Wednesday, 4 March 2026
পারমাণবিক বোমা অর্জনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভাগ্য এত বেশী সহায়ক ছিল যা অন্যকোন দেশের ক্ষেত্রে ন্যুনতম ছিল না।
পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার স্বপ্ন বুনন শুরু হয় ১৯৭০ এর দশকে: জুলফিকার আলী ভুট্টোর উদ্যোগে এবং এই প্রোগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করেন।
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি, ভুট্টো মুলতানে একটা গোপন মিটিংয়ে পাকিস্তানের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের ডেকে নেন এবং নিউক্লিয়ার ওয়েপনস প্রোগ্রাম শুরু করার নির্দেশ দেন।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিন্তা করছিলেন যে নিউক্লিয়ার শক্তি অর্জনের। ভুট্টোর বিখ্যাত ডায়লগ"আমরা ঘাস খাবো, এমনকি ক্ষুধার্ত থাকবো, কিন্তু নিজেদের নিউক্লিয়ার বোমা বানাবো। আমাদের অন্য কোনো চয়েস নেই।"
এই মিটিংয়ে ভুট্টো পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন (PAEC) চেয়ারম্যান মুনির আহমেদ খানকে দায়িত্ব দেন, ১৯৭৬ সালের মধ্যে সম্ভাব্য সকল এস্যাইনমেন্ট শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করেন ।
ড. আব্দুল কাদির খান যাকে বলা হয় "ফাদার অফ পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার বোম"। ১৯৭০এর দশকে নেদারল্যান্ডসের ইউরোনকো কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়ে খান গোপনে সেন্ট্রিফিউজ টেকনোলজি আয়ত্ত্ব করেন, যা ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্টের মূল চাবিকাঠি।
এই টেকনোলজি নিয়ে ফিরে এসে খান ১৯৭৬ সালে কাহুটা রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ (KRL) স্থাপন করেন যা রাওয়ালপিন্ডির কাছে একটা দুর্গম জায়গা, ভারতের সীমান্তের খুব কাছে। এখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হতো, যা বোম তৈরির মূল উপাদান। কিন্তু এই লোকেশনটা ছিল ভয়ংকর রিস্কি কারণ ভারতীয় এয়ারফোর্সের নাগালের মধ্যে!কাহুটা ছিল পাকিস্তানের অ্যাকিলিস হিল।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW কীভাবে এই গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কথা জানতে পারলো? ১৯৭০ এর শেষভাগে, বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে, RAW পাকিস্তানের পশ্চিম ইউরোপ থেকে গোপন নিউক্লিয়ার ইকুইপমেন্ট কেনা নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট করে যেমন প্লুটোনিয়াম টেকনোলজির জন্য ১১ মিলিয়ন ডলার খরচ।
AQ খানের নেদারল্যান্ডস থেকে সেন্ট্রিফিউজ ডিজাইন হাতানোর খবর ১৯৭৯ সালে জার্মান ব্রডকাস্টার ZDFএর ডকুমেন্টারিতে প্রকাশ হয়, যা RAW কে আরও সতর্ক করে।
এছাড়া,১৯৭৮ সালে ফরাসি কূটনীতিকরা কাহুটার কনস্ট্রাকশন সাইটের ফটো তুলে ইউএস এবং ভার*তীয় গোয়েন্দাদের সাথে শেয়ার করেন, যা সন্দেহ কে নিশ্চিত করে।
RAW গোপনে ঢুকে পড়ে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেয় যেমন কাহুটা, ইসলামাবাদ এবং সিহালাকে "সেন্ট্রিফিউজ ট্রায়াঙ্গল" হিসেবে চিহ্নিত করে।
আরেকটি কাহিনি আছে। RAW পাকিস্তানের টপ সাইন্টিস্টদের দীর্ঘদিন ধরে নজরে রাখা শুরু করে। কাহুটার বিষয় নজরে আসলে তারা এখানে জোর নজরদারি চালায়।
নিউক্লিয়ার সাইন্টিস্টরা যেখানে চুল কাটাতে যেতো সেখানকার সেলুন থেকে তাদের চুল সংগ্রহ করে। পরে ল্যাবে তাদের চুলে অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তা দেখে তাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা অর্জনের চেষ্টা করছে।
ভার*ত মিলিটারি অ্যাটাকের প্ল্যান তৈরি করে । কিন্তু এখানে আসে প্রথম বড় টুইস্ট ভা*রতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই! ১৯৭৯ সালে দেশাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে ফোন করে RAW এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানিয়ে দেন।
পাকিস্তানী সেনারা তড়িঘড়ি অভিযান চালিয়ে RAW এজেন্টদের ধরে ফেলে। দেশাইয়ের এই "বিশ্বাসঘাতকতা" (কেউ বলে শান্তির জন্য, কেউ বলে ব্যক্তিগত কারণে) পাকিস্তানের প্রোগ্রামকে বাঁচিয়ে দেয়।
