Friday, 15 September 2023

শাপলা অভিযান ও অধিকারের সাজা

শাপলা অভিযান ও অধিকারের সাজা ➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖ 🌗 ২০১৩ সালের ৫ই মে রাজধানী ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক 'হেফাজতে ইসলাম' নামের সংগঠনের বিশাল জমায়েতে গভীর রাতে চারপাশের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে নিরাপত্তাবাহিনীগুলো "অপারেশন ফ্ল্যাশআউট" ও "সিকিউর শাপলা" নামে যে মিলিত অভিযান চালায় তাতে কতো লোক নিহত হয়েছিল? 🌗 এ বিতর্ক ঘটনার দশ বছর পর ফের উঠছে ঢাকার এক সাইবার আদালত জাতিসংঘের অ্যাফিলিয়েটেড এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশী মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' এর দু'জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে জেল-জরিমানা করার কারণে। এই দণ্ড দেয়া হয়েছে সরকারের আনীত একটা অভিযোগের ভিত্তিতে। সেই অভিযোগটি হচ্ছে, হেফাজতের সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করে তাড়িয়ে দেয়ার দেয়ার অভিযানে ৬১ জন নিহত হয় বলে 'অধিকার' যে পরিসংখ্যান প্রচার করে তা' অতিরঞ্জিত এবং এতে দেশে আরো সহিংসতার উস্কানি দেয়া হয়েছে, আর বিদেশে ক্ষুন্ন করা হয়েছে সরকারের ভাবমূর্তি। 🌗 অর্থাৎ আপত্তি ও বিচার্য বিষয় ছিল ওই অভিযানে নিহতের সংখ্যা এবং এই সংখ্যার বিকৃতিই সাজার কারণ। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এই সরকারের আমলে ন্যায়বিচারের বদলে সরকারি দলের লোকদের মামলা-মোকদ্দমা থেকে অব্যাহতি দেয়া এবং সরকারের অপছন্দের লোকদের সাজা দেয়াকেই তাদের কর্তব্য বলে বেছে নিয়েছে। না হলে প্রশ্ন করা যেতো, মামলার রায় দেয়ার তারিখ পিছিয়ে পার্লামেন্টে পুরনো সাইবার অপরাধ আইনকে নতুন আইন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার পরদিন কেন পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছিল? প্রশ্ন করা যেতো, নিহতের সংখ্যা 'অধিকার'-এর প্রচারিত ৬১ অতিরঞ্জিত হয়ে থাকলে প্রকৃত সংখ্যা কতো? এই নিহতের প্রকৃত হিসেব কি আদালত নিয়েছে বা চেয়েছে সরকারের কাছে? নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিচয় নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে নিরূপন না করে কিভাবে আদালত 'অধিকার'-এর প্রচারিত সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত বলে নিশ্চিত হয়ে সাজার রায় দেয়? 🌗 বাংলাদেশে ন্যায়বিচার থাকলে আরও অনেক গুরুতর প্রশ্ন তোলা যেতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শাপলা চত্বেরের ওই অভিযানের পর পার্লামেন্টে দাবি করেছিলেন, সেদিন একটি গুলিও ছোঁড়া হয়নি এবং একজনও নিহত হয়নি। সকৌতুকে ও সহাস্যে তিনি বলেছিলেন, হেফাজতের লোকেরা রাতের বেলা শাপলা চত্বরে গায়ে লাল রঙ মেখে মৃতের ভান করে শুয়ে ছিল। পুলিস গিয়ে যখন তাদের ধরে তোলার চেষ্টা করে তখন সব লাশ উঠে দৌড় মারে। 🌗 আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অভিযান শুরুর আগে অনতিবিলম্বে শাপলা চত্বর ছেড়ে না গেলে হেফাজতকে 'গর্তে ঢুকিয়ে দেয়ার' হুমকি দেন। ওদিকে হেফাজতের সমাবেশ থেকে বলা হয় যে, তাদের আমির মৌলানা শাহ্ আহমদ শফিকে সমাবেশে আসতে দিলে তারা তাঁর নেতৃত্বে মোনাজাত করে চলে যাবেন। কিন্তু তাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি। মৌলানা শফিকেও আসতে দেওয়া হয়নি সমাবেশস্থলে। মধ্যরাতে সেখানে পুলিস, র‍্যাব সহ বিভিন্ন নিরাপত্তাবাহিনী সশস্ত্র হামলা চালায়। সেই দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করতে থাকায় দুটি টিভি চ্যানেল - দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভির প্রথমে সম্প্রচার বন্ধ এবং পরে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। 🌗 শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ছিল মূলতঃ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পালটা প্রতিক্রিয়া। হেফাজতের অভিযোগ ছিল যে, নাস্তিক ব্লগারদের উদ্যোগে শাহবাগে যে গণজাগরণ মঞ্চ বসানো হয়েছে তারা আল্লাহ্, রাসুল ও ইসলামের বিরুদ্ধে অশ্লীল প্রচারণায় লিপ্ত। এদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ধর্মদ্রোহ বা ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন সহ ১৩ দফা দাবিতে তারা শাপলায় এ সমাবেশ করে। গণজাগরণ মঞ্চ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ চত্বর ও সড়ক অবরোধ করে শাহবাগে টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে রাতদিন তাদের অবস্থান চালিয়ে গেলেও পুলিস তাদের নিরাপত্তা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ ও শাসক দলের নেতারা তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। অপরদিকে জমায়েত শুরু হবার কয়েক ঘন্টার মধ্যে হেফাজতকে শাপলা চত্বর থেকে উৎখাত করে দেয়ার জন্য সরকার বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়েছে। 