Monday, 30 March 2026

বিএনপির অবস্থান গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধীরা ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য ‘আইনি মতামত’ ভাবা ভুল। বরং এটাই বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান, যার লক্ষ্য একটাই: গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার বা সীমাবদ্ধ করা এবং পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। বিএনপি এই অবস্থান নিয়েছে কেন? কারণ যদি স্বীকার করা হয় যে জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে, তাহলে বিদ্যমান সংবিধান বা হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙে যায়। তখন সংসদ আর একমাত্র ক্ষমতার উৎস থাকে না; জনগণ নিজেই হয়ে ওঠে ক্ষমতার উৎস। আর ঠিক এই জায়গাটাই বিএনপি অস্বীকার করতে চাইছে। তাই আইনমন্ত্রী বলছেন, সংস্কার হবে, কিন্তু সংবিধানের ভেতরেই হবে; সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না। এটা কি যুক্তিসঙ্গত? না। এই যুক্তির ভেতরেই ফাঁকি আছে। কারণ গণঅভ্যুত্থান মানেই হলো সংবিধানের সীমা অতিক্রম করা। যদি সংবিধানই সবকিছুর শেষ কথা হয়, তাহলে জনগণ কেন রাস্তায় নামে? কেন জীবন দিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবি তোলে? বাস্তবতা হলো—গণঅভ্যুত্থান সেই মুহূর্ত, যখন জনগণ বলে: “এই সংবিধান আর আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা এই সংবিধান চাই না, আমরা নতুন গঠনতন্ত্র চাই। নতুন ভাবে বাংলাদেশ গড়তে চাই। তার মানে বিএনপি গণঅভিপ্রায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থানকেই আমি বিএনপির জন্য আত্মঘাতী মনে করি। অথচ সেকুলার ইসলাম বিদ্বেষী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির পতনের পর ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির মোকাবিলার মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত এবং যুদ্ধাক্রান্ত টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট জাতীয় সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু বিএনপির ভুল রাজনীতির জন্য তাকে আবার আওয়ামী লীগের মতো চরম মূল্য দিতে হতে পারে। বিএনপির এই অবস্থান বিএনপির অনুকুল নয়। আইনমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক অর্থ ও গাঠনিক তাৎপর্য অস্বীকার করেন। তিনি ঘটনাকে মানেন, কিন্তু তার পরিণতি মানেন না। অর্থাৎ তিনি বলতে চান—জনগণ আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা তাদের নাই; সেই ক্ষমতা থাকবে সংবিধান ও সংসদের হাতেই। এই যুক্তি পুরানা কৌশল—জনগণের শক্তিকে স্বীকার করে তাকে আবার আইনের ভেতরে বন্দি করা। এটাকে সরল ভাষায় বলা যায়: “সংবিধান দিয়ে গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ বা নিদেন পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা।” বিএনপি আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে জনগণ যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায়, তাহলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সেই হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার ব্যবস্থার ভেতরেই ফিরে যেতে হবে। আওয়ামী লীগের স্থান নিয়েছে বিএনপি। এখন যা বোঝার সেটা জনগণকেই বুঝতে ও করতে হবে। এখানে বিরোধীরা যে কথা বলছে, সেটি ভিন্ন। তারা বলছে—যদি গণঅভ্যুত্থান সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে জনগণের নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে। সেই অধিকার থেকে যদি কোনো “সংস্কার পরিষদ” বা “গণপরিষদ” তৈরি হয়, তাহলে সেটি সংবিধানের অধীন হবে না; বরং সংবিধানই তার অধীন হবে। বিরোধীরা সংস্কারবাদী হতে পারে, কিন্তু নিদেন পক্ষে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষেই অবস্থান নেবার চেষ্টা করছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট: আইনমন্ত্রী বলছেন সংবিধান আগে, জনগণ পরে; বিরোধীরা বলছে জনগণ আগে, সংবিধান পরে। যদি ধরে নেওয়া হয় বর্তমান সংবিধানই চূড়ান্ত, তাহলে তার কথা আইনের বই অনুযায়ী ঠিক। কিন্তু সমস্যাটা এখানেই—তাঁর পুরা যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি অঘোষিত ধারণার ওপর, সেটা হলো: সংবিধান এখনো অক্ষত এবং বৈধ। কিন্তু যদি বাস্তবতা এই হয় যে গণঅভ্যুত্থান সেই বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তাহলে এই যুক্তি টেঁকে না, ভেঙে পড়ে। তখন আর “সংবিধানের ভেতরে থাকো” বলা যায় না। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—সংবিধান থাকবে কি থাকবে না, সেটি ঠিক করার ক্ষমতাই জনগণের। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আসলে একটা জিনিস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন—রাষ্ট্রের শেষ কথা সংবিধান, জনগণ না। বিএনপি বলছে, জনগণ প্রতিবাদ করতে পারে, আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র নতুন করে গঠন করার ক্ষমতা জনগণের নাই। সেই ক্ষমতা কেবল সংবিধান-স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার। এটা কি ঠিক? অথচ সংবিধান নিজে কোনো আসমানি কিতাব না—এটি একটি রাজনৈতিক দলিল, যা কোনো এক সময়ে কোনো ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। যদি সেই ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে যায়, যদি জনগণ সেই কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেই সংবিধানের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তখন সংবিধানকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে সবকিছু বিচার করা মানে হলো বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করা। আইনমন্ত্রী বাস্তবতাকে নয়, কাগজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি বলছেন—সংবিধানে যা নেই, তা বৈধ না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে সংবিধান জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার ভেতরে থেকে বৈধতা খোঁজা অন্ধকারে ইঁদুর তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টার অধিক কিছু না। বলা হচ্ছে—যারা নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছে, তারা ভুল বুঝছে; সঠিক বোঝাপড়া হলো সংবিধানের ভেতরে থেকেই পরিবর্তন করা। কিন্তু এই “সঠিক বোঝাপড়া” আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? জনগণের, নাকি আওয়ামী লিগ বা সেকুলার ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির? বিএনপিই কি তাহলে আওয়ামী লীগ? বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে বন্ধ করে দিচ্ছে। দেওয়া —জনগণের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা। যদি বলা হয় “সংবিধানের বাইরে কিছুই বৈধ না”, তাহলে জনগণ কোনো গণপরিষদ গঠন করতে পারবে না, কোনো নতুন গঠনতন্ত্রের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে না। সবকিছুই আবার ফিরে যাবে সংসদ, সরকার, এবং পুরোনো ক্ষমতার কেন্দ্রে। দিল্লীতে বসে শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই অট্টহাসি দিচ্ছেন। ইতিহাসও প্রহসনের রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের যে দরজা জনগণ খুলেছিল——সেটি আবার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি আমাদের তিনটি বার্তা দিচ্ছে। এক. গণঅভ্যুত্থানকে একটি অতি সীমিত ঘটনা, শেখ হাসিনা সরকারের পতনেই তার শেষ এবং ওখানেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আটকে রাখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতা থেকে একজন ব্যক্তির অপসারণ, আর কোন পরিবর্তন না। দুই. জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা বিএনপি অস্বীকার করে, অর্থাৎ জনগণ ভোটার হতে পারবে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে কিম্বা রাষ্ট্রের সংস্কারে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেটা থাকবে জাতীয় সংসদের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং জাতীয় সংসদের ক্ষমতা ৭০ অনুচ্ছেদের বলে একনায়কতান্ত্রিক ভাবে কেন্দ্রীভূত থাকবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিন. কিন্তু ঘটনা হিশাবে বিএনপি গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে না, কারন তা না হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারতো না। এই কারণেই “ভ্রান্ত ব্যাখ্যা”র অভিযোগ আসলে উলটা পড়া দরকার। প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভ্রান্ত ব্যাখ্যা কে দিচ্ছে? যারা বলছে জনগণের ক্ষমতা আছে রাষ্ট্র নতুন করে গঠনের, নাকি যারা বলছে জনগণ শুধু ভোটার। তারা ভোট দেবে, আর কিছু না। ক্ষমতার সবকিছু সংবিধানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ? এখানেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের আসল জায়গা। এটি কোনো টেকনিক্যাল আইনি বিতর্ক না—এটি ক্ষমতার উৎস নিয়ে দ্বন্দ্ব। ক্ষমতার উৎস কি সংবিধান, নাকি জনগণ? আইনমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবিধানকেই সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। বিরোধীরা জনগণকে উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, কিন্তু বিরোধীরাও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাই গণতন্ত্রের সারকথা সেটা স্বীকার করে না। এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত “সংস্কার পরিষদ” নিয়ে বিতর্ক থামবে না। আসল প্রশ্ন পরিষদ কীভাবে গঠিত হবে সেটা না—আসল প্রশ্ন হলো, কার অধীনে গঠিত হবে। সংবিধানের অধীনে, নাকি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে? এখানেই বিএনপির অবস্থান মোটেও আইনী নয় আর, বরং একদমই স্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক, তাঁরা পরিবর্তন চান, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চান না। তাঁরা সংস্কারের কথা বলেন, কিন্তু গঠনের কথা এড়িয়ে যান। তাঁরা গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করেন, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ব্যক্ত জনগণের ক্ষমতার আইনী ও রাজনৈতিক বৈধতা স্বীকার করতে রাজি না। সংসদে বিএনপি উপদেষ্টা সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল , সংশোধন বা শর্তাধীন যেভাবে করবে তা বিএনপির রাজনীতি থেকেই আন্দাজ করা যায়। সে বিষয়ে আমরা আসছি, পরে।

Friday, 27 March 2026

বিএনপি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন এত ঝুঁকি নিতে চায়ছে?

আসলে বিএনপি গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন এত ঝুঁকি নিতে চায়ছে? সম্ভাব্য কারণ হতে পারে গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া বিএনপির একার সিদ্ধান্ত নয়।দিল্লির প্রেসক্রিপশন।বিএনপি এই প্রেসক্রিপশন মেনে চলতে গিয়ে হয় দানব হয়ে উঠবে অথবা খুব দ্রুত নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করবে। যদি গণভোট বাতিলের পক্ষে বিএনপি রায় পেয়ে যায় তবে দানবীয় রুপে বিএনপিকে দেখা যাবে।আবার একটি আওয়ামী স্বৈরশাসন ফিরে আসবে।সেই আয়নাঘর,গু ম সব কিছু। অপরদিকে ১১ দলীয় জোট যদি বিএনপির এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়,রাজপথে নেমে আসে তাহলে বিএনপির পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেন? বিএনপির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে।সেনা হস্তক্ষেপ জায়েজ করার জন্য আওয়ামী লীগ জ্বালাও পোড়াও হ ত্যা শুরু করবে এবং পিছনের দরজা দিয়ে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। এই একটি মাত্র কারণে নির্বাচন জালিয়াতির প্রমাণ থাকার পরও জামায়াত ইসলামী আন্দোলনে যায়নি। এখন কি করবে ১১ দলীয় জোট? গণভোট অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার লিখিত প্রস্তাব করেছে বিএনপি, তৃতীয় শক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ভয়ে জামায়াত কি চুপচাপ তা মেনে নেবে, নাকি রাজপথে ফয়সালা করবে? জামায়াত যে আশঙ্কায় নির্বাচন জালিয়াতি মেনে নিয়ে নীরব থেকেছে বিএনপি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আবার ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে।

Tuesday, 24 March 2026

স্বপ্নের রাষ্ট্র 'পাকিস্তান'

তেইশে মার্চ ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব দিবস। পাকিস্তানীরা এ দিনটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস বা পাকিস্তান ডে হিসেবে পালন করে। পাকিস্তান আমলে আমরাও করতাম। এখন আর করিনা। করলেও দোষ ছিলনা। কেননা এই অভিন্ন ইতিহাস ও সংগ্রামের অংশীদার ছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরাও। ইতিহাসের কোনো ভূমিকা বা গৌরব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ইতিহাসকে খণ্ডিত করার ফল ভালো হয় না। আমরা কোনো দিবস পালন না করলেও এর তাৎপর্য নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাটা অন্তত থাকা উচিৎ। সব দেশেই সেটা হয়। রাজনীতিবিদেরা এড়িয়ে গেলেও একাডেমিশিয়ান, ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকেরা সেটা করেন। আমাদের দেশে সেটাও হয় না। আমরা হাজার বছরের চিরায়ত ইতিহাসের ভুয়া আওয়াজ দিয়ে আমাদের ভুল-ভাল ও মতলবি ইতিহাসের শুরুই করি বিংশ শতাব্দির পঞ্চাশের দশক থেকে। লাহোর প্রস্তাব নিয়ে অনেকের অনেক রকম বিশ্লেষণ রয়েছে। বিশদ পর্যালোচনায় না গিয়ে এ সম্পর্কে আমি একটু তির্যক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমার নিজের সামান্য কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। 🔴 ইতিহাসের অনেক ব্যাখ্যাহীন বাস্তবতা থাকে। 'লাহোর প্রস্তাব' হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক রেজুলিউশানটির মুসাবিদা রচনা করেছিলেন মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ্ খান। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমির প্রস্তাবের খসড়া রচনাকারী জাফরুল্লাহ্ খান শিয়ালকোটের এক কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সন্তান ছিলেন। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির বিরোধিতাকারী ধর্মতাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী পরবর্তীকালে পাকিস্তানে এসে বসত গড়েন এবং কাদিয়ানি-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। সেই আহমদিয়াদেরকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার পাকিস্তানে অমুসলিম ঘোষণা করে। 🔴 ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর কনফারেন্সে আমাদের শেরে বাঙ্গলা এ.কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব পাঠ করেন এবং লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি অর্জন করেন। লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দটির উল্লেখ না থাকলেও পরে এই প্রস্তাব 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও পরিচিতি অর্জন করে। বাঙলাভাষী মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল হক এই প্রস্তাবের উত্থাপক হলেও সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ এ প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা দেয় তার সঙ্গে মুসলিম লীগের বাঙলাভাষী অন্য তিন নেতা দ্বিমত পোষণ করেন। আবুল হাশিম দাবি করেন, লাহোর প্রস্তাব অনুসারে ইন্ডিয়ার পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দু'টি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গড়তে হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবিভাজনের বিরোধিতা করে অখণ্ড বাংলা প্রদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসামকেও পাকিস্তানভূক্ত করার দাবি জানান। 🔴 মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্'কে পাকিস্তানের রূপকার হিসেবে 'কায়েদে আযম' বা মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে তিনি পাকিস্তান নামটির উদ্ভাবক নন। কবি-দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনিই প্রথম ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে প্রদত্ব ভাষণে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তবে পাকিস্তান নামটি তাঁরও দেয়া নয়। ইকবালের স্বপ্নের ভারতীয় মুসলিমদের সেই রাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামো ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের সমন্বয়ে। বেঙ্গলের অন্তর্ভূক্তির কথা তাতে ছিল না। 🔴 ১৯৩৩ সালে কেম্ব্রিজ-এ আইন পড়ুয়া পাঞ্জাবি ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী ভারতীয় মুসলমানদের স্বপ্নের রাষ্ট্রের 'পাকিস্তান' নামটি প্রথম উদ্ভাবন করেন। পাঞ্জাবের P, আফগান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (আফগানিয়া)-এর A, কাশ্মিরের K, সিন্ধু বা Indus region-এর I (আই) এবং বেলুচিস্তানের STAN নিয়ে PAKISTAN রাষ্ট্রের নামকরণ করেছিলেন তিনি। এর ভেতরেও বেঙ্গল ছিল না। চৌধুরী রহমত পূর্বভারতে বাঙলাভাষী মুসলমানদের জন্য 'বাঙ্গিস্তান' নামে এবং দাক্ষিণাত্যের মুসলমানদের জন্য 'ওসমানিস্তান' নামে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাঙ্গিস্তান নামে না হলেও অন্য নামে আমরা সে রাষ্ট্র স্থাপন করি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইন্ডিয়ার সহায়তায় যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে। 🔴 পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল হাজার মাইল দূরের দু'টি অঞ্চল নিয়ে। ইন্ডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশ - পাঞ্জাবের অংশ বিশেষ, সিন্ধু, আফগানিস্তানের পাখতুন এলাকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ বেঙ্গলের পূর্ব অংশের সমন্বয়ে। আমাদের প্রদেশটির নাম ছিল পূর্ব বঙ্গ বা ইস্ট বেঙ্গল। তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে, এই পূর্ব বঙ্গের লোক বলে পরিচিত দু'জন নেতাই কিন্তু এই পূর্ব বঙ্গ নামটাও মুছে দিয়ে এই প্রদেশের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। এরা হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ আলী এক ইউনিট ব্যবস্থা প্রবর্তন করে পশ্চিমের চার প্রদেশকে একত্র করে পশ্চিম পাকিস্তান নামে এক প্রদেশ বানান। আর পূর্ব বঙ্গের নাম দেন পূর্ব পাকিস্তান। মোহাম্মদ আলীর আইন মন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনা করেন এবং তাতে এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দেন। ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন হিসেবে সৃষ্ট পাকিস্তান এই শাসনতন্ত্রের আলোকে রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা অর্জন করে। সোহরাওয়ার্দী রিপাব্লিকের প্রথম প্রধানমমন্ত্রী হন। সোহরাওয়ার্দীকে হটিয়ে ইস্কান্দর মীর্জা এবং তাকে হটিয়ে জেনারেল আইউব ক্ষমতা দখল করেন। আইউব শাসনতন্ত্র স্থগিত করলেও এক ইউনিট ও পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ ঠিক রাখেন এবং মূলতঃ তার হাতেই এই পরিকল্পনা কার্যকারিতা পায়। 🔴 পাকিস্তান শব্দটি উদ্ভাবন ও মুসলিম লীগ গঠনেরও আগে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য আলাদা বাসভূমির ধারণা প্রথম তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে তা বিকশিত হতে থাকে প্রধানত আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে। সেই আলীগড় বা উত্তর প্রদেশ স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমির বাইরে রয়ে যায়। পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ গঠনে শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা এবং বাঙলাভাষী মুসলমানেরা নেতৃস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু কালক্রমে এরা সকলেই পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের কাছে লাঞ্ছিত হতে থাকে। মুসলিম অধ্যুষিত ও মুসলিম শাসিত স্বাধীন বা স্বায়ত্বশাসিত দেশজ রাজ্যগুলো ভারত ছলে-বলে-কলে-কৌশলে দখল করে। ইন্ডিয়ার অন্যান্য প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা অবর্ননীয় দুর্দশার মুখে পড়ে। 🔴 নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আমরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্বেও আমাদের ওপর পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য-নির্যাতন যেমন সত্য ছিল, তেমনই সমান সত্য হচ্ছে, আজকের বাংলাদেশ যদি ১৯৪৭ সালে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান-এর অন্তর্ভুক্ত না হ'তো তা'হলে আমাদের পরিণতিও ইন্ডিয়ার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মতই হোতো। স্বাধীনতার স্বপ্ন আর দেখতে হতো না। 🔴 পাকিস্তানকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে যতই নিন্দা করা হোক না কেন, আসলে ব্রিটিশের ডিভাইড এন্ড রুল অপকৌশল উপমহাদেশে যে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘু দলনের বাস্তবতা তৈরি করেছিল সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানেরা তার ভিক্টিম ছিল এবং এ থেকে রেহাই পেতেই স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। কেবল ধর্মীয় নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারসহ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব বিবেচনাতেই সে সময় পাকিস্তান অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। ইংরেজ শাসক ও উপমহাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল কংগ্রেসের পক্ষে সে বাস্তবতা অস্বীকার বা রোধ করা সম্ভব ছিল না। 🔴 ১৯৭১ সালে আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলকে যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ নামের আলাদা রাষ্ট্র গড়েছি। তবে এই রাষ্ট্রের চরিত্র, কোর ভ্যালুজ বা অন্তর্নিহিত মূল্যবোধসমূহ, জাতীয় ঐক্যসূত্র, রাজনীতি, শাসনপদ্ধতি, প্রতিবেশী সহ বিশ্বের নানান চরিত্রের তাবৎ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, নাগরিক অধিকার, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহের অধিকার-মর্যাদা-নিরাপত্তা সহ কোনো কিছুই আমরা স্থির ও অটল ভাবে সুনির্ধারিত ও সুবিন্যস্ত করতে পারিনি। অনেক বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি বা নিরসন করতে পারিনি আমরা। জাতি ও রাষ্ট্রগঠন এবং এর পরিকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনো অসমাপ্ত ও চলমান। উপসংহারে পৌঁছাবার বাকি পথ এখনো সামনে পড়ে রয়েছে। 🟢 courtesy: Maruf kamal khan

Thursday, 19 March 2026

বিএনপির ২০৩১ সালের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল আয়োজন !

