Showing posts with label freedom of speech. Show all posts
Showing posts with label freedom of speech. Show all posts

Tuesday, 6 July 2010

ব্লাসফেমি আইন বনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার খুব সম্ভব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে এ নাগরিক অধিকার হুমকির মুখোমুখী। হেফাজতে ইসলাম কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছে, সরকার মুক্তমত প্রকাশের পক্ষে না থেকে একটি হীন আপোষের নীতি গ্রহণ করেছে, ফলে মিডিয়া সাধারণের তথ্যঅধিকার প্রদানে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন এমন তরুণ ব্লগারদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে; ধ্বংসের আশঙ্কার মুখে পড়েছে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতও।
বাকস্বাধীনতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? উনিশ শতকের ব্রিটেনের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী ‘ফিলোসফার অব ফ্রিডম’ জন স্টুয়ার্ট মিলের কাছে বিশ্বের প্রায় সব জাতিকেই কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকতে হবে, তাঁর ভাষায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সত্যান্বেষণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে।
প্রথমত, কোনো মানুষই ত্রুটিমুক্ত নয়। হেফাজতে ইসলামও নয়, সরকারও নয়, আমিও নই। কেউ পরম সত্যের সন্ধান পাওয়ার দাবি করতে পারে না। বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠী প্রায়ই এমনতর দাবি করে থাকে, অবশ্যই এটি একটি সমস্যা, এ দাবিটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথম যুগের ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষকদের লেখার মনগড়া ও চরম অবাস্তব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু আমরা জানি যে কথাগুলো আমরা এখন প্রকাশ হতে দিচ্ছি না- হয়তো সেগুলোর মধ্যেই সত্য লুকানো রয়েছে!
দ্বিতীয়ত, মিলের মতে, যদিও-বা অপ্রকাশিত বক্তব্য ভুল হয়ে থাকে- ‘বক্তব্যগুলো সাধারণত সত্যের কোনো না কোনো অংশ ধারণ করে এবং প্রচলিত ও জনপ্রিয় ধারণাগুলো প্রায়ই আংশিক সত্য, তাই প্রচলিত ধারণার বিরোধী বিভিন্ন মতামতের প্রকাশের মধ্য দিয়েই সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।’
তাছাড়া, সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণাগুলোরও সংরক্ষণ ও প্রকাশ প্রয়োজন- কারণ সত্য শুধুমাত্র সন্দেহ, প্রশ্ন ও বিরোধী মতবাদের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে। এ লড়াই থেমে গেলে সত্য পরিণত হয় রক্ষণশীল সামাজিক শৃংখলে।
মানুষের জীবনে সত্যের সন্ধান ও বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবজন্মের সার্থকতা নিজের পছন্দমতো জীবনযাপনের মধ্যে; অন্যের নির্ধারণ করে দেওয়া গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নয়। জীবনের সার্থকতা পেতে হলে মানুষকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সুযোগ পেতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন মতামত এবং দর্শনের মুক্তপ্রকাশের নিশ্চয়তা। এ কারণেই মানুষ সবসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়। এ স্বাধীনতায় যে কোনো হস্তক্ষেপ এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে এবং মানবজীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্র ও মানবীয় গুণাবলীর বিকাশের জন্যও খুবই জরুরি। বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হতে হবে যে দেশে সব ধরনের মতবাদ প্রকাশিত হতে পারবে, হতে পারবে প্রশ্নবিদ্ধ। মতামত যারই হোক না কেন, সেটিকে আমলে নিতে হবে এবং প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলোকে বিরোধী মতবাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে। তবেই কেবলমাত্র রাজনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতি সম্ভব।
