Showing posts with label law. Show all posts
Showing posts with label law. Show all posts

Tuesday, 6 July 2010

ব্লাসফেমি আইন বনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার খুব সম্ভব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে এ নাগরিক অধিকার হুমকির মুখোমুখী। হেফাজতে ইসলাম কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছে, সরকার মুক্তমত প্রকাশের পক্ষে না থেকে একটি হীন আপোষের নীতি গ্রহণ করেছে, ফলে মিডিয়া সাধারণের তথ্যঅধিকার প্রদানে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন এমন তরুণ ব্লগারদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে; ধ্বংসের আশঙ্কার মুখে পড়েছে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতও।
বাকস্বাধীনতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? উনিশ শতকের ব্রিটেনের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী ‘ফিলোসফার অব ফ্রিডম’ জন স্টুয়ার্ট মিলের কাছে বিশ্বের প্রায় সব জাতিকেই কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকতে হবে, তাঁর ভাষায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সত্যান্বেষণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে।
প্রথমত, কোনো মানুষই ত্রুটিমুক্ত নয়। হেফাজতে ইসলামও নয়, সরকারও নয়, আমিও নই। কেউ পরম সত্যের সন্ধান পাওয়ার দাবি করতে পারে না। বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠী প্রায়ই এমনতর দাবি করে থাকে, অবশ্যই এটি একটি সমস্যা, এ দাবিটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথম যুগের ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষকদের লেখার মনগড়া ও চরম অবাস্তব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু আমরা জানি যে কথাগুলো আমরা এখন প্রকাশ হতে দিচ্ছি না- হয়তো সেগুলোর মধ্যেই সত্য লুকানো রয়েছে!
দ্বিতীয়ত, মিলের মতে, যদিও-বা অপ্রকাশিত বক্তব্য ভুল হয়ে থাকে- ‘বক্তব্যগুলো সাধারণত সত্যের কোনো না কোনো অংশ ধারণ করে এবং প্রচলিত ও জনপ্রিয় ধারণাগুলো প্রায়ই আংশিক সত্য, তাই প্রচলিত ধারণার বিরোধী বিভিন্ন মতামতের প্রকাশের মধ্য দিয়েই সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।’
তাছাড়া, সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণাগুলোরও সংরক্ষণ ও প্রকাশ প্রয়োজন- কারণ সত্য শুধুমাত্র সন্দেহ, প্রশ্ন ও বিরোধী মতবাদের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে। এ লড়াই থেমে গেলে সত্য পরিণত হয় রক্ষণশীল সামাজিক শৃংখলে।
মানুষের জীবনে সত্যের সন্ধান ও বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবজন্মের সার্থকতা নিজের পছন্দমতো জীবনযাপনের মধ্যে; অন্যের নির্ধারণ করে দেওয়া গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নয়। জীবনের সার্থকতা পেতে হলে মানুষকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সুযোগ পেতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন মতামত এবং দর্শনের মুক্তপ্রকাশের নিশ্চয়তা। এ কারণেই মানুষ সবসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়। এ স্বাধীনতায় যে কোনো হস্তক্ষেপ এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে এবং মানবজীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্র ও মানবীয় গুণাবলীর বিকাশের জন্যও খুবই জরুরি। বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হতে হবে যে দেশে সব ধরনের মতবাদ প্রকাশিত হতে পারবে, হতে পারবে প্রশ্নবিদ্ধ। মতামত যারই হোক না কেন, সেটিকে আমলে নিতে হবে এবং প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলোকে বিরোধী মতবাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে। তবেই কেবলমাত্র রাজনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতি সম্ভব।
মানবজাতি গত হাজার বছরে অনেকটুকু পথ হেঁটেছে। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি পরিবর্তন, প্রতিটি যুগান্তকারী দর্শন এবং মতবাদ হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচিত। এসব মতবাদের জনক যারা তারা হয়েছেন নির্যাতিত। গ্যালিলিওর সঙ্গে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কীরকম আচরণ করেছিল সেটা সবারই জানা আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ স্বৈরাচারের লক্ষণ; এর স্থান সৌদি আরব কিংবা উত্তর কোরিয়ায়, স্বাধীন বাংলাদেশে নয়। গণতন্ত্রে প্রতিটি মতামতকে প্রকাশিত হতে দিতে হবে; প্রতিটি মতামত নিয়ে মুক্তমনে বিতর্ক হতে হবে। কাউকে কথা বলতে দিলে এবং কাউকে না দিলে সেটা এক ধরনের নাগরিক বৈষম্য।
বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। Universal Declaration of Human Rights এর আর্টিকেল ১৯ অনুযায়ী, “[e]veryone has the right to freedom of opinion and expression; this right includes freedom to hold opinions without interference and to seek, receive and impart information and ideas through any media and regardless of frontiers.” অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষের মতামত ও অনুভূতি প্রকাশের অধিকার রয়েছে; এ অধিকারের মধ্যে রয়েছে বিনাবাধায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কোনো তথ্য ও মতবাদ মাধ্যম এবং রাষ্ট্রনির্বিশেষে আদানপ্রদানের অধিকার।
তাই কেউ যদি বাকস্বাধীনতা রহিত করতে চান, কোনো বিশেষ ধরনের বক্তব্যের গলা চেপে ধরতে চান তাহলে তাদের এর পক্ষে খুব জোরালো যুক্তি প্রদান করতে হবে। কিন্তু তারা তা করেন না।
দেখা যাক ব্লাসফেমি কী। ব্লাসফেমি হল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পবিত্র মনে করে এমন কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ে ব্যঙ্গ, অপমান বা সে সম্পর্কে বাজে কথা বলা। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গীতে আল্লাহকে অপমান করা আল্লাহর অধিকারের বরখেলাপ। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য আল্লাহকে অপমান না করা। কিন্তু সেটা অবিশ্বাসী বা নাস্তিকদের (নাস্তিক কিন্তু কোনো গালি নয়!) জন্য প্রযোজ্য নয়। আর তাই একটি সেকুলার রাষ্ট্রে ধর্মীয় চেতনা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই।
নাগরিকদের ধর্মপালনে বাধ্য করা কিংবা নাগরিকদের উপর কোনো বিশেষ একটা ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। এখানে কেউ বলতে পারেন যে, ব্লাসফেমি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন ধার্মিক ব্যক্তিদের স্বার্থে। কারণ ব্লাসফেমি তাদের অনুভূতিকে আহত করে। এটা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি বটে। কাউকে মানসিকভাবে আহত করা অবশ্যই অনুচিত। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব যদি হয় কারও শারীরিক নিরাপত্তা দেওয়া, তাহলে রাষ্ট্র কেন তার নাগরিকদের ‘মানসিক’ নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে না? তাহলে রাষ্ট্র কেন আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক বক্তব্যপ্রদান নিষিদ্ধ করতে পারবে না?
কারণ প্রথমত সব ধরনের বক্তব্যই কারও না কারও অনুভূতিকে আহত করে। উদাহরণস্বরূপ, হেফাজতে ইসলামের একটি দাবি হল নারীদের সমঅধিকারের আইন বাতিল করতে হবে। এ দাবি অবশ্যই নারীর সমঅধিকারে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে আহত করবে। ঠিক একইভাবে, তারা দাবি করে যে, আহমদিয়া গোষ্ঠীকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে যেটি আহমদিয়া তরিকার অনুসারীদের জন্য অপমানজনক। গীর্জায় খ্রিষ্টান ধর্মযাজকের সারমন মুসলমানের অনুভূতি আহত করতে পারে, কমিউনিস্টের বক্তব্য পুঁজিবাদীদের আহত করতে পারে, কেউ কেউ সমকামীদের নিয়ে লেখা পড়ে আহত হতে পারেন, কেউ কেউ আবার আমার অবাঙালি হয়ে একজন বাঙালি নারীকে বিয়ে করায় তাদের অনুভূতিতে আঘাত বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, যদিও এসব কারও না কারও জন্য অস্বস্তিকর, এগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য।
এছাড়াও কোনো এক শ্রেণির বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাটা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ মানুষ খুব সহজেই নিজেদের এসব বক্তব্য শোনা বা পড়া থেকে দূরে রাখতে পারে। বাকস্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা রক্ষা করা জরুরি। এর পরিবর্তে আপনার অপছন্দনীয় বক্তব্যগুলো শোনা বা পড়া থেকে বিরত থাকা অনেক সহজ। কারও কথা শুনতে ভালো না লাগলে দূরে সরে যান। কারও ব্লগ পড়তে ভালো না লাগলে সেটা ক্লিক করে বন্ধ করে দিন।
কোরান শরীফও একই কথা বলে: “যখন তারা [মুসলমানরা] খারাপ কথা শোনে, তারা সেখান থেকে সরে যায় এবং বলে, ‘আমার জন্য আমার কর্ম এবং তোমার জন্য তোমার কর্ম। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক; আমরা সত্যবিমুখদের সংসর্গে আসতে চাই না’।”২৮:৫৫
হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য কিছু ইসলামিক দলের ধর্মীয় অনুভূতি যদি এতই ঠুনকো হয়ে থাকে তাহলে তারা ওসব ব্লগ পড়ে কেন? যদি তারা চায় যে, কারও ধর্মীয় অনুভূতি আহত না হোক তাহলে তারা সেসব ব্লগের লেখা অন্যদের ডেকে এনে দেখায় কেন? সেসব লেখা কপি করে পত্রিকায় বা লিফলেটে ছাপায় কেন? এ যেন দৌড়ে এসে কারও সঙ্গে ইচ্ছে করে ধাক্কা খাওয়া এবং তারপর তাকে আক্রমণকারী আখ্যা দিয়ে তার শাস্তি চাওয়া! তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ব্লাসফেমি সর্বপ্রকারে বন্ধ করা একেবারেই অসম্ভব। এর চেষ্টা করতে যাওয়াও খুবই সময়সাপেক্ষ ও জটিল। তার চেয়ে এসব বক্তব্য শোনা থেকে বিরত থাকা খুব সহজ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে অধিকাংশ লোক মুসলমান, এখানে কেউ প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য এমনিতেই দিতে পারে না।
