Friday, 9 January 2026

জামায়াত-শিবির ধর্মকে ব্যবহার করছে।

গ্রাম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত জামায়াত-শিবির ধর্মকে ব্যবহার করছে। কখনো জান্নাতের নামে, কখনো হিজাবের নামে, কখনো নারায়ে তাকবির স্লোগানের নামে । তবে গ্রামের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মের প্রভাব বেশি । কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ আইডেনটিটি ক্রাইসিসে ভোগে । তারা শহর, গ্রাম, মফস্বল যেখান থেকেই এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক না কেন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তা বা অধিকার বোধের তুলনায় ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি জানাশোনা, নিয়মিত চর্চা করাটা বেশি হয়। বিশেষত নারীদের ভেতর। তারা ধর্মকে নিজের বা সমাজের নিরাপত্তার আশ্রয় হিসেবে দেখে। তার বেড়ে ওঠার ভেতর এই জিনিসটা তৈরি হয়েছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হলেও তার নিরাপত্তা বা ধর্ম পালনের পরিপূর্ণ অধিকার এ দেশে নাই । এই ধারণা তার ভেতর তীব্র করেছে শেখ হাসিনার শাসনামল। বিশেষত ২০১৩ সালে তারা চোখের সামনে এসব দেখেছে । আমরাও বলেছি যে ইসলামি ভাবধারা বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে অনুপস্থিত। এখানে কলকাতার ভাষা-সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ চলছে । এবং ব্রিটিশ আমলের মতো বাঙালি মুসলমানদের নিজের দেশেই খাটো করে রাখা হচ্ছে । “বাঙালি মুসলমান”, এই টার্মও ইউজ করা যেত না। দাড়ি-টুপি দেখলে হেয় করা হতো, ট‍্যাগ দেওয়া হতো । শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে অনেক ঘটনা আছে যেখানে আলেমদের হ** করা হয়েছে । গুম, মেরে ফেলা তো আছেই । এই সময়ে ইসলামপন্থীরা মব করে হামলার ঘটনা কমই ঘটাইছে বা ঘটায় নাই । বিবাড়িয়ায় ওস্তাদ আলাউদ্দি খাঁর বাড়ি-ঘর ভাঙার ঘটনা আছে। কিন্তু সেটা আসলে কারা করেছে পরিস্কার না। আওয়ামী লীগ মুসল্লিদের মেরে ফেলার পর নিজেরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে সন্দেহ আছে। . এমন পরিস্থিতির ভেতর আমরা আবার দেখেছি যে, প‍্যারাডক্সিকেল সাজিদ জনপ্রিয় হচ্ছে । কাসেম বিন আবু বাকার নামে এক মৃতপ্রায় লেখককে জীবিত করছে বিদেশি মিডিয়া । তাদের বই পড়া হচ্ছে গণহারে। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত । অনেক ঘটনা পাওয়া যাবে তখনকার এই প‍্যা. সাজিদ পড়া নিয়ে। শিক্ষার্থীরা এসব পড়েছে কারণ মেনস্ট্রিম মিডিয়ায় তারা অনুপস্থিত, নাটক-সিনেমায় তারা নাই। ওই সময় থেকে কলকাতার জি-বাংলার সিরিয়ালের বিপরীতে টার্কিশ নাটক পপুলার হতে থাকে। বইমেলায় ইসলাম পন্থী বই বিক্রি বেড়ে যায়। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত অনুবাদ বইয়ের চাহিদা বাড়ে । কোনো প্রকাশনা সংস্থা আলাদা করে ইসলামি কর্নার খোলে। . এই ভয়ে প‍্যারা. সাজিদ বই সেটাও আওয়ামী লীগ বা দিল্লি ইন্টেলিজেন্স পেনিট্রেট করেছে । তা না হলে যে স্ক্রুনিটির ভেতর দিয়ে দেশের প্রকাশক, লেখকদের যেতে হয়েছে, সেখানে এ বই কীভাবে এত প্রচার পেতে পারে। এই ইন্টেলিজেন্স চেয়েছিল যে এখানে ধর্মের নামে একটা গভীর সামাজিক বিভাজন তৈরি হোক। এমন একটা মনস্তত্ত্ব তৈরি হোক যাদের অবদমিত মন বলবে আমিই ইসলাম । এই মনস্তত্ত্ব যে বাংলাদেশে ছিল না তা না। তসলিমা নাসরিনের ফাঁসির