মানবজাতি গত হাজার বছরে অনেকটুকু পথ হেঁটেছে। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি পরিবর্তন, প্রতিটি যুগান্তকারী দর্শন এবং মতবাদ হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচিত। এসব মতবাদের জনক যারা তারা হয়েছেন নির্যাতিত। গ্যালিলিওর সঙ্গে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কীরকম আচরণ করেছিল সেটা সবারই জানা আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ স্বৈরাচারের লক্ষণ; এর স্থান সৌদি আরব কিংবা উত্তর কোরিয়ায়, স্বাধীন বাংলাদেশে নয়। গণতন্ত্রে প্রতিটি মতামতকে প্রকাশিত হতে দিতে হবে; প্রতিটি মতামত নিয়ে মুক্তমনে বিতর্ক হতে হবে। কাউকে কথা বলতে দিলে এবং কাউকে না দিলে সেটা এক ধরনের নাগরিক বৈষম্য।
বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। Universal Declaration of Human Rights এর আর্টিকেল ১৯ অনুযায়ী, “[e]veryone has the right to freedom of opinion and expression; this right includes freedom to hold opinions without interference and to seek, receive and impart information and ideas through any media and regardless of frontiers.” অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষের মতামত ও অনুভূতি প্রকাশের অধিকার রয়েছে; এ অধিকারের মধ্যে রয়েছে বিনাবাধায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কোনো তথ্য ও মতবাদ মাধ্যম এবং রাষ্ট্রনির্বিশেষে আদানপ্রদানের অধিকার।
তাই কেউ যদি বাকস্বাধীনতা রহিত করতে চান, কোনো বিশেষ ধরনের বক্তব্যের গলা চেপে ধরতে চান তাহলে তাদের এর পক্ষে খুব জোরালো যুক্তি প্রদান করতে হবে। কিন্তু তারা তা করেন না।
দেখা যাক ব্লাসফেমি কী। ব্লাসফেমি হল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পবিত্র মনে করে এমন কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ে ব্যঙ্গ, অপমান বা সে সম্পর্কে বাজে কথা বলা। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গীতে আল্লাহকে অপমান করা আল্লাহর অধিকারের বরখেলাপ। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য আল্লাহকে অপমান না করা। কিন্তু সেটা অবিশ্বাসী বা নাস্তিকদের (নাস্তিক কিন্তু কোনো গালি নয়!) জন্য প্রযোজ্য নয়। আর তাই একটি সেকুলার রাষ্ট্রে ধর্মীয় চেতনা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই।
নাগরিকদের ধর্মপালনে বাধ্য করা কিংবা নাগরিকদের উপর কোনো বিশেষ একটা ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। এখানে কেউ বলতে পারেন যে, ব্লাসফেমি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন ধার্মিক ব্যক্তিদের স্বার্থে। কারণ ব্লাসফেমি তাদের অনুভূতিকে আহত করে। এটা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি বটে। কাউকে মানসিকভাবে আহত করা অবশ্যই অনুচিত। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব যদি হয় কারও শারীরিক নিরাপত্তা দেওয়া, তাহলে রাষ্ট্র কেন তার নাগরিকদের ‘মানসিক’ নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে না? তাহলে রাষ্ট্র কেন আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক বক্তব্যপ্রদান নিষিদ্ধ করতে পারবে না?