অনেকে বলেন, ব্লাসফেমির মূল সমস্যা হল এর ফলে গোলযোগ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আসলেই কি তাই? ‘ইনোসেন্স অফ মুসলিমস’-এর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? নিম্নমানের ১৪ মিনিটের ভিডিওক্লিপটি জুলাই মাসে ইউটিউবে আপলোড করা হয়। কিন্তু এর পরবর্তী দু’মাস কিছুই ঘটেনি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ব্লাসফেমি সরাসরি কোনো নৃশংসতা ছড়ায় না। এটা ছড়ায় সেসব মানুষের মাধ্যমে যারা নৃশংসতা ছড়াতে চায়। এটা ছড়ায় সেসব মানুষের মাধ্যমে যারা ব্লাসফেমাস বিষয়গুলো অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। লক্ষ্য করুন, একটি মিশরীয় টেলিভিশনে খালিদ আবদাল্লাহ নামক একজন ব্যক্তি এ প্রসঙ্গে কথা বলার পরই মূলত বিভিন্ন দেশে নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রমন য়। বহুবছর ধরে মানুষ ব্লগের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত ছিল না। এতদিন পর্যন্ত এসব ব্লগ কাউকে আঘাত করেনি কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও সৃষ্টি করেনি। তাই ধর্ম-অবমাননা সমস্যা নয়, সমস্যা হল সেসব রাজনৈতিক সংগঠন যারা অসহিষ্ণু এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নৃশংসতা ছড়ানোর জন্য এসব ব্লগ ব্যবহার করছে। তারা জোরপূর্বক বাংলাদেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
তাছাড়া এর কী নিশ্চয়তা আছে যে, আইন করলেই নৃশংসতা কমে যাবে? পাকিস্তানে তো ব্লাসফেমি আইন রয়েছে। এতে কি ওরা আমাদের চেয়ে ভালো আছে? এর চেয়ে আসুন-সবাইকে আমরা এটা বোঝানোর চেষ্টা করি সংঘর্ষ, নৃশংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কাউকে কথা বলতে না দেওয়া পরমতসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ নয় এবং এর ফলে সমাজে অসহিষ্ণুতা ও অসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আসলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
ব্লাসফেমি আইন সত্যের সন্ধান ব্যাহত করে, এটা মানুষের জন্য খারাপ, মানবসভ্যতার বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। এটা অগণতান্ত্রিক, বাকস্বাধীনতা খর্ব করে। ইতিহাস বলে, এধরনের আইন সবসময়ই সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য ব্যবহার করা হয়। আবারও আমরা এর উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের দিকে তাকাতে পারি।
এর ফলে কখনও সমাজে সহিষ্ণুতা ও শান্তিরক্ষা হয় না। এর দ্বারা ধার্মিকদের ধর্মানুভূতি রক্ষাও অসম্ভব।

Monday, 2 November 2009

নিবর্তনমূলক ৫৭ ধারার অবলুপ্তিসহ আটক দুই কিশোর ব্লগারের মুক্তি ও নিরাপত্তা চাই

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা ও ইতিহাসের সংরক্ষণে বাংলা ব্লগ ও বাঙালি ব্লগারদের যে ভূমিকা তার চূড়ান্ত প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে। এবং বাংলাদেশের অস্তিত্ববিরোধী শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের ব্যবহারটাও আমরা দেখতে পেরেছিলাম সেই একই সময়ে। দেখেছিলাম ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে নব রূপে জন্ম নিয়েছে রাজাকার বান্ধব হেফাজতী আন্দোলন। এরই প্রেক্ষিতে পহেলা এপ্রিল ২০১৩ তারিখে চারজন নাস্তিক ব্লগারকে ডিবি পুলিশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এর ৫৭ (১) ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছিলো। যে ধারাটির সন্নিবেশন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন, মহান সংবিধানের ধর্ম-নিরপেক্ষতার মূলনীতি এবং বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত অবমাননা। [১] এরপরে জল গড়িয়েছে অনেকটাই, অসাংবিধানিক এই ধারাটি তার বিষবৃক্ষের ডালপালা ছড়িয়েছে আরো বহুদূর।
এই কালো আইনের সর্বশেষ শিকার চট্টগ্রাম নিবাসী দুই কিশোর ব্লগার কাজী রায়হান রাহী ও উল্লাস ডি ভাবন। গত ৩০ মার্চ’ ২০১৪ তারিখে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে নিজেদের আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে গেলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি তাদের উপর আক্রমণ চালায় জামাত-শিবির মনষ্ক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীরা। [২] পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা সংগ্রহ করে- অপর এক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসি এবং একাধিক হত্যার হুমকি ও জঙ্গিতৎপরতায় উষ্কানিদাতা ফারাবি শফিউর রহমান’এর সাথে, প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসে দ্বিমত পোষণকারী রাহি ও উল্লাসের কিছু কথপোকথন। [৩] “অপরাজেয় সঙ্ঘ” নামক এই জামাতমনষ্ক সন্ত্রাসি দলটির সাথে ফারাবি’র যোগাযোগের প্রমাণও স্পষ্ট। এরই প্রেক্ষিতে, আক্রান্ত ব্লগারদের উপরে হামলা করবার পূর্বে তারা তৈরি করে ধর্মীয় উষ্কানিমূলক প্রচারপত্র এবং সময় বুঝে ঝাপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র দুই কিশোরের ওপর। গুরূতরভাবে আক্রান্ত কিশোরদ্বয়কে স্থানীয় পুলিশ সুরক্ষা প্রদানের পরিবর্তে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করে তথতাকথিত ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেবার অজুহাতে।
উল্লেখ্য যে, অভিযুক্ত ব্লগার দুজনই অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর এবং এই বারের অনুষ্ঠিতব্য এইচ,এস,সি, পরীক্ষার্থী। তা হওয়া স্বত্বেও তাদের সাথে পুলিসের আচরণ মোটেও কিশোর অপরাধীর মত ছিল না। এমনকি অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়া সত্তেও এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার কারণবশতও, ৫৭ ধারার অবাস্তব মারপ্যাঁচে পড়ে তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়। সেই সাথে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এই কিশোরদ্বয়ের পক্ষে স্থানীয় আইনজীবিরাও দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। উল্লাস, ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মাবলম্বী বলে অনেক আইনজীবিই তার পক্ষে মামলা লড়তে অস্বীকৃতি জানান বলেও জানা গেছে। তাছাড়া এদের পরিবারও স্পষ্ট নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই পুরো ব্যাপারটাই দেশের মধ্যে একটি নষ্ট, জঙ্গিবান্ধব ও ধর্মান্ধ পরিবেশ তৈরি হবার প্রমাণ বহন করে।
তবে এরথেকেও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে- এই ঘটনার পরেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাহি ও উল্লাসের উপর চলা জীবন সংশয় সৃষ্টিকারী এই হামলার হোতা “অপরাজেয় সঙ্ঘ” নামক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী সঙ্গঠনটির একাধিক সদস্যের দাম্ভিক স্বীকারোক্তি থাকা সত্তেও তাদের বিরূদ্ধে কোনো প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি তারা প্রকাশ্যে এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির হুমকি প্রদান করা সত্তেও তারা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। [৩] অথচ এগুলোর সবই বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে স্পষ্ট দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এদের বিরূদ্ধে কোনোপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করা তো হয়ইনি, বরং এদের নির্বিঘ্ন চলাফেরার সুযোগ দিয়ে প্রশাসন এই ব্লগারদের পরিবারকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
উল্লেখ্য যে, তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি প্রথম থেকেই মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের কারণে বিতর্কিত। সেই সাথে স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে বার বার ব্লাসফেমী আইনের বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার যথেষ্টই আশংকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি, দেশের প্রচলিত অন্যান্য আইনের সাথেও এই ধারাটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেউ চুরি করুক, ডাকাতি করুক, খুন করুক, ধর্ষন করুক- তার জামিন আছে। কিন্তু, ৫৭ ধারার অপরাধের কোন জামিনের সুযোগ রাখা হয়নি। সেই সাথে এই ধারায় কৃত অপরাধ-এর ন্যুণতম শাস্তি ৭ বছরের কারা দন্ড, যেখানে ধর্ষনের মত জঘন্যতম একটি অপরাধের ন্যুনতম শাস্তিও এরচেয়ে কম। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ধর্মীয় মৌলবাদি ও রাজাকারদের সংগঠন জামাতে ইসলামীর কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের আগে ও পরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের উস্কানি, পরিকল্পনা কোন রকম বাধা ছাড়াই করেছে। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কোনপ্রকার আইনের আওতায় নেয়া না হলেও সামান্য ফেইসবুক স্ট্যাটাস যেগুলোতে কারো কোন শারীরিক ক্ষতি বা এমন কিছুর দুরতম সম্ভাবনাও নেই সেখানে ধর্মীয় অবমাননার অজুহাতে ব্লগ ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারিরা গ্রেফতার ও হেনস্থার স্বীকার হচ্ছে।
বিসিবিএ বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের মহান সংবিধান কোনো ব্যক্তিবিশেষকে যেমনটি নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস লালল করায় বাঁধা দেয় না, তেমনি কারো ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসেরও পালন, প্রচার এবং প্রকাশকে রূদ্ধ করে না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে বিসিবিএ ঘৃণাভরে বলতে বাধ্য হচ্ছে, স্পষ্টতঃই সরকারের মধ্যে হেফাজতী, ধর্মান্ধ একটি অংশ প্রবল ভাবে প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেছে। এবং এদেরই প্রত্যক্ষ উষ্কানীতে জাতির সংবিধানের রক্ষক হয়েও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মতো সংবিধানের প্রতি চরম অবমাননামূলক একটি আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। এবং ক্রমাগত অপব্যবহারের মাধ্যমে এই আইনটিকেই ব্লাসফেমি আইনের আদলে গড়ে তুলে বাংলাদেশের পাকিস্তান যাত্রা নিশ্চিত করছে তারা।