রেড এলার্ট !! ২০৩১ সালের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল আয়োজন এখনই সম্পন্ন করে রাখতেছে বিএনপি! প্রথমে জুলাই সনদ ও গণভোটে জনগণের রায় প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি সরকার। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাই কোয়ালিফাইড ভিসিদের প্রত্যাহার করে দলীয় ভিসি নিয়োগ দিচ্ছে। দ্যান, সিটি কর্পোরেশন ও ৪২ টি জেলা পরিষদে (মেয়র/কাউন্সিলর) নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে দলীয় প্রশাসক নিযুক্ত করেছে বিএনপি। এবার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় একই কায়দায় দলীয় প্রশাসক নিয়োগের পথে হাঁটছে সরকার। প্রশ্ন হচ্ছে তারা চাইলেই তো নির্বাচন প্রভাবিত করে তাদের লোকদের বসাতে পারে। কিন্তু একেবারে কোন নির্বাচনই না দিয়ে এভাবে কোন স্বার্থে নিয়োগ দিতেছে! সেটাই তো? মূলত ১ বছর বা তার কিছু বেশি মেয়াদের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে। এরপর নির্বাচন দিবে এবং নিজেদের লোকদের জিতিয়ে আনবে। কারণ ৫ বছর পর যখন সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, স্থানীয় প্রতিনিধিদের মেয়াদ আরও ১ বছর অবশিষ্ট থাকবে। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসলেও প্রশাসন কে কন্ট্রোল করা কোন ব্যপারই হবে না। আবার চুপ্পুকেও রেখে দিতেছে বিএনপি। ১ বছর পর নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিবে। সে হিসেবে তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতির মেয়াদও অবশিষ্ট থাকবে নির্বাচনে। ফলাফল হচ্ছে, নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসলেও সেটা হবে পুতুল সরকার। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বিএনপি কব্জায় ই থাকবে। সো, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে কোন চ্যালেঞ্জ ই ফেস করতে হবে না তখন। দেশে আবারও ঝেঁকে বসলো পুরনো ফ্যাসিবাদ। লড়াই-সংগ্রাম ই হয়তো এ যমিনের নিশ্চল নিয়তি!

Tuesday, 17 March 2026

একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে।

"শেখ হাসিনা দিল্লীতে পালিয়ে গিয়েছে, সংসদ ডিসল্ভ করে দেওয়া হয়েছে , সবাই রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছে...” ইত্যাদি। জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ তথ্য দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কি ঠিক কিছু বলেছেন? (কমেন্টে দেখুন) । মোটেও না। গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি—এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারণ ঘটনাগুলো খুব পরিষ্কার: একটি সরকার পতন হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন, সংসদ ভেঙে গেছে—অর্থাৎ পুরানা রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—এখন রাষ্ট্র কে গড়বে? কীভাবে গড়বে? জনগণের ভূমিকা কী হবে? কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে নতুন রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া শুরু না করে, পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই আবার জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি তথাকথিত “উপদেষ্টা সরকার” গঠন করা হয়েছে—যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তিই নাই। এখানে একটা বড় ধরনের দ্বিচারিতা দেখা যায়: একদিকে বলা হচ্ছে সংবিধান মানতে হবে, অন্যদিকে সেই সংবিধানেই নাই এমন একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। তাহলে আসলে কোনটা মানা হচ্ছে? —সংবিধান, না ক্ষমতা? কাদের ক্ষমতা? সেনাবাহিনী, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতা ও রাষ্ট্রপতির? কালের কন্ঠে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার পড়লে পরিষ্কার এটাই বাস্তব হিশাব? আরও বড় প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই সংবিধান মানা হয়, তাহলে নির্বাচন হওয়ার কথা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২০২৯ সালে। এখন নির্বাচন করার কথা উঠছে কেন? আবার যদি বলা হয় এটি গণঅভ্যুত্থানের ফল, তাহলে পুরানা সংবিধানের প্রশ্ন আসে কেন? , পুরানা সংবিধানের বৈধতা নিয়েই বা এত টানাটানি কেন? এই দুই অবস্থান একসাথে সত্য হতে পারে না। এই জায়গাটাতেই জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ। তিনি ঠিকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন—সংবিধান সবকিছুর উপরে নয়। কিন্তু তিনি বলেননি কেন এই সংবিধানই আবার রক্ষা করা হলো? কারা তা রক্ষা করলো? এবং কাদের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা কখনো শূন্য থাকে না। যখন একটি সরকার ভেঙে পড়ে, তখন নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হয়। সেই মুহূর্তে জনগণের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে—কিন্তু সেই সুযোগটাই সবচেয়ে বেশি দখল করে নেয় সংগঠিত শক্তিগুলো: সেনাবাহিনী, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক এলিট। বাংলাদেশেও সেটাই হয়েছে। একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও, সেই শূন্যতা জনগণ পূরণ করতে পারেনি। বরং রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী, এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো মিলে এমন একটি ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যাতে পু্রানা ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত থাকে—শুধু মুখ বদলায়। এখানে “লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণী” কথাটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান না—এর বাস্তব অর্থ আছে। যারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পদ দখল করেছে, ব্যাংক লুট করেছে, অর্থ পাচার করেছে—তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো একটি সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া। কারণ সেই প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা আসতে পারে, আইনবিহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও আয়নাঘরের জন্য বিচার হতে পারে, লুট করে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পদ ফেরত আনার প্রশ্ন উঠতে পারে। যারা গুম, খুন, ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের সঙ্গে জড়িত—তাদের জন্যও পুরানা সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার টিকে থাকা ও টিকিয়ে রাখা নিরাপদ ও জরুরি। কারণ নতুন করে জনগণের রাষ্ট্র গঠন হলে তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ও শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব ত্রাণকর্তা হিশাবে জনাব সালাহ উদ্দিন আছেন। ভয় কি? তাই একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—সংবিধান রক্ষা করা হয়েছে “আইনের প্রতি শ্রদ্ধা” থেকে নয়, বরং গণবিরোধী নির্দিষ্ট ক্ষমতার চরিত্র ও কাঠামোকে অক্ষত রাখার জন্য। এই সংবিধান এমনভাবে তৈরি, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রায় সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এই কেন্দ্রীভুত ক্ষমতা ভাঙা মানে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন—যা বর্তমান ক্ষমতাধারীরা কখনোই চাইবে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—গণঅভ্যুত্থান মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভিত্তি নতুন ভাবে গঠনের সুযোগ। সেই সুযোগে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হতো একটি গণপরিষদ নির্বাচন—যেখানে জনগণ সরাসরি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ করবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি, এমনকি বিএনপির সাধারণ কর্মীসহ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষই ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু সেই পথ নেওয়া হয়নি। কেন? কারণ সেই পথ অনিশ্চিত, নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণীর ভীতির কারন হলো সেই পথ নেওয়া হলে বাস্তব ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরে আসতে পারে। সবশেষে প্রশ্নটা নৈতিকও। যারা জীবন দিয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে, যারা রাস্তায় নেমে রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন দেখেছে—তাদের সেই ত্যাগ কি শুধু একটি সরকার বদলের জন্য ছিল? নাকি একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে “সংবিধান মানতে হবে”—এই কথাটা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একদিকে সংবিধান ভেঙে সরকার বানানো, অন্যদিকে সেই সংবিধান রক্ষার কথা বলা—এটা কোনো নীতির রাজনীতি না, এটা ক্ষমতার রাজনীতি। আমরা কি পুরান ক্ষমতা ব্যবস্থা ও কাঠামোর মধ্যে সামান্য একটি সংস্কার চাই, নাকি সত্যিকারের অর্থে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবে গড়তে চাই? জনাব সালাহ উদ্দীন আহমেদ আসলে কি চান?

শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে

ঠিক ৫২বছর আগে ১৯৭৪ সালের মার্চে দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ, চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের দুর্নীতি, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির শ্রেণিশত্রু খতমের কর্মসূচি, জাসদের সরকারবিরোধী আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানামুখী তৎপরতায় টালমাটাল দেশের পরিস্থিতি। ওই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর মিন্টো রোডের বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেয় জাসদ। সেদিন জাসদের আন্দোলনকারী কর্মীরা ঢাকার রমনা এলাকায় অবস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করলে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে ৩০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী। এছাড়া আটক করা হয় জাসদের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে। প্রসংগত, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের পরপরই জাসদ নেতাকর্মীরা শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। সেসময়ে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা বিরোধী রাজনীতিবিদদের বাড়িতে হামলা, লুণ্ঠন, নির্যাতন, হত্যা, বিরোধী মতাদর্শীদের গুম করা সহ বহু বেআইনি কাজে যুক্ত থাকার ব্যাপারে অভিযুক্ত ছিলেন। আজ ১৭ই মার্চ। শেখ মুজিবের জন্মদিন। তার শাসনামলের এমন এক ১৭ই মার্চের কাহিনি বলি। ১৯৭৪ সাল। ফেব্রুয়ারী মাসে জাসদ একটা কর্মসূচি ঘোষণা করে। মুজিব সরকারের ২৫ মাসে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ, গণনির্যাতন, খামখেয়ালীপূর্ণ শাসন, অপদার্থতা ও বিদেশী দাসত্বকে উল্লেখ করে তারা বিবৃতি দেয়৷ নানা দাবীদাওয়া দিয়ে সরকারকে ১৫ই মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়। দাবীদাওয়াগুলো মেনে নেওয়ার জন্য। আল্টিমেটাম আরকি। কিন্তু মুজিব সরকার গুণেও না তাদেরকে! ফলে ১৭ মার্চ পল্টনে জাসদের উদ্যোগে জনসভা হয়। জলিল ও রব (বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলণকারী) অত্যন্ত জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সভা শেষ হতে না হতেই বিশাল মিছিল মিন্টো রোডের দিকে রওনা হয়। পুলিশ বাঁধা দিতে পারে এজন্য তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা এগিয়ে যায়। মিছিল গিয়ে থামে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাড়ির সামনে। চারিদিকে স্লোগান চলতে থাকে। জাসদ চাচ্ছে একটা স্মারকলিপি দিবে। কিন্তু মন্ত্রী বাড়িতে নেই। কেরানিগঞ্জে গেছেন জনসভায়। এতে করে নেতাকর্মীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়। দু'একজন অতি উৎসাহী হয়ে গেইটে আগুন দিতে যায়। কিন্তু গেট তো লোহার, আগুন কী আর ধরে! হঠাৎ কয়েক ট্রাক বোঝাই করা পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্য এসে হাজির। কথা নেই, বার্তা নেই, সরাসরি গোলাগুলি শুরু করে! জনতা এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। ইনু কমান্ড দেয়, 'সবাই শুয়ে পড়েন।' অনেকে তাই করে। কিন্তু গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়নি। ফলে একটার পর একটা বডি নিচে পড়তে থাকে। সরকারি প্রেস নোটে বলা হয়, তিনজন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে জলিল, রব, মমতাজ বেগম ও মাঈনউদ্দিন খান বাদল ছিলেন। আহত অবস্থাতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। জাসদ দাবি করে, অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন বর্ণনায় আসে ২২ থেকে ৩৫ জন নিহতের কথা। মাঈনউদ্দিন খান বাদলের বাবা আহমদউল্লাহ খান ছিলেন পুলিশের ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলের ডিএসপি। বাদল পরে তাঁর কাছে শুনেছিলেন, ৪০-৫০টি লাশ রক্ষীবাহিনী ট্রাকে করে নিয়ে গেছে। রেফারেন্সঃ জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ-সালাউদ্দিন আহমেদ।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন শিলংয়ের প্রিয় বড় ভাই মাননীয় মন্ত্রী জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামের সংসদ সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যিনি তাদের শপথ পড়ালেন তিনিই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছেন। যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে গিয়ে আইন লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলে তাকে যারা শপথ পড়ানোর অধিকার দিয়েছে তারাই সবচেয়ে বড় আইন লঙ্ঘন করেছে। একজন আইনলঙ্ঘনকারীর হাতে, বেআইনি ব্যক্তির হাতে জাতীয় সংসদের শপথ বাক্য পাঠ করলে তাহলে বিএনপির সকল সংসদ সদস্যরাও এই আইন লঙ্ঘন করেছেন। সেই হিসেবে জাতীয় সংসদ এই মুহূর্তে অবৈধ এবং বেআইনি। বেআইনি সংসদে দাঁড়িয়ে কেউ মন্ত্রী দাবি করা তার চেয়েও বড় বেআইনি কাজ। এর চেয়েও বড় অপরাধ হচ্ছে—একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ বাদ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করা; যা আরও জঘন্য বেআইনি। সংসদের নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিবেকশূন্য হয় কিংবা বিকারগ্রস্ত হয়, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য এবং নির্বাচনেও অযোগ্য। সে হিসেবে আমার ধারণা, প্রিয় বড় ভাই সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব শিলং থেকে ফেরার সময় অসুস্থ অবস্থায় এসেছেন। তিনি যখন শিলংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মানসিক অসুস্থতার কথা বলে কে বা কারা তাকে আইন মেনে সংবিধান অনুযায়ী সেখানে রেখে এসেছিলেন—এ বিষয়টি তিনি জানেন না বলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশে এসে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠকগুলোতে যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, সেগুলো এখন আবার ভুলে যাচ্ছেন এবং অস্বীকার করছেন। যারা তিন মাসের মধ্যে কোনো বিষয় ভুলে যায় এবং অস্বীকার করে, নিশ্চয়ই তারা অক্ষম ও অসুস্থ—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধিহীনও। এই অবস্থায় আমার ধারণা অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব সংসদ সদস্য হওয়ার সকল আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সংবিধান নিয়ে এত বক্তব্য দেওয়া হলেও তার নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনী সমাবেশে গণভোটের পক্ষে রায় চেয়েছিলেন। গণপর্যায়ে যুক্ত হওয়ার ফলে সেই অর্থে তার কথার বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এখন সেটি বাস্তবায়নে বিরম্বনা সৃষ্টি করা এক ধরনের প্রতারণার শামিল। সংবিধান অনুযায়ী কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে তারা সংসদ সদস্য থাকতে পারেন কি না—সে প্রশ্ন রেখে গেলাম। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে শপথ পড়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, সেই সংবিধানের কোথাও কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে শপথ পড়ানোর নিয়ম নেই। জুলাই সনদের ভিত্তিতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন—এবং সে অনুযায়ী দুটি শপথ পড়ানো হয়েছে: একটি মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি মাননীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এখানে শপথ যদি অবৈধ হয়, তাহলে দুটি শপথই অবৈধ হবে—না হলে একটিও হবে না। বরং সংবিধান অনুযায়ী দুটি শপথ গ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামি, এমসিপি-সহ যারা এই শপথ নিয়েছেন তারাই সংসদের বৈধ সদস্য; বাকিরা সংবিধান অনুযায়ী অবশ্যই অবৈধ। আপনি এত সংবিধানের কথা বলেন—তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদে ডেকে আনলেন না কেন? আমাদের মহামান্য “চুপ্পু” সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি দেখেননি। যদি তাই হয়, তাহলে তিনিই তো এখনো প্রধানমন্ত্রী। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে, কোন সংবিধানের ভিত্তিতে আপনারা এখন সরকারে বসেছেন? সংবিধান অনুযায়ী যারা এই অবৈধ কাজ করেছে তাদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আপনারা কি নিজেদের বিচার করছেন, নাকি যারা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে তাদের বিচার করছেন? যদি পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর বিচার করে থাকেন, তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করছেন? সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি চুপ্পু সাহেব হন, তাহলে তার হাতে দেওয়া অধ্যাদেশগুলো কীভাবে অবৈধ হয়? জুলাই সনদ, গণভোট, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং আইন-বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ—সবই তো বর্তমান মহামান্যের স্বাক্ষরে হয়েছে। তাহলে তিনি এগুলো কোন সংবিধানের ভিত্তিতে করলেন? বাংলাদেশে একই সঙ্গে দুইটি বৈধ ব্যবস্থা থাকতে পারে না। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সালাউদ্দিন সাহেব—আপনি যদি বৈধ হন, তাহলে বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রেসিডেন্ট এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যরা সবাই অবৈধ। আর আপনি যদি অবৈধ হন, তাহলে উপরে উল্লেখিত সবাই বৈধ। কারণ সংবিধান আপনার মনমতো বানানো কোনো বিষয়বস্তু নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের যা কিছু হচ্ছে—সবই জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদের ভিত্তিতে হচ্ছে। অতএব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোটে জনতার রায় এসেছে। জনগণ যে বিষয়গুলোর ভিত্তিতে এই গণভোটে রায় দিয়েছে সেটাই এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংবিধানস্বরূপ। এই আইনকে প্রশ্ন করে কেউ যদি বক্তব্য দেয়, আমি মনে করি তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধ করেছে। একদিন না একদিন শক্তিশালী কোনো সরকার এলে অবশ্যই সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। কারণ রাষ্ট্র বলছে আপনাকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিতে, আর আপনি সেই শপথ না নিয়ে সংসদে বসে আবোলতাবোল ও গোয়ার্তুমি করবেন—এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। জামায়াতে ইসলামের নেতারা যেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, নিশ্চয়ই সেই শপথপত্র তারা নিজেরা ফটোকপি করে আনেননি। সেই কাগজ সংযুক্ত করে আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার তাদের শপথ পড়িয়েছেন। আপনার নিয়ম অনুযায়ী যদি এটা অবৈধ হয়, তাহলে সংসদে যারা এই কাগজটি প্রিন্ট করে এনেছেন তারাই সবচেয়ে বড় অপরাধী। পরীক্ষার হলে কেউ সামান্য নকল কাগজ নিয়ে গেলে যেমন তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়, তেমনি সেই নকল সরবরাহকারীও শাস্তি পায়। তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো একটি শপথপত্র যদি আইনে না থাকে, তবে বেআইনিভাবে কারা সেটি তৈরি করে সংসদ সদস্যদের দিয়ে সারা পৃথিবীর মিডিয়ার সামনে শপথ পড়ালেন—এটা নিশ্চয়ই চরম অন্যায় ও আইনবিরোধী কাজ। তাহলে তারা এখনো কোন আইনের ভিত্তিতে গ্রেফতার না হয়ে সাংবিধানিক পদে বসে আছেন? অতএব সালাউদ্দিন সাহেব, আগরবাগর কথা বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। আল্লাহর নামে সেজদা দিন, শুকরিয়া আদায় করুন। দেশনেত্রীর ওপর যে সকল জুলুম হয়েছে সেগুলো স্মরণ করুন। নতুন প্রজন্ম কিন্তু আগের মতো নেই। উল্টাপাল্টা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিলে তারা আর মেনে নেবে না। আপনাদের রেকর্ড এমনিতেই খুব ভালো নয়। তার ওপর সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই যে মাতলামি শুরু করেছেন, তাতে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হতে পারে। সময় থাকতে জনতার রায় মেনে নিন—নচেৎ হাসিনার পরিণতির জন্যই অপেক্ষা করা শ্রেয়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ। ড. ফয়জুল হক।