🌗 ঘটনার কয়েকদিন পর ১৩ মে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা লাল ব্যানার হেডলাইনে প্রকাশিত এক সংবাদে জানায়, শাপলা চত্বরের ওই অপারেশনে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ খরচ হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের হিসাবে ৮০ হাজার টিয়ার শেল, ৬০ হাজার রাবার বুলেট, ১৫ হাজার শটগানের গুলি এবং ১২ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে পিস্তল এবং রিভলবার জাতীয় ক্ষুদ্র অস্ত্রের গুলি খরচ হয়েছে মাত্র সাড়ে ৩০০ রাউন্ড। সরকারের ৫ মের অপারেশনে র‌্যাবের ১ হাজার ৩০০ সদস্য, পুলিশের ৫ হাজার ৭১২ এবং বিজিবির ৫৭৬ জন সদস্য সরাসরি অংশ নেয়। এর বাইরে বিজিবির ১০ প্লাটুন ছাড়াও র‌্যাব এবং পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য ‘স্টাইকিং ফোর্স’ হিসেবে তৈরি ছিল। রাত ২টা ৩১ মিনিটে মূল অপারেশন শুরু হলেও রাত ১২টার পর থেকেই মূলত আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তিন দিক থেকে ধীরে-ধীরে শাপলা চত্বরের দিকে এগুতে থাকে। 🌗 হেফাজত শাপলা চত্বরে তাদের অনুমোদিত সমাবেশে আসার পথে বিভিন্ন পয়েন্টে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরা তাদের বাধা দেয় এবং এতে বেশ কিছু জায়গায় সংঘর্ষ হয়। ১০ মে সরকারি তথ্যবিবরণীতে বলা হয় যে, পাঁচ মে সারাদিন ধরে হেফাজত সন্ত্রাস চালিয়েছে এবং শাপলা চত্বরে হেফাজতের মঞ্চের পাশে কাফনে মোড়া চারটি লাশ পাওয়া যায়। পুলিসের হিসেবে সেদিন নিহতের সংখ্যা পথচারী ও পুলিস সহ ১১ জন বলে উক্ত তথ্যবিবরীতে উল্লেখ করা হয়। 🌗 স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে জারি করা ওই একই তথ্যবিবরণীতে বলা হয় : "শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতে ইসলামের লোকজনকে সরিয়ে দিলে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে আবারও জমায়েত হতে থাকে। পরদিন ৬ মে ভোর থেকেই তারা রাস্তায় ব্যারিকেড বসায়। সেই সাথে নির্বিচারে রাস্তার পাশে রাখা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। এরই মধ্যে পূর্বনির্দেশ মতো বিএনপি-জামায়াত কর্মীরাও ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দেয়। নারায়ণগঞ্জ জেলার কাঁচপুর, সাইনবোর্ড, শিমরাইল, সানারপাড়, কুয়েত মার্কেট ও মাদানীনগর এলাকায় উন্মত্ত ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ভয়াবহরূপ ধারণ করে। তারা মাদানীনগর মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে আশপাশের মসজিদের মাইক ব্যবহার করে চরম উত্তেজনাকর গুজব ছড়িয়ে লোক জড়ো করে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে ২ জন পুলিশ, যথাক্রমে নায়েক ফিরোজ ও কনস্টেবল জাকারিয়া এবং ২ জন বিজিবি সদস্য যথাক্রমে শাহআলম ও লাভলু গুরুতর আহত হয়ে লুটিয়ে পড়ে এবং হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে উন্মত্ত সহিংসতার ফলশ্রুতিতে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেছে মর্মে জানা যায়। ঘটনা আরও চরম আকার ধারণ করতে থাকলে অধিকসংখ্যক ফোর্স সমাবেশ ঘটিয়ে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।" 🌗 সরকারের জারি করা তথ্যবিবরণী অনুযায়ী হেফাজত সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় দু'দিনে নিহতের সংখ্যা পুলিশ, বিজিবি, পথচারী সহ ২৪ জন নাকি সব মিলিয়ে ১৩ জন তা বুঝা মুশকিল। দ্বিতীয় দিনে সংঘর্ষে আহত দু'জন পুলিস ও দু'জন বিজিবি সদস্যের চার জনই মারা গেছেন, নাকি দু'জন তাও পরিস্কার নয়। এই চার জনের সংক্ষিপ্ত নামোল্লেখ ছাড়া সরকারি প্রেসনোটে নিহতদের আর কারও নামধাম বা পরিচয় দেয়া হয়নি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যম তাদের নিজস্ব সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নিহতের বিভিন্ন সংখ্যার কথা উল্লেখ করে। তবুও প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা, সরকারী বিভিন্ন কর্মকর্তা ও দলীয় নেতা "কোনও গুলি হয়নি, কেউ নিহত হয়নি" বলে একটানা প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। তথ্যের এই বিকৃতির জন্য আদালত তাদের কাউকে কোনও ভাবে দায়ী করেছেন বা সাজা দিয়েছেন কিনা - এই প্রশ্নও তোলা যেতো দেশের বিচারব্যবস্থা আইন অনুযায়ী চললে। 🌗 শাপলার ঘটনার পর ঢাকা সহ সারা দেশে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ এবং বিভিন্ন এলাকায় ঘোষিত-অঘোষিত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সংবাদ-মাধ্যমের জন্যও এক ভীতিপ্রদ অবস্থা তৈরি করা হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যারা সমাবেশে যোগ দিতে এসেছিলেন তাদের ছত্রভঙ্গ করে তাড়িয়ে দেয়ার পর তারা নানা দিকে ছিটকে পড়েন। অনেকে নিজ নিজ মাদরাসা বা বাড়িতে ফেরার বদলে আতঙ্কে নানা জায়গায় আত্মগোপন করে থাকেন। ঢাকার সমাবেশে হামলা ও হতাহতের সংবাদ পেয়ে অনেকের স্বজনেরা ছিলেন উৎকণ্ঠিত। যারা কয়েকদিনেও ফেরেননি সেই নিখোঁজদের স্বজনেরা ধরেই নিয়েছিলেন তারা হয়তো নিহত হয়েছেন। 🌗 এমন পরিস্থিতিতে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপন করে একটি তালিকা তৈরি করা খুবই দুষ্কর ছিল। 'অধিকার' তাদের প্রাথমিক তদন্তের আলোকে নিহতের সংখ্যা ৬১ বলে উল্লেখ করে। এতে ত্রুটি থাকা অসম্ভব নয়। আরো যাচাই বাছাই এবং চেক ও ক্রসচেকের মাধ্যমে এ ব্যাপারে একটা নির্ভুল তালিকায় অবশ্যই পৌঁছা যেতো। কিন্তু সরকারের উদ্দেশ্য তা ছিল না। ৬১ জন নিহতের সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত ও উদ্দেশ্যমূলক আখ্যায়িত করে সরকার হামলে পড়ে 'অধিকার' এর উপর। 