কারণ প্রথমত সব ধরনের বক্তব্যই কারও না কারও অনুভূতিকে আহত করে। উদাহরণস্বরূপ, হেফাজতে ইসলামের একটি দাবি হল নারীদের সমঅধিকারের আইন বাতিল করতে হবে। এ দাবি অবশ্যই নারীর সমঅধিকারে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে আহত করবে। ঠিক একইভাবে, তারা দাবি করে যে, আহমদিয়া গোষ্ঠীকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে যেটি আহমদিয়া তরিকার অনুসারীদের জন্য অপমানজনক। গীর্জায় খ্রিষ্টান ধর্মযাজকের সারমন মুসলমানের অনুভূতি আহত করতে পারে, কমিউনিস্টের বক্তব্য পুঁজিবাদীদের আহত করতে পারে, কেউ কেউ সমকামীদের নিয়ে লেখা পড়ে আহত হতে পারেন, কেউ কেউ আবার আমার অবাঙালি হয়ে একজন বাঙালি নারীকে বিয়ে করায় তাদের অনুভূতিতে আঘাত বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, যদিও এসব কারও না কারও জন্য অস্বস্তিকর, এগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য।
এছাড়াও কোনো এক শ্রেণির বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাটা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ মানুষ খুব সহজেই নিজেদের এসব বক্তব্য শোনা বা পড়া থেকে দূরে রাখতে পারে। বাকস্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা রক্ষা করা জরুরি। এর পরিবর্তে আপনার অপছন্দনীয় বক্তব্যগুলো শোনা বা পড়া থেকে বিরত থাকা অনেক সহজ। কারও কথা শুনতে ভালো না লাগলে দূরে সরে যান। কারও ব্লগ পড়তে ভালো না লাগলে সেটা ক্লিক করে বন্ধ করে দিন।
কোরান শরীফও একই কথা বলে: “যখন তারা [মুসলমানরা] খারাপ কথা শোনে, তারা সেখান থেকে সরে যায় এবং বলে, ‘আমার জন্য আমার কর্ম এবং তোমার জন্য তোমার কর্ম। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক; আমরা সত্যবিমুখদের সংসর্গে আসতে চাই না’।”২৮:৫৫
হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য কিছু ইসলামিক দলের ধর্মীয় অনুভূতি যদি এতই ঠুনকো হয়ে থাকে তাহলে তারা ওসব ব্লগ পড়ে কেন? যদি তারা চায় যে, কারও ধর্মীয় অনুভূতি আহত না হোক তাহলে তারা সেসব ব্লগের লেখা অন্যদের ডেকে এনে দেখায় কেন? সেসব লেখা কপি করে পত্রিকায় বা লিফলেটে ছাপায় কেন? এ যেন দৌড়ে এসে কারও সঙ্গে ইচ্ছে করে ধাক্কা খাওয়া এবং তারপর তাকে আক্রমণকারী আখ্যা দিয়ে তার শাস্তি চাওয়া! তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ব্লাসফেমি সর্বপ্রকারে বন্ধ করা একেবারেই অসম্ভব। এর চেষ্টা করতে যাওয়াও খুবই সময়সাপেক্ষ ও জটিল। তার চেয়ে এসব বক্তব্য শোনা থেকে বিরত থাকা খুব সহজ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে অধিকাংশ লোক মুসলমান, এখানে কেউ প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য এমনিতেই দিতে পারে না।
অনেকে বলেন, ব্লাসফেমির মূল সমস্যা হল এর ফলে গোলযোগ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আসলেই কি তাই? ‘ইনোসেন্স অফ মুসলিমস’-এর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? নিম্নমানের ১৪ মিনিটের ভিডিওক্লিপটি জুলাই মাসে ইউটিউবে আপলোড করা হয়। কিন্তু এর পরবর্তী দু’মাস কিছুই ঘটেনি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ব্লাসফেমি সরাসরি কোনো নৃশংসতা ছড়ায় না। এটা ছড়ায় সেসব মানুষের মাধ্যমে যারা নৃশংসতা ছড়াতে চায়। এটা ছড়ায় সেসব মানুষের মাধ্যমে যারা ব্লাসফেমাস বিষয়গুলো অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। লক্ষ্য করুন, একটি মিশরীয় টেলিভিশনে খালিদ আবদাল্লাহ নামক একজন ব্যক্তি এ প্রসঙ্গে কথা বলার পরই মূলত বিভিন্ন দেশে নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রমন য়। বহুবছর ধরে মানুষ ব্লগের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত ছিল না। এতদিন পর্যন্ত এসব ব্লগ কাউকে আঘাত করেনি কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও সৃষ্টি করেনি। তাই ধর্ম-অবমাননা সমস্যা নয়, সমস্যা হল সেসব রাজনৈতিক সংগঠন যারা অসহিষ্ণু এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নৃশংসতা ছড়ানোর জন্য এসব ব্লগ ব্যবহার করছে। তারা জোরপূর্বক বাংলাদেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