Monday, 16 March 2026

প্রবীণ নেতারা চান না তরুণরা রাজনীতিতে আসুক।

ঠিক এই কারণেই প্রবীণ নেতারা চান না তরুণরা রাজনীতিতে আসুক। রাজনীতির একটা সিস্টেম আছে। একটা ট্র্যাডিশন আছে। দশকের পর দশক ধরে যত্ন করে গড়া। রক্ত-ঘাম দিয়ে না… ঘুষ, কমিশন আর তদবির বাণিজ্য দিয়ে। পোলাপাইন আইলেই এইডা ভাইঙ্গা ফালাইবো! এখন কথা হইলো সিস্টেমটা কী? সিস্টেম সহজ, তুই চুরি করবি। ছোট চুরি না, বড় চুরি। এমন চুরি যেন পরের পাঁচ পুরুষ বইসা খাইতে পারে। প্রজেক্টে ৪০%, টেন্ডারে ৩০%, আর বাকিটা "পার্টি ফান্ড", মানে নিজের ফান্ড। টাকা কমাবি। উন্নয়নের বরাদ্দ আসবো ১০০ কোটি, খরচ হইবো ৪০ কোটি, বাকি ৬০ কোটি "প্রশাসনিক জটিলতায়" হাওয়া। কাগজে সব ঠিকঠাক। অডিটর? সেও সিস্টেমের অংশ। বাচ্চাকাচ্চারে বিদ্যাস পড়াইবি। দেশের স্কুলে না অবশ্যই। লন্ডনে, টরন্টোতে, সিডনিতে। দেশের স্কুল? সেইটা জনগণের বাচ্চাদের জন্য। তোর বাচ্চা কি জনগণ? বেগমপাড়ায় বাড়ি কিনবি। গুলশানে ফ্ল্যাট, বনানীতে অফিস, গ্রামে বাড়ি, আর বেগমপাড়ায়... সেইটা বলতে হইবো না। সবাই বোঝে। না বুঝলেও বোঝার দরকার নাই। ভোট কিনবি। ইলেকশনের আগে মহল্লায় মহল্লায় খাম যাইবো। ৫০০ টাকা, ১০০০ টাকা। মানুষ বলবো "নেতা গরিবের বন্ধু।" কেউ জিজ্ঞেস করবো না এই টাকা আসলো কই থেইকা। জিজ্ঞেস করার সাহস নাই, আর থাকলেও সুযোগ নাই। এইটাই সিস্টেম। এইটাই ট্র্যাডিশন। - জনগণ হইলো তোর গোলাম - তুই হইলি রাজা। রাজার একটা ভাব থাকে। রাজা হাঁটলে পিছনে লোক থাকে, রাজা কথা বললে মাইক লাগে, রাজা হাসলে ছবি উঠে, রাজা রাগ করলে মামলা হয়। এই ভাব বজায় রাখতে হইবো!! তাহলে তুই কেন জবাবদিহিতা করবি? রাজার কাছে জবাব চায় কে? কার ঘাড়ে কয়টা মাথা? আর সবচেয়ে বড় কথা, তোর মাথায় ব্রেন থাকবে কেন? মাথায় ব্রেন থাকলে প্রশ্ন করবি। প্রশ্ন করলে সিস্টেম নড়বে। সিস্টেম নড়লে অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। তোর মাথায় থাকবে গু 💩 আর তুই সারাদিন বইসা রেন্ডিয়ার দালালি করবি, নাইলে পাকিদের দালালি করবি। এই দুইটার মাঝখানে অপশন নাই। দেশের মানুষের কথা ভাবার সময় নাই, ওইটা তো "রাজনৈতিক দুর্বলতা"। যে নেতার বিদেশি প্রভু নাই, তার তো ফান্ডিং নাই। ফান্ডিং নাই মানে ইলেকশন নাই। ইলেকশন নাই মানে ক্ষমতা নাই। ক্ষমতা নাই মানে চুরির সুযোগ নাই। তাহলে এত কষ্ট করে রাজনীতিতে আসলি কেন? তাই প্রবীণ নেতারা চান তরুণরা ঘরে বসে থাকুক। ফেসবুকে রাজনীতি করুক। কমেন্টে বিপ্লব করুক। কিন্তু মাঠে নামুক না। কারণ মাঠে নামলে সিস্টেম টিকবে না। আর সিস্টেম না টিকলে বেগমপাড়ার বাড়ির কিস্তি যাবে কোথা থেকে? লন্ডনের টিউশন ফি আসবে কোথা থেকে? আর সবচেয়ে বড় কথা… এতদিন ধরে করা “ত্যাগ আর সংগ্রামের” হিসাবটা মিলবে কীভাবে?

Sunday, 8 March 2026

আস্থার দহন।

আস্থার দহন। ইতিহাসের দাবার বোর্ডে দাপুটে খেলোয়াড়ও কখনো কখনো নিজের সাজানো ঘুঁটির চালে নিজেই কুপোকাত হন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ এসেছে,যেখানে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিশ্ছিদ্র মনে হলেও সময়ের বিবর্তনে সেগুলোই তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চারজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন করার নেপথ্যে যে অগাধ আস্থা ও রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক করুণ নিয়তির পরিহাসে রূপ নিয়েছে। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে শেখ হাসিনা চাইলেন এক নিস্পৃহ অভিভাবক। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে বঙ্গভবনের শীর্ষাসনে বসিয়ে তিনি ভেবেছিলেন এক নিরাপদ ছায়া পেলেন। কিন্তু রাজনীতিতে ‘আদর্শিক নিরপেক্ষতা’ অনেক সময় শাসকের নিজস্ব এজেন্ডার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। শাহাবুদ্দিন আহমেদ নিজের নীতিতে অটল থেকে সরকারের অনেক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েছিলেন।তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সেই আস্থার প্রতিদান মেলেনি; বরং ২০০১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের শাসনামলে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শালসা-র কারসাজি আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই আস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে যায়। নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে তিনি যে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন, তা আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। শেখ হাসিনা নিজেই পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন,এই নিয়োগ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় ভুল। এরপর ২০১৫ সালে সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ছিল তাঁর সরকারের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। সমালোচকদের মতে, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে স্পষ্ট প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও যাঁকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের চাবি দেওয়া হয়েছিল, সেই এস কে সিনহাই এক পর্যায়ে সরকারের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে তিনি যে ‘বিচারিক ক্যু’ বা ‘জুডিশিয়াল ক্যু’র নীল নকশা সাজিয়েছিলেন, তা ঢাকাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের এই নজিরবিহীন দ্বৈরথ কেবল সরকারকে অস্বস্তিতেই ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভারসাম্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছিল। কোনোমতে সেই বিচারিক ক্যু থেকে সরকার রক্ষা পেলেও, যাকে ভরসা করে শীর্ষাসনে বসানো হয়েছিল, তাঁর কলম থেকেই যখন শাসনের বৈধতা নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ এল, তখন সেই ‘ভুল’ ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হিসেবে স্থায়ী রূপ নিল। ২০২৪ সালে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগ ছিল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও আত্মঘাতী জুয়া। নিয়োগের আগে ও পরে অনেক মহল থেকে তাঁর সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও, শেখ হাসিনা পারিবারিক আত্মীয়তা ও দীর্ঘদিনের চেনা আনুগত্যের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে সেই সতর্কতাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যাকে তিনি তাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত রক্ষাকবচ মনে করেছিলেন, সেই সেনাপ্রধানই হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নেপথ্যের মূল নায়ক। ৫ই আগস্টের সেই উত্তাল মুহূর্তে যখন জনস্রোত গণভবনমুখী, তখন সেনাপ্রধানের রহস্যময় ভূমিকা এবং শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল না, বরং অনেকের মতে এর গভীরে লুকিয়ে ছিল আরও ভয়াবহ কোনো ছক। অভিযোগ ওঠে, পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা কেবল ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাতে খোদ শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার বা হত্যার সূক্ষ্ম পরিকল্পনাও ছিল।যে ঢালকে তিনি সবচেয়ে মজবুত ভেবেছিলেন, সেই ঢালই শেষ মুহূর্তে ঘাতকের খড়গ হয়ে তাঁকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাল। সবশেষে মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি করা ছিল এক বিস্ময়কর ও তড়িঘড়ি নেওয়া সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পোড়খাওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অবহেলা করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একজনকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সিদ্ধান্তটি দলের ভেতরে ও বাইরে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আনুগত্যের বিনিময়ে পুরস্কার দেওয়ার এই কৌশলটি ছিল মারাত্মক ভুল; কারণ কোনো পোড়খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বঙ্গভবনে বসানো হলে ৫ই আগস্টের পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতে পারত। সংকটকালীন সময়ে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক যে বিচক্ষণতা ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে পারতেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অসংলগ্ন ও দ্বিমুখী বক্তব্যে তার লেশমাত্র ছিল না। তাঁর দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক সাংবিধানিক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়, যা আওয়ামী লীগের পতন পরবর্তী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রাজনীতিতে অতি-বিশ্বাস অনেক সময় দূরদর্শিতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শেখ হাসিনা এই চারজন ব্যক্তিকে কেবল উচ্চপদেই বসাননি, বরং তাঁদের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের একেকটি স্তম্ভের ভার তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা ব্যক্তিরা যখন জনআকাঙ্ক্ষা আর রাষ্ট্রীয় সংকটের মুখোমুখি হন, তখন ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার চেয়ে নিজের অস্তিত্ব বা অন্তরে গচ্ছিত জিঘাংসা মুখ্য হয়ে ওঠে। এই চারজন ব্যক্তির নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এগুলো ছিল এক একটি রাজনৈতিক বাজি। আর ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, এই বাজিতে প্রতিবারই হারতে হয়েছে খোদ খেলোয়াড়কে। যে হাতগুলোকে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সিংহাসনের পায়া, সেই হাতগুলোই শেষমেশ সেই সিংহাসন উল্টে দেওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।এই চারটি নিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার শীর্ষে বসে শেখ হাসিনা বারবার এমন ব্যক্তিদের ওপর বাজি ধরেছিলেন, যারা সংকটের মুহূর্তে হয় অতি-নিরপেক্ষ ছিলেন, না হয় সরাসরি বিনাশের পথ তৈরি করেছিলেন। ক্ষমতার মোহ অনেক সময় মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে ব‍্যক্তিগত অনুগত মানুষের চেয়ে আদর্শীক অনুগত মানুষকে বেশি নিরাপদ মনে হয়।এই সিদ্ধান্তগুলো কেবল রাজনৈতিক ভুল ছিল না, বরং এগুলো ছিল নিয়তির সেই অমোঘ লিখন, যা তিলে তিলে এক দীর্ঘ শাসনের ভিত গুঁড়িয়ে দিয়ে এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যের জন্ম দিল।