বাংলা কমিউনিটি ব্লগ এলায়েন্স (BCBA) এর পক্ষ থেকে অন্যন্য সমমনা গ্রুপ এবং ব্যক্তিবর্গের সাথে সমন্বয়ে আক্রান্ত দুই ব্লগারকে সর্বোচ্চ আইনী সহায়তা দেবার লক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এই মুহুর্তে। ঘৃণ্য ৫৭ ধারার অজুহাতে বারবার মুক্তমতকে দলিত করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধেও সর্বাত্মক প্রতিরোধ এবং জনসংযোগ সৃষ্টি করতে আমরা সচেষ্ট। এই প্রেক্ষিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত দাবীসমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে-
ক) আটককৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে তাদের শিক্ষাজীবনের সুস্থ প্রবাহ ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
খ) আক্রমণকারী সন্ত্রাসিদের উষ্কানিদাতা, সঙ্গঠকসহ জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের যথাযথ ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে
গ) সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে
ঘ) আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল/সংশোধন করে মুক্তমতের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে
ঙ) ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকরি ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে।
এছাড়াও আটককৃত ব্লগারদের মুক্তি ও নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে বিসিবিএ সচেষ্ট থাকবে এবং আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা রদকল্পে ক্রমাগত কর্মসূচি প্রদান করে যাবে বলে আমরা শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
তথ্যসূত্রঃ

Sunday, 1 November 2009

ধনতন্ত্রে নারী, সমাজতন্ত্রে নারী, গণতন্ত্রে নারী

মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের বর্তমান স্তরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকার শাসনব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায় এবং শাসনের প্রকৃতিভেদে নারীর অবস্থানেরও ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। নারীর পীড়নকে যদি অপসংস্কৃতি হিসেবে মনেকরি, তবে বলা যায় রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা যেমন কোনো দেশের সংস্কৃতি, মানবিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি সৃষ্টি হয় তেমনি সংস্কৃতির দ্বারাও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রভাবিত হয়। শাসন পদ্ধতির ভিন্নতা থাকলেও পৃথিবীর সকল স্থানের নারীই কম-বেশি অধিকারহীন। পৃথিবীর কোথাও নারী পূর্ণ স্বাধীন নয়, পৃথিবীর কোথাও নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা নেই, পৃথিবীর কোথাও নারী পূর্ণ মানুষের মর্যাদা পায়নি। তবে একটি কথা বলা যেতে পারে তুলনামূলক বিচারে যেখানেই নারী কিছুটা স্বাধীনতার আলো দেখছে সেখানেই সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে শাসনব্যবস্থার প্রকৃতির সাথে নারীর অধিকার প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত একথা সবাই একবাক্যে মেনে নিলেও কোন্ ব্যবস্থা নারীর জন্য কতটুকু উপযোগী তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতপার্থক্য।
আলোচনাটা একটু পেছন থেকে শুরু করা উচিত। মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই লিঙ্গ-বৈষম্য ছিল না। রুশোর মতে প্রকৃতির রাজ্যে ছিল অনাবিল সুখ, মানুষের সাথে মানুষের ছিল সোহার্দ্য। সেখানে ছিলনা কোনো শোষণ, ছিলনা কোনো বঞ্চনা। নারী এবং পুরুষ ছিল একে অপরের সহযোগী, তারা ছিল পরস্পরের পরিপূরক। মনিষীদের অধিকাংশের মতেই সম্পত্তিতে যখন ব্যক্তিগত মালিকানার সৃষ্টি হয় তখন থেকেই মূলত শুরু হয় লিঙ্গ-বৈষম্য। মানুষ যখন বন্যযুগ থেকে কৃষিযুগে উত্তরণ করে তখন জমির উপর পুরুষের একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্পদই নারীর জন্য হয়ে পড়ে মহাশত্র“। পুরুষেরা যেমন জমির মালিক হয়, তেমনি নারীর উপরও তার মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে। সামনে চলে আসে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। মাতৃপ্রধান প্রথা ভেঙ্গে সৃষ্টি হয় পিতৃপ্রধান প্রথা। এটাকে বলা চলে পুরুষতান্ত্রিক বিপ্লব। এরপর থেকে আজ অবধি পুরুষ নারীকে করে রেখেছে নিজের দাসী, করেছে শৃঙ্খলিত। নারী হয়ে আছে পুরুষের ভোগের সামগ্রী এবং ব্যবহৃত হচ্ছে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে। সুতরাং পুরুষতন্ত্র মানব ইতিহাসের একটি পর্ব মাত্র, যার ক্ষয় ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী পুরুষতন্ত্রের কবর রচনার কাজ চলছে। কোথাও দ্রুতগতিতে, কোথাও ধীরে। কোথাও নারী একটু বেশি এগিয়েছে, আবার কোথাও কম। দু-একটি রাষ্ট্রের নারীরা যদিও এখন পর্যন্ত ভোটাধিকার পায়নি তথাপি বলা যেতে পারে বিংশ শতাব্দি ছিল পৃথিবীব্যাপী নারীর ভোটাধিকার প্রাপ্তীর কাল। জন ষ্টুয়ার্ড মিল তাঁর ‘নারী-অধীনতা’ বইতে দেখিয়েছেন নারী জাতির অধীনতা দূর হবে প্রগতি ও নৈতিকতার ক্রম-অগ্রগতির মাধ্যমে। এরপর শুরু হবে নর-নারীর সুমধুর সম্পর্কের এক উন্নত পর্ব; বলা চলে ইহাই অভেদ্য, অকাট্য এবং অমোঘ তত্ত্ব। সে প্রেক্ষাপটেই বিশ্বের সকল দেশের নারীরা যেখানে যে অবস্থায় রয়েছে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে দাসত্ব-মুক্তির লড়াই করে চলেছে এবং ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি ঘটাচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রকৃতি যাই হোক না কেন, হতে পারে ধনতন্ত্রী, হতে পারে গণতন্ত্রী অথবা হতে পারে সমাজতন্ত্রী, সকল স্থানেই নারী তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে, মানুষ হিসেবে পুরুষের পাশে নিজেকে দাঁড় করানোর কাজে কঠিনভাবে ব্রত হচ্ছে।
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর অবস্থা সম্পর্কে রয়েছে যথেষ্ট ভিন্নমত। পুঁজিবাদ সম্পত্তির উপর ব্যক্তিমালিকানাকে প্রাধান্য দেয় অর্থাৎ সেখানে উৎপাদনের উপকরণসমূহ ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদন, বন্টন, চাহিদা, যোগান, মূল্য-নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত উদ্যোগকে সমর্থন করা হয়। অনেকেই মনে করেন এই ব্যবস্থায় অবাধ প্রতিযোগীতার কারণে শ্রেণী-শোষণ বৃদ্ধি পায়। ওয়েব্সের মতে, “ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদ হল এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে শিল্প এবং অন্যান্য আইনগত প্রতিষ্ঠানসমূহ এমন একটি স্তরে উপনীত হয় যে অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ উৎপাদনের উপকরণগুলোর মালিকানা হতে বঞ্চিত হয়ে দিনমজুরে পরিণত হয়।” ওয়েব্সের মতকে সমর্থন করলেও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, অধিকাংশ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হওয়ার সাথে লিঙ্গ-বৈষম্যের বিষয়টি সমার্থক নাও হতে পারে। হতে পারে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষ সমভাবে শোষিত। এখানেও রয়েছে ভিন্নমত, বলা হচ্ছে নারীর গৃহকাজ কোনো উৎপাদনশীল কর্ম নয়। কারণ পুঁজিবাদে শ্রমশক্তির সেই ধরনের ব্যবহার উৎপাদনশীল বলে বিবেচিত হয় যা উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। কোনো কাজ তা সমাজের জন্য যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন যদি উহা উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করতে না পারে তবে পুঁজিবাদী কাঠামোতে তা অনুৎপাদনশীল। তাই কলুর বলদের মতো খেটেও নারীর কর্মকে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টিকারী কর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও লিঙ্গ-বৈষম্য যথারীতি টিকে থাকে। শুধু টিকেই থাকে না, এই ব্যবস্থায় সব শ্রেণীর পুরুষ শোষিত হয় না কিন্তু সকল শ্রেণীর নারীই নির্মমভাবে শোষিত এবং প্রচণ্ডভাবে শৃংখলিত হয়ে থাকে। ড. হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, “নারীশোষণে বুর্জোয়া ও সর্বহারায় কোনো পার্থক্য নেই; বুর্জোয়া পুরুষ শুধু সর্বহারা শ্রেণীটিকে শোষণ করে না, শোষণ করে তার নিজের শ্রেণীর নারীকেও; আর সর্বহারা পুরুষ নিজে শোষিত হয়েও অন্যকে শোষণ করতে দ্বিধা করে না, সে শোষণ করে নিজের শ্রেণীর নারীকে। বিত্তবান শ্রেণীর নারী পরগাছার পরগাছা, বিত্তহীন শ্রেণীর নারী দাসের দাসী। শোষণে সব শ্রেণীর পুরুষ অভিন্ন; শোষণে মিল রয়েছে মার্কিন কোটিপতির সাথে বিকলাঙ্গ বাঙালী ভিখিরির, তারা উভয়েই পুরুষ, মানবজাতির রতœ।” তবে একথা নির্ভেজাল সত্যি যে, পুঁজিবাদের পূর্বে সামন্তযুগে নারীর দূরাবস্থা ছিল আরো ভয়ঙ্কর পর্যায়ে। সতীদাহের মতো বহু চরম-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ছিল সামন্তযুগের ফসল। কাজেই সামন্তযুগ থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ নারীর জন্য সামান্য হলেও আশার আলোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আসলে পুঁজিবাদের কাঠামোসমূহ কিভাবে কাজ করে তার উপর নির্ভর করে নারীর দূরাবস্থার ধরণ। পশ্চিম ইউরোপীয় অবাধ পুঁজির দেশসমূহের নারীরা তুলনামূলক বিচারে বেশ কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করছে এবং বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী নারীকে এগিয়ে