🌗 শাপলা সমাবেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীসমূহের উৎখাত অভিযানের পর হেফাজত হাজার হাজার আলেম ও মাদরাসা ছাত্র নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিপুল সংখ্যক লোক নিহত হয়েছে বলে দাবি করে। বিদেশী একাধিক সংবাদ-মাধ্যমে রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন গোরস্তানে পুলিসের তদারকিতে গোপনে অনেক লাশ দাফনের খবর প্রচারিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় বীভৎস সব চিত্র ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে 'অধিকার'-এর মতন একটি মানবাধিকার সংস্থা তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ৬১ নিহতের কথা উল্লেখ করাটা ছিল সরকারের জন্য পরম স্বস্তিদায়ক। এতে গুজবের বাড়াবাড়ি স্তিমিত হয়ে আসে। এই পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে পারতো। কিন্তু তা না করে তারা উলটো পথে হাঁটা দেয়। 🌗 ১০ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে অধিকার’র কাছে শাপলা চত্বরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের পরিচয়সহ প্রকাশিত তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন চাওয়া হয়। এর জবাবে অধিকার এক চিঠিতে বলে, অবশ্যই তারা এসব তথ্য দিতে সম্মত আছে। তবে ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তার আইন বাংলাদেশে না থাকায় সরকারকে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। আর এগুলো নিশ্চিত করলে অধিকার সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। 🌗 অধিকার’র শর্ত তিনটি ছিল- ১. নিহতদের তালিকা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যেসব মানবাধিকার সংগঠন কাজ করছে তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা। ২. তথ্য প্রদানকারী, ভিকটিম, তাদের পরিবার এবং সাক্ষীদের জন্য সুরক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়া ও সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৩. এই তথ্য প্রদানকারী, ভিকটিম, তাদের পরিবার এবং সাক্ষীদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটবে না সেই ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়া। 🌗 অধিকার চিঠিতে বলে, সরকার এসব বিষয়ে নিশ্চিত করলে তারা অবশ্যই সেই কাঙ্ক্ষিত কমিশনের কাছে প্রাসঙ্গিক সকল তথ্য সরবরাহ ও সহযোগিতা করবে। উল্লেখিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিশ্চয়তা বিধান ছাড়া নিহতদের নাম, ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরবরাহ করা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সহায়তা বলে বিবেচিত হবে। মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে অধিকার’র পক্ষে এই দায় নেয়া সম্ভব নয়। 🌗 অধিকার আরো বলে যে, যদি সরকার কোনো তালিকা করে থাকে তাহলে আমরা পরস্পরের সঙ্গে তালিকা মিলিয়ে দেখতে পারি। সরকার আন্তরিক হলে অধিকার সব রকম সহযোগিতা প্রদানে আগ্রহী। 🌗 অধিকারের চিঠিতে বলা হয়, সরকার বলে আসছে যে, ৫ মে দিবাগত রাতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এ নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ, জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় নেতৃস্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরে 'অধিকার' বলে যে, যেখানে সরকার নিজেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত এবং কোনো প্রাণহানি হয়নি বলে বক্তব্য দিচ্ছে সেই পরিস্থিতিতে এই ঘটনা সম্পর্কে অনুসন্ধান ও নিহতের প্রকৃত সংখ্যা জনগণকে জানানোর বিষয়ে সরকার আন্তরিক নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। 🌗 অধিকার তাদের চিঠিতে আরো বলে, নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। গত ৫ মের ঘটনায় অন্তত: ১,৩৩,৫০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী করে ২৩টি মামলা দায়ের করেছে সরকার। ভিকটিম পরিবারগুলোর আশঙ্কা তাদের পরিবারের সদস্যদের সরকার হয়রানি করতে পারে এবং এই কারণে তারা জনসমক্ষে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে ভিকটিমদের নিরাপত্তা বিধান আমাদের কর্তব্য। সুতরাং ভিকটিমদের পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে দায়িত্বশীল মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে অধিকার উপরোক্ত শর্তগুলোর নিশ্চয়তা পেলে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে রাজি আছে। 🌗 অধিকার তাদের প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান রিপোর্টের কপি তথ্যমন্ত্রীকে সরবরাহ করে। 🌗 এরপর অধিকারের বিরুদ্ধে মামলা এবং আদিলুর রহমান খান ও নাসিরউদ্দিন এলানের গ্রেফতার ও কারাবাসের ঘটনা ঘটে। অধিকারের বিরুদ্ধে সরকারী প্রোপাগান্ডা অভিযান, নিবন্ধন বাতিলসহ নিবর্তনমূলক নানান ব্যবস্থা চলতে থাকে। অবশেষে দশ বছর পর সরকারি দলের এক্টিভিস্ট হিসেবে তৎপর ব্যক্তির কোর্টে এক চরম বিতর্কিত আইনে আদিল ও এলানের জেল ও জরিমানার রায় দেয়া হয়েছে। 🌗 এই রায়ের বিরুদ্ধে দুনিয়ার সকল মানবাধিকারবাদীরা সোচ্চার হয়েছেন। রাশিয়া, বেলারুশ, উত্তর কোরিয়া, চীন, ইরান সহ বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার আন্দোলনকারীদের জেল-জরিমানা ও সাজার ঘটনা বিরল না হলেও বাংলাদেশে এমন ঘটনা ইতিহাসে প্রথম। দেখা যাক, শেষ অব্দি কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়।◾