Saturday, 7 March 2026

৭ই মার্চের দ্ব্যর্থতা : জয় বাংলা — জিয়ে পাকিস্তান

(০১) ===================== [সেই একই বাসি খিচুড়ি। সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সেই একই দ্ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। এজন্যই বলি ইতিহাস ক্ষমতা নির্ধারণ করেনা। ক্ষমতাই ইতিহাস তৈরি করে। যদি বলি আজ পলাশী দিবস কিংবা তিতুমীরের শাহাদাত দিবস কিংবা শামস-উদ-দীন ইলিয়াস শাহের মৃত্যু দিবস, তাহলে কী কারও কোনো হেলদোল হবে বা কোনো বিতর্ক বা কোনো উদযাপন? হবেনা। কারণ ক্ষমতার সাথে সেই ইতিহাসের সম্পর্ক চিরতরে চুকেবুকে গেছে। কিন্তু কেন আজ আওয়ামী পক্ষ কিংবা বিপক্ষ সবারই ৭ই মার্চ, মুজিব কিংবা একাত্তর নিয়ে কিছু না কিছু বলে ফেলার একটা তাড়না? কারণ আজও ক্ষমতার পেন্ডুলাম দোদুল্যমান। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেনা আওয়ামী লীগ শেষ। আওয়ামী লীগ মৃত। মুজিব-হাসিনা-বাকশালীদের কবর রচিত হয়ে গেছে। কারণ সবাই জানে যে কোনো পক্ষই তাদের স্বার্থেই আবার এই আওয়ামী লীগকেই ফিরিয়ে আনবে। আনবেই। তাই আজও ৭ই মার্চ প্রাসঙ্গিক। তার ইতিহাসও প্রাসঙ্গিক। ৭ই মার্চের খিচুড়িও প্রাসঙ্গিক। বিস্তারিত ইতিহাসের ছিন্নপত্রের ৩য় খন্ডে।] ০১. “... ৭ মার্চের মিটিং-এর বিশেষ বর্ণনা দেব না। লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল, মাথায় লাল ফিতা বাঁধা ও হাতে লাঙ্গল নিয়ে কৃষকেরাও সমবেত হয়েছিল। বন্ধু-বান্ধবের সাথেই উপস্থিত ছিলাম। সকলেই আশা করছিলাম যে সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হবে। আসলে আমাদের এ ধারণা ছিল আবেগপূর্ণ এবং বিতর্কিত। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সংসদের অধিবেশন এবং মন্ত্রিসভা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছিল। এটিই সঠিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। ৭ মার্চের সভায় তার বক্তব্য “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে শেষ করেছিলেন। তাতে তিনি তো কোন অন্যায় করেননি। পাকিস্তান অবিভক্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চলছিল জনমতের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সুতরাং রাজনীতিক হিসেবে তিনি তিনি তার ভাষণ সুষ্ঠুভাবে সমাপ্তও করেছিলেন। লক্ষাধিক লোক থেকে সেদিন কোন প্রতিবাদ আসেনি। অবশ্য শেষ করার পরমূহুর্তে ছাত্রনেতৃবৃন্দের পরামর্শে তিনি মাইকে ফিরে এসে “জয় বাংলা” ধ্বণিও উচ্চারণ করেছিলেন, যা সেদিন সমবেত জনগণকে উল্লসিত করেছিল। পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলাতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি এবং তার ভাষণ রাজনৈতিকভাবে সুষ্ঠু ও সঙ্গতিপূর্ণই ছিল। অথচ আজকাল ৭ মার্চের এই ভাষণ থেকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কথাটি মুছে ফেলা হয়েছে। কেন? কী কারণে? এতে আমি মনে করি মুজিবুর সাহেবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে খাটো করা হয়েছে। আরো বড় ক্ষতি হয়েছে, যে সম্প্রদায় এই কাজটি করেছেন তার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে॥” — কর্ণেল (অব:) কাজী নূর-উজ্জামান বীরউত্তম (৭নং সেক্টর কমান্ডার) / একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা ॥ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা । পৃ: ১২-১৩] ০২. “... একটা কথা বলি, শেখ সাহেব যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে “জয় বাংলার” সাথে সাথে “জয় পাকিস্তান” শব্দটিও উচ্চারণ করেছিলেন। এখন এই ভাষণ নিয়ে নানা বিতর্ক-বিতন্ডা চলছে। আমি ছোট্ট মানুষ। আমাকে সাক্ষ্য দিতে কেউ ডাকবে না। আমি যেমন শুনেছি, তেমনি বললাম। হতে পারে, আমার শ্রুতির বিভ্রম ঘটেছিল॥” — আহমদ ছফা / বেহাত বিপ্লব : ১৯৭১ । সম্পাদনা : সলিমুল্লাহ খান ॥ [আগামী প্রকাশনী - ডিসেম্বর, ২০১৩ । পৃ: ৮৪] ০৩. “… ’৭১-এর জনতার স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খাই নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে অগ্রগামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জনতার সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার ক্ষমতা তৎকালীন কোন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছিল না। আর তাই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম আপন পরিণতিতে ধাবিত হয়। ’৭১-এর ২৫শে মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ আলোচনা এক পাকিস্তানের ভিত্তিতেই ছিল। ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য যতই স্বাধীকারের পটভূমিতে বিশ্লেষিত হোক না কেন তাও ‘জয় বাংলা’ আর ‘জয় পাকিস্তানে’র উচ্চকিত শ্লোগানে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আপোষ মীমাংসার ধুম্র জালে আবদ্ধ ছিল। ’৭১-এর ২৫শে মার্চের আলোচনা শেষে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাক বাহিনীকে নিরস্ত্র বাঙালী জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে ভূট্টোসহ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে করাচির পথে ধাবমান তখন রাত ৮.৩০ মিনিটে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের সাংবাদিকদের নিকট প্রদত্ত বক্তব্য ‘আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে আর মাত্র ঘোষণা বাকি’-এই বক্তব্যের তাৎপর্য আর যা-ই হোক রাত ১২টায় শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার কোন প্রেক্ষাপটের সাক্ষ্য বহন করে না। … (পূর্ণাঙ্গ ভাষণ) প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্ত্তত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় পাকিস্তান। ... বাংলা জাতীয় লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম. এম. আনোয়ারের উদ্যোগে আগরতলা এসেম্বলি মেম্বার রেস্ট হাউসে আমার ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মালেক উকিলের মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর এক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্ত অবধি কোন নির্দেশ দান করেন নাই। এইদিকে মুজিব-ইয়াহিয়ার মার্চ-এর আলোচনার সূত্র ধরিয়া কনফেডারেশন প্রস্তাবের ভিত্তিতে সমঝােতার আলোচনা চলিতেছে। জনাব মালেক উকিল আমাকে ইহাও জানান যে, তিনি এই আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে আশাবাদী। প্রসঙ্গত ইহাও উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে আমি সর্বজনাব আবদুল মালেক উকিল, জহুর আহমদ চৌধুরী, আবদুল হান্নান চৌধুরী, আলী আজম, খালেদ মোহাম্মদ আলী, লুৎফুল হাই সাচ্চু প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতার সহিত বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাকালে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বা লক্ষ্য সম্পর্কে কোন নির্দেশ দিয়াছিলেন কিনা, জানিতে চাহিয়াছিলাম। তাহারা সবাই স্পষ্ট ভাষায় ও নিঃসঙ্কোচে জবাব দিলেন যে, ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর আকস্মিক অতর্কিত হামলার ফলে কোন নির্দেশ দান কিংবা পরামর্শ দান নেতার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। অথচ স্বাধীনতা উত্তরকালে বানোয়াটভাবে বলা হয় যে, তিনি পূর্বাহ্নেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। শুধু তাহাই নয়, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে, তিনি নির্দেশনামা জনাব জহুর আহমদ চৌধুরীকে পাঠাইয়াছিলেন। ... সময়োপযোগী নেতৃত্বদানের ব্যর্থতা ঢাকিবার জন্যই পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান অসত্যের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নির্দেশ প্রদানের একটি ঘোষণা পত্র ছাপাইয়া সাধারণ্যে বিলি করিয়াছিলেন। ইহা না করিয়া তাহার উচিত ছিল সময়োপযোগী অবদানের জন্য মেজর জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতিদান, ইহা হইত নেতাসুলভ আচরণ। তাঁহার মানসিকতার কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাভাবিকভাবেই তাহা করিতে ব্যর্থ হন। ইহা অতীব পরিতাপ এবং দুঃখের বিষয়॥” — অলি আহাদ / জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে '৭৫ [বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি - অক্টোবর, ২০১২ (পঞ্চম সংস্করণ) । পৃ: ১৭ (তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা) / ৩৮৬ / ৪০৬-৪০৭ / ৪০৯] ০৪. “... জাতির জনক বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষন প্রসংগেও একই ব্যাপার। জাষ্টিস মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সাহেবের বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলাদেশের তারিখ প্রথম সংস্করনে তিনি উল্লেখ করেছেন ভাষনের শেষে শেখ মুজিবুর রহমান বললেন ‘জয় বাংলা। জিয়ে পাকিস্তান’। দ্বিতীয় সংস্করনে তিনি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ অংশটি বাদ দিলেন। কবি শামসুর রহমানের লেখা আত্মজীবনী যা দৈনিক জনকন্ঠে ‘কালের ধূলোয় লেখা’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেখানেও তিনি বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ কথা ছিল ‘জিয়ে পাকিস্তান’। আরো অনেকের কাছে আমি এ ধরনের কথা শুনেছি, যারা আওয়ামী ভাবধারার মানুষ। সমস্যা হল আমি নিজে ৮ এবং ৯ই মার্চের সমস্ত পত্রিকা খুঁজে এরকম কোন তথ্য পাই নি। তাহলে একটি ভুল ধারনা কেন প্রবাহিত হচ্ছে? বংগবন্ধু যদি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলে থাকেন তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। তিনি যা বলেছেন অবশ্যই ভেবে চিন্তেই বলেছেন। পাকিস্তানের সংগে তার আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। তাকে সময় নিতে হবে। ৭ই মার্চে যুদ্ধ ঘোষনার মত অবস্থা তার ছিল না। বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন গেটেসবার্গ এড্রেসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ন বলে আমি মনে করি। এখানে কোন অষ্পষ্টতা থাকা বাঞ্জনীয় না॥” — হুমায়ুন আহমেদ / জোছনা ও জননীর গল্প ॥ [অন্য প্রকাশ - ফেব্রুয়ারী, ২০০৪ । ভূমিকা (পূর্ব কথা)] ০ ৫. “... ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন - ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় পাকিস্তান’। এই ঘোষণা সেদিন মানুষকে উদ্দিপীত করেছিলো। মানুষকে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্রধারণে অনুপ্রাণিত করেছিলো। আজ শেখ সাহেবের সমর্থকরা সেদিনের ক্যাসেট থেকে ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দটি তুলে ফেলেছেন। আর তার বিরোধীরা বলছেন, শেখ সাহেব ওই শ্লোগানের মাধ্যমে পাকিস্তান রাখতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ কেউই তাকে বিশ্বাস করছে না। এমন করে কি অবিকৃত ইতিহাস লেখা যায়॥” — নির্মল সেন / স্বাধীনতার অবিকৃত ইতিহাস ॥ [সাপ্তাহিক বিচিত্রা - ১৪/০৪/১৯৯৪] ০৬. “... শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কীভাষণ! আর শেখ সাহেবের কী গগনবিদারী কণ্ঠ! গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান।” শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’। আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত। এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, “আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন? আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা aggressive হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না?” এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন॥” — নির্মল সেন / ৭ই মার্চের ভাষণ “জয় পাকিস্তান” বিতর্ক ॥ (সংগৃহীত) আমার জীবনে একাত্তর ॥ [বর্তমান সময় - ২০০৯ । পৃ: ১১] ০ ৭. “... আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদে কোনো দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনাই হয়নি বা আলোচনা করা সম্ভবও ছিল না। কারণ আওয়ামী লীগ কোনো গুপ্ত বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান নয়। অথচ স্লোগান দিয়েছে একটি দেশ স্বাধীন করার। শত্রু প্রস্তুতি নিয়ে আঘাত হানতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ শত্রুর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব চাচ্ছে। চাচ্ছে সংগ্রামের আহ্বান। কিন্তু সংগঠন হিসেবে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না আওয়ামী লীগের। সুতরাং সিদ্ধান্ত নিয়ে জনসভা ডেকে স্বাধীনতা ঘোষণা দেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এ ধরণের একটি সংগ্রামে যাবার কথা অন্তত: আওয়ামী লীগের নয়। কিন্তু তা হলে কী হবে? এ বিতর্কই হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ। ৭ মার্চ শেখ সাহেব জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলে ভাষণ শেষ করলেন। আমার মনে হলো এবার স্বাধীনতা হচ্ছে না। প্রস্তুতি নেই। সময় নিতে হবে। সাময়িককালের জন্য হলেও শেখ সাহেবকে আপোষ করতে হবে। বন্ধু রুহুল আমিন কায়সার বললেন, এবারেই স্বাধীনতা, আওয়ামী লীগ বুঝেই হোক না বুঝেই হোক, আগুনে হাত দিয়েছে। যাদের মাঠে নামিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া তাদের ঘরে ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। আমরা সংঘর্ষ চাই বা না চাই ওরা সংঘর্ষ চাপিয়ে দেবে। যেকোনো মূল্যেই হোক এবারই স্বাধীনতা। আমি একমত হলাম না। দু'জনে বাজি ধরলাম। বাজিতে আমি হেরেছিলাম। রুহুল আমিন কায়সার পঞ্চাশের দশকের ছাত্র আন্দোলনের একটি উজ্জল নাম। ছাত্র অবস্থায় বিপ্লবী দলের (আর এস পি) সংস্পর্শে আসেন। ষাটের দশকে চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বাজিতে তিনি জিতে গেলেন। কিন্তু আমার হিসাব কি ভুল ছিল? আমি বলেছিলাম, আমাদের প্রস্ততি বলতে বাংলাদেশের মানুষের প্রস্তুতির কথাই বুঝিয়েছিলাম। ভারতের সাহায্য এবং সহযোগিতার প্রশ্নটি আমার হিসেবে ছিল না। আমি বুঝেছিলাম, ভারত সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ভৌগলিক দিক থেকে স্বাধীন হতে পারে, কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। আর ভারতই বা আমাদের সাহায্য করবে কেন? তাই আগরতলা গিয়েই কংগ্রেস নেতাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আপনারা সীমান্ত খুলে দিলেন? আপনাদের কী লাভ বাংলাদেশকে স্বাধীন করে? মা, আমার খটকা লেগেছিল আগরতলা গিয়ে। ত্রিপুরাবাসী আমাদের দু'হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়েছে। এর অর্থ বুঝি। কিন্তু ভারত আমাদের সাহায্য দিচ্ছে কেন? কেন ট্রেনিং দিচ্ছে? ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কি সমঝোতা হয়েছে? এ সম্পর্কে সকলেই অন্ধকারে। একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমাকেও সেই অন্ধকারে ঝাঁপ দিতে হলো। সে মুহুর্তে ভিন্ন কোন বিকল্প ছিল না॥” — নির্মল সেন / মা জন্মভূমি ॥ [তরফদার প্রকাশনী - ডিসেম্বর, ২০০৭ । পৃ: ৬১-৬২] ০৮. “... আওয়ামী লীগ একটি সংসদীয় দল ছিল এবং শেখ মুজিব মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সময় বিরোধীদের বিরুদ্ধে শারিরীক শক্তি প্রয়োগে অভ্যস্ত হলেও সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা তার মাথায় কোনদিন থাকে নি। গোপন অবস্থায় থাকার ব্যাপারেও তার কোন চিন্তা ছিল না। বিশেষ বিশেষ জরুরী অবস্থায় জেলে যাওয়া ছাড়া তার করার মত কিছু ছিল না। সেটাই তিনি বরাবর করে এসেছিলেন। ১৯৭১ সালেও স্বাধীনতা যুদ্ধ ইত্যাদির কথা বললেও তার কোন চিন্তা বা প্রস্তুতি তার ছিল না। ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে তার বক্তৃতায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার পর তিনি যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন তা হলো, ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর সাথে আলোচনা। এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিশ্চিত করে পাকিস্তানের কাঠামো রক্ষা করা। তিনি নিজে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। সেটা সাধারণ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ছিল। এই চেষ্টা তিনি করেছিলেন। ৭ই মার্চের বক্তৃতার শেষে “জয় পাকিস্তান” বলা এদিক দিয়ে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এটা এখন আওয়ামী লীগের লোকেরা অস্বীকার করে কারণ তার কোন রেকর্ড নেই। ৭ই মার্চের পর রেডিও তাদের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকার সময় তারা ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি মুছে ফেলেছিলেন। তখন কোন ক্যাসেট রেকর্ডারের ব্যবহার ছিল না। একমাত্র রেকর্ড ছিল রেডিওতে। যারা শুনেছিল তাদের স্মৃতি ছাড়া এর অন্য কোন চিহ্ন নেই। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশের তারিখ’ নামক বইয়ের প্রথম সংস্করণে লিখেছিলেন যে, ৭ই মার্চ শেখ মুজিব “জিয়ে পাকিস্তান” বলেছিলেন। কিন্তু বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে এই সত্য ভাষণ বাদ দেয়া হয়েছে। অহিংস অসহযোগ আন্দোলন করলেও স্বাধীনতা যুদ্ধে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা তার ছিল না। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, তৎকালীন জরুরী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডেকে এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় নি। দেশের প্রশাসন তারা পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু নিজেদের সংগঠনে এ নিয়ে কোন আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন তারা বোধ করেন নি। সব কিছুই শেখ মুজিবের ‘হুকুম’ অনুযায়ী। তিনি তার ৭ই মার্চের বক্তৃতাতেও 'হুকুম' দেওয়ার কথা নিজেই বলেছিলেন।” — বদরুদ্দীন উমর / আমার জীবন (তৃতীয় খন্ড) ॥ [জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ - জুন, ২০০৯ । পৃ: ১৪১-১৪২] ০৯. “... Zaman (Quazi Nooruzzaman) talks about the famous 7 March speech of Sheikh Mujibur Rahman, an event where he was present, and heard the Father of the Nation ending his speech with “Pakistan Zindabad”, and, moments later, on the advice of the student leaders, “Joy Bangla”. Zaman takes no issue with the end salutations, reasoning that Pakistan was still politically undivided, but takes a dim view that the words “Pakistan Zindabad” have been expunged from the rendering of the speech with the observation that, “I believe this tampering with the speech diminishes Sheikh Mujib's political efforts.” And, over a particularly contentious issue that continues to deeply divide the nation against itself, Zaman is convinced, offering a number of arguments in support, that Ziaur Rahman first announced the independence of Bangladesh over the radio. He then reasons, “Let's say it was Ziaur Rahman who was the first announcer of independence. What does it matter? Does this announcement belittle the Awami League or Sheikh Mujibur Rahman? Not in the least.” — Shahid Alam / A freedom fighter's testament ( Review of “A Sector Commander Remembers Bangladesh Liberation War 1971” by Quazi Nooruzzaman)॥ [ The Daily Star - Saturday, November 27, 2010 ] ১০. “... সময়টি ছিল জটিল। আমরা সবাই এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু আজ যখন দীর্ঘকাল পরে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে চিন্তা করি, তখন একটি কথার সদুত্তর পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য সেটাই ছিল প্রকৃষ্ট সময়। পশ্চিমারা তাদের মরণযুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি তখনও সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি। এ প্রান্তে সৈন্যসামন্তও অপ্রতুল এবং বাঙালিই বেশি। সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা এলে বাংলাদেশের মানুষকে হয়ত এত বড় মূল্য দিতে হত না। ’৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে বক্তৃতা দিলেন তা যেমনি ছিল ঐতিহাসিক, তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বললেন বটে, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম — এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...” কিন্তু ঘোষণা দিলেন না আনুষ্ঠানিকভাবে । শেষ করলেন, “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলে॥” — শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন / বলেছি বলছি বলব ॥ [অনন্যা - মে, ২০১৫ । পৃ: ৩৭]