তাছাড়া এর কী নিশ্চয়তা আছে যে, আইন করলেই নৃশংসতা কমে যাবে? পাকিস্তানে তো ব্লাসফেমি আইন রয়েছে। এতে কি ওরা আমাদের চেয়ে ভালো আছে? এর চেয়ে আসুন-সবাইকে আমরা এটা বোঝানোর চেষ্টা করি সংঘর্ষ, নৃশংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কাউকে কথা বলতে না দেওয়া পরমতসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ নয় এবং এর ফলে সমাজে অসহিষ্ণুতা ও অসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আসলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
ব্লাসফেমি আইন সত্যের সন্ধান ব্যাহত করে, এটা মানুষের জন্য খারাপ, মানবসভ্যতার বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। এটা অগণতান্ত্রিক, বাকস্বাধীনতা খর্ব করে। ইতিহাস বলে, এধরনের আইন সবসময়ই সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য ব্যবহার করা হয়। আবারও আমরা এর উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের দিকে তাকাতে পারি।
এর ফলে কখনও সমাজে সহিষ্ণুতা ও শান্তিরক্ষা হয় না। এর দ্বারা ধার্মিকদের ধর্মানুভূতি রক্ষাও অসম্ভব।

Monday, 2 November 2009

ধর্মান্ধতা ও বাঙ্গালী মুসলমান মনস্তত্ত্ব

বাংলাদেশে মুসলমানরা জন্মের পর থেকেই ধর্মান্ধতা আয়ত্ব করতে শেখে। কেউ যদি বলে বাংলাদেশের বেশীরভাগ মুসলমান উদার মুসলিম সামাজিক সাংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে সে কথার সাথে আমি মোটেও একমত পোষন করবো না। এদেশের মুসলমানরা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি কতটা অসহিষ্ণু তা আমি আমার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার দেখেছি আর বড় হয়ে একে নিকৃষ্ট বর্ণবাদী ধর্মান্ধ এক সমাজ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারিনি। অন্তত আমি ছেলেবেলা যে সমাজে বেড়ে উঠেছি সেখানকার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এমন ধারনাই পোষন করি। বর্ণবাদী সমাজ একারনেই বললাম যে বর্ণবাদ যেমন নিজ বর্ণ বা জাত ছাড়া অন্য কাউকে পূর্নাঙ্গ মানুষ বলে মনে না করে কেবল ঘৃনা পোষন করে, এদেশের মুসলমানদের বড় একটা অংশই অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি ঘৃনা পোষন করে।
আমি ছেলেবেলাতেই দেখেছি এই মুসলমান সমাজ কিভাবে ভীন্ন ধর্মাবলম্বীকে জোর-জবস্তি করে মুসলমান বানাতে চায়। এসমাজ প্রকাশ্যে অমুসলিমদের বিষদগার করে। যেকোন স্থানেই তারা ভীন্ন ধর্মাবলম্বীদের মালাউন বলে গালমন্দ করতে দ্বিধাবোধ করে না। এমনকি সেখানে ভীন্ন ধর্মাবলম্বী কোন মানুষ আছে বুঝতে পারার পরও এই মুসলমানরা লজ্জিত হয় না, বরং ভীন্ন ধর্মাবলম্বীরা বিপথে আছে বলে তাকে ধর্মন্তরিত হবার পারমর্শ দেয়, আর তারা নিজ ধর্মকে সমর্থনমূলক কথা বললে তাদের পেতে হয় ভৎসনা। মুসলমান ভীন্ন অন্য সবার ধর্মকেই এখানে অবমাননা করা হয়। এখানে ভীন্ন ধর্মাবলম্বী সবাই হিন্দু হিসেবে পরিগনিত হয়। একজন বৌদ্ধ, খ্রিষ্ট্রান বা আদিবাসী হলেও সাধারন সমাজ মনস্বত্ত্ব হল ‘সে হিন্দুই’। এমনকি একজন নাস্তিকও ওই সমাজে হিন্দু হিসেবেই পরিগনিত। মানুষ কতটা গন্ড মূর্খ এমনটা ভাবতে পারে তা বলাই বাহুল্য!