Thursday, 7 September 2023

ডঃ ইউনুস এবং শ্রমিকদের “লাভ্যাংশ”

ইউনূস শ্রমিকদের ঠকিয়েছেন। কীভাবে ঠকিয়েছেন? তিনি শ্রমিকদের লাভ্যাংশ দেন নাই। Let’s unpack that argument. শ্রমিকদের “লাভ্যাংশ” নিয়ে কোনো আইডিয়া আছে রে, বেকুবের দল? এই লাভ্যাংশ মানে প্রভিডেন্ট ফান্ড বা রিটায়ারমেন্ট ফান্ড না। এই লাভ্যাংশ হলো কোম্পানির প্রফিট শেয়ারিং। অর্থাৎ, একটা কোম্পানির যত প্রফিট হয়, তাঁর ৫ শতাংশ কোম্পানির সকল কর্মীর মধ্যে বিভিন্ন ভাবে বিতরণ করার একটা প্রোগ্রেসিভ ল’ বাংলাদেশে আছে। এই ল’ পৃথিবীর কোন কোন দেশে আছে — আমি জানি না। আমেরিকাতে যে নাই, এটা নিয়ে আমি একশত ভাগ নিশ্চিত। প্রফিট শেয়ারিং-এর ধারণা উন্নত বিশ্বের গুটিকয়েক কোম্পানিতে নিজ উদ্যোগে প্রচলিত আছে; অনেক বুদ্ধিজীবী একে বৈষম্য নিরোধনের উপায় হিসেবে তুলে ধরছেন ইদানীং; কিন্তু পৃথিবীর খুব কম দেশই আইন করে প্রফিট-শেয়ারিং-এর বিধান রেখেছে। এবং, বাংলাদেশের অনেক “ভালো” আইনের মতো, এই আইনও কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে খুব কমই অনুসৃত হয়। বাংলাদেশে কিছু বিদেশী কোম্পানি, বিদেশী-বিনিয়োগের ফার্মা কোম্পানি, কিছু ব্যাংকে (সব বছরই নয়) কর্মীদের “প্রফিট বোনাস” হিসেবে লাম্প সাম একটা টাকা দেয়া হয় বলে অনেকে কমেন্টে লিখেছেন। অ্যানিওয়েজ, আমি আমার জীবনে বাংলাদেশে ৩টা বহুলপরিচিত কোম্পানিতে কাজ করেছি। আমার সঙ্গে এদের কেউই ১ পয়সা প্রফিট শেয়ার করেনি; আমার জানামতে কোনো এমপ্লয়ীর সঙ্গেই কেউ করেনি, করেও না। কিন্তু ইউনূসকে করতেই হবে। কারণ, ইউনূস মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছেন — সুতরাং এই গ্রহের কারও বেলায় ওই নিয়ম প্রযোজ্য না হলেও, তাঁর বেলায় হবে! আচ্ছা, তারপর আসেন। এখন এখানে মজার বিষয় হলো, যেই কোম্পানির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই কোম্পানি হলো একটা নন-প্রফিট কোম্পানি। নাম হলো গ্রামীন টেলিকম। এই কোম্পানির মালিক ইউনূস নন; তিনি কোম্পানির বোর্ডের চেয়ারম্যান। আইনগতভাবেই নন-প্রফিট বা অলাভজনক কোম্পানির কেউ মালিক হতে পারেন না। কিন্তু কোম্পানির মালিক ইউনূস না হলেও, কর্মীদের সঙ্গে লাভ্যাংশ শেয়ার না করার অভিযোগ উঠে ইউনূসের বিরুদ্ধে; গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে নয়। আচ্ছা, তারপর আসেন। এটা নিয়ে গ্রামীন টেলিকম ও কোম্পানির কর্মীদের মধ্যে একটা বিরোধ দেখা দেয়। কারণ হলো গ্রামীন টেলিকম সেই শুরুর দিকে গ্রামীনফোনের ৩৪% শেয়ারের মালিক। আর সেই সূত্রে নব্বইয়ের দশক থেকে জমতে জমতে তাদের মোট রেভিনিউ এখন প্রায় ১-২ বিলিয়ন ডলারের সমান; বাংলাদেশি অর্থে এখন ১০-২০ হাজার কোটি টাকা। বিরাট অংকের টাকা! এই টাকা শুধুমাত্র দাতব্য খাতে ব্যয় করার বিধান রেখেই গ্রামীন টেলিকম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইউনূস কী বোকা দেখেন! সেই ইউরোপ থেকে ফান্ড এনে গ্রামীনফোনে বিনিয়োগ করিয়েছিলেন। কিন্তু মালিকানা দিয়েছেন একটা নন-প্রফিটকে। নিজের বা নিজের পরিবারের নামে মালিকানা রাখেন নাই। কিন্তু গ্রামীন টেলিকমের নিজস্ব কোনো প্রোডাকশন বা ইউটিলিটি নাই। নব্বইয়ের দশকে তারা গ্রামেগঞ্জে সস্তায় নোকিয়া ফোন ডিস্ট্রিবিউট করার জন্য ৩০০ কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু এরপর তো সবার হাতে হাতে ফোন চলে আসলো, ওই ব্যবসাও আর রইলো না। এরপর থেকে তাদের কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন। যারা শুধু অফিস পরিচালনার কাজ কর্মই করতেন — যেহেতু কোম্পানির সমস্ত আয় ছিল গ্রামীনফোনের ডিভিডেন্ড থেকে। এখন ১-২ বিলিয়ন ডলার কোম্পানির এমপ্লয়ী মাত্র ৬০ জন বা সাবেক শ’ খানেক; আর এরাই চাইলেন ৫% প্রফিট। আপনি মঙ্গলগ্রহের আইন বাদ দেন। একেবারে কমনসেন্স খাটায়ে বলেন যে একটা ১-২ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, যাদের কোনো নিজস্ব প্রোডাক্ট বা সার্ভিস নাই, যাদের সমস্ত প্রফিট আসে আরেক কোম্পানির শেয়ার থেকে প্রাপ্ত ডিভিডেন্ড থেকে, সেই কোম্পানির এত বড় ডিভিডেন্ডের অঙ্ক কি গুটিকয়েক কর্মচারি ডিজার্ভ করেন? ইউটোপিয়ায় হয়তো করে থাকতে পারেন। আচ্ছা, এরপর আসেন। এমপ্লয়ীরা যখন ওই টাকা চাইলেন, কোম্পানির লইয়াররা বললেন, এই টাকা দেওয়া যাবে না; কারণ নন-প্রফিট কোম্পানি হিসেবে কোম্পানির লাভের অঙ্ক কাউকে দেওয়া যাবে না। আইনে বলা আছে, শুধু দাতব্য কাজেই এই অর্থ ব্যয় করা যাবে। ইফ ইউ আস্ক মি, দ্যাট’স অ্যা ভেরি লেজিটিমেট লিগ্যাল পজিশন। অর্থাৎ, গ্রামীন টেলিকমের কর্মচারিরাই বরং কোম্পানির দাতব্য কাজের সুবিধাভোগীদের হক মারতে চাইছেন। কিন্তু এমপ্লয়িরা গোস্বা করলেন — মামলা করার উদ্যোগ নিলেন। একেবারে ক্ল্যাসিক কোম্পানি ভার্সাস এমপ্লয়ী কেইস। ইউনূসের এত রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি আইনি পথে বিষয়টা মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিলেন। অথচ, তিনি চালাক হলে তখনই ৫-১০ কোটি টাকা দিয়ে বিষয়টা মিটমাট করে ফেলতে পারতেন। বিষয়টা এতদূর আসতে দিতেন না। মামলা হলো। সরকারের লেবার পরিদর্শকরাও মামলা করলেন। গ্রামীণ টেলিকমের আইনজীবীদের আরেকটা শক্ত যুক্তি ছিল, গ্রামীনফোনের শেয়ার থেকে যেই ডিভিডেন্ড গ্রামীন টেলিকম পেয়েছে, সেটা তো টেলিকমের কর্মীদের হক নয়; সেটা হলো