Friday, 6 March 2026

৭ই মার্চের ভাষণ—উন্মুক্ত পাঠ নাকি দলীয় পাণ্ডুলিপি?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে যতগুলো রাজনৈতিক প্রতীক গড়ে তোলা হয়েছে, তার মধ্যে ৭ই মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত একটি টেক্সট। এই ভাষণকে একদিকে “জাতির মুক্তির রূপরেখা” এবং “স্বাধীনতার কার্যকর ঘোষণা” হিসেবে মূর্ত করে দেখা হয়েছে, অন্যদিকে এটাকে পাকিস্তানের ভেতরে সমাধান খোঁজার শেষ প্রচেষ্টা, এমনকি কৌশলগত দ্বিধার নিদর্শন হিসেবেও পাঠ করা হয়েছে। এভাবে একই ভাষণকে বিপরীত রাজনৈতিক শিবির ভিন্ন ভিন্নভাবে মালিকানা নেওয়ার চেষ্টা করেছে—কেউ এটিকে নায়ক–পূজার কেন্দ্রে বসিয়ে, কেউ আবার এটিকে ইতিহাস মুছে ফেলার রিসেট বাটনের বিপরীত দিক থেকে ব্যবহার করে। ফলে ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনার প্রথম শর্তই হলো—এটাকে কেবল পবিত্র প্রতীক বা নিখুঁত দলিল হিসেবে নয়, বরং তার সময়, সীমাবদ্ধতা, কৌশল, পরবর্তী দলীয় ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় বিকৃতির পুরো প্রক্রিয়াসহ একটি রাজনৈতিক টেক্সট হিসেবে দেখা। এই প্রবন্ধ সেই জায়গা থেকেই ভাষণের মাহাত্ম্যকে অস্বীকার না করে, বরং এর চারপাশে নির্মিত ক্ষমতার রাজনীতি, আখ্যানের একচেটিয়াকরণ ও স্মৃতির উপর দখলদারিত্বের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবে। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে সমালোচনামুখর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ভাষণ নিজে যতটা ঐতিহাসিক, তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় ও দলীয় আখ্যান ঠিক ততটাই রাজনৈতিকভাবে নির্মিত এবং বিতর্ক–উদ্রেককারী। ১. ইতিহাস নয়, আখ্যান নির্মাণ: ভাষণের চারপাশে দেয়াল ৭ই মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে এক উত্তাল ইতিহাসের কেন্দ্রীয় মুহূর্ত—অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভাষাগত জাতীয়তাবাদ, কৃষি ও শ্রম-আন্দোলনের দীর্ঘ সঞ্চিত ক্ষোভের বিস্ফোরণকে সেখানে একটি রাজনৈতিক ভাষা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে এই ভাষণকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সাতই মার্চ কেবল একক নেতার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফল, আর তার বাইরের বহুমাত্রিক সামাজিক শক্তিগুলো যেন ইতিহাসের প্রান্তিক ফুটনোট মাত্র। এই “ব্যক্তিকেন্দ্রিক” আখ্যান দুইভাবে সমস্যাজনক। - প্রথমত, এটি জনগণের সংগ্রামকে এক ব্যক্তির ক্যারিশমায় সংকুচিত করে, ইতিহাসকে জীবন্ত প্রক্রিয়া থেকে “নায়ক–কেন্দ্রিক কাহিনি”তে নামিয়ে আনে। - দ্বিতীয়ত, একই ইতিহাসকে ভিন্নভাবে পড়ার, সমালোচনা করার বা নতুন করে ব্যাখ্যার যেকোনো চেষ্টাকে “বঙ্গবন্ধু–বিরোধী” বা “মুক্তিযুদ্ধ–বিরোধী” বলে দমন করা সহজ হয়ে যায়। খুন যোগ্য করে তোলা হয়। একই ভাষণকে সামরিক শাসনামলে “সংযমের মুহূর্ত” হিসেবে, আর আওয়ামী লীগ আমলে “বিপ্লবের চূড়ান্ত ডাক” হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এ থেকে বোঝা যায়, ইতিহাসের ঘটনাটি যেমন আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কে কীভাবে সেটি রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগাচ্ছে। ২. স্বাধীনতার ঘোষণা বনাম দ্বিধার রাজনীতি ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক: এটি কি স্বাধীনতার ঘোষণা, নাকি পাকিস্তানের ভেতর ক্ষমতা আদায়ের এক কৌশলী বক্তৃতা? একদিকে, আওয়ামী লীগ ঘরানা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা যুক্তি দেন—মুজিব আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিচ্ছিন্নতাবাদী ট্যাগ এড়াতে শব্দে “স্বাধীনতা” উচ্চারণ করেননি, কিন্তু বাস্তবে চার দফা দাবি, অসহযোগ, কর–বর্জন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও “প্রতিটি ঘরে দুর্গ গড়ে তোল” আহ্বানের মাধ্যমে কার্যত স্বাধীনতারই ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের পাঠে, কৌশলগত অস্পষ্টতা ছিল আন্তর্জাতিক ও সামরিক বাস্তবতা বিচার করে নেওয়া এক দূরদর্শী অবস্থান; ছাত্রনেতাদের সরাসরি ঘোষণার দাবি তিনি ঠেকিয়ে দিয়েছেন গণহত্যা ঠেকানোর জন্য। অন্যদিকে, সমালোচক এবং কিছু বিকল্প ধারার গবেষকরা অভিযোগ করেন, ৭ই মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতর থেকেই ক্ষমতা নেওয়া—চার দফা ছিল আসলে সামরিক জান্তা ও ভুট্টোর উপর চাপ তৈরি করার হাতিয়ার। বিবিসি বাংলা–তে উদ্ধৃত এক গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, মুজিব ২৪ মার্চ পর্যন্তও পাকিস্তানের ভেতরে ক্ষমতা হস্তান্তরের সমাধানের পথ খোলা রাখতে চেয়েছিলেন; তাই ভাষণটি “চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দলিল” হিসেবে পড়া এক ধরনের রেট্রো–অ্যাকটিভ নায়ক বানানোর চেষ্টা। এই দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক ফল স্পষ্ট: - আওয়ামী লীগ লাইন: “ঘোষক একটাই—মুজিব; ৭ই মার্চই স্বাধীনতার কার্যকর ঘোষণা।” - প্রতিপক্ষ ন্যারেটিভ: “৭ই মার্চ ছিল অর্ধেক পথ; ২৫–২৬ মার্চের সামরিক আক্রমণ ও ২৭ মার্চের চট্টগ্রাম ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ বাস্তবে শুরু।” ফলে ভাষণটি একদিকে বিপ্লবী অনুপ্রেরণার পাঠ্য, অন্যদিকে স্বাধীনতার “অথেনটিক ঘোষক” নিয়ে অন্তহীন রাজনৈতিক টানাটানির ইন্ধন। ৩. রাষ্ট্রীয় দিবস, পরিবার–কেন্দ্রিকীকরণ এবং প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি ৭ই মার্চকে দীর্ঘদিন কোনো রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়নি; হটাৎ করে ২০২০ সালে হাইকোর্টের নির্দেশের পর তা জাতীয় দিবসের তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঢোকে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারকালীন সময় থেকে ৭ই মার্চ ঘিরে ব্যাপক মঞ্চ, শো, বিজ্ঞাপন, সরকারি প্রচার শুরু হয়—যা দিনটিকে শুধু ঐতিহাসিক স্মরণ নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ব্র্যান্ড–ব্যবস্থাপনার অংশে পরিণত করে। সমালোচনা এসেছে দুইদিকে থেকে: - এক, “এক পরিবারকে ঘিরে অতিরিক্ত সংখ্যক দিবস”—১০ই জানুয়ারি, ১৫ আগস্ট, ৭ই মার্চ, জন্মদিন, মুজিববর্ষ ইত্যাদি—রাষ্ট্রীয় অর্থে পালন করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে একধরনের পারিবারিক পুজো–ব্যবস্থায় নামিয়ে আনা হচ্ছে। - দুই, দিবসের সংখ্যা বাড়ানো এবং অতিরিক্ত আড়ম্বর সাধারণ মানুষের মধ্যে “উৎসব ক্লান্তি” এবং বিরক্তি তৈরি করেছে; ঐতিহাসিক স্মরণ আর রাজনৈতিক প্রচারের সীমারেখা মুছে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪–২৫ সালে ৭ই মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত এলো একেবারে বিপরীত মেরুতে—এবার অনেকে এটাকে “ইতিহাসের রিসেট বাটন” বলে ব্যাখ্যা করলেন, যেখানে পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এখানে সমালোচনা উভয় দিকে: আওয়ামী লীগ আমলে অতিরিক্ত পার্টি–সেন্ট্রিকীকরণ যেমন সমস্যা ছিল, তেমনি নতুন সরকার এটিকে সহনশীল সমালোচনার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল মুছে–ফেলার মাধ্যমে এক ধরনের “উল্টো রিভিশনিজম”-এ যাচ্ছিল। ৪. সংবিধানে ভাষণের বিকৃত পাঠ: স্মৃতির ওপর অবহেলার ছাপ যে ভাষণকে ইউনেসকো “মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” নিবন্ধনে স্থান দিয়েছে, সেই একই ভাষণের পাঠ যখন দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন দেখা যায় সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে শতাধিক ভুল, বাদ–বাকী আর বিকৃতি রয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত কমিটি সংবিধানে থাকা পাঠে প্রায় ১৩০টি ভুল বা অমিল শনাক্ত করে—কোথাও বাক্যাংশ বাদ গেছে, কোথাও শব্দ বদলে গেছে, কোথাও পুরো লাইন নেই। দুই দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে “৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু” নিয়ে অভূতপূর্ব প্রচারণা চললেও ভাষণের সবচেয়ে মৌলিক কাজ—এর নির্ভুল টেক্সট দায়িত্ব নিয়ে সংরক্ষণ—রাষ্ট্র এবং দল দুপক্ষই করেনি; এটা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, স্মৃতির প্রতি গভীর অবহেলার লক্ষণ। সমালোচকেরা এখানে তির্যক প্রশ্ন তুলেছেন: যে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত এই ভাষণের নাম নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের “ইতিহাস–বিরোধী” বলে, তারা নিজেরাই যদি সংবিধানে বিকৃত ভাষণ রেখে দেয়, তাহলে প্রকৃত ইতিহাসবিরোধী কে? ৫. ইউনেসকো, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অভ্যন্তরীণ বন্ধ–দরজা ৭ই মার্চের ভাষণ ২০১৭ সালে ইউনেসকোর “মেমরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড” রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচারণায় এটাকে প্রায় একধরনের আন্তর্জাতিক সীলমোহর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—“বিশ্ব স্বীকৃত ঐতিহ্য” এখন সমালোচনার উর্দ্ধে। কিন্তু সমালোচকেরা মনে করিয়ে দেন, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কোনো দলিলকে “ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান” বললে তা সমালোচনাহীন বা সর্বসম্মত হয়ে যায় না; বরং সেই স্বীকৃতি গবেষণা, বিতর্ক ও নতুন পাঠকে উৎসাহিত করার কথা, থামিয়ে দেওয়ার নয়। যখনই কেউ ৭ই মার্চের ভাষণে মুজিবের কৌশলগত দ্বিধা, পাকিস্তানের ভেতরে সমাধান খোঁজার চেষ্টা বা সহিংসতার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেন, তাকে দ্রুত “ইউনেসকো স্বীকৃত ইতিহাস অস্বীকারকারী” বলে ট্যাগ করা হয়। ফলে ইউনেসকোর মতো আন্তর্জাতিক ফোরামের স্বীকৃতি একধরনের “বন্ধ–দরজা” যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হয়—যেখানে গবেষণা বা বিকল্প পাঠ আর নিরাপদ থাকে না। ৬. স্মৃতি মুছে ফেলা বনাম একচেটিয়া স্মৃতি: দু’পাশের একই রোগ ডেইলি স্টার–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৭ই মার্চের তাৎপর্য কখনো সরাসরি মুছে ফেলা হয়েছে (সামরিক শাসন, ২১ বছরের নিষেধাজ্ঞা), কখনো আবার একক আখ্যানের মধ্যে বন্দী করে রাখা হয়েছে (আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্র অনুমোদিত বয়ান)। এক ক্ষেত্রে ভাষণ নেই, অন্য ক্ষেত্রে ভাষণ আছে কিন্তু ভিন্ন পাঠের অবকাশ নেই—দু’ক্ষেত্রেই সমস্যাটা একই: ক্ষমতাসীন পক্ষ ইতিহাসকে বহুবচন থেকে একবচনে নামিয়ে আনে। আজকের বিতর্ক—৭ই মার্চ জাতীয় দিবস বাতিল, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা, “রিসেট বাটন”–এর ভাষ্য—দেখায়, নতুন ক্ষমতাসীন পক্ষও একই খেলাটা উল্টো দিক থেকে খেলছে।[7][8][1] এবার প্রশ্ন কেবল “মুজিব বনাম অন্য কেউ” নয়; প্রশ্ন দাঁড়ায়—রাষ্ট্র কি কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিকে বহুত্ববাদীভাবে ধারণ করবে, নাকি প্রতি সরকার নিজের সুবিধামতো অধ্যায় কেটে দেবে আর নতুন অধ্যায় লিখবে? ৭. উপসংহার:
৭ই মার্চের ভাষণকে সমালোচনামূলক চোখে দেখলে তিনটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি— - ভাষণটি ছিল এক বাস্তব রাজনৈতিক সঙ্কটের মুহূর্তে, কৌশলগত অস্পষ্টতা ও বিপ্লবী আহ্বানের এক জটিল মিশ্রণ; এতে যেমন সাহসের ভাষা ছিল, তেমনই ছিল আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনায় কম–বেশি দ্বিধা। - ভাষণ–পরবর্তী রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় ব্যবহারে এটিকে ব্যক্তিপূজার কেন্দ্রে বসানো হয়েছে, যা জনগণের সংগ্রামকে ছাপিয়ে গেছে এবং সমালোচনাকে অপরাধসমতুল্য করে তুলেছে। - নতুন সরকার এই একচেটিয়া স্মৃতির প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি দিবস বাতিল, গুরুত্ব কমানো ইত্যাদির মাধ্যমে ঠিক একই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ইতিহাস–রাজনীতি করছে, কেবল নায়ক বদলে। সব তর্ক–বিতর্ক ছেঁকে দেখলে স্পষ্ট হয়, ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে দ্বন্দ্ব মূলত ভাষণের ভেতর কিংবা ঐতিহাসিক মুহূর্তের জটিলতায় যতটা, তার চেয়েও বেশি এই ভাষণকে ঘিরে পরবর্তী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার ও অপব্যবহারে। একদিকে যখন এই ভাষণকে ব্যক্তিপূজা ও দলীয় ব্র্যান্ডিংয়ের প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে, তখন অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীলভাবে দিবস বাতিল, মর্যাদা কমানো বা বিকল্প নায়ক বানানোর প্রতিযোগিতা একই ইতিহাসকে আবারো ক্ষমতার দাঁড়িপাল্লায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। প্রকৃত সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাই একযোগে দু’টি কাজ দাবি করে: প্রথমত, শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে তার সময়ের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক কৌশলের ভেতরে রেখে পড়া; দ্বিতীয়ত, এই ভাষণকে দলীয় পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধার করে একটি উন্মুক্ত ঐতিহাসিক সম্পদে পরিণত করা, যেখানে ভক্তি যেমন বৈধ, তেমনি বৈধ প্রশ্ন, বিরোধিতা এবং বিকল্প ব্যাখ্যাও। যতক্ষণ না রাষ্ট্র এবং রাজনীতি এই বহুত্ববাদী পাঠের সুযোগ তৈরি করছে, ততক্ষণ ৭ই মার্চের ভাষণ ইতিহাসের দলিলের চেয়ে বেশি হবে—এটি থাকবে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে, এবং তার চারপাশের বিতর্কও থামবে না, বরং আরও নতুন আকারে ফিরে আসবে।

ও সুন্নীদের মধ্যে কেনো মতপার্থক্য ?

ইসলাম ধর্মে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় সৃষ্টি হয় নবীজীর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর। শিয়া এবং সুন্নীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতিষ্ঠিত মুসলমান সমাজের কে হবেন পরবর্তী নেতা তা নিয়ে। গোড়ার দিকে ইসলামে কিভাবে গোষ্ঠী সৃষ্টি হলো তা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করলে আজকের আধুনিক মুসলিম সমাজকে বুঝতে সুবিধা হবে। এই বিভক্তি ১৩শ’বছর ধরে মুসলমানদের কাছ থেকে মুসলমানদেরকে পৃথক করে রেখেছে। রাসুলুল্লাহ(সঃ)-এর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর মুসলমানদের যারা শাসন করেছেন তাদের খলিফা বলা হয়। শিয়ারা বিশ্বাস করে যে প্রথম খলিফা ছিলেন হজরত আলী। আলী ছিলেন রাসুল (সঃ)-এর চাচাতো ভাই এবং নবীজির কন্যা ফাতিমাকে বিয়ে করেছিলেন। হজরত আলী হলেন রাসুলের দৌহিত্রদের পিতা। কিন্তু সুন্নীরা আবু বকরকেই প্রথম খলিফা বলে মনে করে। শিয়া এবং সুন্নীরা হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় দুটি গোষ্ঠী। তাদের ধর্মীয় মতবাদ এবং ইতিহাস জানা ও বোঝা জরুরি। শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয় নবী মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত মুসলমান সমাজের কে হবেন পরবর্তী নেতা তা নিয়ে। শিয়ারা দাবি করে, নবী মুহাম্মদ শেষবার হিজরতকালে পথিমধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং তার সহযাত্রীদের সম্মুখে ঘোষণা করেন হজরত আলী হবেন পরবর্তী উত্তরাধিকারী। কিন্তু সুন্নীরা বিশ্বাস করে, দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় নবী তার আরেক স্ত্রীর পিতা আবু বকরকে উত্তরাধিকার নির্বাচন করেন। শিয়াদের বক্তব্য হলো, আলী যখন নবীকে কবর দিতে ব্যস্ত তখন হজরত উমর (পরবর্তীতে ২য় খলিফা নির্বাচিত হন) সাহাবাদেরকে ডাকেন এবং আবু বকরকে নেতা নির্বাচিত করেন। সুন্নী মুসলমানরা বলে, আবু বকরের নির্বাচনই সঠিক। শিয়ারা বলে প্রকৃতপক্ষে আলী প্রথম খলিফা এবং ইমাম। আবু বকরের পর উমর এবং উসমান খলিফা নির্বাচিত হন। উসমানের হত্যাকাণ্ডের পর আলী চতুর্থ খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সকলেই তা মেনে নেন, শুধু বর্তমান সিরিয়ার তখনকার বাসিন্দারা ব্যতীত। ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উসমানের হত্যার পর আলী ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু তার শাসনকাল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অবশেষে আলী ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে আততায়ীর হাতে নিহত হন এবং তার পুত্র ও নবীর দৌহিত্র হোসেন ক্ষমতারোহন করেন। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের নেতা হয়ে উঠা মোয়াবিয়া তাকে অস্বীকার করেন। মোয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। তৎকালীন ইরাকিরা আলীর দ্বিতীয় পুত্র হুসেনকে সমর্থন করেন। হুসেন ইরাকের নগরী কুফায় গমন করেন এবং খিলাফতের দাবিতে রাজধানী দামাস্কাস অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। পথে কারবালা নামক স্থানে তিনি ইয়াজিদ বাহিনীর হামলার শিকার হন। ইয়াজিদ বাহিনী হুসেনের পরিবারসহ শিশুদের খাবার পানি সরবরাহ করতে অস্বীকার করেন এবং তাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হুসেনের শিরচ্ছেদ করা হয় এবং তার বোন জয়নাবকে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। শিয়ারা এই ঘটনাকে তাদের ইতিহাসের উৎস মনে করে। তারা আলী, হুসেন এবং নবী পরিবারের যারা নিহত হয়েছেন তাদেরকে জীবন্ত প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে। এখান থেকেই তারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের চিন্তায় থেকে যায় অত্যাচার, করুণ ঘটনা এবং শহীদ হওয়ার কাহিনী। সুন্নী ইসলামে আইন বিষয়ক চারটি তরিকা রয়েছে — হানাফি, সাফি, মালিকি এবং হানবালি। অন্য একটি উঠে আসা গোষ্ঠী হলো ওয়াহাবি গোষ্ঠী। এই ওয়াহাবিরাই আজকের সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাশীল। ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ আবদ আল ওয়াহাব (১৭০৩–১৭৯২)। তিনি মূলত হানবালি মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। ওয়াহাব আরব প্রধান ইবনে সৌদের সঙ্গে হাত মেলান এবং তারা দু’জনে মিলে আরব উপদ্বীপ দখল করেন। পরে সৌদের পরিবার আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজ্যের ইসলাম চর্চা শুরু হয় ওয়াহাবি মতবাদ অনুসারে। তারা জামাতে উপস্থিত হওয়াকে বাধ্যতামূলক করে। ওয়াহাবিরা শিয়াদের সহ্য করতে পারেনি। ১৮০২ সালে আধুনিক ইরাকের কারবালা তারা ধ্বংস করে এবং যত শিয়া পুরুষ, নারী ও শিশু পাওয়া যায় তাদের হত্যা করে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে কারবালা একটি পবিত্র শহর। ওয়াহাবি মতবাদের অনুসারীরা একটি কট্টর ও উগ্র সম্প্রদায়। তারা মুসলমানদের কিছু সম্প্রদায়কে স্বধর্মত্যাগী মনে করে এবং শিয়াদের হত্যা করা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করে। এই কারণে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র রক্তাক্ত হয়েছে এবং গৃহযুদ্ধ বেঁধেছে বারবার। অধিকাংশ সুন্নী মনে করে, বিরোধীতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ওয়াহাবিদের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের সহিংসতা, যা পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