নেয়ার কাজে পুঁজিবাদীদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। জাতিসংঘ, বিভিন্ন প্রকার এনজিও এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের ‘উদারনৈতিক নারী আন্দোলন’ এর ধারা বিশ্বের সকল স্থানের নারীকেই স্পর্শ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ধারার সকল কার্যক্রমের মর্মবস্তু হচ্ছে নারীকে পুঁজিবাদী উৎপাদনের সাথে ও বাজার ব্যবস্থার সাথে আরও বেশি একীভূত করা এবং সেক্ষেত্রে সব ধরনের বাধা ও বৈষম্যকে দূর করা। পুঁজি চায় শ্রম। নারীর শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। সেই যুক্তিতে লিঙ্গ-বৈষম্য থাকার কথা নয়। কিন্তু পুঁজির মালিকরা পুরুষতন্ত্রকে ব্যবহার করে নারী শ্রমিকের মজুরি পুরুষের তুলনায় কম নির্ধারণ করে থাকে। নারী এখানে পুঁজির দ্বারা এবং পুরুষতন্ত্রের দ্বারা দ্বি-মুখী শোষণের শিকার। বাংলাদেশে তৈরি-পোষাক শিল্পে কর্মরত ত্রিশ লক্ষ নারী-শ্রমিক কি পরিমান পুঁজিবাদী শোষণের শিকার তা আমরা অনেকেই অনুমান করতে পারি। ওভারটাইম বাধ্যতামূলক করে সেখানে আইএলও ঘোষিত আন্তর্জাতিক শ্রম আইনকে(৮ ঘন্টা কাজ) নির্লজ্জভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখানো হচ্ছে। ওরা ভোর ৫টায় ওঠে আর রাত ১০টার পর ঘরে ফেরে এবং রাত ১২টায় ঘুমোতে যায়। ছুটি-ছাটার বালাই নেই, এমনকি জাতীয় দিবসেও না। ওরা শুধু জানে দিন গিয়ে রাত আসে, রাত গিয়ে দিন। তারপরেও আমি মনেকরি, স্বামীর দাসত্ব করার চাইতে গার্মেন্ট-এ গোলামী করা অনেক উত্তম। তার প্রমাণও রয়েছে। শতকরা কতজন গৃহিনী আত্মহত্যা করছে আর শতকরা কতজন বস্ত্র-বালিকা আত্মহত্যা করছে তার হিসাব করলেই প্রমাণ পাওয়া যাবে। ‘স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে যৌনপল্লীতে বিক্রী’ এইরকম একটি খবর প্রকাশিত হলো গত ১০ এপ্রিলের অধিকাংশ জাতীয় পত্রিকায়। যেসব গৃহবধূ একটু কম কষ্টে আছে বলে মনে হচ্ছে অর্থাৎ আত্মহত্যা করছেনা বা খুন হচ্ছেনা বা বিক্রী/পাচার হচ্ছে না তাদের গার্হস্থ্য শ্রমকেও পুঁজিবাদ হিসাবের মধ্যে আনছে না। সাণ্ড্রা হার্ডিং মনে করেন, পুরুষতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ এর শেকড় শুধুমাত্র পরিবারের ভেতর লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজনের মধ্যেই প্রোথিত নেই, এটি একই সঙ্গে প্রোথিত আছে সামাজিক ব্যক্তির জৈবিক ও মনোজাগতিক জগতের মধ্যেও। পুরুষতন্ত্র ও পুঁজির ঐক্য বুঝতে পারলে এটাও বোঝা সম্ভব যে, পুরুষের পক্ষে কাউকে শ্রেণী ও লিঙ্গ নিপীড়ন থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয় সব রকম নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নারীকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। জেরেটস্কির কথা অনুযায়ী, “নারী আসলে পুঁজির জন্যই কাজ করছে পুরুষের জন্য নয়; দৃশ্যমান ঘটনা হল নারী পুরুষের জন্য কাজ করছে এবং বাস্তব হল নারী কাজ করছে পুঁজির জন্যÑ এই দুইয়ের তফাৎ না বোঝার জন্য নারী আন্দোলনের অনেক শক্তি দিক্ভ্রান্ত হচ্ছে।”
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে যেহেতু আমরা শোষণমুক্ত সমাজকেই বুঝি এবং নারীর পরাধীনতা যেহেতু অন্যতম একটি শোষণ-প্রক্রিয়া, সুতরাং সমাজতন্ত্রে লিঙ্গ-বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে দুরীভূত হওয়ার কথা। সমাজতন্ত্রীদের বক্তব্য হল, পুঁজিবাদ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের বিকশিত রূপ। নিজের অমরত্বের জন্য পুরুষের যে আকাঙ্খা সেখান থেকেই নারীদেহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। যে বোধ থেকে পুরুষ উৎপাদনের উপায়ের উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় একই বোধ থেকে পুনরুৎপাদনের উপায়(নারী)-এর উপরও কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সকল প্রকার শোষণ, যেমন: শ্রেণী-শোষণ, বর্ণ-বৈষম্য, লিঙ্গ-নিপীড়ন সব একই সূত্রে গ্রোথিত এবং তা হল ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার। তাঁদের মতে, নারীর মুক্তির জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত করা এবং পরিবার নামক সংগঠনটির মৌলিক পরিবর্তন করা। এর জন্য পরিবারের আর্থিক দায়িত্বটি নিতে হবে রাষ্ট্রকে, পুঁজিবাদ সে ভার কখনও নেবে না। একমাত্র সাম্যবাদের মধ্যেই নারী পেতে পারে প্রকৃত মুক্তি; সেখানে পরিবার থাকবে, তবে তা গড়ে উঠবে নারী-পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণের ভিত্তিতে। তাই নারী-মুক্তি আন্দোলন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপক সংগ্রামের একটি অংশ বলে বিশ্বাস করেন মার্কসবাদীরা। কাজেই তাঁদের তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা ধরে নিতে পারি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা পাবে। আমাদের মতো একইরূপ ধারণা পোষণ করতেন বিশ্ব নারীবাদের প্রবক্তা সিমোন দ্য বোভোয়ার। শুধু ধারণা পোষণ করেই বোভোয়ার ক্ষান্ত ছিলেন তা নয়, তিনি জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই ব্যয় করেছেন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার লড়াইয়ে। ১৯৪৯ সালে তাঁর রচিত মহাগ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ বিশ্বব্যাপী পুরুষতন্ত্রের ভিত দুর্বল করে ফেলেছে সত্যি, কিন্তু বইটি যখন রচনা করেছেন তখনও তিনি নিজেকে নারীবাদী না বলে সমাজতন্ত্রী বলেই দাবী করেছেন। কিন্তু পরবর্তিতে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর ভুল তিনি বুঝতে পারেন। তিনি পরিস্কার দেখতে পান যে, সমাজতন্ত্র নারীকে মুক্তি দিচ্ছে না। উহাও পুরুষতন্ত্র। সে প্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালে বোভোয়ার নিজেকে নারীবাদী হিসেবে ঘোষণা দেন এবং নিজেকে নারীবাদী সংগঠনের সাথে যুক্ত করেন। বোভোয়ারের মানসিকতার পরিবর্তন ‘নারীবাদ’-কে বিশ্বব্যাপী স্বতন্ত্র মাত্রা দান করেছে, গতিশীল করেছে র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্টদের। ১৯৭৩ সালে র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্টরা ঘোষণা করেন, “আমরা বিশ্বাস করি না যে পুঁজিবাদ অথবা অন্য কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নারী নিপীড়নের কারণ, এটাও আমরা বিশ্বাস করি না যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিপ্লবের লক্ষ্য দিয়েই নারী নিপীড়ন দূর হতে পারে।” এভাবেই শুরু হয়েছে সমাজতন্ত্রের প্রতি নারীবাদীদের অনাস্থা। সমাজতন্ত্রে নারী মুক্ত না হওয়ার কারণসমূহ নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রকার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। অনেকে মনে করেন মার্কসবাদ নারীমুক্তি আন্দোলনের মতাদর্শিক কোনো কাঠামো যোগান দিতে পারে না। কেউ কেউ বলেছেন, মার্কসবাদ শ্রেণী-সংগ্রামের উপর অধিক গুরুত্ব দেয় যার কারণে নারীমুক্তি আন্দোলন উপেক্ষিত থাকে। আবার অনেকে মনে করেন, মার্কসবাদের মধ্যেই পুরুষ-পক্ষপাত রয়েছে এবং ক্ষমতাসীন পার্টি যে আমলাতন্ত্রের জন্ম দেয় তা পুরুষতন্ত্রকেই সহায়তা করে। অনেকে বলেন, যেহেতু মার্কসবাদ মনেকরে ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকেই সব শোষণ-পীড়নের উদ্ভব সেহেতু সম্পত্তি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করলেই নারী-নির্যাতনের সমাপ্তি ঘটবে কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া অনেকেই মনে করেন, যেহেতু মার্কসবাদ মানুষের মুক্তির মতবাদ সুতরাং এর সাথে নারী-মুক্তির মতবাদ সম্পর্কিত করা সম্ভব এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় তত্ত্ব সংযোজন করা দরকার। কৃষ্ণাঙ্গ নারীর দূরাবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে গ্লোরিয়া জোসেফ বলেছেন, মার্কসীয় প্রত্যয়গুলো শুধু লিঙ্গ-অন্ধ নয় বর্ণ-অন্ধও বটে। তিনি আরও বলেছেন, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীর মধ্যে যতটুকু সংহতি দেখা যায় তার চাইতে অনেক বেশি সংহতি দেখা যায় শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ও নারীর মধ্যে। লিঙ্গ-বৈষম্যের চাইতে বর্ণ-বৈষম্যের প্রখরতা অনেক বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। সেজন্যে তাঁর মতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী তত্ত্বকে হিসাবের মধ্যে না আনলে কোনো কার্যকর নারীবাদী আন্দোলন সম্ভব নয়। আর একটি বিষয় চিন্তার উদ্রেক করে তা হল দেশে দেশে যেসমস্ত বাম সংগঠন মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে চলেছে সেই সকল সংগঠনে নারীর অবস্থান একেবারেই প্রান্তিক পর্যায়ে। কাজেই তাঁরা রাষ্ট্র-ক্ষমতায় গেলেই নারী মুক্ত হয়ে যাবে কি-না তা ষ্পষ্টতই প্রশ্নের দাবীদার। বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, মার্কসবাদ ও নারী প্রশ্নের সম্পর্ক নিয়ে এত সব আলোচনা বা বিতর্কের কারণ হচ্ছে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য এখন পর্যন্ত সব চাইতে শক্তিশালী বিশ্লেষণ পদ্ধতি মার্কসবাদ দিতে সক্ষম। এবং দেশে দেশে বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ, শ্রেণী নিপীড়নের বিরুদ্ধে জোরালো কণ্ঠ মার্কসবাদীদেরই। বিদ্যমান সমাজ-অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন যাঁরাই অনুভব করেন তাঁদেরকেই মার্কসবাদকে হিসাবের মধ্যে আনতে হয়। সে কারণে নারী-মুক্তি আন্দোলন, তা যে আকারেই হোক, শেষ পর্যন্ত মার্কসবাদকে উপেক্ষা করতে পারে না। আনু মুহাম্মদের বক্তব্যকে যুক্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া মোটেই সম্ভব নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ঊনবিংশ শতাব্দিতে যখন নারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ কিনা তা নিয়ে ছিল সংশয়-সন্দেহ, তখন মার্কস এবং এঙ্গেলস মানব মুক্তির অপরিহার্য অংশ হিসেবে নারী-মুক্তিকেও নির্দেশ করেছিলেন। যে ধর্মীয় কুসংস্কার নারীকে মানুষের পর্যায়ে আসতে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তার বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য মার্কসবাদীদেরই। বোভোয়ার সমাজতন্ত্রের মধ্যে নারী-মুক্তি খুঁজে না পেলেও তিনি নিজেই কিন্তু মার্কসবাদের সৃষ্টি, একথাও সত্যি। তবে মার্কসবাদীরা একটি বিশেষ দোষে দুষ্ট যে, তাঁরা সকল ক্ষেত্রেই শ্রেণী-দন্দ্ব খোঁজেন। বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীর তালিকায় ফেলে বাতিল করে দেন মার্কসবাদের প্রতি সকল প্রকার সমালোচনাকে। মার্কসের ‘উদ্বৃত্ত-মূল্য তত্ত্ব’ একটি অভ্রান্ত বিশ্লেষণ যা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী মাত্রা দান করেছে বটে তবে শ্রেণী-দন্দ্বের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাকে চিন্তাশক্তির অসাঢ়তা বলেই অনেকে মনে করেন। সমাজ বিকাশের একটি স্তরে শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু নারীর সৃষ্টি-ইতিহাস মানব সৃষ্টির ইতিহাসের সমান। তবে শ্রেণী-শোষণ হয়তো লিঙ্গ-বৈষম্যকে উস্কে দিতে পারে, একথা মানা সম্ভব। কাজেই শ্রেণী-দন্দ্বের বাইরেও মানবজাতির আরো বহু সমস্যা রয়েছে। সেকারণে নারী-আন্দোলন থেকে যদি মার্কসবাদের প্রতি সমালোচনামূলক বক্তব্য উত্থাপিত হয়, সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গী বলে বাতিল করা আমার মনেহয় মার্কসবাদীদের যথার্থ হবে না।
গণতন্ত্র হচ্ছে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা। তবে গণতন্ত্রে নারীর অবস্থান ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত সহজ একটি কাজ হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তা খুবই দুরূহ; কারণ এসময়ের প্রায় সকল রাষ্ট্রের সকল শাসকগোষ্ঠীই নিজেদের ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলে চালানোর চেষ্টা অথবা অপচেষ্টা করছেন। একদিকে সমাজতন্ত্রীরা যেমন নিজেদের শাসনকে গণতান্ত্রিক বলে দাবী করছেন, অন্যদিকে যারা জণগনের সার্বভৌমত্বেই বিশ্বাস করেনা এইরূপ চরম-প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদীরাও নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক বলতে মোটেই ইতস্ততঃ করছে না। কাজেই ‘গণতন্ত্র’ বললেই কোন্টি প্রকৃত গণতন্ত্র আর কোন্টি প্রতারণা এবং কতটুকু প্রতারণা তা আগে ষ্পষ্ট করতে হবে। আমরা জানি, যে শাসনব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ নাগরিকদের সমানভাবে অংশগ্রহণ থাকে তাহাই গণতন্ত্র। লর্ড ব্রাইস লিখেছেন, “যেখানে শাসনক্ষমতা কোনো শ্রেণীর উপর ন্যস্ত না থেকে সমগ্র সমাজের সদস্যদের উপর ন্যস্ত থাকে তাহাই গণতন্ত্র।” অন্যান্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীও একইরূপ বলেছেন। কিন্তু গণতন্ত্র বলতে যদি গণমানুষের শাসনকে বুঝানো হয়ে থাকে, নারী ও পুরুষ উভয়ই যদি সমানভাবে মনূষ্য প্রজাতির অংশ হয়ে থাকে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের শাসনব্যবস্থা যদি গণতান্ত্রিক হয়ে থাকে এবং সরকারসমূহ যদি গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্ন হয়ে থাকে তবে নারীর কোনো দূরাবস্থা থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। দেশে দেশে নারী আজ চরমভাবে নির্যাতিত, নিষ্পেশিত। মানবতা আজ লুন্ঠিত, নারীর অধিকার আজ ভূলুন্ঠিত। সংজ্ঞা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু নারী আজ এতই অবহেলিত যে, পরিবারে অথবা সমাজে অথবা রাষ্ট্রের কোথাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর কোনো ভূমিকাই গ্রাহ্য নয়। অনেকে মনে করেন গণতন্ত্র আসলে পরিমানের ব্যাপার, কোনো রাষ্ট্র একটু বেশি গণতান্ত্রিক আবার কোনোটি কম। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কিছু অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে লিঙ্গ, ধর্ম এবং বর্ণভেদে সকল নাগরিককে সমান সুযোগ প্রদান। এছাড়া গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আরো কিছু শর্ত রয়েছে, যেমন: ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি অনুসৃত হওয়া, স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা, সরকারের জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা, প্রতিনিধি নির্বাচনে স্বচ্ছতার ব্যবস্থা ইত্যাদি। তবে সকল শর্তেরই মূললক্ষ্য কিন্তু তিনটি। তা হল: রাষ্ট্রের চরিত্রকে (১)ধর্ম-নিরপেক্ষ, (২) লিঙ্গ-নিরপেক্ষ এবং(৩) বর্ণ-নিরপেক্ষ করা। অর্থাৎ ধর্মের কারণে বা লিঙ্গের কারণে বা গায়ের রংয়ের কারণে রাষ্ট্র কারো প্রতি বৈরি আচরণ করবে না অথবা কাউকে অধিক সুযোগ প্রদান করবে না। কাজেই কোনো রাষ্ট্রের নারীর অবস্থা বা দূরাবস্থা বুঝতে আমাদের জন্য সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে দৃষ্টি দেওয়াই যথেষ্ট। এখন আমরা উদাহরণ হিসাবে বাংলাদেশের শাসনপদ্ধতি কতটুকু গণতান্ত্রিক তা বিবেচনা করতে পারি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের চাইতে অধিক গণতান্ত্রিকতা চর্চার দেশ যেমন পৃথিবীতে অনেক রয়েছে, আবার সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের থেকে পিছিয়ে থাকার দেশও কয়েকটি রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে ইসলামকে সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে। ‘মদিনার সনদ’-এ নবী অত্যন্ত সচেতনভাবে ‘বিস্মিল্লাহ্’ লেখেন নি। নবীর না লেখার কারণ মদিনার সনদ শুধু মুসলমানদের জন্য ছিল না বরং তা ছিল মদিনাবাসীর জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের শুরুতে ‘বিস্মিল্লাহ্-র্হি-রাহ্মান-র্হিরাহিম’ লেখা হয়েছে। এভাবে রাষ্ট্র নিজেই একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী হওয়ায় উহার ধর্ম-নিরপেক্ষ চরিত্র সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছে। সন্দেহ নেই সংবিধান অনুযায়ীই বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, অর্থাৎ সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। এবং সেকারণে সংখ্যালঘু ধর্মীয়গোষ্ঠীর সংখ্যা দিন দিন লোপ পাচ্ছে। এপ্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, ধর্ম দিয়ে কখনও রাষ্ট্র হয়না। যদি করা হয় তাহবে এক‘শ ভাগ প্রতারণা। ধর্ম দিয়ে যদি রাষ্ট্র হতো তবে ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ইত্যাদি আলাদা আলাদা রাষ্ট্র যেমন হতো না তেমনি বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া মিলেও একটি রাষ্ট্র করা যেত। অবশ্য ইতিহাসে এরকম একটি এবং একটিমাত্র রাষ্ট্রেরই নজির পাওয়া যায়, তা হল পাকিস্তান। যার খেসারত হিসেবে দিতে হয়েছিল নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ, যা ছিল বিশ্বে মানবহত্যার অন্যতম রেকর্ড। আমার কথাগুলো আমাদের রাজনীতির কর্তাদের কাছে পৌঁছবে কি-না জানিনা তবে তাঁদের কেহ বাংলাদেশকে মুসলমান বানাতে ব্যস্ত আবার কেহ বাংলাদেশের মুসলমানত্ব টিকে রাখতে ব্যস্ত। দ্বিতীয়ত: লিঙ্গ-নিরপেক্ষতার কথা। বাংলাদেশের সংবিধান এদিক দিয়ে ত্র“টিমূক্ত। সংবিধানের ২৮নং অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। সংবিধানে উক্ত কথাগুলি কেন লেখা হয়েছে তা আমার জানা নেই। অনেকে বলেন সংবিধানের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য তা লেখা হয়েছিল, কারণ বাস্তবে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে নারী এবং পুরুষকে মোটেই সমান দৃষ্টিতে দেখা হয় না। রাষ্ট্র নিজেই প্রবল পুরুষতান্ত্রিক। রাষ্ট্রের আইন দ্বারাই পরিবারের সম্পত্তি বন্টন, বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ ইত্যাদি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে নারীকে করা হচ্ছে নিকৃষ্টভাবে বঞ্চিত। পরিণত করে রেখেছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে। রাষ্ট্র কর্তৃক নারীর উপর বৈরী আচরণের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে ঘরে ঘরে অসন্তোষ, প্রেমহীনতা। চলছে নির্লজ্জ নিপীড়ন। সরকারের মন্ত্রীরা মাঝে মাঝে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কথা বলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কথা বলেন না। আমি বলি রাষ্ট্র ঠিক হলেই কেবল পুরুষরা ঠিক হয়ে যাবে, অন্যথায় নয়। রাষ্ট্র নারীর সাথে তামাশাও একেবারে কম করছে না। একদিকে লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন দ্বারা নারীকে অসহায় করে রাখছে, অন্যদিকে নারীকে রক্ষার জন্য আবার নতুন নতুন আইনও করছে। সকল নাগরিককে রক্ষার দায়িত্ব যদি রাষ্ট্রের হয় এবং নারীরা যদি পূর্ণ-নাগরিক হয় তবে নারীকে রক্ষার জন্য কি আলাদা কোনো আইনের দরকার আছে? এসব হচ্ছে রাষ্ট্রীয় তামাশা। নারী নিয়ে তামাশা। ফসল-রক্ষা, বন্দর-রক্ষা, নদী-রক্ষার মতো নারীকে রক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে কিন্তু পুরুষ রক্ষার কোনো প্রয়োজন হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ফসল, বন্দর, নদী, নারী সবই সম্পদ এবং তা পুরুষের সম্পদ। এসবের মূল কারণ রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চরিত্র। অগণতান্ত্রিকতা নারীকে বিপদে ফেলছে। এভাবে যেখানে অগণতন্ত্র, সেখানেই নারী বিপদগ্রস্ত। যেখানে নারী একটু স্বাধীন, গণতান্ত্রিকতা সেখানে এগিয়ে। সেই হিসেবে এক‘শ ভাগ গণতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্র পৃথিবীতে নেই। তবে উত্তর আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহে নারীরা অনেকটাই স্বাধীনতা ভোগ করছে, বাস্তবিকেও উক্ত দেশসমূহ গণতন্ত্রের চর্চায় এগিয়ে।

Saturday, 5 September 2009

আদালত অবমাননা বনাম আদালত সমালোচনা !!!!!