গ্রামীনফোন কর্মীদের হক। কেউ যদি ওই অর্থ প্রাপ্য হন, সেটা হবেন গ্রামীনফোনের কর্মীরা; টেলিকমের নয়। এমপ্লয়ীরা জানতেন, তারা হেরে যাবেন দুই যুক্তিতে। তারপর তারা একটা শয়তানির আশ্রয় নিলেন। তারা কোম্পানি আদালতে মামলা করলেন যে, যেহেতু গ্রামীণ টেলিকমের সস্তায় নোকিয়া ফোন বিক্রয়ের প্রকল্প আর নাই, তাহলে কোম্পানি হিসেবে গ্রামীন টেলিকমের আর উপযোগিতা নাই; ফলে একে বিলুপ্ত করে দেওয়া হোক। এবং, কোম্পানি কোর্ট সেই যুক্তি আমলে নেয়। অর্থাত, আপনার আদরের “শ্রমিকরা” সিদ্ধান্ত নিলেন আমরা যেহেতু ফল খাইতে পারুম না, ফলে পুরা ফলগাছ কাইটা ফেলবো! এইখানে তারা আর কী পাবে আর না পাবে, সেটার প্রশ্ন নাই। তারা জানে ইউনূস চাপে আছে; অতএব আরও চাপ কেমনে দেওয়া যায়! একেবারে আদর্শ ”শ্রমিক“ যাদের বলে আরকি। আচ্ছা, এরপর আসেন। এই ঘটনার পর গ্রামীন টেলিকম বুঝে যায় আইনি পথে তাদের জয়ের সম্ভাবনা নাই। কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি। তখন তারা ইউনিয়নের সঙ্গে দরকষাকষিতে বসেন। এবং, সমঝোতা অনুযায়ী গ্রামীন টেলিকমের লইয়াররা শ কয়েক কর্মীকে ৪৩৬ কোটি টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। প্রত্যেক কর্মীর ভাগে প্রায় ১-২ কোটি টাকা করে পড়েছে! জ্বি, আগের লাইনটা আবার পড়েন। আপনার সারাজীবনের চাকরির বেতন ২ কোটি টাকা হবে তো? ৫% প্রফিট থেকে ২ কোটি তো দূরে থাক। এই হলো আপনার শ্রমিকের “হক” যেইটা গ্রামীন টেলিকমের কর্মচারীরা প্রাপ্য না হয়েও পেয়েছে; যেইটা আপনি আপনার প্রাপ্য শ্রমিককে দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেন না; আর যেইটা আপনি নিজেও কখনও পাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। আচ্ছা, এরপর আসেন। সমঝোতা হওয়ার পর, একটা যৌথ অ্যাকাউন্টে টাকাটা সাথেসাথে ডিসবার্স করে দেওয়া হয়। আদালত থেকে এই সেটেলমেন্ট অ্যাপ্রুভ করা হয়। মামলা ডিসমিস! আমি এমনও শুনেছি যে, কর্মীরা ওই টাকা বুঝে পাওয়ার সাথে সাথেই দুয়েকটা করে অ্যাপার্টমেন্ট কিনে ফেলেন! এদিকে তখন সরকারের টনক নড়ে! আরে পাখি তো খাঁচা ছাইড়া যাইতাছে গা! এতদিন পর্দার আড়ালে খেললেও, সরকার একেবারে নগ্ন হয়ে উঠে। যেই শ্রমিকদের হক নিয়ে সরকারের এত হাহাকার, সেই সরকার ঘোস্বা করলো কেন তারা কোটি কোটি টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট হইলো! তারা কেন মামলা অব্যাহত রেখে সরকারের গুটিতে পরিণত হইলো না! এদিকে পত্রিকায় খবর আসে যে ইউনূস নাকি ঘুষ দিয়া মামলা দফারফা করাইছেন! অর্থাৎ, যেই “হক” ইউনূস তাঁর শ্রমিকদের দেন নাই বলে আপনি চিৎকার করতেছেন, সেই “হক” রাতারাতি হয়ে গেল “ঘুষ”। আপনাদের ন্যারেটিভ নির্মানের দক্ষতা দেখে আপনাদেরই গর্ব হওয়া উচিৎ! খুব দ্রুতই ডিবি থেকে কর্মীদের নেতা দুইজনকে গুম করা হয়। তাদেরকে টর্চার করা হয়েছে, এমন অভিযোগও আমরা শুনেছি। কর্মীদের যেই লইয়ার তাদেরকে ৪৩৭ কোটি টাকার সেটেলমেন্ট পাইয়ে দিলেন, সেই লইয়ারও নাকি ঘুষ পাইছেন! অথচ, সেই লইয়ার তাঁর পূর্বচুক্তি অনুযায়ী সেটেলমেন্টের একটা অংশ পেয়েছে মাত্র। একেবারে আইনগত নথিপত্র অনুযায়ী হওয়া ও সর্বোচ্চ আদালত অনুমোদিত একটি বৈধ সেটেলমেন্ট রাতারাতি হয়ে গেল ঘুষ! এই হলো মঙ্গলগ্রহের আইন আর বিধান! আরও আইন-কানুনের গল্প শুনবেন? যেই হাইকোর্ট সেটেলমেন্ট অ্যাপ্রুভ করলো, সেই হাইকোর্টই ক’ দিন বাদে সেই সেটেলমেন্ট বাতিল করলো! খুবই স্বাধীন কোর্ট আপনাদের! ডিসমিস হয়ে যাওয়া মামলা পুনরায় চালু হলো; গুম হওয়া শ্রমিক নেতা বের হয়ে এসে “স্বীকারোক্তি” দিলেন ইউনূসের বিরুদ্ধে; আরও ডজন খানেক মামলা যোগ হলো রাতারাতি! সেইটা চলতে থাকলো বছরের পর বছর। আচ্ছা, এরপর আসেন। এখানে আয়রনিক ঘটনা হলো, ওই ঘটনার পর ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি কমিশন মানি-লন্ডারিং-এর অভিযোগ আনে। লেবার ল’ অনুযায়ী, ৫ শতাংশ লাভ্যাংশের একটা অংশ কর্মীদের ফান্ডে রাখতে হয়, একটা অংশ সরকারি ফান্ডে রাখতে হয়, বাকিটা কর্মীদের দিতে হয়। তো এই ৪৩৭ কোটি টাকার একটা অংশ, ২৬ কোটি টাকা, কর্মীদের ফান্ড অর্থাৎ ইউনিয়নের ফান্ডে যায়৷ এই টাকাকে আপনারা বলেছেন ইউনিয়নকে দেওয়া ঘুষ। আর দুদক বলেছে মানি লন্ডারিং! অর্থাৎ, ইউনূস শ্রমিকের হক “পরিশোধ” করার পর সেটা হলো পাচার! একেবারে দো-ধারি তলোয়ার! আচ্ছা, শেষবারের মতো আসেন। ২০২১ সালের দিকে ইউনূসের সঙ্গে আমার প্রথম ও শেষবারের মতো আলাপ হয়। ওই সময় পর্যন্ত তাকে দেখে মনে হয়েছে তিনি সেটেলমেন্ট আর পরিস্থিতি নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। তিনি আইনি পথেই হাঁটতে চান। আমি আর আমার আরেক সাংবাদিক সহকর্মী বিষয়টা নিয়ে খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম। তো পরিস্থিতি এরপর থেকে এতই বাজে দিকে গেছে যে ইউনূসের মতো চরম অপ্টিমিস্টিক মানুষও ফিল করতেছেন যে, তাকে এবার গ্রেপ্তারই করা হবে! অথবা, তাঁর মিত্ররা পুরো বিষয়টা টেকওভার করেছেন। তারা বুঝেছেন যে, বিষয়টা ইউনূসের অপ্টিমিজমের উপর ছেড়ে রাখলে, ইট উইল বি টু লেইট। এরপর বারাক ওবামা থেকে শুরু করে বিশ্বের বেশিরভাগ জীবিত নোবেল পুরষ্কারজয়ী যখন বিবৃতি দেওয়া শুরু করলেন যে ইউনূসের বিরুদ্ধে বিচারিক হয়রানি চলছে, তখন আপনি গোস্বা করলেন! আপনাদের সাধের সোহাগা বিচার বিভাগ নিয়ে এত বড় কথা! :-)