যাহোক, এসব আমি জেনেছি আমার জীবন থেকে, মানে দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে জেনেছি। এখানে হিন্দু ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ শৈশবের প্রারম্ভ থেকে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত। হিন্দু বিদ্বেষ এ দেশের মুসলিম সমাজে একজন শিশু তার সামাজিকিকরন প্রকৃয়ার মধ্য থেকেই শেখে। আমি শৈশবে আমার খেলার সাথীদের কাছ থেকে শিখেছিলাম লাল রংয়ের পিপড়াঁ হিন্দু তাই কামড় দেয় এবং এর কামড়ে বিষ থাকে! আমি আমার পারিপার্শ্বিকতা থেকে শিখেছিলাম হিন্দুরা মারা গেলে ভুত হয় কেননা হিন্দুরা খারাপ মানুষ! আমার সব সহপাঠিই মনে করত ভুতেরা হিন্দু! সে সমাজে শিশুদের শেখানো হয়েছিল কবরস্থান পবিত্র জায়গা আর শ্বশান অপবিত্র জায়গা, তাই শ্বশানে ভুতের আঁখড়া! তাই শশ্বানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় সুরা পড়তে পড়তে যেতে হত সবাইকে পাছে যদি আবার ভুতে ধরে! আমার ছেলে বেলায় মক্তবে গিয়ে শিখেছিলাম মুসলমান মারা গেলে সাথে সাথে বলতে হবে ‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন’ (মৃত ব্যক্তি জান্নাতবাসী হোক) কিন্তু হিন্দু মরলে বলতে হবে ‘ফী নারি জাহান্নাম খালিদীনা ফীহা’ (মৃত ব্যাক্তি চিরকাল জাহান্নামের আগুনে পুড়ুক)! আমার কৈশোরে যখন যৌনতার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছিলাম তখন আমার এক সহপাঠির কাছ থেকে শুনেছিলাম যে কুমারী হিন্দু নারীর সাথে যৌন ক্রিয়া করলে নাকি বাতের ব্যাথা ভাল হয়ে যায়!
এ মুসলমান সমাজে একটি শিশু এসব শুনতে শুনতেই হিন্দুদের শত্রু হিসেবে নিজের অজান্তে দাঁড় করায়। ফলে এমন মনস্বত্ত্ব তৈরী হয় যে বড় হয়ে এসব মুসলমানের কাছে হিন্দু নারী ধর্ষন, মন্দিরের প্রতিমা ভাংচুর, ধর্মন্তারকরন এক একটা একটা পূন্য কাজ বলে মনে হয়। আমার ছেলেবেলায় দেখছি ভারত পাকিস্থানের ম্যাচে ভারত জিতুক বা হারুক যাই হোক আমার হিন্দু বন্ধুদের বাড়ীর চালে ডিল পড়েছে। খুব ছোট থেকেই দেখেছি মানুষ অনায়াসে হিন্দুদের ডান্ডি, ডেডা ইত্যাদি নামে ডাকছে। আমার এক বন্ধুর নাম ছিল সঞ্জিব, ওকে আমিসহ আমার বন্ধুরা অবলিলায় বলে দিতাম ‘কিরে হিন্দু তুই কালকে কই ছিলি’ এ জাতিয় কথা । মাঝে মাঝে ডান্ডিও বলতাম সামনা সামনি। সেও এধরনের সম্বোধন শুনে অভ্যস্ত ছিল। পরে বুঝেছি কিভাবে এই ধরনের সম্বোধন একজন মানুষের মাঝে ভয়ংকর ভাবে আদারনেস তৈরী করে।
আমি যখন খুব ছোট তখন আমাদের পাশের হিন্দু পাড়ার দিলিপ একদিন মুসলমান হল। সে বয়সে ঘটনার সারমর্ম যা বুঝেছিলাম আর যতটুকু মনে আছে সে অনুসারে বলা যায় দিলিপ অভাবের তাড়নায় এক রেলওয়ে কর্মকর্তা দেয়া চাকরির প্রলোভনে মুসলমান হয়েছিল। দিলিপের নতুন নাম হয়েছিল রুস্তম। পাড়ায় রুস্তমকে নিয়ে একটা উৎসব আমেজ তৈরী হল। রুস্তমকে সবাই দাওয়াত করে খাওয়ায়। অল্পদিনেই রুস্তম বেশ মোটাতাজা হয়ে উঠল কিন্তু শুকিয়ে গেল রুস্তমের দুই মেয়ে আর বউ, ওরা মুসলমান না হওয়ায় মুসলমানরা ওদের ডেকে খাওয়ায় না আর অন্যদিকে নিন্মবর্ণের হিন্দু