দাবির সময়েই দেখা গেছে যে এই মানসিকতা এখানকার ইসলামপন্থীদের আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছিল না। আগে হুমায়ূন, সমরেশ, সুনীল পড়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত, এখন আসছে প‍্যারা. সাজিদ পড়ে, টার্কিশ সিরিয়াল দেখে বা ইউটিউবে ইসলামি জজবার নাটক দেখে। এখানে একটা বিষয় হলো যে, এসব স্টুডেন্টরা যার যার লাইফস্টাইলে যেমন হোক রাজনীতির প্রশ্নে ইসলামকে রাখতে চায়। এটা তাদের পলিটিক্যাল ইসলাম। তাদের রাজনৈতিক জ্ঞান এটা যে, তারা এন্টি শাহবাগী। শাহবাগ যেহেতু ইসলামকে বা মুসলমানদের দমন করতে চেয়েছে। তাদের ইসলামপন্থা সে কারণে এন্টি শাহবাগ। এই গভীর বিভাজন আওয়ামী লীগের তৈরি করা। . আরেকটা বিষয় হলো, প‍্যারা সাজিদের যুক্তি করার ধরন আর শিবিরের যুক্তি করার ধরন সেম। এই যুক্তির ভিত্তি হলো প্রতিপক্ষ তৈরি করা যে কোনো উপায়ে। যে যাই বলুক, খাটুক বা না খাটুক অপরকে কনডেম করে তারা যুক্তির নামে জবরদস্তি চালায় । যুক্তির এ ধরন নিয়ে আরেকদিন কথা বলা যাবে। . এখানে মূল কথাটা আসলে বলতে চেয়ে ছিলাম, জুলাই অভ্যুত্থান কিন্তু ইসলামি পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য হয় নাই । তবে জুলাইয়ের পর এ জিনিসটাকে আবার জাগিয়ে তোলা হয়েছে। এই সময়ে মাজার ভাঙা থেকে শুরু করে কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো বা জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে । অথচ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা এটা নিয়ে বিক্ষোভ করে নাই । কিন্তু তাদের অনেককে দেখা গেছে ছাত্ররাজনীতি, হিজাব, নারায়ে তাকবির স্লোগান-এসব ইস্যুতে বিক্ষোভ করতে । এতক্ষণ যে আলোচনাটা করলাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যে সেন্টিমেন্ট সেটা শিবিরের কাজ করার একটা উর্বর ক্ষেত্র । অন‍্যরা জল ঘোলা করছে আর তারা সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে । বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই যে সেন্টিমেন্ট সেটা গন্তব্যহীন বা অন্ধ । তারা দেখেছে যে ভারত তাদের দমিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর। হাসিনাকে খেলানোর পর সেখান থেকে তারা মুক্ত। কিন্তু এরপর কি তারা জানে না। এই শূন্য অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে শিবির। তারা সবকিছুতে ধর্মকে প্রবিষ্ট করছে। ফলে এখানে ভারত বিরোধিতা মানে নারায়ে তাকবির স্লোগান । হিজাব পরতে আওয়ামী লীগ মানে ইন্ডিয়া বাধা দিত, এখন ছাত্রদল দিচ্ছে । সেই একই বৃত্ত। শিক্ষার্থীদের অনুভূতি নিয়ে এই খেলায় অবশ্য শিবির একজন খেলোয়াড় মাত্র । বিস্তৃত ইনফ্রাস্টাকচার আছে এর পেছনে। আওয়ামী লীগের তৈরি করা সামাজিক বিভাজনের যে মনস্তত্ত্ব, সেটাকে তারা কাজে লাগাচ্ছে । সহজে কাউকে ভারতের দালাল বলা, ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হলে মির্জা আব্বাসকে দায়ী করতে পারা-এই যে আওয়ামী সাইকি এখনো রয়ে গেছে মানুষের ভেতর সেটা আরো বাড়িয়ে বড় করতে চাইছে তারা। বিষয়টা সবার বুঝে উঠতে সময় লাগবে। . তবে এটাকে সফ্ট ডানপন্থার উত্থান হিসেবে দেখাটা ভুল হবে। এটা সফট ডানপন্থা না, এটা একটা তৈরি করা পরিস্থিতি । জোর করে দেখানো হচ্ছে ডানপন্থাকে। মানুষের সেন্টিমেন্ট নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে ।

No comments:

Post a Comment