রাজতন্ত্রে রাজা-রানী কিংবা রাজপরিবারের প্রাথমিক সদস্যদের সমালোচনা করা অপরাধ, রীতিমত ফৌজদারি অপরাধ, কোন কোন রাষ্ট্রে এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। আইনি পরিভাষায় lese majesty নামে পরিচিত। সমসাময়িককালে অনেক দেশে আইনটি হালকা প্রয়োগ হলেও কোন কোন রাজতন্ত্রে, বিশেষত এশিয়ার অনেক দেশে খুবই গুরুত্বের সাথে প্রয়োগ করা হয়। রাজতন্ত্রের আরও অনেকগুলো নর্মের মধ্য অন্যতম হল – রাজা-রানীকে “না” শুনানো যাবেনা এবং তাদের দিকে উল্টো ঘুরে প্রস্থান করা যাবেনা ইত্যাদি ইত্যাদি

… রাজতন্ত্রে বসবাসকারী জনগণ একাধারে ঐ রাজ্যর নাগরিক (citizen of the country) এবং রাজা/রানীর তথা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রজা (subject of the crown)। ব্রিটেন কিংবা নেদারল্যান্ডের মত প্রগতিশীল দেশের নাগরিক যেখানে নাগরিক অধিকার সর্বোচ্চ, তবুও সিম্বলিক্যালি সেখানকার নাগরিকগণ কারও সাবজেক্ট। সাধারণতন্ত্রের/প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে এই দিক থেকে আমরা আসলেই অনেক ভাগ্যবান।
রাজতন্ত্রে উচ্চ আদালত এবং নিম্ন আদালতের বিচারকগণ হলেন রাজা/ রানীর প্রতিনিধি যারা রাজন্যর হয়ে বিচার কাজ সম্পন্ন করেন। শুধু বিচারক নন- রাজা দ্বারা কমিশনড এবং গ্যাজেটেড প্রাপ্ত সকল ব্যক্তিই রাজা/রানীর প্রতিনিধি। রাজতন্ত্রে তিনটি সমাজ বিদ্যমান – রাজ-পরিবার, অভিজাত এবং সাধারণ। আধুনিক গ্রেট ব্রিটেনেও এই পার্থক্য খুবই ভালোভাবে সমাজের বিভিন্ন যায়গায় বজায় রাখা হয়। ব্রিটেনের দুই কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা হলেও একটা ব্যাপার খুবই লক্ষণীয় – ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এ জয়েন্ট সেশন হয়না (কেবল রাজ অভিষেক ব্যতীত) – এবং ওটাতেও হাস্যকর ভাবে অভিজাত এবং সাধারণ এই দুয়ে পার্থক্য করা হয় – উপরন্তু রাজা-রানী কখনও হাউজ অফ কমন্স এ প্রবেশ করেননা। কেননা সাধারণদিগের সমাবেশ প্রবেশ করা রাজন্যর শানের অপমান।
সাধারণতন্ত্রে বিচার বিভাগের কনসেপ্ট ভিন্ন – সাধারণতন্ত্রে বিচারপতিরা – জনগণের কর্মচারী মাত্র, যারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি দ্বারা নিয়োজিত এবং প্রজাতন্ত্রের প্রচলিত আইন, যা জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা পার্লামেন্টে গৃহীত হয় তার ব্যাখ্যা এবং তার আলোকে জনগণের বিভিন্ন অভিযোগ খণ্ডন করেন।
রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ
আমাদের দেশের বিভিন্ন পাবলিক ইন্সটিটিউশন ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার প্রাপ্ত। যেহেতু ভারত এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তি কোন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হয়নি তাই পুরো সিস্টেম হঠাৎ বদলায়নি। গত শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত (ভারতের সংবিধানের ২৬ তম সংশোধনীর আগে) ভারতের বিভিন্ন রাজপরিবার (কাগজে কলমে মূলত ব্রিটিশ সেক্সকোবার্গ গোথা রাজ পরিবারের সাবেক সামন্ত) বিভিন্ন সরকারী সুবিধা ভোগ করত। বেসামরিক এবং সামরিক সরকারী কর্মচারী (বিশেষত যারা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কমিশনড প্রাপ্ত গেজেটেড) মাঝেও অভিজাত ভাবটা বহুদিন পর্যন্ত ছিল। এখন অনেক কমে গিয়েছে।
একটি প্রজাতন্ত্রে সবাই জনগণের কর্মচারী – প্রজাতন্ত্রে শাসন বিভাগের ভূমিকা ব্যবস্থাপকের এবং সমন্বয়কারীর, আইনসভার তদারক ব্যবস্থাপনা প্রণয়নকারীর এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থাপনা বিধি ব্যাখ্যাদানকারীর – সবাই রাষ্ট্রের তথা জনগণের কর্মচারী। এই তিনটি স্তম্ভের আলোচনা-সমালোচনা করা রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক অধিকার।
সমালোচনা করার অধিকার মানেই যা ইচ্ছা তা বলা নয় – কেননা এতে অন্য নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে অবশ্যই গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকার সবার থাকতে হবে। সমালোচনার ঊর্ধ্বে কেউই নয়।
#রাষ্ট্রের কর্মচারীদের সমালোচনা দু ভাবে হতে পারে –
১. ব্যক্তি হিসেবে ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা সামাজিক প্রেক্ষাপটে ।
২. দায়িত্বরত অবস্থায় কৃত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে ।
#এ দুটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত কারণে সমালোচনা করার অধিকার জনগণ দুই ভাবে সংরক্ষণ করে –
১ ব্যক্তি নাগরিক হিসেবে সমালোচনার অধিকার।
২. ভোটার এবং করদাতা হিসেবে সমালোচনার অধিকার।
সমালোচনা দুভাবে করা যেতে পারে – 
১. বাক্যর মাধ্যমে
২. কাজের মাধ্যমে
সমালোচনা এবং অবমাননা দুটি ভিন্ন ব্যাপার। সমালোচনা করা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার এবং অবমাননা করা একটি অপরাধ। যেকোনো নাগরিককে অপর কোন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী অবমাননা করলে এর প্রতিকার চাওয়ার অবিকার সবার আছে।
গ্রামের একজন চৌকিদারের সমালোচনা করার অধিকারের মত রাষ্ট্রের প্রধান রাষ্ট্রপতির সমালোচনা করার অধিকারও নাগরিকের আছে। এমন ভাবেই সংসদগণ প্রতিনিধি, সরকারী চাকুরে সবার সমালোচনা করার অধিকার জনগণ রাখে। তেমনি বিচার বিভাগ এবং বিচারকদের কাজেরও সমালোচনা করার অধিকার সবাই রাখে। সমাজের যেকোনো ব্যক্তির সমালোচনা করার অধিকারও অন্যরা সংরক্ষণ করে।
অন্যদিকে, লাইসেন্সধারী – আইনমান্যকারী দেহব্যবসায়ীরও অবমাননা করার অধিকার রাষ্ট্রের অন্য কারো নেই; যেমন কারো নেই প্রেসিডেন্ট, আইনসভা কিংবা বিচার বিভাগের অবমাননা করার এবং এই সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের। এমনকি যেকোনো আইন পালনকারী কোন ব্যক্তির অন্য আইন পালনকারী ব্যক্তিকে অবমাননা করার অধিকার নেই। এমনকি সংবাদপত্রেরও এই অধিকার নেই – কেননা অবমাননা করা একটি অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড। আইন মান্য-কারী যেকোনো নাগরিককে অবমাননা হতে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
কিছু অপ্রিয় সত্য ব্যাপার
আমাদের উপমহাদেশে বিচারকগণ সমাজে অত্যন্ত মর্যাদায় অধিস্ট আছেন। বলা হয়ে থাকে মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগ কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কোন কোন বিচারপতিরা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই সরকারের অবৈধ অন্যায় কাজের সহায়ক হিসেবে কাজ করে এসেছেন। ব্রিটিশ আমল অনেক দূরের। আমরা পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশেই দেখেছি কতিপয় বিচারপতির সামরিক জান্তার লেজুড়বৃত্তি। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মুনির এবং শেখ আনোয়ারুল হক বিচার বিভাগীয় মেকিয়াভিলিয়াজম এর জন্মদাতা। সম্প্রতি মিশরেও দেখা গিয়েছে ওখানকার বিচারপতিরা কিভাবে গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সামরিক সরকারে-এবং শাসনের লেজুড়বৃত্তি করতে। আমেরিকার দাসপ্রথা তার স্বাধীনতারও ৮০ বছরেরও বেশি সময় বজায় ছিল; এর অন্যতম কারণ তৎকালীন কতক বিচারপতির অদূরদৃষ্টি সম্পন্ন চিন্তা ভাবনা – বিচারপতি রজার বি ট্যানি মনে করতেন কালো মানুষের কোন অধিকার নেই মৌলিক অধিকারের।
বাংলাদেশের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে-
বিচারপতি নুরুল ইসলাম যিনি যুদ্ধের সময় প্রকাশ্য পাকিস্তানী সরকারকে সহায়তা দিয়ে গিয়েছেন তথা পাকিস্তানের গণহত্যার অন্যতম সহযোগী; পরবর্তীতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। যদিও ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর তিনি সামরিক জান্তা কর্তৃক পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। বিচারপতি সাত্তার মুক্তিযুদ্ধের সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আঁতাত করত প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আইনসভা তথা জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত আওয়ামীলীগের নির্বাচিত সদস্যর আসন শূন্য ঘোষণা করে রাজাকার এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের নির্বাচিত ঘোষণা করেন। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের অনূগত থেকে তাদের নানা অপকর্মে সহায়তা দিয়ে গিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রেখেছিলেন স্বৈরশাসনের পথ সুগম করার জন্য। আবার অন্য দিকে, বিচারপতি সায়েম মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে ভূমিকা রাখলেও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অন্যান্য অনেকের মত রাজনৈতিক অঙ্গনে খুবই প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রেখেছিলেন – তিনিও স্বৈরশাসকের সাহায্য কাজ করেছিলেন। বিচারপতি এম মাসুদ নির্বাচন কমিশনার থাকার সময় আক্ষরিক ভাবেই স্বৈরাচারী এরশাদের রাজনৈতিক ব্যাডবয় হিসেবে কাজ করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে একটি তামাশায় পরিণত করেছিলেন।
বিচারবিভাগ এবং সমাজ
আমাদের দেশের বিচারপতিদের যেন সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন। তারা কোথাও যেতে পারেননা কিংবা গেলেও সংবাদপত্রে চলে আসে। যেন বিচারপতিরা সমাজের বিচ্ছিন্ন কেউ!