প্রতিবেশীরাও রুস্তমের পরিবারের বোঝা বইতে পারে না। একদিন দেখি পাড়ায় রুস্তমের সালিশ বসেছে কেননা তাকে হিন্দু পাড়ায় তার ঘরে বউ-বাচ্চা সাথে সাথে রাত কাটাতে দেখা গেছে। সালিশে কি বিচার হয়েছিল মনে নাই। তবে মনে আছে, রুস্তমের পরিবারের উপর নেমে এসেছিল এক সংকট। একদিকে পরিবার মুসলমান না হওয়ায় রুস্তম পরিবারের কাছে যেতে পারে না। অন্যদিকে পরিবারের নেই কোন খোরাকি। এভাবে একদিন রুস্তমের বউ দুই মেয়েকে নিয়ে মুসলমান হতে হল। তাদের জন্য পাড়ায় নতুন খুপড়ি ঘর বানান হল। একদিন রুস্তমের চাকরিও হল। কিন্তু আবার বিপত্তি দেখা দিল কেননা রুস্তমের বউকে নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেল সে লুকিয়ে মন্দিরে যায়। এরপর আরো অনেক সালিশই হতে দেখেছি রুস্তমের বউয়ের মন্দিরে যাওয়া নিয়ে। কি বিচার হয়েছিল তাও ভুলে গেছি। অনেক ছোট ছিলাম সবকিছু মনে নেই ঠিকঠাক। তবে সমাজটা যে নিষ্ঠুর ছিল এটা বুঝেছিলাম। তাই ভুলে যেতে পারিনি এঘটনা কোনদিনই। বড় হয়ে বুঝেছিলাম এটা ছিল একটি জোর-জবস্তির ধর্মান্তরকরন। এরকম আরো হাজার হাজার ঘটনা আজো ঘটে চলেছে এদেশের আনাচ কানাচে।
আমার ছোটবেলার সেই পাড়া থেকে বেড়িয়ে এসে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম। এখানে এসে দেখলাম ভীন্ন ধর্মাবলম্বীদের আদারনেস প্রব্লেম আরো বড়। তাদের জন্য একেবারে আলাদা হলই। ৮৪ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি, নাম, যশ বেশ বেড়েছে কিন্তু ধর্মকেন্দ্রীক পৃথকীকরন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বের হতে পারেনি। তাই আজো অমুসলিম ছাত্রদের জন্য আলাদা আবাসন ব্যবস্থা এদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে। কয়েকদিন আগে শুনলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ নতুন একটি হল সব শিক্ষার্থীর উম্মুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে মুসলমান শিক্ষার্থীরা। যেদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ধর্মন্ধতা অস্তিত্বশীল সেদেশে সাধারন মানুষের মনস্তত্ত্ব কেমন তা সহজেই অনমেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে এসেছি বছর দশেক চলছে এখনও আশপাশ থেকে কানে ভেসে আসে ‘মালউনের বাচ্চাদের একপা ভারতে’ এজাতিয় কথা। এইতো সেদিন অফিসের এক প্রকল্প পরিচালক সম্পর্কে এক কলিগ অভিযোগ করল তিনি নাকি বলেছেন, তার প্রজেক্টে কোন মালাউন রাখা হবে না। সেদিন বাংলাদেশ-ভারতের খেলায় লিটন দাস ভাল পারফর্মেন্স না দেখানোয় পরিচিত একজন মন্তব্য করে বসল, নামের শেষে দাস আছে সে জন্যই দলে চান্স পেয়েছে। সেদিন তো একজন তর্কই জুড়ে দিল বাংলাদেশ নাকি ইসলামিক দেশ। তাকে কোনভাবে বোঝানো গেল না এদেশে প্রায় ১৫ ভাগ অন্য ধর্মের মানুষ বাস করে। বোঝানো যাবেই বা কিভাবে? সংবিধানে একদিকে লেখা আছে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম আর অন্যদিকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। আর এ কারনেই পাশ থেকে একজন টিপ্পনি কেটে উঠল, ভাই কি ধর্ম নিরপেক্ষ নাকি?