Wednesday, 4 March 2026

পারমাণবিক বোমা অর্জনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভাগ্য এত বেশী সহায়ক ছিল যা অন্যকোন দেশের ক্ষেত্রে ন্যুনতম ছিল না। পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার স্বপ্ন বুনন শুরু হয় ১৯৭০ এর দশকে: জুলফিকার আলী ভুট্টোর উদ্যোগে এবং এই প্রোগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি, ভুট্টো মুলতানে একটা গোপন মিটিংয়ে পাকিস্তানের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের ডেকে নেন এবং নিউক্লিয়ার ওয়েপনস প্রোগ্রাম শুরু করার নির্দেশ দেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিন্তা করছিলেন যে নিউক্লিয়ার শক্তি অর্জনের। ভুট্টোর বিখ্যাত ডায়লগ"আমরা ঘাস খাবো, এমনকি ক্ষুধার্ত থাকবো, কিন্তু নিজেদের নিউক্লিয়ার বোমা বানাবো। আমাদের অন্য কোনো চয়েস নেই।" এই মিটিংয়ে ভুট্টো পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন (PAEC) চেয়ারম্যান মুনির আহমেদ খানকে দায়িত্ব দেন, ১৯৭৬ সালের মধ্যে সম্ভাব্য সকল এস্যাইনমেন্ট শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করেন । ড. আব্দুল কাদির খান যাকে বলা হয় "ফাদার অফ পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার বোম"। ১৯৭০এর দশকে নেদারল্যান্ডসের ইউরোনকো কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়ে খান গোপনে সেন্ট্রিফিউজ টেকনোলজি আয়ত্ত্ব করেন, যা ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্টের মূল চাবিকাঠি। এই টেকনোলজি নিয়ে ফিরে এসে খান ১৯৭৬ সালে কাহুটা রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ (KRL) স্থাপন করেন যা রাওয়ালপিন্ডির কাছে একটা দুর্গম জায়গা, ভারতের সীমান্তের খুব কাছে। এখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হতো, যা বোম তৈরির মূল উপাদান। কিন্তু এই লোকেশনটা ছিল ভয়ংকর রিস্কি কারণ ভারতীয় এয়ারফোর্সের নাগালের মধ্যে!কাহুটা ছিল পাকিস্তানের অ্যাকিলিস হিল। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW কীভাবে এই গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কথা জানতে পারলো? ১৯৭০ এর শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে, RAW পাকিস্তানের পশ্চিম ইউরোপ থেকে গোপন নিউক্লিয়ার ইকুইপমেন্ট কেনা নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট করে যেমন প্লুটোনিয়াম টেকনোলজির জন্য ১১ মিলিয়ন ডলার খরচ। AQ খানের নেদারল্যান্ডস থেকে সেন্ট্রিফিউজ ডিজাইন হাতানোর খবর ১৯৭৯ সালে জার্মান ব্রডকাস্টার ZDFএর ডকুমেন্টারিতে প্রকাশ হয়, যা RAW কে আরও সতর্ক করে। এছাড়া,১৯৭৮ সালে ফরাসি কূটনীতিকরা কাহুটার কনস্ট্রাকশন সাইটের ফটো তুলে ইউএস এবং ভার*তীয় গোয়েন্দাদের সাথে শেয়ার করেন, যা সন্দেহ কে নিশ্চিত করে। RAW গোপনে ঢুকে পড়ে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেয় যেমন কাহুটা, ইসলামাবাদ এবং সিহালাকে "সেন্ট্রিফিউজ ট্রায়াঙ্গল" হিসেবে চিহ্নিত করে। আরেকটি কাহিনি আছে। RAW পাকিস্তানের টপ সাইন্টিস্টদের দীর্ঘদিন ধরে নজরে রাখা শুরু করে। কাহুটার বিষয় নজরে আসলে তারা এখানে জোর নজরদারি চালায়। নিউক্লিয়ার সাইন্টিস্টরা যেখানে চুল কাটাতে যেতো সেখানকার সেলুন থেকে তাদের চুল সংগ্রহ করে। পরে ল্যাবে তাদের চুলে অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তা দেখে তাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা অর্জনের চেষ্টা করছে। ভার*ত মিলিটারি অ্যাটাকের প্ল্যান তৈরি করে । কিন্তু এখানে আসে প্রথম বড় টুইস্ট ভা*রতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই! ১৯৭৯ সালে দেশাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে ফোন করে RAW এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানিয়ে দেন। পাকিস্তানী সেনারা তড়িঘড়ি অভিযান চালিয়ে RAW এজেন্টদের ধরে ফেলে। দেশাইয়ের এই "বিশ্বাসঘাতকতা" (কেউ বলে শান্তির জন্য, কেউ বলে ব্যক্তিগত কারণে) পাকিস্তানের প্রোগ্রামকে বাঁচিয়ে দেয়। এরপর দেশাই ইস*রায়েলে*র ১৯৭৭ সালের একটা প্রপোজালও রিজেক্ট করেন, যেখানে ইস*রায়েল কাহুটা অ্যাটাকের জন্য ভা*রতের সাথে জয়েন্ট অপারেশন চায়।বলা হয়ে থাকে মোররাজি দক্ষিণ এশিয়ায় উদারপন্থার কারণে সামরিক সংঘাত থেকে এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নেন। ভুট্টোর লিডারশিপে এই প্রোজেক্ট ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চলে, পরে জিয়াউল হকের মিলিটারি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফ*গানি*স্তান আক্রমণ করে। এটা পাকিস্তানের জন্য গোল্ডেন অপরচুনিটি! আমেরিকা সোভিয়েতকে হারাতে চায়, আর পাকিস্তানী আর্মি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পার্টনার। বিনিময়ে? ৪০টা F-16 ফাইটার জেট! এই জেটগুলো কাহুটাকে প্রটেক্ট করার জন্য পারফেক্ট। ভার*তের যেকোনো অ্যাটাক রুখে দিতে পারে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক বলেছিলেন, "আমরা ঘাস খেয়ে থাকব, কিন্তু বোম বানাবো!" এই F-16 প্যাকেজটা ছিল তাদের শিল্ড। আমেরিকা জানতো পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম, কিন্তু আফ*গান যুদ্ধের জন্য চোখ বুজে রাখে। পরবর্তীতে, ১৯৯০ সালে প্রেসলার অ্যামেন্ডমেন্ট দিয়ে আমেরিকা পাকিস্তানকে সামরিক সাহায্য বন্ধ করে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভাগ্যের খেলা, তাই না? ইস*রায়ে*লের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে লেটার লেখেন, পাকিস্তানের "এটম বম" কে "মর্টাল ডেঞ্জার" বলে সতর্ক করেন। বেগিন ফ্রান্স এবং ওয়েস্ট জার্মানির লিডারদেরও একই লেটার পাঠান। কিন্তু ডিপ্লোম্যাসি না চলায় ই*সরা*য়েল অ্যাকশন নেয়। ১৯৭৯-১৯৮১ সালে মো*সাদ AQ খানের ইউরোপীয় সাপ্লায়ারদের উপর বোম অ্যাটাকস চালায়, যেমন ফ্রান্সে একটা কোম্পানির অফিস ধ্বংস। এমনকি AQ খানকে অ্যাসাসিনেট করার চেষ্টা করে বিষ দিয়ে বা বোম দিয়ে, কিন্তু খান বেঁচে যান!১৯৮১ সালে ইস*রায়েলী এয়ারফোর্স ইরাকের ওসিরাক নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরে অ্যাটাক করে, পুরোটা ধ্বংস করে দেয় কোনো লস বা বাধা ছাড়াই! এটা থেকে অনুপ্রাণিত হয় ভার*ত। কেন? কারণ ইস*রায়েলে*র ভয় ছিল "ইসলামি দেশের হাতে এটম বোম" এবং তা যদি যদি লিবিয়া বা অন্য আরব দেশগুলোর হাতে পড়ে, তাহলে ইস*রায়ে*লের অস্তিত্ব বিপন্ন। ১৯৭৯-১৯৮৩ সালে ইস*রা*য়েল আর ভা*রত জয়েন্ট প্ল্যান করে: ইস*রা*য়েলী F-16 এবং F-15 জেটগুলো ভা*রতের জামনগর এয়ারবেস থেকে উড়বে, উধমপুরে রিফুয়েল করবে, আর কাহুটায় বোমা ফেলবে। ভার*তীয় জাগুয়ার জেটগুলো সাপোর্ট দেবে। ভা*রতের মিলিটারি অফিসাররা ইস*রা*য়েল গিয়ে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইকুইপমেন্ট কেনে। ইন্দিরা গান্ধী দুবার অ্যাপ্রুভ করেন কিন্তু আমেরিকার চাপে ব্যাক আউট করেন! আমেরিকা বলে, "যদি অ্যাটাক করো, আমরা পাকিস্তানের সাইড নেবো।" CIA পাকিস্তানকে টিপ অফ দেয়, আর প্ল্যান ফেল হয়। ইন্দিরা বলেছিলেন, "আমরা চাই না যুদ্ধ, কিন্তু প্রস্তুত আছি।" কিন্তু শেষমেশ পিছু হটেন। পরবর্তীতে, ১৯৮৭ সালে ভার*তের আর্মি চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৃষ্ণাস্বামী সুন্দরজি "অপারেশন ব্রাসট্যাকস" দিয়ে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ শুরু করার চেষ্টা করেন, যাতে কাহুটা অ্যাটাক করা যায় কিন্তু আবার আমেরিকার চাপে থেমে যায়। ১৯৯৮ এর বিজয় এবং লং-টার্ম ইফেক্টসইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর (১৯৮৪) ভার*তের অন্য সরকারগুলো আর এই পথে যায়নি। রাজীব গান্ধীর সময়েও চেষ্টা হয়, কিন্তু আমেরিকা আর পাকিস্তানের F-16-এর ভয়ে থেমে যায়। অবশেষে, ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান নিউক্লিয়ার টেস্ট করে চাগাই-১! বিশ্ব অবাক, কিন্তু পাকিস্তানের স্বপ্ন পূরণ হয়। এরপর ১৯৯১ সালে ভা*রত-পাকিস্তান নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটিস অ্যাটাক না করার অ্যাগ্রিমেন্ট সাইন করে। এটা শুধু টেকনোলজির জয় নয়, ডিপ্লোম্যাসি, স্পাই গেম, অ্যাসাসিনেশন অ্যাটেম্পটস আর ভাগ্যের খেলা।রাহাত হাকিমি।

আওয়ামী ঘরানার কিছু মিডিয়া যে পরিমাণ দুর্নীতির গল্প বানিয়েছে

গত এক মাস ধরে তিনজন মানুষকে টার্গেট করে আওয়ামী ঘরানার কিছু মিডিয়া যে পরিমাণ দুর্নীতির গল্প বানিয়েছে, সেগুলো পড়লে রাগের চেয়ে বরং হাসিই বেশি পায়। “ড. মুহাম্মদ ইউনূস”আহসান এইচ মনসুর"আসিফ মাহমুদ বসুন্ধরা গ্রুপ–ঘনিষ্ঠ একটি মিডিয়ায় বলা হলো, আসিফ মাহমুদ নাকি ১৬ মাসে ১০ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতি করেছে। একটু হিসাব করলেই বোঝা যায়—এই দাবি মানতে হলে দিনে প্রায় ২০ লাখ ডলার করে দুর্নীতি করতে হয়। বাস্তবতা বাদ দিলাম, গল্প হিসেবেও কি এটা সম্ভব? একইভাবে বলা হলো, ড. ইউনূস নাকি ১১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি করেছেন। যে মানুষ বেতন নেন না, প্রতিষ্ঠানের লাভ নিজের পকেটে তোলেন না, ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, অথচ ৩০ মিনিটের বক্তৃতায় লাখ ডলার আয় করতে পারেন—তাঁকে নাকি দুর্নীতি করতে হবে! এই পর্যায়ের গল্প লিখেও কেউ যদি সাংবাদিকতা দাবি করে, সেটাই আসল ট্র্যাজেডি। এবার আসল কাহিনীটা। ৫ আগস্টের পর আসিফ মাহমুদের বাসায় বড় বড় কোম্পানির “বোয়াল মাছ” হাজির হয়েছিল—সব ক্লিয়ার করে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা। ছাত্র উপদেষ্টাদের তখন সরকারের ভেতরে বাস্তব প্রভাব ছিল। কিন্তু ওই সব টাকার প্রস্তাব আটকানো হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে ড. ইউনূস ও আহসান এইচ মনসুরের সমর্থনও ছিল—এ কথা অজানা নয়। খেয়াল করলে দেখবেন, পুরো ইন্টেরিম সময়জুড়ে দেশে বড় কোনো ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। বরং কোটি কোটি টাকা আটকে দেওয়া হয়েছে। অনেক লোভ, বড় অঙ্কের অফার দিয়েও যখন এই তিনজনকে কেনা যায়নি, তখনই শুরু হয়েছে পরিকল্পিত গল্প লেখা। সমস্যা হলো—এই ধরনের মিডিয়া নাটক মানুষ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে।তাই এসব কেউ খায়নি। আজ তো আসিফ মাহমুদ নিজে এবং পুরো পরিবারের ব্যাংক স্টেটমেন্ট সামনে এনেছেন। এখন প্রশ্ন একটাই—এই মিডিয়াগুলো কি ক্ষমা চাইবে? সম্ভবত না। অভিনন্দন ড. ইউনূস। অভিনন্দন আহসান এইচ মনসুর। অভিনন্দন আসিফ মাহমুদ। আপনারা কতটুকু করতে পেরেছেন—সে হিসাব ইতিহাস করবে।কিন্তু এক মাস ধরে যেভাবে মাফিয়ারা আপনাদের নাম ধরে কান্নাকাটি করছে, সেটাই প্রমাণ করে—আপনারা মাথা নত করেননি। এটাই প্রমাণ করে, গত ১৬ মাসে কারা সত্যিকারের পেইনে ছিল। #Shahriar #BDMediaMafia #dryounus Sharier

Friday, 27 February 2026

বিএনপি কেন বিচার করতে চাচ্ছে?

বিএনপি ৭৫ অভ্যুত্থানের বেনিফিট নিয়েছে কিন্তু বিপ্লবীদের দেশছাড়া করেছিল। সেই সিলসিলার ধারাবাহিকতায় এখন তারা ২৪শের গণঅভ্যুথানকারীদের বিচার করতে চায়। যেহেতু জুলাই গণঅভ্যুথানের বেনিফিট ইতোমধ্যে তারা ঘরে তুলেছে। একটা কথা বলে রাখি- জুলাই গণঅভ্যুথানে পুলিশ ছিল খুনি লীগের পক্ষে। সুতরাং তারা ছাত্র-জনতা কে যেখানে যেভাবে সম্ভব খুন করতেছিল। একটা বিপ্লব বা অভ্যুথানকালে শত্রুপক্ষের কোন সোলজার খুন হলে বিচার হয় না। সেটাই আন্তর্জাতিক প্রাকটিস। তাহলে বিএনপি কেন বিচার করতে চাচ্ছে? কারণ BNP ভয় পাচ্ছে যদি জুলাই বিপ্লবীরা আবার রাস্তায় নামে। যেহেতু BNP চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাসী করতেই থাকবে আগামী পাঁচ বছর। অতএব, জুলাই যোদ্ধাদের বিচারের ভয় দেখিয়ে বা কয়েকটা টা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়ে, বাকিদের কন্ট্রোলে রাখা। যাতে ছাত্র-জনতা আগামীতে মাঠে না নামে। মনে হয় না খুব একটা কাজ হবে। তবে গাদ্দারির ১০০% ফল পাবে। খুব দ্রুতই পাবে । ইনশা আল্লাহ।

Thursday, 26 February 2026

বিএনপি টিকতে পারবে কি? সামনের চ্যালেঞ্জগুলো কি কি!!

১৯৭৩ সালে আওয়ামিলীগ ২৯৩ আসন পাইছিলো! দুই বছর যেতে না যেতেই শেখ মুজিব বাকশাল ঘোষণা করলো! মানে "একদলীয় শাসন ব্যবস্থা"! কিন্তু ২ বছরের ভিতরেই চান্দুর পুরো পরিবারসহ নাই করে দিছে। *১৯৮৬ সালে ১৫১ টা আসনে জয়ী হইছিলো জাতীয় পার্টি কিন্ত জাতীয় পার্টির এরশাদ কাকু টিকলো মাত্র ১৭ মাস। কারণ তখন বিএনপি নির্বাচন বয়কট করছিলো! *১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ২৭৮ আসনে জিতছে বিএনপি কিন্তু টিকতে পারছে মাত্র ১২ দিন। কারণ আওয়ামিলীগ, জামাত নির্বাচন বয়কট করছিলো। *২০২৪ সালে আওয়ামিলীগ ২২৩টি আসন পাইলো মাত্র ৮ মাস পর প্রজম্ম চুদলিং*পং করে দিলো। এবার ২১২ টা আসনে বিএনপি জয়ী হইলো! সরকার গঠন করলো! প্রশ্ন হলো ,সামনে বিএনপি টিকতে পারবে কি? সামনের চ্যালেঞ্জগুলো কি কি!! ১,এবারের নির্বাচন পুরোপুরি লীগকে মাইনাস করে হইছে! আওয়ামী লীগের ভাষ্যমতে "গণতান্ত্রিক রীতি অনুসরণ করে নির্বাচন হয় নাই কারণ বড় একটা দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই। সংবিধান অনুযায়ীও নির্বাচন হয়নি কারণ ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন হওয়ার কথা। ২,জামাত -এনসিপির অভিযোগ," ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং" হইছে! মেবি দেশকে শান্ত রাখতে সহজেই সবকিছু মেনে নিচ্ছে! ৩,সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা হলো "গণভোট নিয়া নতুন নাটক" চলছে! মানে শপথ না নিয়ে গণভোটের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইছে বিএনপি! তারমানে পুরো দেশের মানুষের মধ্যে অলরেডি ক্ষোভ তৈরি হয়ে গেছে। ৪,আজকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দিলো ,এমন একজন ব্যক্তিরে যে ব্যক্তি একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ,শুনলাম ঋণখেলাপীর সাথেও নাকি জড়িত। এখানেই শেষ না! আজকে বিএনপির বিক্ষোভের মুখে রানিং গভর্নরের অফিস ছাড়তে হইছে ,মানে উনার সাথে মব করা হইছে! এমন একটা যোগ্য লোকের সাথে যিনি ১৭ মাস চেষ্টা করে লুট হওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগলে রাখছেন,দেশের রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন থেকে ৩২ বিলিয়নে নিয়েছেন। লীগের ব্যাংক ডাকাত, লুটেরাজ একটারেও ছাড় দেয়নি! বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সেরা গভর্নর! এই ঘটনা দেশের প্রত্যেকটা বিবেকবান সচেতন মানুষের মধ্যে দাগ কাটছে! ৫,কয়দিন আগে চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ভাইকে অপসারণ করে বিএনপির এক লোকেরে বসাইছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চিত হইছে, জুলাই হত্যাকান্ডের তদন্ত ও বিচার কাজ স্বাভাবিক চলবে কিনা জনমনে সন্দেহও তৈরি হইছে। ৬,কয়দিন আগে বিএনপির সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী বললো ,"সড়কে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া চাঁদা নয়, বাধ্য করা হলে চাঁদা!" মানে চাঁন্দাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করলো! পুরো দেশে একটা ক্যাচাল লেগে গেলো! অলরেডি জনরোষ তৈরি হইলো। ৭,মেবি ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে জ্বালানি মন্ত্রী বললো,"আজকের জেন-জি যদি ইনকিলাব বলে, তবে আমার রক্তক্ষরণ হয়। বাংলাকে ধারণ করতে হলে 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' চলবে না"। তারপর পুরো তরুণ প্রজম্ম তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠলো। কারণ এই স্লোগান দিয়েই হাসিনার পতন হইছে ,বিএনপির লোকেরা মুক্তি পাইছে,ভদ্রলোক এখন মন্ত্রী হইছে। ৮,দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামিলীগের লোকদের অফিস খোলে দেয়া হচ্ছে। ধরেন ১-২ বছরের ভিতরে তারা দেশে ফিরলো! আপনার কি মনে হয় তারা বিএনপি সরকারকে মেনে নিবে? জীবনেও না! বরং সরকার বিরোধী কোন আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা থাকবে লীগের কারণ তারা অলরেডি নির্বাচন বয়কট করছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো ,জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার লাশের বিনিময়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসলো! যারা দেশে পরিবর্তন চায়, যারা সংস্কার আর বিচার চায় তাদের প্রত্যাশাকে বাদ দিয়া বিএনপি আগামী ৫ বছর ক্ষমতায় টিকতে পারবে কি? জামাত,এনসিপি আর লীগের চুপ থাকার মানে কিন্তু নীরবতা না! খুব সম্ভবত তারা বিএনপিকে তাদের ভুল শোধরানোর জন্য সময় দিতে চাইছে! কারণ ঈদের পর কঠোর আন্দোলন এসব বুলি তারা দিবে না, মেবি ঝোপ বুঝে কোপ মারার ধান্দায় বিক্ষুব্ধ জনগনরে সাথে নিয়া বসে আছে। তিক্ত হলেও সত্য, এই জেনারেশন দেশে পরিবর্তন চাই! পুরোনো ধারার রাজনীতি, লীগ স্টাইলের রাজনীতি,স্বজনপ্রীতি ,দুর্নীতি, স্বৈরাচারী আচরণ, মামলা বানিজ্য ,বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বাকস্বাধীনতা হরণ, জঙ্গি নাটক সাজানো, সন্ত্রাসী ,চান্দাবাজি ,ধর্ষণ ,বিদেশীদের গোলামী ,পুলিশ দিয়া নতুন নতুন স্ক্রিপ্ট সাজানো, প্রশাসন দিয়া ভয়ভীতি দেখানো,গুম -খুন ,নতুন আয়নাঘর ,ভিন্নমতকে ধমন পীড়ন ,জাতির সাথে বৈষম্য আর দেখতে চাই না! বাস্তাপচা রাজনীতি কেউ দেখতে চাইছে না! আমরা চাই, বিএনপি টিকে থাকুক। তারা জনগণের সমর্থন আর ভালোবাসা নিয়া টিকে থাকুক কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা আর ভাল্লাগে না! আর হ্যাঁ প্রজম্মের প্রত্যাশাকে বাদ দিয়া বাংলাদেশে রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব কারণ এটা মিডিয়ার যুগ! এ প্রজম্ম রাজনীতি নিয়া বহু সচেতন! তারা এতোটাই সচেতন, জীবন যৌবন ,ক্যারিয়ার,প্রেম,ভালোবাসা,নাটক,সিনেমা,কৌতুক ,জোকস ,ইনজয় সব ভুইলা গেছে। দেশপ্রেমের নেশায় মেক্সিমাম তরুণ হাবুডুবু খাচ্ছে! প্রজম্ম এতোটাই সাহসী ,তারা দেশের স্বার্থে , জনগণের স্বার্থে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না! বুঝলে বুঝ পাতা ,না বুঝলে তেজ পাতা!!!#

আওয়ামীলীগ কখনও প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না।

শুধু মনে রাখবেন, আওয়ামীলীগ কখনও প্রতিরোধ নিতে ভুল করে না।তারা হিসেব নেয় করায় গন্ডায়। সয়ং বেগম খালেদা জিয়াকে ও জেল খাটতে হয়েছে। আর মিথ্যা মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁ*সি দিয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টু দুজনেই আওয়ামীলীগের আমলে ফাঁ*সির অপেক্ষায় কারাগারে ছিলেন। নাসিরুদ্দিন পিন্টু ভাইকে তো কারাগারেই হ*ত্যা করা হয়েছে। আর বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়েছে দলের মহাসচিব থেকে শুরু করে থার্ড লেয়ারের প্রত্যেক নেতাকে। আরেকটু ইতিহাসের পেছনের পাতায় যাই... শুধুমাত্র আওয়ামীলীগের একজন কর্মী মৃত্যুর পর মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায় বিএনপির ৪ জন নেতাকে মৃত্যুদন্ড আর ১ জন কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলো শেখ হাসিনার আদালত। আর ২৫ বছর আগে পাবনায় শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলার জন্য বিএনপির নয় নেতাকে ফাঁ*সি দিয়েছিলো আওয়ামীলীগ সরকার। (বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলায় কয়জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত) আরও ইতিহাস শুনেন.... জেলহাজতে সাত বছর আগে মারা যাওয়া বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন মাহবুবকে তিন বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলো আদালত। আবার দুই বছর আগে মারা গেছেন এমন এক নেতাকেও পৃথক মামলায় দেওয়া হয়েছিলো চার বছরের কারাদণ্ড। শুধু কি তাই......শুধু বেগম খালেদা সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু তথ্য মনে করিয়ে দেই... বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে এক কাপড়ে বের করে দিয়েছিলো।তারপর গুলশানের বাসার পানির লাইন,বিদ্যুৎ লাইন,টেলিফোন লাইন আর বালুর ট্রাকের ইতিহাস তো সেই দিনের ঘটনা। অসুস্থ অবস্থায়ও আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। আর তৃণমূল..... কি বলবো ভাই, শীতের সময় ধান খেতে ঘুমাতে হয়েছে। মাথার নিচে ইট দিয়ে। ছেলে বিএনপি করে এই অপরাধে বাবাকে হ*ত্যা করার ঘটনা মনে আছে? এগুলো কি ১৪০০ মানুষ *হত্যার পর গনঅভ্যুত্থানে বেগম খালেদা জিয়া বা বিএনপির পতনের পর বেগম জিয়ার মন্ত্রী সভার সব সদস্য পালিয়ে পাকিস্তান যাওয়ার পরের ঘটনা? না... তত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে স্বাভাবিক, গনতান্তিক নির্বাচনের পর এমন সব দোজখ শুরু করেছিলো আওয়ামীলীগ সরকার। আজ যারা আওয়ামীলীগের নেতা হ*ত্যা মামলার আসামী ইয়াবা বদি,আইভি রহমান,তালুকদার মোঃ ইউনুস,দবিরুল রহমান এমপিরা সহ,ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার জামিন দিয়ে মুক্ত করে দিয়েছেন। লীগের, তাদের সকল নেতাকর্মীদের সব কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, জেলগেট থেকে ফুল দিয়ে বরণ করছেন, হ*ত্যা মামলার আসামিকে খালাস পাইয়ে দিচ্ছেন। আওয়ামীলীগ আবার ফিরলে হয়ত আতাতকারী,ইতিহাসের মীর জাফর আলী খান নামক সিনিয়র/ জুনিয়র কিছু নেতাদের তেমন ক্ষতি হবে না। তবে তৃণমূলের নেতাদের উপর ভয়ানক দুর্যোগ যে নেমে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।। সেদিন ২০০৯-২০২৪ সালের অতীতের মত আমাদের বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষে কেউ দাঁড়াবে না। না কোন সুশীল সমাজ, না কোন ফেসবুক এ্যাক্টিভিষ্ট, না কোন মিডিয়া, না কোন সাহিত্যক, কিংবা প্রশাসনের কেউ। তুষার আবদুল্লাহর মত কোন সফট দলীয় নেতাকেও পাব না। সব কিছুর ভার বহন করতে হবে, শহীদ ছাত্রদল নেতা জনি,চট্টগ্রামের নুরুল আলম নুরুর মত আমাদের পরিবারকে।

Wednesday, 25 February 2026

বিএনপিকে আওয়ামী লীগ ও ইন্ডিয়া ভাল একটা ট্র্যাপে ফেলেছে।

বিএনপিকে আওয়ামী লীগ ও ইন্ডিয়া ভাল একটা ট্র্যাপে ফেলেছে। এই ট্র্যাপটা বুঝতে হলে প্রথমে ভোট ব্যাংকের সমীকরণ কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে হবে। জামায়াত দীর্ঘ সময় ধরে একটা ১০% দল ছিল। এবার জামায়াত-এনসিপির জোট ৪০% ভোট পেয়েছে। এই অতিরিক্ত ৩০% ভোট কোথা আসছে? মূলত বিএনপির ভোট ব্যাংক থেকে। আওয়ামী লীগ থেকে কিছু আসছে, তবে সেটা শহরে বেশি, গ্রামে কম। ট্রেডিশনালি যেসব ফ্যামিলির মানুষেরা বিএনপিতে ভোট দেওয়ার কথা তাদের একটা বড় অংশ জামায়াত ও এনসিপিতে চলে গেছে। এই ৪০% এর কমপক্ষে অর্ধেক ভোটই আসলে বিএনপির ছিল। এটা বিএনপির অনেক বড় লস। এই মানুষগুলো বিভিন্ন কারণে বিএনপির ওপরে বিরক্ত হয়ে অন্য দলে চলে গেছে। তাদের কিছু মিনিমাম এক্সপেক্টেশন ছিল যেটা বিএনপি ফুলফিল করতে পারে নাই। এখন সরকারে আসার পর বিএনপি আরো বেশি ব্লান্ডার করছে এবং করবে। মিনিমাম এক্সপেক্টেশনের সাথে ব্যারিয়ার আরো বেশি বাড়বে। ফলে যে ভোট ব্যাংক ইতোমধ্যে বিএনপি ছেড়ে চলে গেছে তারা আর ফিরে আসবে না। বরং বিএনপি থেকে এই মাইগ্রেশন চলতেই থাকবে। বিএনপির কোর ভোট ব্যাংক সামনে আরো সংকুচিত হবে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, বিএনপির বর্তমান ভোট ব্যাংক নির্বাচনে জেতার জন্য এখন আর এনাফ না। এবারের জাতীয় নির্বাচনে জেতার জন্য বিএনপিকে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের ওপরে নির্ভর করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট না পেলে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া খুবই কঠিন হত। আওয়ামী লীগের সব ভোট পাওয়ার জন্য বিএনপির হাইকমান্ড লীগের সাথে আঁতাত করেছে। বিএনপির এম্পি প্রার্থীরা স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি বিএনপিকে রাখতে হবে। এবং তারা রাখছে। কারণ জাতীয় নির্বাচনই শেষ না। সামনে স্থানীয় নির্বাচন আছে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আছে। লীগের ভোট ব্যাংক ছাড়াও প্রশাসন ও মিডিয়াতে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামীদের সমর্থন লাগবে। বিএনপি যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে তারা ইমেডিয়েট ফল পাবে। লীগ পুনর্বাসন এবং ইন্ডিয়ার সাথে হাত মেলানো ছাড়া বিএনপির সামনে আর কোন উপায় নাই। সমস্যা হচ্ছে যে, লীগ পুনর্বাসন ও ইন্ডিয়ার কাছে নতজানু হওয়াকে বিএনপির কোর ভোট ব্যাংক কখনই ভালভাবে নিবে না। এরা এটার ঘোর বিরোধী। তারা দেখবে যে, তারা যে রাজনীতিটা চায় সেটা তারা জামায়াত ও এনসিপি থেকে পাচ্ছে। এই ইস্যুটা যখন বড় হয়ে উঠবে, তখন বিএনপির ভোট ব্যাংক আরো অনেক বেশি হারে জামায়াত ও এনসিপির দিকে চলে যাবে। বিএনপির এই লস যত হতে থাকবে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা তত বেশি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হতে থাকবে। তখন লীগের ভোট ধরে রাখতে হলে লীগের সাথে আঁতাত আরো বাড়াতে হবে, পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি আরো বেশি বেশি পূরণ করতে হবে। এগুলো দেখে বিএনপির ভোট ব্যাংক আরো কমবে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের ওপর বিএনপির নির্ভরতা বাড়বে, আঁতাত ও পুনর্বাসন বাড়বে। এইটা একটা সাইকেল। একদিকে বিএনপি নিজে নিঃশেষ হতে থাকবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পরিপুষ্ট হতে থাকবে। বিএনপি এই দুষ্ট চক্রের ট্র্যাপে পড়ে গেছে। বিএনপির ভুল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও ইন্ডিয়া প্ল্যান করে বিএনপিকে এই ট্র্যাপে ফেলছে। এখান থেকে কি বিএনপিকে উদ্ধার করা সম্ভব?

Tuesday, 24 February 2026

ফিউচ্চারিস্টিক অনুমান

একটা ফিউচ্চারিস্টিক অনুমান শেয়ার করি - ১। সারাদেশে ২৬ টি স্থানে লীগের অফিস খোলার খবর পেলাম বিভিন্ন মিডিয়ায়। 'জয়বাংলা' স্লোগানে হয়েছে ঝটিকা মিছিল (গাইবান্ধায় প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে)। দলীয় পতাকা উত্তোলন, মুজিব ও খু/নী হাসিনার ছবি টাঙানো এবং তা ক্রমবর্ধমান। এইটা বিএনপির জন্যে অশনি সংকেত এবং জাশি /এনসিপির জন্যে লাইফ থ্রেট হিসেবে দেখছি। কারণ এ নরমালাইজেশনের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচণে নানা ব্যানারে প্রার্থী হবে লীগের সি টিম, ডি টিম। কেউ কেউ জিতেও যাবে। প্রশাসনে একসেস নিবে। নেটওয়ার্ক রিঅ্যাকটিভ করবে। দুর্নীতি, চুরি চামারি, ফাঁসানো- ইত্যাদি চলবে আগের মতো। তুমুল গন্ডগোল বাঁধাবে। সবগুলোর দায় বিএনপির কাঁধে চাপবে। দলে মিশে যাওয়া লীগ গু/ন্ডাদের চাঁদাবাজি, খু/ন - খারাবির দায় তো থাকবেই। নিজেদের ইস্যু প্লাস এই লীগ পুনঃপ্রবেশজনিত বিশৃঙ্খলা ডাবল ক্রাইসিস তৈরি করতে যাচ্ছে বিএনপির জন্যে। এই ইনফিলট্রেশন ও ক্রিমিনাল লেবেল নতুন দলে ট্রান্সফারের ফলে, লীগের প্রাক্তন সফ্ট সাপোর্টারের মনে নয়া বয়ান হাজির হবে - "সবই তো এক, লীগ তাড়ায়ে কি লাভ হইলো"- মেইনলি যারা এবার ধানে ভোট দিয়েছে। ২। দ্বিতীয় অশনি সংকেত চিফ প্রসিকিউটর দূর্দান্ত পেশাদার ও চরম সৎ তাজুল ইসলামকে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অপসারণ করাটা। তাজুল না থাকলে, যে বারো জন আর্মি অফিসার গ্রেফতার হইছিলো - তাও হইতো না - এতে আমি নিশ্চিত। অর্থাৎ তাজুল থাকলে ডগিফাই পার পাবে না। তাকে অপসারণ করা লাগবেই। ফ্যাক্ট ইজ -তারেক চাইলেও এটা ফেরাতে পারবে না। বিডিআর, ডগিফাই, আর্মিলীগের বিচার ঠেকানোর চুক্তিতে আপস করে, তারেক দেশে ফিরেছে আগেও লিখেছি। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সেই আপসের আরেকটা অংশ - এটা ক্লিয়ার হইলো। বিচারের নামে আইওয়াশ দেখবেন সামনে। "বিচার কতদূর"- এ প্রশ্ন এখন আর তোলা যাবে না। নতুন নিয়োগে, "নতুন করে কাজ শুরুর কারণে সময় লাগছে" অজুহাত দেখাবে। আমরা ভুলে যাব। একদিন তারাও লাপাত্তা। বিচারও লাপাত্তা। অর্থাৎ 'আপস তত্ত্ব' আর কোনো কনস্পিরেসি হিশেবে থাকবে না। পলিটিক্যাল ফ্যাক্ট হিশেবে প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে। ৩। মন্ত্রীসভায় কিছু লোকের মন্ত্রীত্ব পাওয়াকে তারেকের ম্যান্ডেট মনে হয় না। হিসাব মেলাতে পারিনি। বিভিন্ন আলাপে বিএনপির অনেকেকই কনফিউজড দেখলাম মন্ত্রীসভা নিয়ে। 'তারেক অরা' রেশের একটা চাপ আছে। সেই মনস্তাত্তিক চাপের ফলে আলাপ করতে কমফোর্ট ফিল করছে না। তবে সময়ের সাথে সাথে এই কনফিউজন প্রকাশ্যে দেখতে পাবেন। আমার অনুমান - কয়েকজন আছে ডিপস্টেট্ সেটাপ। কিছু করার নাই আশলে। আপসের বিনিময়ে ক্ষমতায় বসলে, সিদ্ধান্ত স্বাধীন রাখা যায় না। তো ওইসব মন্ত্রী জুলাইয়ের বিপক্ষে বিতর্কিত আলাপ দিয়ে যাবে ক্রমাগত- যেটা সরকারের জন্যে পপুলারিটি ক্রাইসিস তৈরি করবে। ৪। কারণ, এই জুলাই সফ্টলীগেরসহ সর্বস্তরের জনগণের ছিলো। কিছু ছাপড়ি আর দালাল ছাড়া, এটা বিএনপির অনেকেই ধারণ করে। ক্ষমতাসীন হবার পর জুলাইয়ের বিরুদ্ধে বিএনপির স্ট্যান্স লাউড এন্ড ক্লিয়ার। এই বোল্ড স্ট্যান্স লীগকে যোগাবে সাহস। বিএনপির হাতের তলে থেকে লীগ জুলাই সক্রিয়দের অ্যাসাসিনেশন করবে। বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে সঙ্গে থাকবে বিএনপি নেতারা। ডগিফাই পরে সেই সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ করে বিএনপিকে ফেলবে বেকায়দায়। লীগ, ডগিফাই, আর্মিলীগ বিচার থেকে নিস্তার পাইলে- এখন যে মিডিয়া বিএনপির তলা চাটছে - সবাই পল্টি মারবে। এইসব খু/ন - খারাবি নিয়ে বিএনপির ইমেইজ সংকট তৈরি করবে তুমুল প্রচারণায়। বিএনপি হয়ে পড়বে দূর্বল। বিএনপিতে যে পরিমান গাদ্দার আছে- যারা লীগ সুবিধা নিয়ে টিকে ছিলো গত দশক এবং র নিয়ন্ত্রিত ডগিফইয়ের হাতে ব্ল্যাকমেইল -তাদের প্ররোচনায় জাশিকে ঠেকাতে লীগকে ফুল একসেস দেওয়ার আলাপ উঠলে বিএনপির মধ্যে বিভাজন দেখা দিবে। ওটাই হবে লিটমাস টেস্ট। শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওই বিভাজনের ওপর নির্ভর করবে, দেশে আরেকটা জুলাই হবে কি হবে না। তারেককে আমি এখনো বিশ্বাস করি। আপস করলেও, সেটা নেসেসিটি অব টাইম ছিলো। যদি দু বছরের মধ্যে গুপ্তচর আইডেন্টিফাই করে, ব্ল্যাকমেইল হওয়া নেতাদের সাইড করে, প্রশাসন ও দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে - তবে সকলের জন্যে মঙ্গল। অন্যথায়, সেকেন্ড জুলাই অনিবার্য। ৫। শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে এই অনিবার্য ধ্বংস ঠেকানো যাবে না- পপুলারিটি লাগবেই। পপুলার লেজিটিমেসি ছাড়া কন্ট্রোল টেকসই হয় না। সো, জনমত পাশে না থাকলে বিপদ। শুধু ছাপড়ির সাপোর্ট ইনাফ না- এই আলাপ যত দ্রুত বুঝবে, ততই ভালো। যদি বিচার থেমে যায়, ন্যারেটিভ হাতছাড়া হয়, আর অভ্যন্তরীণ বিভাজন বিস্ফোরিত হয়- তাইলে "সেকেন্ড জুলাই" ঠেকানো যাবে না। ভারত ও ডগিফইয়ের নগ্ন সমর্থন, ট্রিকস , ফুল ব্যাকাপ, প্রশাসনিক সেটাপ থাকা সত্ত্বেও হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে - এইটা যেনো আমরা ভুলে না যাই। -----== তো, প্রেডিকশন হইলো - ২৪-৩০ মাসের কৌশলগত পলিটিক্যাল প্রাকটিস ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের সামনে আমরা দাড়ায়ে আছি। যেটা নির্ধারণ করবে - 'পুনর্গঠন' নাকি 'পুনর্বিস্ফোরণ।'