Thursday, 17 August 2023

বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছিল।

সাইদীর জানাজায় মানুষের ঢল নামায় আজব এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে পুরা বাংলাদেশে। উনার জন্য ইন্নালিল্লাহি পড়ায় বিতর্কে পরেছেন হুজুর স্কুলের শিক্ষক থেকে আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা কর্মীরা । আমিও ক্ষমা করে দোয়া চেয়ে বিরোধের জন্ম দিয়েছি। সবার এখন একটাই প্রশ্ন কেন বঙ্গবন্ধুর জানাজায় সামান্য কিছু মানুষ হয়েছিলো? স্বাধীনতা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বাদ দিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন নি। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা এতটাই নীচে নেমে গিয়েছিল যে 'তার নিজের দলের নেতারা মার্কিন দূতাবাসে বারবার গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।' এবার আসি দেশের জনগণের প্রতিবাদ নিয়ে। নিজ দলীয় লোকদের লুটপাট, রাজনৈতিক দলগুলোকে বিলুপ্তকরণের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তার উপর মানুষের একটা ক্ষোভ জন্মায়। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দেশের ইতিহাসে সবথেকে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যেখানে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। সারা দেশে শুধু হাহাকার চলতেছিল। দলীয় এবং সরকারি লোকদের কিছু না হলেও এর প্রভাব দেশের সাধারণ জনগণ ভালো করেই টের পেয়েছিল যার ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর চরম অব্যবস্থাপনার উপরে। এক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের লোকেরা যে যুক্তিটি সবথেকে বেশি দাঁড় করায় তা হচ্ছে সারা দেশে কারফিউ জারি ছিল। এটা স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর অজনপ্রিয়তাকে ঢাকতে তা কেবলই একটা প্রোপাগান্ডা মাত্র। তারা এটা ভুলে যাচ্ছেন যে এই অভ্যুন্থান সেনাবাহিনীর মাত্র ২ টি ইউনিটের ৯০০ জন সৈন্য অংশগ্রহণ করেছিল তাও কিছু না বুঝে। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা এতটাই নীচে নেমে গিয়েছিল যে তার মৃত্যুর পর ঢাকা শহরে একটা প্রতিবাদী মিছিল পযর্ন্ত বের হয় নি। মূলত, তার সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গরা একটু ভয় পেয়েছিলেন। সেসময়ের কিছু কথা হুবহু তুলে দিলাম। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) এম এ হামিদ সাহেবের ভাষ্যমতে, " বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পরিদর্শনের পরে) ৩২ নং রোড থেকে ফিরে আমি স্টেশন হেডকোয়ার্টার থেকে জেনারেল শফিউল্লাহকে জানালাম ১৪৪ ধারা জারির কোন দরকার নেই। কোনরকম গন্ডগোলের আশঙ্কা কোথাও নেই। " তিনি আরো লিখেছেন, দুপুরে আমার অফিসে বসে স্টেশন সিকিউরিটি প্লান বানাচ্ছিলাম। এমন সময় জেনারেল শফিউল্লাহর ফোন এলো। তিনি আমাকে তাড়াতাড়ি শহরের অবস্থাটাও দেখে আসতে বললেন। সেই সাথে ৩২ নম্বর রোডের অবস্থাটাও দেখে আসতে বললেন। আমি সিকিউরিটি প্ল্যানের একটা খসড়া দাঁড় করিয়ে আমার স্টাফ অফিসারকে মোসাবিদা করতে বলে জিপ নিয়ে শহরের দিকে ছুটলাম। এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে আসছিলাম। রাস্তাঘাট ফাঁকা। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। মোড়ে মোড়ে জটলা। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে একটি মাত্র জীপই বীরদর্পের সশব্দে এগিয়ে যাচ্ছিল। আওলাদ হোসেন মার্কেট, ফার্মগেট দিয়ে যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে আর্মি জিপ দেখে হাত নেড়ে স্লোগান তুললো, আল্লাহু আকবার ! সেনাবাহিনী জিন্দাবাদ ! একদিনেই এত পরিবর্তন ! অথচ গতকালও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কি অবাক কান্ড ! তবে আমার বুঝতে অসুবিধা রইলো না যে, পরিবর্তিত অবস্থাকে সাধারণ মানুষ মেনে নিয়েছে। কোন বড় রকমের গন্ডগোল হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। আমি ১৪৪ ধারা জারির পক্ষে কোন যুক্তি দেখতে পেলাম না। শুধুমাত্র ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে সৈনিকরা বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল। মূলত এই ঘটনায় অনেকেই খুশি ছিলেন, এজন্য প্রতিবাদ করেন নি। অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ভাষ্যমতে, মুজিবের মৃত্যুর ১০ বছর পরেও আত্মীয়-পরিজনদের মতানৈক্যের জন্য তাদের গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায় মুজিবের সমাধির উপর একটি সুযোগ্য স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে পারেননি বলে, তার কন্যা হাসিনা আমাকে জানান। মুজিবের নাকি অনেক জনপ্রিয়তা ছিল জনগণের কাছে, এমনটাই দাবি আওয়ামীলীগের। চিন্তা করেন, যে দলের লোকেরা দশ বছরেও নিজের নেতার একটা স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে পারেন নি, তারা প্রতিবাদ করবে কিভাবে? তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পরার কারন কী ছিলো? এজন্য আপনাকে শেখ মুজিব সাহেবের শাসনামল পড়তে হবে। তবে একটা বক্তব্যের মাধ্যমে কিছু একটা ধারনা সবাই পেয়ে যাবেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেন, Althought he lacked any sophisticated knowledge of running a modern government. For his own part he was content to centralize all powers in his hands and attempted to rule the country like a medieval despot. অনুবাদ : আধুনিক একটা রাষ্ট্র চালানোর যে দক্ষতা থাকা দরকার, শেখ মুজিবের মধ্যে তার ঘাটতি ছিল। তার নিজের অধীনে তিনি সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং মধ্যযুগীয় স্বৈরশাসকের মতো দেশ শাসন করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই মধ্যযুগীয় কায়দায় দেশ চালানোই তার জনপ্রিয়তাকে নিচে নামিয়ে দিয়েছিল। দেশের অবস্থা চরম অবনতির পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল সরকারি দলের লুটপাট আর নৈরাজ্যের কারনে। অ্যান্থনী মাসকারেনহাসের বক্তব্য অনুসারে, দুইশত কোটি ডলার পরিমাণ আন্তর্জাতিক সাহায্য দেশে আসার পরও ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে দেশটি দেউলি হয়ে গেল। আমদানি আর বিতরণ প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি স্তরে দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাচালানি ইত্যাদির বদৌলতে খাদ্য সরবরাহ অবনতির দিকে দিকে ধাবিত হতে লাগলো। চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেল। তারপরই দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা প্রলয়ংকারী বন্যায় ডুবিয়ে দিলো। মানুষখেকো বাঘের মতো দুর্ভিক্ষ সদর্পে সারাদেশে ছেয়ে গেল। গ্রামগুলোতে মশা মাছির মতো মানুষ মরতে শুরু করলো। উল্লেখ্য, শেখ মুজিব সাহেব স্বীকার করেছিলেন যে, খেতে না পেয়ে প্রায় ২৭,০০০ লোক মরে গেছে কিন্তু বাস্তবে লক্ষাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। এইরকম মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছিল। রেফারেন্স বই ও তথ্য : ১। Bangladesh: A Legacy Of Blood, Anthony Mascarenhas. অনুবাদক : মোহাম্মদ শাহজাহান ২। তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে. কর্নেল (অব.) এম.এ হামিদ, পিএসসি। ৩। The Killing of Sheikh Mujibur Rahman: New Zealand International Review (September/ October 1976), Page: 18

অধ্যাপক ইউসুফ আলী: সব সরকারের মন্ত্রী

এটা পড়ার পর আগামী দুই দিন পাগল থাকবেন 🤣 আমি আগে
সম্পর্কে জানতাম- তিনি মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন। বাকি অল্প স্বল্প জানতাম। একটা ফেসবুক পোস্টের সূত্রে বাংলাপিডিয়া দেখে যা জানলাম- উনি ছিলেন বাংলার অধ্যাপক। ৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য হন। ৬৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য, ৭০ সালে আবার গণপরিষদের সদস্য এবং চিপ হুইপ। মুজিবনগর সরকারের ইউথ কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রী, ৭৫ সালে বাকশালের শ্রমমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু নিহত হলে খুনী মোশতাকের পরিকল্পনা মন্ত্রী, ৭৭ সালে আওয়ামীলীগ (মিজান) এর সাধারণ সম্পাদক, ৭৯ সালে জিয়ার(বিএনপি) শ্রমমন্ত্রী, ৮১ সালে বিচারপতি সাত্তারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, ৮২ সালে এরশাদের সময় বিচারপতি সাত্তারের সরকারে শিল্পমন্ত্রী, ৮৫ সালে এরশাদের মন্ত্রীসভায় (জাতীয় পার্টি) ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হন!! কেমন বোধ করছেন? 🤣

এ্যাভারেজ আমেরিকান মহিলারা মাত্র সাতাশ মিনিট আর বাঙ্গালি মহিলারা গড়ে সাড়ে পাঁচ ঘন্টা সময় প্রতিদিন রান্নাঘরে ব্যয় করে।

বাংগালী নারীদের জীবনের বিশাল অংশ এই রান্নাঘরেই কেটে যায়। কয়েকসপ্তাহ আগে আমার প্রতিবেশী হ্যারল্ডের বাসায় আমাদের ডীনারের দাওয়াত ছিলো। সন্ধ্যা ছটার আগেই সাধারণত এরা ডীনার শেষ করে। একেবারে ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ছটা বাজেই ডীনার শুরু হলো। ডীনারের আয়োজন ছিলো টুনা ফীস, সালাদ, কিছু চিপস আর কোমল পানীয়। ব্যস । হ্যারল্ডের ওয়াইফ ম্যারি আর হ্যারল্ড আমাদের সাথে ক্লান্তিহীন আড্ডা দিলেন। রান্নার আয়োজন যেহেতু কম-আড্ডার আয়োজনতো সুন্দর হবেই। কেউ যদি বলে বাংগালীরা আড্ডা প্রিয়। কথাটি ভুল। আমরা আসলে ভোজনপ্রিয়। আমাদের বাসায় কারো দাওয়াত মানেই বিশাল রান্নার আয়োজন। কে কত আইটেম বাড়াতে পারে ভাবীদের সাথে ভাবীদের চলে এর প্রতিযোগিতা। যেদিন অতিথিদের নিমন্ত্রণ বলতে গেলে এর এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয় রান্নার আয়োজন। একেকটা রান্নার আয়োজন একেকটা ঘুর্ণিঝড়। এরকম ঘুর্ণিঝড়ের ভিতর সময় পার করে ঘরের বউ, ভাবী ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। সুতরাং সুন্দর পরিবেশে বসে আড্ডাটা হবে কখন? রান্নাঘর আর বাথরুম দেখে মানুষের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা পাওয়া যায়। হ্যারল্ডের ঘরে পা দিয়েই বুঝা গেলো- কত সুন্দর, পরিপাটি আর কত পরিচ্ছন্ন হতে পারে একটি ঘরের পরিবেশ। সুন্দর ঘর রাখার অন্যতম প্রধান কারণ হলো- ওদের রান্নার আয়োজন খুবই কম। আপনি যখন গরম তেলের ওপর দুনিয়ার নানা রকমের মশলা ছাড়বেন- সাথে সাথেইতো ঘর গ্রীজি হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দিবে। আর এই তৈলাক্ত গ্রীজ শুধু আপনার কিচেন নষ্টই করছেনা। আপনার উদরও নষ্ট করছে। তবে কি আমেরিকানরা রান্না করেনা। না করলে এতো গ্রোসারি আইটেম যায় কই । জ্বি করে। বেশ আয়োজন করেই করে। তবে একদিনে চৌদ্দ পনের পদ তৈরি করে- ডাইনিং টেবিলের এই মাথা থেকে ঐ মাথা পর্যন্ত খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেনা। আমি নিজেও বুঝিনা। এতো পদ দিয়ে একসাথে খাবার খেয়ে এতো ভূরিভোজনের দরকারটাই বা কি? কালকে মারা গেলে- আজকে বেশ করে খেয়ে নেন ঠিক আছে। কিন্তু তাই যদি না হয়- তবে আজকে দুপুরে এক আইটেম দিয়ে খান। রাতের বেলা আরেকটা দিয়ে খান। এভাবে প্রতিদিন একেকটা আইটেম দিয়ে খেলেইতো নানা রকমের খাবারের স্বাদ পাওয়া যায়। আমাদের পিকনিক মানেই ঐ খাবার দাবার। গাড়ীতে খাবার ঢুকাও, গাড়ী থেকে খাবার নামাও, খাবার সাজাও, খাবার রান্না করো, খাবার পরিবেশন করো, খাবারের পর এবার তালা, বাসন, বাটি, ঘটি গাড়িতে তোল। ব্যস খাবারের আয়োজনের ভিতরই পিকনিক শেষ । একবার সমূদ্র দর্শন করতে গিয়ে দেখলাম- এক আমেরিকান কী সুন্দর করে ফোল্ডিং চেয়ার খোলে পানিতে পা ভিজিয়ে বসেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা যায়। সে বসা। তার মাথার ওপর ছাতা। পাশে একটা ড্রিংক। বুঝা গেলো সে আজ মন প্রাণভরে সমূদ্র দেখবে। আর আমরা- খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সমূদ্র দেখলাম। আর সমূদ্র দেখার পাশাপাশি এই দোকানে ঢু মারলাম, আরেক দোকান থেকে বের হলাম, একটু এদিক ওদিক ঘুরলাম, রাজনীতি, কম্যুনিটি নীতি, ট্রাম্প, মোদি, গদি, হাসিনা, খালেদা, পাপিয়া, সাফিয়া,কাদেরি , তাহেরি সহ দুনিয়ার সব বিষয়ে বিপুল আলোচনা, হালকা বাক বিতণ্ডা, ঝাপসা মনোমালিন্য নিয়ে সমূদ্র জয়ের পাশাপাশি দুনিয়া জয় করে ঘরে ফিরলাম। গত শনিবার। গ্রোসারি কিনতে যাবো। দেখি হ্যারল্ড। সেও আমার সাথে যাবে। আমাদের গ্রোসারির লিস্টি মাশাল্লাহ- এইগুলো একটার সাথে আরেকটা জোড়া লাগালে- চাঁদের দেশে যাওয়া যাবে। মাংসের জন্য এক দোকান, মাছের জন্য আরেক দোকান। সব্জির জন্য ফার্মাস মার্কেট। সেখানে আবার দেশি লাউ পাওয়া যায়না। যাও আরেক দোকান। কাঁচামরিচের জন্য আরেক জায়গায়। দুধ-ডিমগুলো আবার এইসব দোকানে ভালো পাওয়া যায়না। যাও আমেরিকান গ্রোসারিতে। বিশাল লিস্টের যুদ্ধ শেষ করে যখন ফিরছি- হ্যারল্ড বললো- একটু দাঁড়াও। এক ফাস্টফুডের দোকানে দাঁড়ালাম। হ্যারল্ড একটা স্যান্ডউইচ কিনলো। স্যান্ডউইচের অর্ধেক সে খাবে। বাকি অর্ধেই ওর বউয়ে খাবে। ঝামেলা শেষ। সেইজন্য ওরা নাসা থেকে স্পেসে যায়। আর আমরা বেডরুম থেকে কিচেন আর কিচেন থেকে বেডরুমে যাই। আর, এর ফাঁকে ফাঁকে ইয়া বড় বড় ভুড়ি বানাই। স্পেশ স্টেশানে যাওয়ার সুযোগ আসলে আমরা খোঁজ নিবো- কিমার জন্য ফ্রেশ গ্রাউন্ড বীফ, কাচ্চি বিরিয়ানির মশলা, ডালের জন্য পাঁচফোড়ন, খাওয়ার পর গোলাপজামুন, চায়ের সাথে বিস্কুট, পানের সাথে চুন, খয়ের এসব কিছু সেখানে ঠিকঠাক পাওয়া যাবেতো? আমি একটা জিনিস পর্যবেক্ষণ করলাম। যার গ্রোসারির ট্রলি যত বড়- মেধা আর যোগ্যতায় সে তত ছোট। যারা দরিদ্র-অর্থের অভাবে খেতে পায়না-সেটা ভিন্ন কথা। মেক্সিকান আর আমাদের গ্রোসারির ট্রলিগুলো যেন একেকটা মুদির দোকান। চেকআউট লেনে দাঁড়ালে মনে হয় কোনো ছোট দোকান ঘরের পিছনে দাঁড়িয়ে আছি। এতো বেশি বেশি খাবার উদরে যায় বলে আমাদের মগজে আর বেশী কিছু যায়না। হিসপানিক আর ভারতীয় অধ্যুষিত এলাকায় আপনি কোনো ভালো লাইব্রেরি কিংবা কোনো ভালো বইয়ের দোকান পাবেন না। এগুলো পাবেন শুধু সাদা বিশেষ করে ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায়। রান্না করে আর খেয়েইতো আমাদের জীবন শেষ। অধ্যাবসায়ের অতো সময় কোথায়? বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গ, স্টিভ জবস ওনাদের সামনে কোনোদিনও ইয়াবড় খাবারের প্লেট দেখিনি। যেমন দেখেছি-রাজা-বাদশাহ-আমীর ওমরাহদের সামনে। প্রিয় ভাই, চাচা, বাবা, দাদারা দয়া করে বউ, ভাবি, বোন, চাচী, মাসিদের রান্নাঘরের একচেটিয়া জীবন থেকে মুক্তি দিন। আর ভাবী, আপা আপনারাও একজনের সাথে আরেকজনের রান্নার আইটেম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা থেকে দয়া করে নিজেদের হেফাজত করুন। এক জনে পাঁচজনের জন্য প্রতিদিন পাঁচপদ রান্না না করে পাঁচজনে মিলে একপদ রান্না করুন। সম্পর্ক বাড়বে। ভালোবাসা তৈরি হবে। কষ্ট লাঘব হবে। কিচেনে আপনার সময় যত বাড়বে- ভাইয়ের ভুড়িও তত বাড়বে। আর এই ভুড়ি ভালোবাসা না। এটা সর্বনাশা। এটা জীবননাশা। জীবন ধারনের জন্য খেতেতো হবেই। কিন্তু রান্নাঘর আর ভোজন যেন আমাদের পুরো জীবনটাই খেয়ে না ফেলে- দয়া করে সেদিকে একটু লক্ষ্য রাখব। © আরিফ মাহমুদ

Wednesday, 16 August 2023

২১ দিন কী করেছেন তোফায়েল-রাজ্জাক?

◾আওয়ামী লীগের ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনীতির বড় পুঁজি হচ্ছে 'মুজিব হত্যা'। 'পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাকশাল-এর মুজিববাদী সমাজতন্ত্রের বিরোধী গণতন্ত্রপন্থী নেতাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এতে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে এবং একদলীয় শাসন উৎখাত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। এই রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তনকে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমান ও তার স্বজনদের নিছক খুনের ঘটনা বলে প্রচার করে। একসময় তারা খুনের বিচার চেয়ে রাজনীতি করতো। পরে খুন দেখিয়ে অভ্যুত্থানে জড়িত মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের তারা অধিকাংশের ফাঁসি কার্যকর করে। এরপর সেই রক্তাক্ত ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমান ও স্বাধীনতা-বিরোধীদের দায়ী করে রাজনীতি করতে থাকে। এর পাশাপাশি এবার তারা নিজেরাই আঙুল তুলেছে নিজেদের ঘরের দিকে। শেখ হাসিনা নিজেই এক লেখা লিখে তার দলের লোকদের দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়েছেন। তাদের একটি অনলাইন প্রোপাগান্ডা সাইট, সৈয়দ বোরহান কবিরের 'বাংলা ইনসাইডার' এ নিয়ে এক রচনা প্রচার করেছে। তাতে '৭৫-এর ১৫ আগস্টের অভিযানে আ.লীগের গৃহশত্রু বিভীষণদের ভূমিকা যাচাই করে দেখার জন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এ রচনা পাঠে আমি আমোদ পেয়েছি। আপনারাও যারা মজা পেতে চান, তারা পড়ে দেখতে পারেন।◾ ****************************************************** বাংলা ইনসাইডার-এর রচনা। শিরোনাম :
````````````````````````` ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে। যে কোনো সময় তদন্ত কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে- এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির একটি লেখা শোকাবহ আগস্টের আগের দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বেদনায় ভরা দিন’- শিরোনামে এই লেখাটি এখন টক অফ দা টাউন। এই লেখায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যর্থতা এবং নির্লিপ্ততা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সেই সময়ের জনপ্রিয় দুই তরুণ নেতার ভূমিকা নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রশ্ন তুলেছেন। এদের একজন প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক এবং অন্যজন তোফায়েল আহমেদ। প্রধানমন্ত্রীর লেখায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই দুই নেতাকে বঙ্গবন্ধু ফোন করেছিলেন, এদের একজন স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্বে ছিলেন এবং অন্যজন রক্ষী বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ সভাপতির এই লেখা আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এই দুই নেতার ব্যাপারে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সভাপতির এই লেখাই শেষ বিষয় নয়, আগস্টে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার ভূমিকা নিয়ে যতই গবেষণা করা যায়, ততই নিত্য নতুন তথ্য বের হয়। যে তথ্যগুলোতে সুস্পষ্টভাবে নেতাদের ব্যর্থতা, নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা এবং কাপুরুষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পরই খুনি মোশতাক নতুন সরকার গঠন করে এবং এই নতুন সরকারে আওয়ামী লীগের সব নেতাই যোগ দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো- খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় কোন প্রধানমন্ত্রী রাখা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর শেষ মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনসুর আলী। তিনি ১৫ই আগস্টের পর তার বাসায় অবস্থান করছিলেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- ১৭ই আগস্ট মনসুর আলীর সঙ্গে খুনি মোশতাক সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে কি আলাপ-আলোচনা হয়েছিল, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য সেই সময়ের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। তবে ১৫ই আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত মনসুর আলী, নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সামাদ আজাদ, কামরুজ্জামান ও কোরবান আলী কেউই গ্রেপ্তার হননি। তারা স্ব স্ব অবস্থানে ছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই ৮ দিন, অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তারা কি করলেন? তারা কি একটি প্রতিবাদও করতে পারলেন না? তারা কি ঘর থেকে বের হতে পারলেন না? তারা কি কর্মীদেরকে একটা নির্দেশ দিতে পারলেন না? এতোটুকুই ঝুঁকি যদি রাজনীতিতে কেউ না নেয়, তাহলে সে রাজনীতিকে কি বলা উচিত? জাতীয় চার নেতাসহ অন্যান্যদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২৩শে আগস্ট। তার আগে পর্যন্ত তারা আসলেই যথাযথ ভূমিকা পালন করেছিলেন কিনা?- সে প্রশ্ন ইতিহাসে অমীমাংসিত হয়েই থাকবে। তবে তোফায়েল আহমেদ এবং আব্দুর রাজ্জাকের দায়টি আরও বেশি। তোফয়েল আহমেদ এবং আব্দুর রাজ্জাক, দুজনই গ্রেপ্তার হন ৬ সেপ্টেম্বর। ১৫ই আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর, ২১ দিন। অর্থাৎ তিন সপ্তাহের ব্যবধান। এই তিন সপ্তাহ তারা গৃহান্তরীণ থাকুক, গৃহবন্দি থাকুক বা যে অবস্থায় থাকুন না কেন, তারা বাড়িতে ছিলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার হননি। এই সময়ে তারা কি করেছেন? তাদের সাথে কি খুনিরা কোনো সমঝোতার চেষ্টা করেছিল? খুনিরা তাদেরকে গ্রেপ্তারে এতো বিলম্ব করল কেন? তোফায়েল আহমেদ বা আব্দুর রাজ্জাকের মত বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ নেতারা-তো সাথে সাথেই খুনিদের চরম টার্গেট হওয়ার কথা, যেভাবে টার্গেট হয়েছিলেন শেখ মনি। সেক্ষেত্রে তোফায়েল আহমেদ আর আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তারে এতো বিলম্ব হলো কেন? তাদের সাথে কি কোনো দরকষাকষির চেষ্টা হয়েছিল?- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন। আর এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্যই প্রয়োজন একটি জাতীয় কমিশন গঠন। ⚫

Tuesday, 15 August 2023

সুখরঞ্জন বালি

একজন বহুদেববাদী সনাতন ধর্মাবলম্বী কিন্তু সত্য ন্যায়ের উপর তার ঈমানী জজবা ছিল ইস্পাত-দৃঢ়।গতকাল ও জানাজা কালে বেঈমান জালিমের সেবাদাসী উচ্ছিষ্টভোগী প্রশাসনের হাতে মৃত্যুঝুকি উপেক্ষা করে সবার সম্মুখে হাত তুলে আবার স্বাক্ষ্য দিয়েছেন আল্লামা সাঈদি নির্দোষ তার উপর জুলুম করা হয়েছে।