Friday, 6 March 2026

ও সুন্নীদের মধ্যে কেনো মতপার্থক্য ?

ইসলাম ধর্মে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় সৃষ্টি হয় নবীজীর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর। শিয়া এবং সুন্নীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতিষ্ঠিত মুসলমান সমাজের কে হবেন পরবর্তী নেতা তা নিয়ে। গোড়ার দিকে ইসলামে কিভাবে গোষ্ঠী সৃষ্টি হলো তা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করলে আজকের আধুনিক মুসলিম সমাজকে বুঝতে সুবিধা হবে। এই বিভক্তি ১৩শ’বছর ধরে মুসলমানদের কাছ থেকে মুসলমানদেরকে পৃথক করে রেখেছে। রাসুলুল্লাহ(সঃ)-এর দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর মুসলমানদের যারা শাসন করেছেন তাদের খলিফা বলা হয়। শিয়ারা বিশ্বাস করে যে প্রথম খলিফা ছিলেন হজরত আলী। আলী ছিলেন রাসুল (সঃ)-এর চাচাতো ভাই এবং নবীজির কন্যা ফাতিমাকে বিয়ে করেছিলেন। হজরত আলী হলেন রাসুলের দৌহিত্রদের পিতা। কিন্তু সুন্নীরা আবু বকরকেই প্রথম খলিফা বলে মনে করে। শিয়া এবং সুন্নীরা হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় দুটি গোষ্ঠী। তাদের ধর্মীয় মতবাদ এবং ইতিহাস জানা ও বোঝা জরুরি। শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয় নবী মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত মুসলমান সমাজের কে হবেন পরবর্তী নেতা তা নিয়ে। শিয়ারা দাবি করে, নবী মুহাম্মদ শেষবার হিজরতকালে পথিমধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং তার সহযাত্রীদের সম্মুখে ঘোষণা করেন হজরত আলী হবেন পরবর্তী উত্তরাধিকারী। কিন্তু সুন্নীরা বিশ্বাস করে, দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় নবী তার আরেক স্ত্রীর পিতা আবু বকরকে উত্তরাধিকার নির্বাচন করেন। শিয়াদের বক্তব্য হলো, আলী যখন নবীকে কবর দিতে ব্যস্ত তখন হজরত উমর (পরবর্তীতে ২য় খলিফা নির্বাচিত হন) সাহাবাদেরকে ডাকেন এবং আবু বকরকে নেতা নির্বাচিত করেন। সুন্নী মুসলমানরা বলে, আবু বকরের নির্বাচনই সঠিক। শিয়ারা বলে প্রকৃতপক্ষে আলী প্রথম খলিফা এবং ইমাম। আবু বকরের পর উমর এবং উসমান খলিফা নির্বাচিত হন। উসমানের হত্যাকাণ্ডের পর আলী চতুর্থ খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সকলেই তা মেনে নেন, শুধু বর্তমান সিরিয়ার তখনকার বাসিন্দারা ব্যতীত। ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে উসমানের হত্যার পর আলী ক্ষমতায় আসেন, কিন্তু তার শাসনকাল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অবশেষে আলী ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে আততায়ীর হাতে নিহত হন এবং তার পুত্র ও নবীর দৌহিত্র হোসেন ক্ষমতারোহন করেন। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের নেতা হয়ে উঠা মোয়াবিয়া তাকে অস্বীকার করেন। মোয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। তৎকালীন ইরাকিরা আলীর দ্বিতীয় পুত্র হুসেনকে সমর্থন করেন। হুসেন ইরাকের নগরী কুফায় গমন করেন এবং খিলাফতের দাবিতে রাজধানী দামাস্কাস অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। পথে কারবালা নামক স্থানে তিনি ইয়াজিদ বাহিনীর হামলার শিকার হন। ইয়াজিদ বাহিনী হুসেনের পরিবারসহ শিশুদের খাবার পানি সরবরাহ করতে অস্বীকার করেন এবং তাদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হুসেনের শিরচ্ছেদ করা হয় এবং তার বোন জয়নাবকে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। শিয়ারা এই ঘটনাকে তাদের ইতিহাসের উৎস মনে করে। তারা আলী, হুসেন এবং নবী পরিবারের যারা নিহত হয়েছেন তাদেরকে জীবন্ত প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে। এখান থেকেই তারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের চিন্তায় থেকে যায় অত্যাচার, করুণ ঘটনা এবং শহীদ হওয়ার কাহিনী। সুন্নী ইসলামে আইন বিষয়ক চারটি তরিকা রয়েছে — হানাফি, সাফি, মালিকি এবং হানবালি। অন্য একটি উঠে আসা গোষ্ঠী হলো ওয়াহাবি গোষ্ঠী। এই ওয়াহাবিরাই আজকের সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাশীল। ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ আবদ আল ওয়াহাব (১৭০৩–১৭৯২)। তিনি মূলত হানবালি মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। ওয়াহাব আরব প্রধান ইবনে সৌদের সঙ্গে হাত মেলান এবং তারা দু’জনে মিলে আরব উপদ্বীপ দখল করেন। পরে সৌদের পরিবার আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজ্যের ইসলাম চর্চা শুরু হয় ওয়াহাবি মতবাদ অনুসারে। তারা জামাতে উপস্থিত হওয়াকে বাধ্যতামূলক করে। ওয়াহাবিরা শিয়াদের সহ্য করতে পারেনি। ১৮০২ সালে আধুনিক ইরাকের কারবালা তারা ধ্বংস করে এবং যত শিয়া পুরুষ, নারী ও শিশু পাওয়া যায় তাদের হত্যা করে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে কারবালা একটি পবিত্র শহর। ওয়াহাবি মতবাদের অনুসারীরা একটি কট্টর ও উগ্র সম্প্রদায়। তারা মুসলমানদের কিছু সম্প্রদায়কে স্বধর্মত্যাগী মনে করে এবং শিয়াদের হত্যা করা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করে। এই কারণে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র রক্তাক্ত হয়েছে এবং গৃহযুদ্ধ বেঁধেছে বারবার। অধিকাংশ সুন্নী মনে করে, বিরোধীতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ওয়াহাবিদের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের সহিংসতা, যা পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

No comments:

Post a Comment