্যর্থতার ফল— এবং পরিশেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতার পুরো দায় ১৯৪৮ সালের এক অসুস্থ, তাড়াহুড়োয় থাকা প্রতিষ্ঠাতার ঘাড়ে চাপানো প্রকৃত ইতিহাসকে দরিদ্র করে তোলে। জিন্নাহকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা রাজনৈতিক পছন্দ হতে পারে। কিন্তু তাঁকে “বাংলাদেশের বিপক্ষে” দাঁড় করানো তথ্যগতভাবে অসম্ভব। যা সম্ভব, তা হলো তাঁর সিদ্ধান্তের পরিণতি বিচার করা—কোনো পক্ষের ন্যারেটিভের খাতিরে নয, বরং ইতিহাসের খাতিরে। যদিও পাকিস্তান আমলেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে, বাংলা এবং উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করা হয়। ২০২৬ সালে যে জাতীয়তাবাদ কেবল শত্রু চিহ্নিত করে আনন্দ পায়, সেই জাতীয়তাবাদ ইতিহাস চর্চা করে না; সেখানে তাদের অজ্ঞতাই মূল কারণ। Photo: Quaid-i-Azam with Sir Fredrik, the governor of East Bengal, Miss Fatima Jinnah, and Dr Hasan, vice chancellor of Dacca University. The picture was taken in front of Curzon Hall in Dacca in 1948.

No comments:

Post a Comment