ডিসি মাসুদ

ডিসি মাসুদ একজন আগাগোড়া চাটুকার, নির্লজ্জ, বেহায়া পুলিশ। দুইটা ঘটনা বলি শুনেন। মির্জা আব্বাস নির্বাচনে এমপি হওয়ার পর সে ফুল নিয়ে তার কার্যালয়ে যায়। এরপর মির্জা আব্বাসের তোষামোদি করে আসে। কারণ ডিসি মাসুদ ভেবেছিলো মির্জা আব্বাস বড় কোনো মন্ত্রী হবে। আর ডিসি মাসুদ ছিলো মির্জা আব্বাসের নির্বাচনী এলাকার ডিসি৷ তাই নির্বাচনে ডিসি মাসুদের পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়। দ্বিতীয় ঘটনা আরো ভয়াবহ। তারেক রহমান নির্বাচনে জেতার পর নাহিদ ইসলামের বাসায় দেখা করতে যায়। নাহিদ ইসলামের বাসা যেহেতু ডিসি মাসুদের এলাকায় তাই ঐদিন সে আইনশৃংখলা বাহিনীর দায়িত্বে ছিলো। নাহিদের সাথে তারেক রহমানের আলোচনা শেষ হলে ডিসি মাসুদ নিয়ম বর্হিভূতভাবে সেই রুমে প্রবেশ করে। তারপর তারেক রহমানকে একটা লম্বা সালাম দিয়ে বলে, "স্যার আমি মাসুদ। রমনা জোনের ডিসি। আমার বাড়ি বগুড়া।" এই কথা শুনে তারেক রহমান ডিসি মাসুদের কাধে স্নেহের হাত বুলিয়ে দেন। এরপর থেকেই ডিসি মাসুদ বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারেক রহমানের স্নেহের পরশ পাওয়ার পর উনি আর কাউকে পরোয়া করছেন না।

হাদি বলেছিলেন

হাদি সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ্জা-মান" কে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিলেন:— সাহস থাকলে ক্যু করে দেখান। জনগণ গিয়ে ইট খুলে আনবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে। এটা কোনো হুমকি ছিল না— এটা ছিল জনতার শক্তির ঘোষণা। "হাদি প্রধান উপদেষ্টার" চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন:— আমি বিশ্বাস করি, আপনি পালাতে আসেননি। তাই ভয় পাবেন না। নামগুলো বলেন- কারা আপনাকে কাজ করতে দিচ্ছে না। এই কথার ভেতর ছিল না ভদ্রতার মুখোশ, ছিল সত্য বলার চূড়ান্ত সাহস। "ইন্টেরিমের উপদেষ্টাদের" উদ্দ্যেশে হাদি বলেছিলেন:— একজন রিকশাওয়ালাও জানে- আপনাদের কেউ ভালো না। আপনারা জুলাইকে বেঁচে দিয়েছেন। এক পা বিদেশে, আরেক পা ক্ষমতার টেবিলে। শহীদদের রক্তের সঙ্গে আপনারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এই অভিযোগ কোনো গুজব না— এটা রাজপথের রায়। "হাদি বিএনপি"-কে বলেছিলেন:— শহীদ জিয়ার দলকে ভা'র'তের দাস বানাতে দেবো না। কারণ স্বাধীনতার নামে দাসত্ব মানে শহীদদের অপমান। "হাদি জামায়াতে ইসলামী"-কে বলেছিল:— নিজামী, সাঈদীর জামাতকেও ভা'র'তে'র দাস হতে দেবো না। কারণ আদর্শের কথা বলে পরাধীনতা মেনে নেওয়া সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি। "হাদি এনসিপি"-কে সোজাসাপটা বলেছিলেন:— তোমরা জুলাইকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়েছ। মনে রেখো- জুলাই কোনো দলের না, জুলাই পুরো দেশের। এই কথায় কেঁপে উঠেছিল অনেকের সাজানো বয়ান। "হাদি এমনকি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী-লীগের" ক্ষেত্রেও বলেছিলো:— যারা গণহ*/ত্যায় জড়িত না, তাদের সাথেও ইনসাফ করতে চাই। কারণ হাদির রাজনীতি ছিল প্রতিশোধের না। ন্যায়ের, ইনসাফের। ঢাকা–৮ আসনে হাদি নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা আব্বাস আর হেলাল উদ্দীনকে "ভাই" বলে দোয়া চেয়েছিলেন:— কারণ সে শিখিয়েছিলো, রাজনীতি মানেই শত্রুতা না, রাজনীতি মানেই মানবতা, আদর্শ। হাদি “হেভিওয়েট রাজনীতি”র মিথ ভাঙতে চেয়েছিলো:— ক্ষমতা আর টাকার কাছে মাথা নত না করে সবার জন্য সমান মাঠ গড়তে চেয়েছিল। হাদি প্রমাণ করতে চেয়েছিল:— সততা, ভালোবাসা, ত্যাগ আর জনগণের ভাষা বুঝতে পারলে, কোটি টাকার প্রার্থীকেও হারানো যায়। "হাদি চেয়েছিল" হিন্দুদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম:— যাতে কোনো দল আর কোনো সময় তাদের ভোটব্যাংক বানিয়ে ব্যবহার করতে না পারে। হাদি স্বপ্ন দেখেছিলো:— ভা'র'তীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই দেশের মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানোর। হাদি কালচারাল ফ্যা'সি'জমের বিরুদ্ধে যোগ্য, দক্ষ সাহসী মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিলো। হাদী চেয়েছিলো:- জুলাইয়ের শহীদদের খু*/নীদের বিচার। "৫৭ বিডিআর" হ*/ত্যার বিচার। ৫ই মে শাপলা গণহ*/ত্যার বিচার। সকল চাঁদাবাজি বন্ধ এবং বিচার বহিঃভূত হ*/ত্যাকান্ডের বিচার। Barrister Shariar Kabir

Monday, 23 February 2026

চুপ্পুনামা

যে ফ্যাসিস্ট হানিনা চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি করলেন। তো, সাংবিধানিক ভাবে হাসিনার মেয়াদও ২০২৮ পর্যন্ত নাকি? সংবিধানের কোথায় ছিলো তত্বাবধায়ক সরকার? তিনি কিসের উপর তাদেরকে শপথ পাঠ করালেন? বালেরকন্ঠ আর ডীপ সব একাকার। সাংবাদিক Rajib Ahamod এর পোস্টটি আপনারা পড়ুন নিচে- 'চমকানো তথ্য দিলেন রাষ্ট্রপতি' শিরোনামে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সাক্ষাতকার পড়ে চমকানোর মত কিছু পাইনি। সাক্ষাতকারটিতে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রশ্নের জবাবের নামে ইউনূস সরকারকে গালাগালির জন্য চুপ্পু প্ল্যাটফর্ম দেওয়া হয়েছে সাক্ষাতকারে। যেখানেই চুপ্পু নিজেই সংবিধান লঙ্ঘনকারী। ১. চুপ্পুর দাবি করেছেন, তাঁকে সরাতে অসাংবিধানিক উপায়ে চেষ্টা হয়েছিল। তিনি দৃঢ় থেকে সংবিধানকে রক্ষা করেছেন। তো এক্ষেত্রে প্রশ্ন করা উচিত ছিল, সেখানে ৭(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা পরাহূত করা মৃত্যুদন্ড যোগ্য অপরাধ, সেখানে তিনি কীভাবে সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান না থাকা সত্ত্বেও ইউনূস সরকারকে শপথ পড়ালেন? সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের কারণে, রাষ্ট্রপতির বাপেরও ক্ষমতা নেই ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স চাওয়ার। মন্ত্রিসভার অনুমোদন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বাধ্যতামূলক। তো শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার পর, কীভাবে ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের কাছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের রেফারেন্স চেয়েছিলেন? শুধু এই দুটি নয়, সংবিধানের আরও চারটি লঙ্ঘন করেছিলেন এবং এখনও করছেন চুপ্পু। চব্বিশের ৬ আগস্ট তিনি, ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কীভাবে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দিয়েছিলেন? একই অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে সংসদ বিলুপ্ত করেছিলেন? কীভাবে খালেদা জিয়ার সাজা বাতিল করেছিলেন? ৪(ক) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘণ করে কীভাবে বঙ্গভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়েছে? এগুলোর সবগুলোর উত্তর হল, অভ্যুত্থানের দোচনের মুখে করেছিলেন। ৫৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ ছাড়া সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির বাপেরও নাই। সংবিধান ক্লিয়ার, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও, রাষ্ট্রপতি তা শুরুতেই করতে পারবেন না। আগে তাকে দেখতে হবে, সংসদের অন্য কোনো এমপি সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির আস্থাভাজন কী না। এমন কাউকে না পাওয়া গেলে, তবেই সংসদ ভাঙবেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু এগুলোর কোনোটি না করে সংসদ ভেঙে, অ্যাটর্নি নিয়োগ দিয়ে, রেফারেন্স চেয়ে এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে চুপ্পু বারবার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। বাকি আলাপ বাদ, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ছাড়া বাজেট হবে না, হবে না, হবে না। কিন্তু চুপ্পু এগুলো অনুমোদন করেছেন। তাহলে কে সংবিধান লঙ্ঘনকারী? ২. তবে আসল কথা হল, সংবিধান মেনে অভ্যুত্থান হয় না। অভ্যুত্থান সংবিধান মানেও না। অভ্যুত্থানে জনগণের জনগণের অভিপ্রায়ের যে পরম অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, ওইটাই আসল এবং একমাত্র সংবিধান। সংসদ বিলুপ্তি, অ্যাটর্নি নিয়োগ, রেফারেন্স চাওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ জনগণের অভিপ্রায়েই হয়েছে। সুতরাং সব বৈধ। সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর আলাপ হল, তাঁকে সরানোর জন্য যে 'অসাংবিধানিক চেষ্টা' হয়েছিল সব বিএনপি এবং সশস্ত্র বাহিনীর কারণে ব্যর্থ হয়েছে। পুরনো পত্রিকা ঘাঁটলে দেখবেন, চুপ্পুকে প্রথম দিকে সরকার ও ছাত্ররা মেনে নিয়েছিল। 'শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র পাননি'- এই রকম একটা বক্তব্যের কারণে ছাত্ররা ক্ষেপে উঠে। চুপ্পুর অপরাসারণের দাবিতে বঙ্গভবনের দিকে যায়। তখন বিএনপি চুপ্পুর পক্ষ নেয়। এটা নিয়েছিল চুপ্পুর প্রতি প্রেমের কারণে না। কারণটা ছিল, অভ্যুত্থানের পরের দেড় মাসে পরিস্থিতি নরমালের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময়ে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিলে, দেশে আর কোনো পদক্রম, প্রজাতন্ত্র কোনোটাই থাকত না। প্রধান উপদেষ্টা যদি তাঁর সাংবিধানিক 'বস' রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে পারে আন্দোলনের জোরে, তাহলে প্রধান উপদেষ্টাকে তাঁর নীচের পদের কেউ সরিয়ে দিতে চেষ্টা করবে না- এই নিশ্চয়তা নেই। তাই বিএনপি এনার্কিতে যায়নি। আরেকটা কারণ হল, গণভোটের আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের যে টেকনিক্যাল আইনী বৈধতা ছিল, তা ছিল রাষ্ট্রপতির সংসদ বিলুপ্ত করা, আদালতের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ পড়ানোর কারণেই। তো রাষ্ট্রপতি যে বলছেন, প্রধান উপদেষ্টা বিদেশ সফরের বিষয়ে তাকে না জানিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন, এর আগে তার ভাবা উচিত- উনি কতবার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। ৩. চুপ্পুর একজন স্টাফ আমাদের বন্ধু। চব্বিশের অক্টোবরে উনি আমাকে জানিয়েছিলেন, মহামান্য আজকাল জিয়াউর রহমানের জীবনী পাঠ করছেন। বিএনপিকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন। এখনও সেই চেষ্টা অব্যহত রেখেছেন। 'তারেক রহমান আপনার আব্বাকে একটু আব্বা ডাকি'- গান গাইছেন। কিন্তু বিএনপি যে এতে গলছে না, তা ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরেই টের পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রাচার হলো, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিলে, প্রধানমন্ত্রী আগে যান। রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করেন। তারপর কর্মসূচি শেষে রাষ্ট্রপতিকে বিদায় দেন। কিন্তু একুশ ফেব্রুয়ারি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বেরিয়ে যাওয়ার পরের মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারে প্রবেশ করেছেন। এটা তো কাকতালীয় নয়। প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত এড়িয়েছেন। প্রটোকল মেনে চললে, রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করে একসঙ্গে ফুল দেওয়ার কথা। ৪. নির্বাচনের আগে সাক্ষাতকারে রাষ্ট্রপতি জানিয়েছিলেন তিনি অপমাণিত বোধ করছেন। নির্বাচনের পর পদত্যাগ করবেন। এখন ডেকে নিয়ে সাক্ষাতকার দিয়ে, বিএনপি ও তারেক রহমানকে তেল দিয়ে চুপ্পু যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তা হচ্ছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত পদে থাকার চেষ্টা। কারণ, পদত্যাগ চুপ্পুর জন্য বিপজ্জনক। সংবিধানের কারণে সিটিং রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলে না। বিচার করা যায়। পদত্যাগের পর চুপ্পুকে এগুলো ফেইস করতে হবে। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম-নাগরিকত্ব, দু্বাইয়ে টাকা পাচারের মাধ্যমে প্রপার্টি কেনা, এস আলমের সঙ্গে ঘনিষ্টতার জোরে ইসলামী ব্যাংকে ঢুকে লুটপাট, দুদকে থাকার সময় খাম নেওয়া- অনেক কিছুর জন্য তাকে ধরা হবে। তাই চেষ্টা করছে, বিএনপিকে তেল মালিশ এগুলো থেকে বাঁচা যায় কিনা। এই কারণেই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি। সরকার জানত, একবার বিদেশ গেলে আর ফিরবে না। ৫. আমি সাক্ষাতকার নিলে, যে প্রশ্নটা করতাম তাহলো, আপনি বলেছিলেন পদত্যাগ করবেন- তাহলে কবে যাচ্ছেন? এই বেসিক প্রশ্নটাই নেই। এর মানে এটা সাক্ষাতকার নয়। পেইড পিআর। চুপ্পু বারাবার দুঃখ করে বলেছেন, তার ছবি বিদেশি মিশন থেকে সরিয়ে অপমাণ করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধানের ৪(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তো, রাষ্ট্রপতির অফিসে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকার কথা। সেই ছবি কী আছে? নাই। চোদনের মুখে সরিয়ে ফেলেছে। তো যে চোদনের মুখে সংবিধান লঙ্ঘন করে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে ফেলে, সে কীভাবে আশা করে তার ছবি অন্যরা রাখবে? সংবিধান এবং আইনানুযায়ী, সরকারি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন যেকোনো দপ্তরে, দূতাবাসে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু এবং সরকারপ্রধানের ছবি থাকবে। দূতবাসে থাকবে রাষ্ট্রপতির ছবি। কয়েকদিনের জন্য হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টারাও নিজেদের ছবি ঝুলিয়েছিলেন। ড. ইউনূস এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। তারেক রহমান তা অব্যহত রেখেছেন। কোথাও প্রধানমন্ত্রীর ছবি নেই। যুক্তির কথা ধরতে গেলে, ড. ইউনূসের মত তারেক রহমানও সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ নিয়ে তা রক্ষা করছেন না। ৪(ক) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন কররছেন, বঙ্গবন্ধু ছবি না লাগিয়ে। পদ যাওয়ার এটুকুই যথেষ্ট। ৬. এ কারণেই সংবিধানে কী লেখা আছে, এটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল জনগণের অভিপ্রায়। নতুন সংসদ বসার পর ১০ মিনিটের মধ্যে স্পিকার নির্বাচিত হয়ে যাবে। এরপর আর সাংবিধানিক শূন্যতার আশঙ্কা থাকবে না। চুপ্পু যতই বিএনপিকে তেল দিক বা পিআর ক্যাম্পেইন করুক, আমার ধারনা তাকে রাষ্ট্রপতি পদে রাখবে না সরকার। কারণ, দুদকে থাকাকালে নানা তত্ত্ব হাজির করে যেভাবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, তা 'হি ওয়াজ ভেরি কর্ডিয়াল' এই তেলে মুছবে না। তবে পদত্যাগের আগে চুপ্পুকে অভিশংসন করা উচিত। তারপর যা আকাম অতীতে করেছে, এর ন্যায়বিচার করা উচিত। যাতে সাক্ষাতকার নিয়ে তাকে সাধু সাজানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।