একটা বিখ্যাত উক্তি আছে – পাগল এবং শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হতে পারেনা। আমাদের এই “নিরপেক্ষ” নামক অস্বচ্ছ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নাহলে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করার জন্য ভিন্ন দেশ হতে জনগণ ভাড়া করতে হবে। অন্যথায় এই “নিরপেক্ষ” নামক ধোয়া থেকে বের হয়ে এসে আমাদের জোড় দিতে হবে সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ এবং যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালনের প্রতি। কোথাও ইন্সপেকশনে গেলে কিংবা সাইট হ্যান্ডিংএ গেলে আপ্যায়ন করা স্বাভাবিক – কিংবা কাজের ক্ষেত্রে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাওয়া স্বাভাবিক। এটা ঘুষ নয়- সামাজিক ভদ্রতা। এর মানে এই নয় যে কেউ তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করবেননা। এতেই যদি দায়িত্ব পালনে সমস্যা হয় – তাহলে ব্যাপারটা এমন নয় কি যে দায়িত্ব পালনে মানসিক ভাবে প্রস্তুত নয়।
আমাদের প্রধান সমস্যা হল আমরা যৌক্তিক থেকে সরে সবসময় অতিমাত্রার আশ্রয় নেই। হয় দেবতা নাহলে শয়তান – আমরা ভুলে যাই এই দুইয়ের মাঝে মানুষ। যারা কোর্টের বিচারপতি হন তারাও এই মাঝের অংশে পরেন। তারাও অন্যান্য সব কিশোর – যুবকদের মত বয়স পার করে এসেছেন। তারা কোনভাবেই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। একজন জজকে রাষ্ট্র যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে – খুবই মানবিক ভাবেই তারা ক্ষমতার কারণে অনেক সময় ভুল কিংবা ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত কিংবা কাজ করতে পারেন – যা একমাত্র গঠনমূলক সরাসরি সমালোচনার মাধ্যমে তাদের এ ব্যাপারটি সম্পর্কে সর্বদা সজাগ রাখতে হবে। যদিও বিচারকগণ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় অঙ্গের কর্মচারী হতে অপেক্ষাকৃত নিজ দায়িত্ব এবং অবস্থান সম্পর্কে বেশি সচেতনতা রাখেন – ভুল হতেই পারে।
কতিপয় ঘটনাবালি –
কতগুলো খুব দুঃখজনক ঘটনা আছে – কিছুদিন আগে যমুনা ব্রিজে টোল না দিয়ে এক বিচারপতি ব্রিজে উঠে পড়েন আবার বেআইনি ভাবে ব্রিজের মাঝে গাড়ি থামিয়ে ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এর পর টোল চায়তে গেলে বিচারপতি টোল দেওয়া দূরের কথা- পুলিশকে দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করান। দোষ ছিল ব্যক্তিটি নাকি বেয়াদবি করেছেন। একটি প্রজাতন্ত্রে এর থেকে বড় তামাশা আর কি হতে পারে। সে যদি আসলেই বেয়াদব করে তাহলে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ করা জেত। তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হয়রানি করা হয়। কিছুদিন পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না পেয়ে। তাকে যে হয়রানি করল তার কিছুই হলনা।
বিভিন্ন দেশে উচ্চ এবং নিম্ন আদালতের বিচারকগণ এবং তাদের পরিবারের সদস্যগণ বিভিন্ন কারনে ক্রাইমেও জড়িত থেকেছেন – শাস্তিও হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মূহুর্তে মনে পড়ছে – কিছুদিন আগে নিম্ন আদালতের এক বিচারক ফেন্সিডিল সহ ধরা পরেছিলেন – এখন জেলে। বেশ কয়েক বছর আগে এক বিচারপতির পুত্র একটি বেসরকারি বহুজাতিক কোম্পানির প্রকৌশলীকে এসিড মেরেছিল – জামিন অযোগ্য অপরাধ হলেও পুলিশ ছেড়ে দেয়। এই কেসের পরে কি হয়েছিল এখন জানিনা – সংবাদ পত্রে এটা নিয়ে আর তেমন রিপোর্ট হয়নি। আরেকটি হল – বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফায়েজির এলএলবি আইন ডিগ্রীর সার্টিফিকেট জাল করে উচ্চ আদালতে নিয়োগ পাওয়া এবং ঘটনা ফাঁসের পর পদত্যাগ করা। ইন্টারনেটে খুব সহজেই পাওয়া যাবে অন্যান্য দেশের অবস্থা।
প্রায় এমন হয় – কোন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে রাখা হয় শাস্তি সরূপ অভিযোগ প্রমানের আগেই। একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই রাজতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই দুঃখজনক। আমাদের বিভিন্ন আইনের সংশোধনের সাথে সাথে আদালতের এসব ঔপনিবেশিক কালচার দূর করতে হবে।
বিচার বিভাগের চেক এন্ড ব্যালেন্স –
আমাদের দেশে গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক যে কয়েকটি আইনি ব্যবস্থা আছে তার একটি হল তথাকথিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। এই ব্যবস্থাটি – মূলত এটা পাকিস্তান আমলে কিছুদিনের জন্য করা হয়েছিল – যুক্তি ছিল সংসদ সদস্যরা পর্যাপ্ত “অভিজ্ঞ” নয় বিচার বিভাগকে “চেক” করার। এর পর এটাকে তুলে দেওয়া হয় যা স্বৈরশাসকগণ আবার নিয়ে আসেন; যেন এক্সিকিউটিভ এবং জুডিসিয়ারির সমঝোতায় (যেমন ডক্ট্রিন অফ নেসেসিটির মত রুল জারিতে) – আইন বিভাগকে পাশ কাটিয়ে কাজ করতে সুবিধা হয়। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এমন ব্যবস্থা এছে – যে কয়টিতে আছে সবগুলোই স্বৈরশাসনের জন্য কুখ্যাত যেমন পাকিস্তান কিংবা মিশর। আমাদের দেশে বিচারপতিরা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ নন – তারা দায়িত্ব নেবার আগে সংসদ হতে কোন হিয়ারিং এর দরকার হয়না আবার গুরুতর অসদাচরণের জন্যও তাদের সংসদের কাছে কোন দায় নেই – নিজেরাই নিজেদের বিচার করেন। এই ব্যবস্থা গণতন্ত্রের ট্র্যাডিশনাল চেক এন্ড ব্যালেন্স এর উপযুক্ত নয়। এই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাদ দিয়ে বিচারকদের অসদাচরণের জন্য অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যাস্ত করা উচিত।
আদালত অবমানানা আইন –
আদালত অবমাননা বলতে একেবারে সোজা ভাষায় রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি আবশ্যক কর্তৃপক্ষ আদালতের তথা বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব স্বীকার না করা কিংবা সাধারণ নির্দেশ -আদেশ ইত্যাদি অমান্য করা বোঝায়। এর সাথে যোগ হয় রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ বিচার বিভাগ তথা আদালতকে অপমান, তাচ্ছল্য কিংবা অবজ্ঞা করা।
কিছুদিন আগে আদালত অবমাননা আইন ২০১৩ (যা মূলত আদালত অবমাননা আইন ১৯২৬ – ঔপনিবেশিক বৃটিশ সরকারের ১৯২৬ সালে করা আইনের সংস্কার) অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু কিছু ধারার অবশ্যই পরিবর্তন প্রয়োজন; যেমন আইনে স্পষ্টত অন্যায় ভাবে দুটি গ্রুপকে (আমলা এবং সাংবাদিক) সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যেখানে আমজনতার তথা প্রাইভেট সিটিজেন যারা রাষ্ট্রে “আপামর জনতা” তাদের ব্যাপারে স্পষ্টত কিছু বলা হয়নি। বিচার বিভাগকে সমালোচনা করতে যেয়ে শাসন বিভাগকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা টিরানির অপ্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়। গণতন্ত্র অধিকার নামে উক্ত আইনে অত্যন্ত নির্লজ্জ ভাবে সরকার সরকারী কর্মকর্তাদের পাইকারি অব্যাহতি দিতে চেয়েছে।
আবার এটাও ঠিক, এই মামলা দিয়ে অবৈধ কাজ চালিয়ে যাবার একটি প্রচেষ্টা সবার মাঝেই দেখা যায় – সরকারী এবং বেসরকারি দুটো ক্ষেত্রেই। আমলাদের দাবী অনুযায়ী তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আসলে আদালতের সমালোচনা (বাক্য দ্বারা) নয় – কোর্ট অর্ডারের জন্য প্রশাসনিক কাজের সমস্যা। তথা, তাদের কাজের মাধ্যমে সমালোচনা সমসাময়িক আইনে কাজের মাধ্যমে অবমাননায় রূপ নেয়। প্রচলিত আইনে কোর্টের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু “করলেই” অবমাননা – এই সুযোগে কেউ স্থগিত আদেশ নিয়ে আসলে গোটা ব্যবস্থাটি জগদ্দল পাথরের মত স্থবির হয়ে যায়। সামান্য বদলী এমনকি অবৈধ কাজ সম্পাদনকারী ব্যক্তিও কোর্ট হতে স্থগিত আদেশ নিয়ে আসে – গোটা সিস্টেমই এর কারণে স্থবির হয়ে যায়। কিছুদিন আগে এসএ পরিবহণ নামক একটি বেসরকারি কুরিয়ার কোম্পানি কোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে – ঢাকা শহরে যেন তাদের বড় পরিবহণ ট্রাক ঢুকতে পুলিশ বাধা না দেয় সে জন্য – পুলিশের কিছুই করার থাকেনা এতে; অন্যদিকে এই কোম্পানির অন্যান্য ব্যবসায়ী প্রতিযোগী তাদের বড় গাড়ী ঢাকা শহরে ঢুকাতে পারতোনা পুলিশের বাধার কারণে কেননা তাদের কোর্টের স্থগিতাদেশ ছিলনা যার ফলে, ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে অনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এই অবস্থা স্পষ্টতই আইনের শাসনের খেলাপ। যদিও নির্বাহী বিভাগের কিছুই করার নেই – কোর্টের স্থগিতাদেশ না মানলে আদালত অবমাননা হবে।
সংবাদ মাধ্যমের বিষয়টি বাক্যর মাধ্যমে সমালোচনা মাঝে মাঝে বাক্যর মাধ্যমে অবমাননায় রূপ নেয়। সংবাদ মাধ্যম এবং সাংবাদিকদের দের ব্যাপারটা সামগ্রিক ভাবে জটিল – প্রথমত সংবাদসংস্থা অলিখিত ভাবে রাষ্ট্রের অন্যতম একটি স্তম্ভ হলেও এটি একটি ব্যবসা। সব ব্যবসার মতই এতে বিনিয়োগ থাকে – যা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেন। অনেক সময় সাংবাদিক তাদের প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীর তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমাদের দেশে প্রতিটি ব্যবসায়ী কোম্পানি নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থা সামান্য ভালো হলেই সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগ করে – প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক দুই ক্ষেত্রেই। বেশিরভাগ সময় এর মূল উদ্দেশ্য সংবাদ মাধ্যম দিয়ে ব্যবসা নয় – এর মাধ্যমে তার অন্যান্য মূল ব্যবসা এবং নিজের সামাজিক অবস্থান শক্ত করা।
সুতরাং, গণহারে এক লাইনে দায়মুক্তই দিলে এটার যথেচ্ছ ব্যবহার হবে। আগে ঠিক করতে হবে কোন কোন এই অবমাননার আইন প্রযোজ্য এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় – যা আইনে ব্যাখ্যা সহ থাকতে হবে।
লক্ষণীয়, নৃপতি অবমাননা / রাজা-রানীর অপমান (lese majesty ) এবং আদালত অবমাননা আইনের (Contempt of Court) এর “কাছাকাছি” আইনসভা অবমাননা (Contempt of Parliament) ও কোথাও কোথাও আছে। মানহানি / অপবাদ আইন (Defamation) প্রায় সব দেশে আছে। আরেকটি হল ধর্ম অবমাননা / ধর্ম নিন্দা / ঈশ্বর অবমাননা আইন (Blasphemy) – এটা অনেক দেশে থাকলেও কোথাও প্রয়োগ হয় কোথাও হয়না – সবচাইতে বিতর্কিত। বিধি অবমাননা (Contempt of Statute) নামক একটি ধোঁয়াশা আইনও আছে কোথাও কোথাও।
আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি যেন এক না হয়ে যায়। ফরাসী রাজা চতুর্দশ লুইয়ের চেতনা “আমিই রাষ্ট্র” তথা “আমিই প্রতিষ্ঠান” নামক কোন ব্যাপার যেন কোন পাবলিক প্রতিষ্ঠানে না থাকে। কারও ব্যক্তিগত নিন্দনীয় ব্যাপারের সমালোচনা যদি সে যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তার গোটা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা ধরা হয় এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে এটা চতুর্দশ লুইয়ের চেতনার কাজ হবে – যা একটি প্রজাতন্ত্রে/সাধারণতন্ত্রে সর্বাবস্থায় বর্জনীয়।
আদালত অবমাননা আইন ২০১৩ আবৈধ ঘোষণার রায়ে দুই বিচারক বলেছেন –
“…constitution provides that the SC and the HC possess inherent power to summon anybody before them for committing contempt of court, and the administration will act in aid of the courts….”
“…The bench said those who have no idea about law and court proceedings should not be allowed to write whatever they wish on the proceedings…….”
“……The court cannot accept any comment on the ongoing trial proceedings, as criticism on any issue should be made within a periphery. The court is aware of the consequence of criticisms if those are made without adequate knowledge on the topics……”
বিচারপতি কাজী রেজা-উল-হক এবং বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেন।
তবে অবশ্যই সংশোধন করত, ১৯২৬ সালের ঔপনিবেশিক আদালত অবমাননার আইন পরিবর্তন হতে হবে – একবিংশ শতাব্দীর একটি গণতান্ত্রিক সাধারণ তন্ত্রের উপযুক্ত করে। যেখানে স্পষ্ট থাকতে হবে কোনটা আদালত অবমাননা এবং কোনটা নয়। কাউকেই ফ্রি লাইসেন্স দেওয়া যাবেনা (যেমন ২০১৩ সালেরটাতে সরকারী কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের দেওয়া হয়েছে।)
আমাদের বিচারপতিরা কি মনে করেন এটা সম্পর্কে একটু ধারনা পাওয়া গেল; এখন দেখা যাক পৃথিবীর বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের বিচারপতিরা কি মনে করেন –
“…… I think anybody can criticize the Supreme Court without any qualms. We do it enough in our dissents. So, I think people should feel perfectly free to criticize what we do. Some people, I think, have an obligation to criticize what we do, given their office – if they think we’ve done something wrong. So I have no problems with that (adverse comments toward my decision).”
বিচারপতি জন রবার্ট, ইউনাইটেড স্টেট সুপ্রিম কোর্ট, মার্চ ৯, ২০১০ এ এক বক্তব্য।
“……truth based on facts should be allowed as a valid defence, if courts are called upon to decide contempt proceedings relating to a speech or an article or an editorial in a newspaper or magazine unless such defence is used as a camouflage to escape the consequences of a deliberate attempt to scandalise the court…….”
বিচারপতি জি.এস. সিংভি এবং বিচারপতি অশোক কুমার, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট, আগস্ট ১৩, ২০১০ এর এক রায়ে।
“……a fair and reasonable criticism of a judgment, which is a public document or a public act of a judge concerned with the administration of justice, would not constitute a contempt of court. In the judges’ opinion, such fair criticism should be encouraged…….”
বিচারপতি জে.এম. পঞ্চাল এবং এ.কে. পাট নায়েক ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে।
প্রতিটি পেশাতেই কিছুনা কিছু অপ্রীতিকর বাস্তবতা এবং নিন্দনীয় কাজ থাকে, যা সাবধানতার সাথে বাহিরের মানুষ হতে গোপন রাখা হয়। নিজ নিজ পেশার গৌরব এবং গুরুত্ব বজায় রাখার জন্য পেশাদারগণ এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন এবং তা মানসে লালন করেন। এটা পেশাদারী দায়িত্বেরই অন্যতম অংশ। আসলে এটা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য – রাষ্ট্রীয় সামাজিক অবস্থা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুচারু ভাবে বজায় রাখার জন্য এটা প্রয়োজন – এই নয় যে গোপন করে ক্ষতিকর অবৈধ কাজ সম্পাদন করা; এর মানে এই যে বাহিরের মানুষের কাছে পেশাগত কাজের ধারা সৌন্দর্য এবং কার্যকারিতার সাথে প্রকাশ।
বিচারবিভাগ তথা উচ্চতর এবং নিম্ন আদালত রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মতই একটি অতি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান – যার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটেনা। বিচারবিভাগের উপর আস্থাহীনতা অর্থ রাষ্ট্রে নৈরাজ্য। কেউ এটাকে অন্যায়ভাবে আক্রমণ করলে এবং মানহানিকর বিস্বাদগার করলে তাকে আইনের আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। তবে এই বিচার বিভাগে যারা দায়িত্ব পালন করেন তারা যদি কোন-ভুল ত্রুটি করেন তার সমালোচনা করা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। অবমাননার ক্ষমতা ব্যবহার পূর্বক, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা মৌলিক মানবাধিকারকে দমন করার নিরিখে তা অস্বীকার করলে রাষ্ট্রের কর্মচারী রূপে থাকার অধিকার কারো নেই – এটা শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ কিংবা বিচার বিভাগ যেটাই হোউক।