Sunday, 25 October 2026

মানিক পসারীর দাফন

পিরোজপুরে দাফনে দুটি কথা প্রথম কথা হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রেও নিয়ম আছে। অনার কোড আছে। তা হচ্ছে, মৃত শত্রুর অবমাননা করা যাবে না। মৃত্যুর সঙ্গের হিসাব শেষ। দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার বাদি মানিক পসারীর দাফনে বাঁধা সেই অনার কোডের চরম লঙ্ঘন, অমানবিক। সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীর উচিত ছিল, বাপের শত্রুর দাফনে নিজে থেকে এগিয়ে যাওয়া। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দাফন করা। স্থানীয়দের বা জামায়াতের কর্মীদের ক্ষোভ থাকলেও। তাহলে বোঝা যেতো, স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে মাসুদ সাঈদী সবার জনপ্রতিনিধি। তার পরিবারের সঙ্গে যাই ঘটেছে, এর বদলা তিনি নেননি। কিন্তু এই মানবিকতা তিনি দেখাননি। সাঈদীর রায়ের পর একটা বিদেশি মিডিয়ার নিউজের জন্য কাজ করেছিলাম। তখন থেকেই জানতাম, সাঈদীর মামলার বাদি মানিক পসারি মুক্তিযোদ্ধা না। তাঁর ভাই চান পসারি তখনই জানিয়েছিলেন, ভাতা দেওয়া হবে প্রলোভনে তৎকালীন এমপি আউয়াল সাহেব, মানিক পসারি মুক্তিযোদ্ধা বানাতে ডিও দেন। মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার পর তাঁকে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটে ঢোকানো হয়। এ নিয়ে স্থানীয় আসল মুক্তিযোদ্ধাদের তখন থেকেই ক্ষোভ ছিল। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে ভাতা, চাকরির কোটা এবং সুবিধার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হওয়া নিয়ে যা হয়েছে তা লজ্জানক। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরের তালিকা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার ৯৫ জন। যদিও সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, ইপিআর মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন ১৯ হাজার অফিসার সৈনিক। ভারতের ট্রেনিং নিয়েছেন আরও ৫০ হাজার। ভারত সরকারের ১৯৭৩ সালে দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, সব মিলিয়ে সংখ্যাটি ৬৯ হাজার ৫০৯ জন। এর বাইরে ভারতে র প্রশিক্ষণ দিয়েছিল মুজিব বাহিনীর আরও ৪ থেকে ৬ হাজার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। যদিও সংখ্যাটি ১০ হাজার পর্যন্ত দাবি করা হয়। দেশে কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, আফসর বাহিনী, লতিফ বাহিনী, বাতেন বাহিনী, হালিম বাহিনী, আকবর বাহিনীসহ নানা বাহিনীতে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ আরও ৩০ হাজার সদস্য ছিলেন (সৈনিক নয়, সদস্য)। সব যোগ করলেও মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কোনোভাবেই ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি হবে না। ১ লাখেরও কম হতে পারে। কিন্তু গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা ১ লাখ ৯৮ হাজার প্লাস! এবং তা নিয়মিত বাড়ে কমে! ১৯৮৬ সালে প্রথম গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ভারত সরকার থেকে তালিকা সংগ্রহ করে। এতে ইবিআরসি বা মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৮৩৩ জন। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করাদের তালিকা করলে সংখ্যাটি ৮০ থেকে ৯০ হাজার হতে পারে। ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকার যে তালিকা করেছিল, তাতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার। ছিয়ানব্বইয়ে শেখ হাসিনা ভাতা চালু করেন। এবং শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি। ওই পাঁচ বছরে ১ লাখ নতুন মুক্তিযোদ্ধা যোগ করা হয় তালিকায়! মানে যত মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেননি, এর বেশি মুক্তিযোদ্ধা যোগ হয় সেই পাঁচ বছরে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যাচাই বাছাইয়ে ১ লাখ ৮৬ থেকে কমে ২০০১ সালের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৮ হাজার। ২৮ হাজার ভুয়া ধরে পরে ওই পাঁচ বছরেই। ২০০১ থেকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আবার তালিকা শুরু করে। আরও ৫২ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যোগ করে। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা হয়ে যায় ২ লাখ ১১ হাজার। সেখানে আবার ১২ হাজার ভুয়া ধরে পড়ে। এতে সংখ্যা কমে হয় ১ লাখ ৯৯ হাজার। স্বাধীনতার আটবার তালিকা এবং ১০ বার সংজ্ঞা পরিবর্তন হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার। শেষ নিয়ম হচ্ছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কারো বয়স সাড়ে ১২ বছর হলে মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবে। অথচ মুক্তিযুদ্ধে শিশু সৈনিক ছিলই না বলতে গেলে। আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে আবেদনের সুযোগ দিলে, ১ লাখ ৪৩ হাজার লোক আবেদন করেছিল নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে! আগেই থেকেই তালিকায় ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার প্লাস। নতুন করে ১ লাখ ৪৩ হাজার মানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন!! দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে ২০১৪ সালে আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি ছিল। স্বাধীনতার ৪৩ বছর তাদের মনে পড়েছে, ওহ আমি তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম! ২০১৬ সালে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা হয় ২ লাখ ১৫ হাজার। তখন শুরু হয় বিএনপি আমলে মুক্তিযোদ্ধা হওয়াদের বাদ দেওয়া। এতে ২০২০ সালে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা কমে হয় ১ লাখ ৯২ হাজার। ডিজিটাইশেন করার পর ওই বছর এ সংখ্যা কমে ১ লাখ ৭১ হাজার হয়ে যায়। ২১ হাজার মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়ে যায়! এর কারণ ছিল অনেকে দুই জায়গা থেকে ভাতা তুলছিলেন, ফলে ডাবল কাউন্ট হচ্ছিল। অনেকে ছিল প্রমাণ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু মামলা করে, কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ এনে নাম রেখেছেন। এই হল তালিকার হাল। এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কারণে গার্ড অব অনারে বাঁধাসহ নানা সমস্যা আগামী দিনে আরও দেখবেন। মাস খানেক আগেই জামালপুরে একজন 'মুক্তিযোদ্ধার' গার্ড অব অনার হতে দেননি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা। তাদের বক্তব্য, ওই লোক ভুয়া কাগজ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছেন। কিন্তু উদ্বেগের হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এবার আরও ২০ হাজার আবেদন করেছেন নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে। ভাতা চালুর পর বিএনপি পূর্ণ মেয়াদে ৫ বছর ক্ষমতায় ছিল? এটা কী কোনোভাবে সম্ভব যে, এই আবেদনকারীরা মুক্তিযোদ্ধা হলে ওই সময় তাদের আবেদন করার কথা মনে ছিল না? ভুয়া ভুক্তিযোদ্ধা শুধু সামাজিক সমস্যা বা ইতিহাস বিকৃতি নয়। আর্থিক ক্ষতিও। প্রতি বছর ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতায়। এর বাইরে ব্যাংক ঋণ, চিকিৎসা, আবাসনসহ নানা সুবিধা রয়েছে। নিশ্চিতভাবে তালিকার অর্ধেক হচ্ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। সরল হিসাব করলেও, বছরে ট্যাক্স পেয়ারের ৩-৪ হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পেছনে। স্থানীয়রা কিন্তু ঠিকই জানেন, কে আসল আর কে ভুয়া। বিশেষ সুবিধা সমাজে ক্ষোভ তৈরি করে। ফলে ভুয়া কাউকে গার্ড অব অনার দিতে দিলে নানান জায়গা প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবার সেই পুরান বিতর্ক করে শুরু করে। তাই সরকারের উচিত নয়, ৫৫ বছর পর এসে নতুন করে আবার মুক্তিযোদ্ধা উৎপাদন করা। বরং যারা ভুয়া আছে তাদের ডিটেক্ট এবং ডিলিট করুন।

No comments:

Post a Comment