এরপর দেশাই ইস*রায়েলে*র ১৯৭৭ সালের একটা প্রপোজালও রিজেক্ট করেন, যেখানে ইস*রায়েল কাহুটা অ্যাটাকের জন্য ভা*রতের সাথে জয়েন্ট অপারেশন চায়।বলা হয়ে থাকে মোররাজি দক্ষিণ এশিয়ায় উদারপন্থার কারণে সামরিক সংঘাত থেকে এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নেন।
ভুট্টোর লিডারশিপে এই প্রোজেক্ট ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চলে, পরে জিয়াউল হকের মিলিটারি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে।
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফ*গানি*স্তান আক্রমণ করে। এটা পাকিস্তানের জন্য গোল্ডেন অপরচুনিটি! আমেরিকা সোভিয়েতকে হারাতে চায়, আর পাকিস্তানী আর্মি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পার্টনার।
বিনিময়ে? ৪০টা F-16 ফাইটার জেট! এই জেটগুলো কাহুটাকে প্রটেক্ট করার জন্য পারফেক্ট। ভার*তের যেকোনো অ্যাটাক রুখে দিতে পারে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক বলেছিলেন, "আমরা ঘাস খেয়ে থাকব, কিন্তু বোম বানাবো!" এই F-16 প্যাকেজটা ছিল তাদের শিল্ড। আমেরিকা জানতো পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম, কিন্তু আফ*গান যুদ্ধের জন্য চোখ বুজে রাখে। পরবর্তীতে, ১৯৯০ সালে প্রেসলার অ্যামেন্ডমেন্ট দিয়ে আমেরিকা পাকিস্তানকে সামরিক সাহায্য বন্ধ করে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ভাগ্যের খেলা, তাই না? ইস*রায়ে*লের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে লেটার লেখেন, পাকিস্তানের "এটম বম" কে "মর্টাল ডেঞ্জার" বলে সতর্ক করেন। বেগিন ফ্রান্স এবং ওয়েস্ট জার্মানির লিডারদেরও একই লেটার পাঠান। কিন্তু ডিপ্লোম্যাসি না চলায় ই*সরা*য়েল অ্যাকশন নেয়।
১৯৭৯-১৯৮১ সালে মো*সাদ AQ খানের ইউরোপীয় সাপ্লায়ারদের উপর বোম অ্যাটাকস চালায়, যেমন ফ্রান্সে একটা কোম্পানির অফিস ধ্বংস। এমনকি AQ খানকে অ্যাসাসিনেট করার চেষ্টা করে বিষ দিয়ে বা বোম দিয়ে, কিন্তু খান বেঁচে যান!১৯৮১ সালে ইস*রায়েলী এয়ারফোর্স ইরাকের ওসিরাক নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরে অ্যাটাক করে, পুরোটা ধ্বংস করে দেয় কোনো লস বা বাধা ছাড়াই!
এটা থেকে অনুপ্রাণিত হয় ভার*ত। কেন? কারণ ইস*রায়েলে*র ভয় ছিল "ইসলামি দেশের হাতে এটম বোম" এবং তা যদি যদি লিবিয়া বা অন্য আরব দেশগুলোর হাতে পড়ে, তাহলে ইস*রায়ে*লের অস্তিত্ব বিপন্ন।
১৯৭৯-১৯৮৩ সালে ইস*রা*য়েল আর ভা*রত জয়েন্ট প্ল্যান করে: ইস*রা*য়েলী F-16 এবং F-15 জেটগুলো ভা*রতের জামনগর এয়ারবেস থেকে উড়বে, উধমপুরে রিফুয়েল করবে, আর কাহুটায় বোমা ফেলবে। ভার*তীয় জাগুয়ার জেটগুলো সাপোর্ট দেবে।
ভা*রতের মিলিটারি অফিসাররা ইস*রা*য়েল গিয়ে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইকুইপমেন্ট কেনে। ইন্দিরা গান্ধী দুবার অ্যাপ্রুভ করেন কিন্তু আমেরিকার চাপে ব্যাক আউট করেন! আমেরিকা বলে, "যদি অ্যাটাক করো, আমরা পাকিস্তানের সাইড নেবো।" CIA পাকিস্তানকে টিপ অফ দেয়, আর প্ল্যান ফেল হয়। ইন্দিরা বলেছিলেন, "আমরা চাই না যুদ্ধ, কিন্তু প্রস্তুত আছি।" কিন্তু শেষমেশ পিছু হটেন।
পরবর্তীতে, ১৯৮৭ সালে ভার*তের আর্মি চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৃষ্ণাস্বামী সুন্দরজি "অপারেশন ব্রাসট্যাকস" দিয়ে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ শুরু করার চেষ্টা করেন, যাতে কাহুটা অ্যাটাক করা যায় কিন্তু আবার আমেরিকার চাপে থেমে যায়। ১৯৯৮ এর বিজয় এবং লং-টার্ম ইফেক্টসইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর (১৯৮৪) ভার*তের অন্য সরকারগুলো আর এই পথে যায়নি।
রাজীব গান্ধীর সময়েও চেষ্টা হয়, কিন্তু আমেরিকা আর পাকিস্তানের F-16-এর ভয়ে থেমে যায়। অবশেষে, ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান নিউক্লিয়ার টেস্ট করে চাগাই-১! বিশ্ব অবাক, কিন্তু পাকিস্তানের স্বপ্ন পূরণ হয়। এরপর ১৯৯১ সালে ভা*রত-পাকিস্তান নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটিস অ্যাটাক না করার অ্যাগ্রিমেন্ট সাইন করে। এটা শুধু টেকনোলজির জয় নয়, ডিপ্লোম্যাসি, স্পাই গেম, অ্যাসাসিনেশন অ্যাটেম্পটস আর ভাগ্যের খেলা।রাহাত হাকিমি।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment